বিশ্বের শীর্ষ দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্ভাব্য ভয়ংকর স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। এই যুদ্ধ এড়াতে দুই দেশকে তাদের মধ্যকার নিষ্ফ্ক্রিয় সম্পর্ক দ্রুত মেরামত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক ইস্যুতে আজ শুরু হচ্ছে বিশ্বনেতাদের বৈঠক। ঠিক তার আগে গত শনিবার বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্নায়ুযুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে বিশ্বকে সতর্ক করলেন গুতেরেস।

করোনা মহামারির কারণে গত বছর সংক্ষিপ্ত পরিসরে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন। আন্তর্জাতিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরাসরি আলোচনা করতে পারেননি বিশ্বনেতারা। সাধারণ অধিবেশনের পাশাপাশি প্রতিটি দেশের আলাদা আলাদা এজেন্ডা থাকে। দ্বিপক্ষীয় পার্শ্ব বৈঠকে জাতিসংঘে আলোচনা করে সমাধানের পথও বের হয়। এক বছর পর আবার সরাসরি বৈঠকে বসছেন বিশ্বনেতারা। এবার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু রক্ষা ও করোনা মোকাবিলা। এ দুই ইস্যুসহ দক্ষিণ চীন সাগরের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্ব বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য রয়েছে। এ অবস্থায় জাতিসংঘে এক টেবিলে বসতে যাচ্ছেন দুই পরাশক্তির প্রেসিডেন্টরা। এমন সময়ে তাদের মধ্যকার বিভেদ কমিয়ে বিশ্বকে নতুন একটি স্নায়ুযুদ্ধের ঝুঁকি থেকে রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন গুতেরেস।

এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গুতেরেস বলেছেন, 'যে কোনো মূল্যে সম্ভাব্য স্নায়ুযুদ্ধ ঠেকাতে হবে আমাদের। এটি শুরু হলে তা হবে আগের স্নায়ুযুদ্ধের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা, আরও ভয়ংকর এবং তা কাটিয়ে ওঠা হবে খুবই কঠিন।' তিনি বলেছেন, বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনৈতিক শক্তিকে জলবায়ু রক্ষার বিষয়ে সহযোগিতা করতে হবে এবং বাণিজ্য ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সমাঝোতার উপায় বের করতে হবে। একইসঙ্গে মানবাধিকার, অর্থনীতি, অনলাইন নিরাপত্তা ও দক্ষিণ চীন সাগর দাবি করা চীনের সার্বভৌমত্বের বিতর্কিত ইস্যুতে মতবিরোধ নিষ্পত্তিতে দুই দেশকে এগিয়ে আসতে হবে।

গুতেরেস বলেন, 'দুর্ভাগ্যজনক, আজ আমরা শুধু সংঘাত দেখছি।' তিনি বলেন, 'দুই পরাশক্তির মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপিত হওয়া আমাদের জন্য এখন খুবই প্রয়োজন।' চীন-যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্যান্য সুপারপারওয়াকেও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব। তিনি বলেন, 'অনেক বৈশ্বিক সমস্যার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে টিকা সমস্যা ও জলবায়ু সংকট নিয়ে আলোচনা করা খুবই জরুরি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে সুপারপাওয়ারদের মধ্যে গঠনমূলক সম্পর্ক ছাড়া এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।'

দুই বছর আগেও জাতিসংঘ মহাসচিব বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে ঘিরে দুই শিবিরে ভাগ হয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। মুদ্রানীতি, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে নিজ নিজ স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে দুই দেশ। এ ছাড়া ভূরাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। সেই আশঙ্কা পুনর্ব্যক্ত করে জাতিসংঘ সম্মেলন উপলক্ষে এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গুতেরেস বললেন, 'প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পরাশক্তির ভূরাজনীতি ও সামরিক কৌশল বিপদের বার্তা দিচ্ছে এবং তা বিশ্বকে দুই শিবিরে ভাগ করে ফেলবে।'

দ্বিতীয় যুদ্ধের পর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তাদের প্রাচ্যের মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের পশ্চিমা মিত্রদের স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত পতনের মধ্য দিয়ে তা শেষ হয়। তখনকার দুই শীর্ষ পরাশক্তির মতাদর্শিক লড়াই ছিল এটি। একদিকে সমাজতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদ এবং অন্যদিকে গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদ। তবে এবার স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হলে তার রূপ আগের চেয়ে ভয়ংকর হবে।

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়াকে সাবমেরিন দেওয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, তাতে দেশটিকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবাধ গোপন অভিযান চালানোর সুযোগ দেবে। জটিল ধাঁধার এটি ছোট্ট একটি নমুনা, যা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একেবারে নিষ্ফ্ক্রিয় সম্পর্কের উদাহরণ।

মন্তব্য করুন