উগ্র ধর্মান্ধতার আগুনে পুড়ছে পাকিস্তান। ধর্ম রক্ষার নামে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে প্রায়ই দেশটি অশান্ত হয়ে ওঠে। এতদিন এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী নিজ দেশের মানুষকে হত্যা-নির্যাতন করলেও গত শুক্রবার শ্রীলঙ্কার এক নাগরিককে পিটিয়ে হত্যার পর পুড়িয়ে দিয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তানজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। ঘটনার সঠিক তদন্ত ও বিচারকাজে সহায়তা দিতে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে সেনাবাহিনী। এই বর্বরতায় নিন্দার ঝড় বইছে বিশ্বজুড়ে।

শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টে এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দ্রুত বিচার দাবি করা হয়েছে। দোষীদের দ্রুত শাস্তির দাবি জানিয়ে উগ্রবাদীদের প্রতিহতের আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টিসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। নিহত শ্রীলঙ্কার নাগরিকের নাম প্রিয়ান্থা কুমারা। তিনি পাঞ্জাবের ক্রীড়াসামগ্রী তৈরি কারখানা রাজকো ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপক হিসেবে প্রায় ১০ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

ঘটনার শুরু গুজব থেকে। গুজব উঠেছিল যে কুমারা কোরআনের বাণী লেখা পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেছেন। এই অভিযোগ ওঠার পর শুক্রবার সকালে ওই কারখানার মূল ফটকে ভিড় করতে শুরু করে একদল লোক। পরে কারখানায় ঢুকে তাকে জিম্মায় নেয় তারা। এ সময় তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন সহকর্মীরা। পরে পিটিয়ে হত্যার পর তার মরদেহ পুড়িয়ে দেয় ক্ষুব্ধ জনতা।

এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, এটি তার দেশের জন্য একটি লজ্জার দিন। তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে এ ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম দেখভাল করছি। এতে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।

শিয়ালকোটের ডিসি ও ডিপিও জানিয়েছেন, ১৬০টি সিসিটিভির ভিডিওসহ অন্য ভিডিওচিত্র সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। পাঞ্জাব পুলিশের আইজি রাও সরদার আলি খান বলেছেন, পুলিশের সঙ্গে বিশেষ বাহিনী কাজ করছে। মামলার নথি সন্ত্রাসবিরোধী আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি আরও বলেন, মূল অভিযুক্ত ফারহান ইদ্রিস, উসমান রশিদসহ দেড় শতাধিক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে দেশটির ক্ষমতাধর সেনাবাহিনী। সাধারণত ধর্মীয় ইস্যুতে সামরিক বাহিনীর এমন তৎপরতা দেখা যায় না। এই ঘটনাকে 'ঠান্ডা মাথায় খুন' উল্লেখ করে সেনা সদর দপ্তরের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সেনাপ্রধান এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে বেসামরিক প্রশাসনকে সব ধরনের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে সামরিক বাহিনী।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, 'ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শিয়ালকোটে শ্রীলঙ্কার এক কারখানা ব্যবস্থাপককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।' এ ছাড়া বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে।

কুমারাকে হত্যার ঘটনায় গতকাল শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টে নিন্দা প্রস্তাব পাস হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ রাজাপাকসে বলেছেন, এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে আমরা শোকাহত। কুমারার স্ত্রী ও তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা। আমার ও শ্রীলঙ্কার মানুষের বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন।

ধর্ম অবমাননা রুখতে পাকিস্তানে একটি আইনও রয়েছে। ওই আইনে দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডেরও বিধান রাখা হয়েছে। তা সত্ত্বেও এমন নৃশংস হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে।

কয়েকদিন আগে খাইবার পাখতুন প্রদেশে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর স্থানীয়রা একটি থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সেখানে এক ব্যক্তিকে আটক করেছিল পুলিশ। গত বছর পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের এক নাগরিককে বিচার চলার সময় আদালতের ভেতরে গুলি করে হত্যা করে ধর্মান্ধরা।

এসবের পেছনে রাজনৈতিক সংযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সবশেষ ঘটনার সময় তেহরিক-ই-লাব্বিক পাকিস্তানের (টিএলপি) নামে স্লোগান দিতেও শোনা গেছে। ওই গোষ্ঠীটি কিছুদিন আগে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ফরাসি দূতাবাস বন্ধের দাবিতে আন্দোলনের সময় প্রকাশ্যে রাস্তায় পিটিয়ে কয়েক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছিল। একই অভিযোগে নেদারল্যান্ডসকে মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকিও দিয়েছিল এই গোষ্ঠী। তারপরও ক্ষমতা বাঁচাতে সম্প্রতি ওই গোষ্ঠীর কাছে নতিস্বীকার করেছে সরকার। কার্যত ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে পাকিস্তান। সূত্র :ডন, কলোম্বো গেজেট, এএফপি ও আলজাজিরা।

মন্তব্য করুন