পারমাণবিক সাবমেরিন বিক্রির চুক্তিকে কেন্দ্র করে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অভিযোগ তুলেছেন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-ইভেস লে ড্রিয়ান। এর আগে গত শুক্রবার অকাস চুক্তির প্রতিবাদে দেশ দুটিতে নিযুক্ত নিজেদের রাষ্ট্রদূতদের ডেকে পাঠিয়েছিল ফ্রান্স। পাশাপাশি ত্রিদেশীয় নিরাপত্তা চুক্তির অন্যতম অংশীদার যুক্তরাজ্যকে 'সুযোগসন্ধানী' বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এদিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন মিথ্যা বলার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তির চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে পারমাণবিক সাবমেরিন পেতে অস্ট্রেলিয়াকে আরও অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এই অপেক্ষা ২০৪০ সাল পর্যন্ত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন মরিসন। খবর বিবিসি, এএফপি ও এনডিটিভির।

স্থানীয় সময় গত শনিবার টেলিভিশন চ্যানেল ফ্রান্স-২-এর সঙ্গে এক আলাপচারিতায় অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অভিযোগ আনেন ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সম্পাদিত অকাস নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ ও অপমানজনক আচরণ করেছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। নতুন এই চুক্তি মিত্র দেশগুলোর সম্পর্কের মধ্যে 'মারাত্মক সংকট' সৃষ্টি করেছে বলে উল্লেখ করে জ্যঁ-ইভেস লে ড্রিয়ান বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের সম্পর্কের ইতিহাসে এই প্রথম আমরা আমাদের রাষ্ট্রদূতদের ডেকে আনলাম। এটি একটি গুরুতর রাজনৈতিক পদক্ষেপ। দুই দেশের সম্পর্কে সংকট কতটা, তা এ থেকে বোঝা যাচ্ছে।'

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে চুক্তি হয়। এইউকেইউএস নামে এই চুক্তির অধীনে অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক সাবমেরিনের প্রযুক্তি সরবরাহ করবে ওই দু'দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার এই চুক্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফ্রান্স। কারণ, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে দেশটির সাবমেরিন সংশ্নিষ্ট একটি চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তির আর্থিক মূল্য চার হাজার কোটি মার্কিন ডলার। দু'দেশের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার নতুন এই চুক্তির মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ফ্রান্সকে বিষয়টি জানানো হয়। ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ফ্রান্সের নৌযান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নেভাল গ্রুপের কাছ থেকে তারা নতুন সাবমেরিন তৈরি করে নেবে। নতুন এই সাবমেরিন প্রতিস্থাপিত হবে পুরোনো কলিন্স সাবমেরিনের জায়গায়। গত জুনে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন যখন ফ্রান্সে গিয়েছিলেন, তখন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোনও দু'দেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার কথা বলেছিলেন। দুই সপ্তাহ আগেও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেছিলেন, তারা ফ্রান্সের কাছ থেকেই এই সাবমেরিন তৈরি করে নেবেন। কিন্তু দুই সপ্তাহের ব্যবধানে হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে অস্ট্রেলিয়া।

অকাস চুক্তি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত নিজ দেশের রাষ্ট্রদূতদের ডেকে পাঠালেও চুক্তির অন্যতম অংশীদার যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতকে দেশে ফিরতে বলা হয়নি। এ নিয়ে জ্যঁ-ইভেস লে ড্রিয়ান বলেন, যুক্তরাজ্য থেকে রাষ্ট্রদূতদের ডেকে পাঠানোর কোনো মানে হয় না। দেশটি আগে থেকেই 'সুযোগসন্ধানী'।

এদিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন ফ্রান্সের আনা মিথ্যা বলার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তি রক্ষার চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কী কারণে চুক্তি বাতিল করেছি সেটা তাদের বুঝতে হবে। ফ্রান্স আমাদের যে সাবমেরিন দিতে চেয়েছিল, তা আমাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।'

পারমাণবিক সাবমেরিনের 'বুমারস' ও 'অ্যাটাক' প্রযুক্তির মধ্যে অস্ট্রেলিয়া 'অ্যাটাক' প্রযুক্তির সাবমেরিনের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে জানা গেছে। এই প্রযুক্তির সাবমেরিন পেতে অস্ট্রেলিয়াকে আরও অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছেন স্কট মরিসন। বিশেষ করে তা কয়েক দশক পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। গত বুধবার তিন দেশের যে চুক্তি হয়েছে, তাতে ১৮ মাস গবেষণা করে অস্ট্রেলিয়ার জন্য উপযোগী সাবমেরিন তৈরির বিষয়টি ঠিক করা হবে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ার নৌবহরে নতুন সাবমেরিন যুক্ত হতে ২০৪০ সাল পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

মন্তব্য করুন