জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণেই অত্যন্ত বৈরি রূপ নিচ্ছে আবহাওয়া। এর ফলে বিভিন্ন দেশে আকস্মিক ঝড়, বন্যা, দাবানল ও খরার মতো দুর্যোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশে এখন বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় তাপদাহ; ভারত, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে বন্যা হচ্ছে। দেশে দেশে আকস্মিক বৃষ্টিপাতের প্রভাবে ভূমিধসের ঘটনা বেড়েছে। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ও টর্নেডোও বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব দুর্যোগে ২০২০ সালে তিন কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ইন্টার্নাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার (আইডিএমসি)। বিজ্ঞানীরা আগে থেকে সতর্ক করে আসছেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে চরম আবহাওয়ার কবলে পড়বে পৃথিবী। গবেষকদের সেই আশঙ্কার বাস্তব রূপ বর্তমানে দেখছে বিশ্ব।

ভারত, পাকিস্তান, চীন, জার্মানিসহ এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে বন্যা হচ্ছে। ভারতের মহারাষ্ট্রে গত দু-তিন দিন টানা বৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে মুম্বাইসহ বেশিরভাগ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। টানা বৃষ্টিপাতের কারণে মহারাষ্ট্রে বৃহস্পতিবার তিনটি ভূমিধসে ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভূমিধসের কারণে এখনও ৩৫ থেকে ৪০ জন আটকা পড়ে আছেন। উদ্ধারকারী দল তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করছে।

শুক্রবার চীনা কর্তৃপক্ষ জানায়, রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিতে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে তছনছ হয়ে গেছে চীনের হেনান প্রদেশ। এরই মধ্যে সেখানে ৫১ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ঘরছাড়া হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। অনেক জায়গায় ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। চাপা পড়েছে বাড়িঘর। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা সংকেত দেওয়ায় শুক্রবার ঝেনঝু অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানে বৃষ্টিপাত সংশ্নিষ্ট দুর্যোগে বৃহস্পতিবার অন্তত ১৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে। শুক্রবার কর্তৃপক্ষ জানায়, খাইবার পাখতুনখোয়ায় টানা মৌসুমি বৃষ্টিতে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে ৪০ জনের মতো হতাহত হয়েছেন।

জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলে সাম্প্রতিক রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতজনিত বন্যায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনও শত শত লোক নিখোঁজ রয়েছেন। উত্তর-পশ্চিম ইউরোপজুড়ে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে জার্মানি ছাড়াও বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস এবং সুইজারল্যান্ডে বর্তমানে বন্যা হচ্ছে। বেলজিয়ামে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপে গত কয়েক দশকের মধ্যে এটিই দেশটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা।

বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই সতর্ক করছিলেন, মানুষের কর্মকাে র জন্য জলবায়ুতে যে পরিবর্তন হচ্ছে তার পরিণামে ঠিক এই রকম অতিমাত্রায় বৃষ্টিপাতের মতো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটবে।

গত মাসে কানাডায় সর্বকালের উচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় দাবানলে মাত্রাতিরিক্ত তাপজনিত কারণে হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

২০২০ সালে আবহাওয়ার অবনতি ও সহিংসতার ফলে ঘরছাড়া হয়েছেন চার কোটি মানুষ। তার মধ্যে শুধু জলবায়ুজনিত দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন তিন কোটি মানুষ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার আবহাওয়াকে উষ্ণ করে তুলছে, যার কারণে বাড়ছে বিরূপ প্রভাব। এর ফলে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ অপ্র্যাশিত বন্যা বা ঝড়ের কারণে ঘর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। একই সঙ্গে এ বছর থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও চরম হচ্ছে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব। গবেষকরা বলছেন, যেভাবে ঘন ঘন দুর্যোগ আঘাত হানছে, তাতে চলতি বছরের মধ্যে রেকর্ড ভেঙে সাড়ে পাঁচ কোটি ছাড়াবে শরণার্থী। বহু মানুষকে ছাড়তে হবে নিজ দেশ।

আইডিএমসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০২০ সালে বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষের ৮০ শতাংশই এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের বাসিন্দা। যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।

এসব কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিবাসন নিয়ে কর্মরত গবেষকরা বিভিন্ন দেশকে অবিলম্বে তাদের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনতে আহ্বান জানিয়েছেন। তা না হলে পরিস্থিতি আরও বিপর্যয়কর হবে বলে হুঁশিয়ার করেন তারা। তথ্যসূত্র :এএফপি, রয়টার্স, বিবিসি ও ডয়চে ভেলের।

মন্তব্য করুন