তালেবান নেতৃত্বাধীন আফগানিস্তানে খাদ্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আগস্টে কট্টরপন্থিদের হাতে দেশের ক্ষমতা যাওয়ার পর থেকে বৈদেশিক সহায়তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া দেশটিতে গত বছরে দুইবার খরায় ফসল উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক সহায়তা-নির্ভর দেশটির বেশিরভাগ মানুষ খাদ্য সংকটে পড়েছে। দিন দিন অনাহারীর সংখ্যা সেখানে বেড়েই চলেছে। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ খাদ্য সংকটে রয়েছে। এরই মধ্যে পশ্চিম কাবুলে খাদ্যাভাবে আট শিশুর মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মানবিক বিপর্যয় রোধে আফগানদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। খবর আলজাজিরা ও এনডিটিভির।

জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, আফগানিস্তানে খাদ্য পরিস্থিতি ধসে পড়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে শীতে লাখো আফগান শিশুকে অনাহারে থাকতে হবে। সোমবার আরব আমিরাতের দুবাইয়ে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বিসলে বলেন, দেশটির ৩ কোটি ৯০ লাখ নাগরিকের মধ্যে ২ কোটি ২৮ লাখ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় রয়েছেন। তাদের অনাহারে থাকতে হচ্ছে। অথচ দুই মাস আগে এ সংখ্যা ১ কোটি ৪০ লাখ ছিল। এ ছাড়া পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩২ লাখ শিশুও খাদ্যাভাবের কারণে অপুষ্টিতে ভুগছে।

তিনি আরও বলেন, 'শিশুরা না খেয়ে মারা যাচ্ছে। অনাহারে দিন কাটাচ্ছে মানুষ। এগুলো আরও ভয়াবহ খারাপ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে।'

ডেভিড বিসলে আরও বলেন, 'অর্থনীতি ভেঙে পড়া এবং তহবিল স্বল্পতার মধ্যে খাদ্য সংকটের কারণে সেখানে শিশুসহ লাখো মানুষ মৃত্যুর মুখে- এ অবস্থায় কীভাবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া যায়, আমি তা জানি না।'

গত সেপ্টেম্বরে ডব্লিউএফপি সতর্ক করে জানিয়েছিল, কেবল ৫ শতাংশ আফগান পরিবারের কাছে খেয়ে বেঁচে থাকার মতো খাবারের ব্যবস্থা আছে। এরপর অক্টোবরে সংস্থাটি জানায়, ১০ লাখ শিশু ভয়াবহ পর্যায়ের পুষ্টিহীনতার শিকার হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে।

জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা এখন বলছেন, আফগানিস্তান পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ মানবতার সংকটে ভুগতে থাকা দেশের মধ্যে অন্যতম। এখন তাদের জীবন বাঁচাতে শিগগির জরুরি সেবা সহায়তা প্রয়োজন।

এরই মধ্যে রোববার নিউজ এশিয়া ইন্টারন্যাশনাল জানায়, কাবুলের পশ্চিমাঞ্চলে অনাহারে আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দেশটির সাবেক আইনপ্রণেতা হাজি মোহাম্মদ মোহাকেক বলেন, এ অঞ্চলে সংখ্যালঘু শিয়া মতাবলম্বী হাজারা সম্প্রদায়ের বাস। যে শিশুরা মারা গেছে, তারা সবাই এ সম্প্রদায়ের।

গত আগস্টে আফগানিস্তান দখলের পর সেপ্টেম্বরে সরকার গঠন করে তালেবান। এরপর থেকে দেশটির অর্থনীতি শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। এরই মধ্যে পশ্চিমাদের চলমান ত্রাণ প্রকল্পও স্থগিত হয়ে যায়। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফও তাদের অর্থ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি এসব কারণে মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয় দেশটিতে। এরই মধ্যে দেশটির গ্রামাঞ্চলের মতো শহরে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পরিচালক কিউ ডংইউ জানান, আফগানিস্তানে জরুরি ভিত্তিতে ও কার্যকরভাবে খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। শীতে দেশটির বড় একটি অংশে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আগেই কাজটি করতে হবে। সময়মতো উদ্যোগ না নিলে নারী, শিশু, বয়স্ক ও কৃষকসহ লাখো মানুষ প্রচণ্ড শীতের মধ্যে অভুক্ত থাকবেন।

পরাজয় নিশ্চিত জেনেই তালেবানের সঙ্গে সমঝোতা করে যুক্তরাষ্ট্র- জালমে খলিলজাদ :যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তানবিষয়ক সাবেক বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ বলেন, তালেবানের কাছে যুদ্ধে হেরে যাচ্ছিল দেখে বিকল্প হিসেবে আলোচনার পথ বেছে নেয় ওয়াশিংটন। সিবিএস নিউজের সঙ্গে আলাপকালে খলিলজাদ বলেন, 'আমরা (যুক্তরাষ্ট্র) যুদ্ধে জিততে যাচ্ছি না- এমন বিচার-বিবেচনার ফলই (তালেবানের সঙ্গে) সমঝোতা। সময় আমাদের পক্ষে ছিল না।'

তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী :তালেবানের সঙ্গে বৈঠকে করছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। গতকাল কাতারের রাজধানী দোহায় দু'দিনব্যাপী এ বৈঠক শুরু হয়। সূত্র জানায়, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রে আফগানিস্তানের জব্দ করা অর্থ ছাড় করানো এবং মানবিক সহায়তা ইস্যুতে গুরুত্ব আরোপ করছে উভয়পক্ষ।

মন্তব্য করুন