চারমাত্রা

চারমাত্রা


ক্রিকেট শুধুই একটি খেলা জীবন-মৃত্যুর সংগ্রাম নয়

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      
ব্রেন্ডন ম্যাককুলাম, নিউজিল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক। টেস্ট ক্রিকেটে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ডটি তার দখলে। ২০১৬ সালে এমসিসি স্পিরিট অব ক্রিকেট কাউড্রি লেকচারে বলেছেন ক্রিকেট নিয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা। সেই লেকচারের অংশবিশেষ ভাষান্তর করেছেন আকেল হায়দার

নিউজিল্যান্ডের সাউথ দুনেদিন শহর। এক শনিবার সকালে জানালার পর্দা সরালে দেখতে পেলাম বৃষ্টিহীন, স্বচ্ছ, নির্মল আকাশটাকে। উত্তর দিক থেকে ঈষৎ মৃদুমন্দ হাওয়া ঝির ঝির করে বইছে। সূর্যটা ঝলমল করে হাসছে সোনালি আলোয়। যদি কেউ দুনেদিনে গ্রীষ্ফ্মের সময় অবস্থান করে থাকেন তবে জানবেন এখানকার প্রকৃতি ও তার বিচিত্র খামখেয়ালিপনার কথা। স্থানীয়রা প্রকৃতির এই হেঁয়ালিকে মজা করে বলেন স্কটিশ মিষ্ট। এখানে সব কিছুর জন্য নির্ধারিত একটা সময় আছে। গ্রীষ্ফ্মের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে আমার বেড়ে ওঠা। রোদেলা দিন মানে চমক আর ক্রিকেটের সুবর্ণ সময়।

আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে খেলার উদ্দেশ্যে মাঠে যাওয়ার সে দিনটির কথা। সরঞ্জামসহ ব্যাগ নিয়ে বাবা-মার সঙ্গে গাড়িতে যাচ্ছিলাম। মাঠে গিয়ে হেঁটে যেতে যেতে দেখলাম বিভিন্ন বয়সী ছেলেমেয়ে কত রকম খেলায় মেতেছে! আমার বাবা স্টু, ওটাগোর হয়ে ৭৬টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছিলেন। তিনি একজন ভালো টিম মেম্বার এবং সামনের সারির দর্শক। বাবার সময়ে ওটাগো টিম দারুণ পরিশ্রম করত আর অপ্রতিদ্বন্দ্বী সব খেলা খেলত।

বাবা যখন আজ তার সময়কার ক্রিকেট অভিজ্ঞতার কথা বলেন, তখন তিনি রান, উইকেট, গড় স্কোর, রাগ, উত্তেজনা- এসবের কিছু থাকে না তাতে। বরং সেখানে বন্ধুত্ব, শোভন আচরণ, পারস্পরিক সুন্দর সম্পর্কের কথাই থাকে বেশি। এই ক্রিকেটই আজ আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের অনেককে অতিক্রম করে বিশ্বের খ্যাতিমান একটি দলের অংশীদার হিসেবে গ্রেট কলিন কাউড্রিতে ক্রিকেট বিষয়ক বক্তব্য দেওয়ার জন্য।

যখন আমি প্রথম নিউজিল্যান্ড ওডিআই টিমে যোগ দেই, সেখানে কিছু সংখ্যক খেলোয়াড় ছিলেন যারা আমার কাছে বীরের মতো। তবে তাদের চালচলন ও ব্যবহার ছিল দম্ভে ভরা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ। তারা কি আমাকে পছন্দ করবে? সাদরে গ্রহণ করে নেবে তাদের দলে? এসব প্রশ্ন কেবল মনে আসছিল। অথচ অবিশ্বাস্যভাবে অল্প সময়ের মধ্যে আমি তাদের কাছে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে গেলাম। কোনো কিছুর পরোয়া না করে উৎসর্গ করলাম নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার জন্য।

পেছনের দিকে তাকালে এখনও কিছু ভুল-ত্রুটি মনে আসে। সেসব আমাকে কিছুটা অনুতপ্তও করে মাঝে মাঝে। অনেক কিছু হয়তো করার ছিল, যা শেষ পর্যন্ত করা হয়ে ওঠেনি। আমি মনে করি জীবনে মানসিক এবং শারীরিক বিকাশ যেমন করে আসে, ঠিক একইভাবে তা খেলার মাঠেও প্রযোজ্য।

আমি আমার জীবনের ভাবনাগুলো শেয়ার করতে চাই। যেখানে আমি আমার প্রাথমিক পরিকল্পনাগুলো প্রয়োগ করেছিলাম। আমি স্বচ্ছতার সঙ্গে বলতে চাই, কিছু বিষয় খানিকটা দেরিতে এসেছে আমার পেশাগত জীবনে। খ্যাতিমানদের সঙ্গে খেলাগুলো ছিল আমার জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। খেলায় কিছু অসামঞ্জস্য হলে দারুণ কষ্ট হতো। আবার ভালো কিছু হলে নিমিষেই তা হাওয়ায় মিলিয়ে যেত। ধীরে ধীরে এক সময় ক্রিকেটের প্রতি আমার ভালোবাসা বৃদ্ধি পেতে লাগল।

আমি আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়ে বলতে চাই, যেটা ক্রিকেটকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। ২০১৪ সালের ২৫ নভেম্বর সিডনি ক্রিকেট মাঠের ঘটনা। সেদিন ফিল হিউজ দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষের ম্যাচে মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। বিষয়টি শোনার পর তাৎক্ষণিক আমরা খেলা বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেই। আমি ড্রেসিং রুমের চারপাশটা দেখলাম এবং অনুধাবন করলাম, কেউই খেলতে আগ্রহী নয়। সবকিছু মনে হচ্ছিল অর্থহীন। একটা উপলব্ধি মনে কাজ করছিল। তা হলো, এটা আমাদের জন্য কিছু ব্যতিক্রমী কোনো ফলাফল বয়ে আনতে পারে। আমরা কখনও কল্পনা করিনি ক্রিকেট বলের আঘাতে কারও মৃত্যু হতে পারে! আজকের দিনে তো মোটেও না।

আমি চাচ্ছিলাম আমাদের ফাস্ট বোলাররা সবসময় উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বিজয়ী মনোভাব নিয়ে খেলুক। ব্যাটসম্যানদের দুর্বল জায়গাগুলো খুঁজে সেখানে আক্রমণ করুক, তবে অবশ্যই কারও জীবনের ক্ষতি করে নয়। ক্রিকেট শুধুই একটি খেলা; জীবন-মৃত্যুর সংগ্রাম নয়।

নিউজিল্যান্ড টিম অনেক পরিপকস্ফ, এটা আমি বলতে চাই না। এও বলতে চাই না, কেউ আমাদের অনুসরণ করুক। আমাদের সবার মাঝে দারুণ একটা বন্ধন আছে। খেলাকে সত্যিকার অর্থে ভালোবেসে সবটুকু দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত সবার মাঝে। প্রতিপক্ষকে সাদরে গ্রহণ করতাম এবং মোকাবেলা করতাম। যেখানেই যেতাম ভোরে যখন জানালার পর্দা সরাতাম, দেখতাম রোদেলা নির্মল আকাশ। আমি মৃদু হাসতাম আর অনুভব করতাম দুনেদিনের সেই সেই স্বপ্ন, যেখানে আমি বড় হয়েছি।

ক্রিকেট বিশ্বব্যাপী সমাদৃত একটি খেলা। এটি বেশ চমকপ্রদ! এটাকে আবিস্কার করতে হয় এবং একই সঙ্গে যত্ন নিয়ে পরিচর্যা করতে হয়। আমি নিজেকে বেশ ভাগ্যবান অনুভব করি এজন্য, এত দীর্ঘ সময় ধরে খেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছি আর এত চমৎকার সব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি, যা আমার জীবনের অমূল্য অর্জন। একজন প্রফেশনাল ক্রিকেটার হিসেবে প্রতিদিন কিছু না কিছু পেয়েছি, হয়তোবা কিছু হারিয়েছি। আন্তর্জাতিক এবং প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট থেকে আমি অবসর নিয়েছি কোনোরকম তিক্ত অভিজ্ঞতা ছাড়াই। আজ স্মরণ করি সেসব চমৎকার মানুষের, যাদের সঙ্গে রয়েছে ম্যাচ খেলাসহ অসংখ্য স্মৃতি, ঠিক যেমনটি বাবা বলতেন।