আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনের আগে জাতিসংঘের বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বদলাতে ধনী দেশগুলোর লবিংয়ের নথি ফাঁস হয়েছে। বিবিসির হাতে আসা এসব নথিতে দেখা গেছে, বেশকিছু সম্পদশালী দেশ আসন্ন কপ২৬ সম্মেলনে উত্থাপিত হতে যাওয়া ওই প্রতিবেদন পরিবর্তনের জন্য লবিং করছে। সৌদি আবর, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি কিছু দেশ জাতিসংঘকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দ্রুত সরে আসার প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করতে অনুরোধ করেছে। এ ছাড়া তারা দরিদ্র দেশগুলোকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে আরও বেশি অর্থায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এ কারণে আসন্ন সম্মেলনের সফলতা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জাতিসংঘের বিশেষ কমিটি ইন্টারগভার্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) প্রতি ছয় থেকে সাত বছরে একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। ওই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার নীতিনির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় করণীয় ঠিক করতে এবং কার্বন নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে কয়েক বছর পরপর আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন-কপ অনুষ্ঠিত হয়। এবার আগামী ১২ নভেম্বর স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে কপ-২৬ অনুষ্ঠিত হবে। এ সম্মেলনের জন্য জলবায়ু প্রতিবেদন তৈরির মধ্যেই এ-সংক্রান্ত নথি ফাঁস হয়েছে।

নথিতে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি দেশ ওই প্রতিবেদন বদলাতে অনুরোধ করেছে কিংবা কোনো সুপারিশ বাদ দিতে বলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতিসংঘের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপাত্ত পরিবর্তনে এসব দেশ কউভাবে চেষ্টা করেছে, তা পরিলক্ষিত হয়। জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে উত্থাপনের জন্য যে সুপারিশমালা প্রস্তুত করছে, তাতে জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশের ক্ষেত্রে ধীর নীতি অবলম্বন এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার হার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার অনুরোধ করেছে এসব দেশ। এদিকে ফাঁস হওয়া নথিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধের সুপারিশে আপত্তি জানাতে দেখা যায় ভারতকে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পর ভারত তৃতীয় সর্বোচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ।

বিবিসির কাছে এমন ৩২ হাজার নথি এসেছে, যেগুলো বিভিন্ন দেশের সরকার, কোম্পানি ও অন্য আগ্রহী অংশীদাররা জাতিসংঘের ওই বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন তদারকি প্যানেলের কাছে উপস্থাপন করেছে। সেই প্যানেল জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার সবচেয়ে ভালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ জড়ো করার কাজ করছে।

ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা গেছে, কিছু সংখ্যক দেশ ও সংস্থা বিতর্কের সুরে বলছে, বিশ্বে বর্তমান সুপারিশ অনুযায়ী এত দ্রুত জীবাশ্ম জ্বালানি হ্রাস করার দরকার নেই। সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন উপদেষ্টা দাবি করেছেন, সব ক্ষেত্র থেকে দ্রুত ও তাৎক্ষণিক হ্রাস কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তার মতো অনুচ্ছেদ প্রতিবেদন থেকে বাদ দেওয়া উচিত। অস্ট্রেলিয়া সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধের প্রয়োজনীয়তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভারতের সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অব মাইনিং অ্যান্ড ফুয়েল রিচার্সের এক বিজ্ঞানী সতর্ক করে বলেছেন, কয়লা আগামী কয়েক দশক ধরে শক্তি উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি হিসেবে বিদ্যমান থাকবে।

সৌদি আরব, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের মতো বড় জ্বালানিনির্ভর দেশগুলো বরং কার্বন ধারণ এবং সংরক্ষণের (কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ-সিসিএস) নীতির পক্ষে মত দিচ্ছে। আইপিসিসি বলছে, বিভিন্ন সরকারের মন্তব্যগুলো বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনের পর্যালোচনায় রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সব কিছুই বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হচ্ছে।

মন্তব্য করুন