চারমাত্রা

চারমাত্রা


কলিংবেল

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

নূরনবী সোহাগ

সিঁড়ি দিয়ে উঠে নাক বরাবর সোজা দেয়ালের সঙ্গে লাগানো দুটো কলিংবেলের সুইচ। বামপাশের সুইচটা আমার বাসার। এ বাসায় সাবলেট হিসেবে নতুন উঠেছি। পরিবেশের সবকিছুর সঙ্গে এখনও ঠিক অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি। আঙুল ভুল করে ডানপাশের সুইচটা টিপে দিল। কী সর্বনাশ! কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ধড়মড় করে দরজা খুলে এক তরুণী মুখ বের করল- 'কাকে চাই?' আমি একরকম থতমত করে বললাম- 'ভুল করে প্রেস করেছি।' তৎক্ষণাৎ একই ভঙ্গিতে দরজা লাগিয়ে দিল। পুরো ঘটনায় শুধু মাথায় থাকল- তরুণীর এক মুহূর্তের মুখচ্ছবি। কী রকম একটা শুভ্রতা, স্নিগ্ধতা ছিল তার চোখে-মুখে! এরপর কয়েকদিন শুধু মগজের রিলে থেকে ওই মুহূর্তটা টেনে টেনে দেখলাম। ততদিনে মনের মধ্যে সে অজ্ঞাত তরুণী যে বেশ এঁটেসেঁটে বসতে শুরু করেছে। এরপর আমি আবারও সেই বাসার কলিংবেল চাপলাম। তবে এবার কিন্তু একদম ভুলবশত না। ইচ্ছাকৃত। উত্তরটা কী দেব তাই-ই ফন্দি করছিলাম। রীতিমতো দরজা খোলার আওয়াজ। খেয়াল করলাম দরজা খোলায় আজ কোনোরকম ব্যস্ততা নেই। সে একই মুখ। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম কিন্তু তার আগেই বললো- 'আজও কি ভুল করে?' এ যেন আমার হয়ে পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন তিনি। মৃদু হেসে মাথা উপরে নিচে নাড়ালাম। তিনি যতটা ধীরে দরজা খুলেছিলেন তার থেকেও ধীরগতিতে দরজা লাগালেন। তার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা আমায় যেন কিছুর ইঙ্গিত দিল অথবা আমি অতি স্বাভাবিক বিষয়টাকেও যেন অস্বাভাবিক কিছু ভেবে নিলাম। কলিংবেলের সঙ্গে মেয়েটার একটা আত্মিক সম্পর্ক আছে। কলিংবেলের সুইচ যেন চাবি। একবার টিপ দিলেই মেয়েটা স্বশরীরে এসে হাজির হয় দরজার ওপাশে। দিনে দিনে মেয়েটা যথেষ্ট দুর্বল জায়গা দখল করে নিল আমার মধ্যে। তারপর কিছুদিন ধরে দারুণ রকম ছটফটানি। ব্যাটে-বলে হচ্ছিল না বলে আর কলিংবেল দেওয়া হয়ে ওঠেনি। আজ ক্লাস থেকে ফিরে একটা দারুণ রকম অনুকূল পরিবেশ খেয়াল করলাম পুরো সিঁড়িতে। মনের প্রবল আগ্রহ আর ছটফটানি দমানোর জন্য এটাই মোক্ষম সময় ভেবে নিলাম। যতটা সম্ভব দীর্ঘ নিঃশ্বাস টানলাম। আশপাশে আরও একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে সুইচের কাছাকাছি যখন আঙুল পৌঁছে দিয়েছি, অমনি মৃদু শব্দে দরজা খুলে গেল। একই মানুষ- একই হাসিমুখ। 'আজও কি ভুল করে দিতে যাচ্ছিলেন?' ধরা পড়া চোরের মতো মাথা নিচু করে থাকলাম। অনেকটা বাধ্য হয়েই তার দিকে চোখ তুলে তাকালাম। অদ্ভুত লাজুকতা তার চোখে-মুখে ভর করেছে। দরজা লাগানোর মুহূর্তে একটা চাপা কণ্ঠস্বর আমার কান অবধি পৌঁছল- 'পাগল একটা।' বোধহয় আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। তবে যতক্ষণ ছিলাম ততক্ষণ মাথার ভেতর বারবার প্রতিধ্বনিত হয়েছে, 'পাগল একটা।'
ঝালকাঠি