ইউক্রেনের দক্ষিণে খেরসন প্রদেশের চোনহার গ্রাম। গ্রামের পূর্ব প্রান্তে নীল এবং হলুদ পতাকা দিয়ে একটি সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে। সীমানার ওপারে রাতদিন রাশিয়া সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আনাগোনা। সুযোগ পেলেই ইউক্রেনীয় প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছোড়ে, গুলি চালায় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। বিপরীতে চোনহার ফ্রন্টলাইন একেবারেই শান্ত। বালুর বস্তা দিয়ে ঘেরা পরিখার ওপারে বসা ইউক্রেনীয় সেনাদের চোখে-মুখে রাজ্যের কাঠিন্য। সীমান্তের ওপারে অদৃশ্য শত্রুকে লক্ষ্য করে বন্দুকের নল তাক করে আছে সবাই। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর ফটোগ্রাফার মাইকোলা চেকম্যান সৈন্যদের পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। চোখ দুটো বাইনোকুলারে নিবদ্ধ। রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনকে সংযোগকারী সেতুটির দিকে নির্দেশ করে একসময় চেকম্যান বললেন, 'এই উপদ্বীপটি দখল করার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ক্রিমিয়া অনেক যুদ্ধ দেখেছে।' চেকম্যানের পেছনেই একটি দেয়ালে ক্রিমিয়ার মানচিত্র টানানো। তাতে সাংকেতিক ভাষায় বিভিন্ন সামরিক কৌশল বর্ণনা করা রয়েছে।

একজন সামরিক কর্মকর্তা এগিয়ে এসে ইউক্রেন যুদ্ধের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করলেন। তার ভাষায়- ভদ্মাদিমির পুতিন রাশিয়ার ডনবাস ও ক্রিমিয়ার রাশিয়া অধিকৃত অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি স্থল করিডোর তৈরি করার স্বপ্ন দেখছেন। তবে সেই সুযোগ পুতিনকে দেওয়া হবে না বলে দৃঢ়তা প্রকাশ করলেন ওই অফিসার। একটু পর আবার বললেন, আক্রমণসহ যা কিছু ঘটুক আমরা তার জন্য প্রস্তুত। রাশিয়া হামলা চালালে আমরা শক্ত হাতে তা প্রতিরোধ করব।

সীমান্তের ওপারে রুশ সৈন্য আদৌ রয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতির কয়েকটি সুস্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। রাতে লুকিয়ে থাকা শত্রু ট্যাঙ্কের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। রুশ সৈন্যদের চোখে দেখা না গেলেও বাস্তবতা হচ্ছে, ক্রেমলিন যে কোনো সময় অগ্রসর হতে পারে। স্থল, সমুদ্র বা আকাশপথে- তিন দিক থেকেই আক্রমণ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। যুদ্ধ করার অভিপ্রায়ে রাশিয়ার সুদূর পূর্ব অঞ্চল থেকে যুদ্ধকৌশল সংক্রান্ত একটি বাহিনীকে ইউক্রেন সীমান্তে হাজির করেছে মস্কো। সঙ্গে আনা হয়েছে রকেট লঞ্চার, এস-৪০০ এয়ার মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই শক্তিশালী সেনাবাহিনী কিয়েভ থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়া প্রায় এক লাখ সেনা সমাবেশ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক রুশ সেনা সমাবেশের ফলে রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসনের পরিকল্পনা করছে বলে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও রাশিয়া এমন আশঙ্কা নাকচ করে দিয়েছে। ইউক্রেন আক্রমণ করার পেছনে রাশিয়ার কৌশলগত লক্ষ্য হচ্ছে- ক্রিমিয়াকে ডোনেটস্ক এবং লুহানস্কের বিচ্ছিন্নতাবাদী মিনি-ফিফডমের সঙ্গে যুক্ত করা। ২০১৪ সাল থেকেই মস্কো কার্যকরভাবে এই অঞ্চলগুলো দখল করে আছে।

লুক হার্ডিং :গার্ডিয়ানের বিদেশবিষয়ক প্রতিবেদক ও লেখক

ইউক্রেনকে 'প্রাণঘাতী' সামরিক সরঞ্জাম দিল যুক্তরাষ্ট্র

রাশিয়ার আগ্রাসনের আশঙ্কার মধ্যে ইউক্রেনে 'প্রাণঘাতী সামরিক সরঞ্জাম' পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র। ৯০ টনের ওই সামরিক সহায়তা ইতোমধ্যে ইউক্রেনে পৌঁছেছে। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস সামরিক সহায়তা পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। খবর বিবিসির।

ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা পাঠানোর বিষয়ে সম্প্রতি অনুমোদন দেয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার। ওই সামরিক সহায়তার মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিরক্ষার জন্য গোলাবারুদ রয়েছে। গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের কিয়েভ সফরের পরপরই ওই সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হলো।

ইউক্রেন নিয়ে উত্তেজনা কমাতে শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বৈঠক করেন ব্লিঙ্কেন ও রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। ওই বৈঠকের পর দেশ দুটি জানায়, তারা ইউক্রেন ইস্যুতে চলমান উত্তেজনা হ্রাসের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।

বাইডেন গত ডিসেম্বরে ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা সহায়তার জন্য ২০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তার প্যাকেজে অনুমোদন দেন। কিয়েভে মার্কিন দূতাবাস ফেসবুক পোস্টে বলেছে, ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অধিকারের প্রতি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে সামরিক সরঞ্জামের প্রথম চালান এসেছে। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে রাশিয়ার আগ্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এ রকম সহায়তা অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র্র। এ সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওলেক্সি রেজনিকভ।

মন্তব্য করুন