আফগানিস্তান থেকে বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রতিনিয়ত তালেবানের কাছে বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে সরকারি বাহিনী। বর্তমানেও বিভিন্ন প্রদেশে কট্টরপন্থিদের সঙ্গে লড়াই চলছে সেনাবাহিনীর। ফলে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে বহু মানুষ। তালেবানের দখলে যাওয়া এলাকাগুলোয় জারি করা হচ্ছে তাদের নিয়মনীতি। এমন সহিংসতা ও কট্টরপন্থিদের উত্থানের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন বিদেশিদের পক্ষ হয়ে কাজ করা আফগান দোভাষীরা। তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না বলে তালেবান প্রতিশ্রুতি দিলেও ইতোমধ্যে কয়েকশ দোভাষী খুন হয়েছেন। অনেকেই মৃত্যুভয়ে আত্মগোপনে গেছেন। এমন পরিস্থিতিতে তাদের অভিবাসন ভিসা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার কর্মসূচি দেওয়া হলেও তাও চলছে অনেক ধীরগতিতে। তারপরও যাদের নেওয়া হয়েছে তাদের রাখা হয়েছে সেনাক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণে গৃহহীন অবস্থায়। কার্যত দেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটোর হয়ে কাজ করে উভয় সংকটে পড়েছেন তারা।

আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে বহু আফগান তাদের সহযোগিতা করতে দোভাষীর কাজ করেছেন। তবে এখন দেশটি থেকে সব বিদেশি সেনা প্রত্যাহার করার প্রক্রিয়ার মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা চালিয়ে দখলে নিচ্ছে তালেবান। এমন পরিস্থিতিতে এই দোভাষীসহ যারা বিদেশিদের সহায়তা করেছিলেন, তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করছে কট্টরপন্থিরাই। তাদের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৮ সাল থেকে ৭০ হাজার আফগান দোভাষী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের জন্য বিশেষ অভিবাসন ভিসা দেওয়া হয়েছে। এখনও দেশ থেকে বের হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে ২০ হাজার দোভাষী ও তাদের পরিবার।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বলছে, জীবন বাজি রেখে যারা তাদের জন্য কাজ করেছে তাদের প্রতি ওয়াশিংটনের দায়িত্ব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর দোভাষী এবং অন্যান্য সহযোগীদের নিয়ে দেশটিতে আশ্রয় ও পুনর্বাসনের জন্য ইতোমধ্যে জরুরি তহবিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে এই ভিসা প্রক্রিয়া জটিল এবং দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে আবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ন্যাটো দেশভুক্ত আর যেসব দেশ আফগানিস্তানের সেনা মোতায়েন করেছিল তারা তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করা আফগানদের আশ্রয় দেওয়া নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

গত জুনে তালেবান নেতৃত্ব এক বিবৃতিতে আশ্বাস দেয়, পশ্চিমা বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছেন এমন লোকজনের কোনো ভয় নেই। কিন্তু সেই আশ্বাসে শুধু আফগানরা নয়, বিদেশি রাষ্ট্রগুলোও ভরসা পাচ্ছে না। কারণ, 'নো ওয়ান লেফট বিহাইন্ড' নামে যুক্তরাষ্ট্রের যে এনজিও আফগানদের আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে কাজ করছে, তাদের এক হিসাবে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০০ আফগান দোভাষী বা তাদের পরিবারের সদস্য খুন হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার আফগান দোভাষীদের ২২১ জনের একটি দল কাবুল থেকে একটি বিমানে ওয়াশিংটনের ডালেস বিমানবন্দরে নেওয়া হয়েছে। পরে তাদের সেখান থেকে বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় ১৩০ মাইল দূরে ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে ফোর্ট লি সেনা ঘাঁটিতে। বাসস্থানের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই একটি হোটেলে আপাতত কড়া নিরাপত্তার ভেতরে থাকবে তারা।

আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর দোভাষী হিসেবে বা অন্যান্য সহকারীর ভূমিকায় যারা কাজ করত তাদের এবং তাদের পরিবারের সদস্য মিলিয়ে ২৫০০ জনকে জরুরি ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আশ্রয় দেওয়ার জন্য সম্প্রতি সিদ্ধান্ত হয়েছে। তার অংশ হিসেবে প্রথম বহরে ওই ২২১ জনকে নেওয়া হয়। এই দলে রয়েছে ৫৭টি শিশু এবং ১৫টি অল্প বয়সী বাচ্চা। কার্যত তারা হয়েছে গৃহহীন। এর আগে যাদের নেওয়া হয়েছে তাদের অভিযোগ, তাদের শরণার্থী ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। আফগান দোভাষীদের বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে থাকলে তালেবানের হাতে মৃত্যুর ভয় আর যুক্তরাষ্ট্রে গেলে গৃহহীন শরণার্থী। তথ্যসূত্র :বিবিসি, রয়টার্স।

মন্তব্য করুন