চারমাত্রা

চারমাত্রা


বর্ষবরণের যতকথা

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

তানিয়া সুলতানা

হিন্দু সৌর পঞ্জিকামতে, বাংলায় বারোটি মাস অনেক আগে থেকেই উদযাপিত হয়ে আসছে। সম্রাট আকবর বাংলা পঞ্জিকার প্রবর্তন করেন। ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনের পর থেকে আরবি হিজরি পঞ্জিকা অনুযায়ী তারা কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সাল চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষি ফলনের সঙ্গে এর কোনো মিল পাওয়া যেত না। সম্রাট আকবর তখন একটি সুষ্ঠু সমাধানের জন্য বাংলায় বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সম্রাটের আদেশ অনুযায়ী তখনকার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌর বছর ও আরবি হিজরি সালের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম তৈরির কাজ শুরু করেন। বাংলা বছর নির্ধারণ নিয়ে বিভিন্ন তথ্যমতে, ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে পরীক্ষামূলক এই গণনা পদ্ধতি কার্যকরভাবে শুরু হয় ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের তারিখ থেকে। প্রথমে ফসলি সন বলা হলেও পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল নববর্ষ উদযাপিত হয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত পঞ্জিকা অনুসারে এ দিনটিকে নির্দিষ্ট করা হয়।

বিভিন্ন দেশে নতুন বছর উদযাপনের নানা প্রথা রয়েছে। স্কটল্যান্ডে নতুন বছর উদযাপনের রীতিকে বলা হয় 'হগম্যানাই'। 'ফার্স্ট ফুটিং' বা প্রথম পদক্ষেপ দিয়ে যাত্রা হয় এই উৎসবের। স্কটিশ রীতি অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যরাত থেকেই সবাই তাদের প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানান। সঙ্গে উপহার হিসেবে থাকে কয়লা বা ছোট রুটি। পাশাপাশি সারারাত ধরে রাস্তায় রাস্তায় চলে গান-বাজনা।

জাপানে নতুন বছর উদযাপন উৎসব তাদের বার্ষিক উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম। 'ওসুগাটসু' নামের এই উৎসবে শামিল হয় জাপানের সব মানুষ। নতুন বছরে নতুন করে শুরু করার প্রত্যাশা নিয়ে পুরনো বছরকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে থাকে জাপানিরা। ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ মধ্যরাতে বৌদ্ধমন্দিরে ১০৮টি ঘণ্টাধ্বনির মধ্য দিয়ে মানুষের ১০৮টি দুর্বলতাকে মুছে ফেলার কামনায় নতুন বছরের উৎসব শুরু করে তারা। স্পেনের অধিবাসীরা নতুন বছর শুরু করে ১২টি আঙুর খাওয়ার মাধ্যমে। ১২টি আঙুর খাওয়ার উদ্দেশ্য, আগামী বারোটি মাস যেন তারা সুখ ও সমৃদ্ধির সঙ্গে কাটাতে পারে। হল্যান্ডের মানুষ ক্রিসমাস ট্রিতে আগুন জ্বালিয়ে এবং আকাশে আতশবাজি ফুটিয়ে নতুন বছর শুরু করে। আগুনের মাধ্যমে পুরনোকে জ্বালিয়ে দিয়ে নতুনকে স্বাগত জানানোই তাদের উদ্দেশ্য। এদিকে গ্রিস শহরের সেন্ট বাসিলে হয়ে থাকে নতুন বছরের উৎসব। এদিন তাদের ঐতিহ্যগত খাবার 'ভাসিলোপিসা' বা সেন্ট বাসিলস কেক পরিবেশন করা হয়। এই কেকের বৈশিষ্ট্য হলো, কিছু কেকের ভেতর রুপা অথবা স্বর্ণের কয়েন দেওয়া থাকে। যারা এই কয়েন পেয়ে থাকেন, তাদের বিশেষ সৌভাগ্যবান হিসেবে ধরা হয়। ইউএসএ তথা যুক্তরাষ্ট্রে 'নিউ ইয়ার সেলিব্রেশন'-এর উৎসবকে ধরা হয় পুরো বিশ্বের সবচেয়ে বড় নতুন বছর উদযাপন উৎসব। নিউইয়র্ক নগরীর টাইমস স্কয়ারে ৩১ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৫৯ মিনিটে 'নিউ ইয়ার বল' ফেলার মাধ্যমে নতুন বছর শুরু হয়। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ১৯০৭ সাল থেকে টাইমস স্কয়ারে এই উদযাপন হয়ে আসছে।

নতুন বছর নিয়ে সাহিত্যেও কিছু কাজ এবং বাণী লক্ষ্য করা যায়। ইংরেজি সাহিত্যে নতুন বছর উদযাপনের সবচেয়ে আদি গীতিকবিতা লেখা হয়েছে স্কটল্যান্ডে। লোকগীতি হিসেবে খ্যাত 'ওল্ড ল্যাংগ সাং' বা 'পুরনো দিনের কথা' গানটি প্রথম লোকসমক্ষে আনেন কবি রবার্ট বার্নস। ১৭৯৬ সালে তিনি গানটি 'স্কটস মিউজিক্যাল মিউজিয়াম' নামের বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করেন। নতুন বছর নিয়ে টি.এস. ইলিয়ট তার 'লিটল গিডিং' কবিতায় লিখেছেন- 'গত বছরের শব্দগুলো গত বছরের ভাষার জন্য/ এবং আগামী বছরের শব্দগুলো নতুন ভাষার জন্য অপেক্ষা করছে/এবং কিছু শেষ হয় নতুন এক যাত্রার জন্যই।' চার্লস ডিকেন্স নতুন বছর নিয়ে বলেছেন, 'সব সময়ই নতুন বছরের জন্য চাই একটা নতুন হৃদয়'। কবি লর্ড আলফ্রেড টেনিসন লিখেছেন, 'পুরাতনকে বাইরে রাখো, নতুনকে কাছে টানো/চারিদিকে খুশির ঘণ্টা বাজাও/এই বছর যাচ্ছে, যাক/ মিথ্যাকে দূরে সরাও, সত্যকে সামনে আনো।' কবি ওমর খৈয়াম নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে লিখেছেন, 'নতুন বছরে পুরনো বাসনা জাগে/চিন্তাশীল প্রাণে নির্জনতার অনুরাগে।' বাংলা নতুন সনকে স্বাগত জানাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এসো হে বৈশাখ' গানটি না হলে যেন অপূর্ণই থেকে যায় আমাদের নববর্ষের উৎসব। পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা-গান প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে ছায়ানট নামের একটি সংগঠন রমনা পার্কে পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণ উৎসব উদযাপনের আয়োজন করে। সেখানে এই গানটি গাওয়ার মাধ্যমে তারা নববর্ষ উৎসব উদযাপনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ১৯৭২ সালের পর থেকে রমনা বটমূলে বর্ষবরণ জাতীয় উৎসবের স্বীকৃতি পায়। আর ১৯৮০ সালে বৈশাখী মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে এক ধাপ বাড়তি ছোঁয়া পায় বাংলা নববর্ষ বরণের অনুষ্ঠান।