চারমাত্রা

চারমাত্রা


মহাকাশে অভিযানের ৫৭ বছর

বিশেষ

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      
১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল, ভোস্তক-১-এ চড়ে ইউরি গ্যাগারিন মহাশূন্য অভিযানে গিয়ে পরিণত হয়েছেন প্রথম নভোচারী। মানুষের মহাকাশ অভিযাত্রার ৫৭ বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। কত না সংগ্রাম আর ত্যাগের ছিল মানুষের এই অভিযাত্রার ইতিহাস! মহাশূন্যে মানুষের এই যাত্রাপথের দিকে আমরা ফিরে তাকাতে চেয়েছি। লিখেছেন বিজ্ঞান বক্তা আসিফ

মানুষের নভোযানে করে মহাশূন্য অভিযানের ৫৭ বছর পার হতে চলল। মহাকাশযান ভোস্তক-১-এ চড়ে ইউরি গ্যাগারিন (৯ মার্চ ১৯৩৪-২৭ মার্চ ১৯৬৮) এই কাজটি করেছিলেন। মানব ইতিহাসে তিনি পরিণত হয়েছিলেন প্রথম নভোচারী। এই সম্মানে ১৯৬৮ সালে নিকটস্থ শহরের নাম পরিবর্তন করে তার নামে রাখা হয়। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের লাখ লাখ মানুষের মতো, গ্যাগারিন পরিবারও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসি দখলদারিত্বের ভুক্তভোগী। সোভিয়েতরা তাদের এই নায়ককে সহজে হারাতে চাননি; তাই পেশাগত জীবনে তাকে দুর্ঘটনা সম্পর্কিত কাজ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তারপরও তাকে রক্ষা করতে পারেননি। বিমান দুর্ঘটনায় অল্প বয়সে তার জীবনের সমাপ্তি ঘটে।

৪০ থেকে ৭০-এর দশক পর্যন্ত মহাকাশ অভিযানের মূল শক্তি ছিল মূলত মার্কিন ও রুশ পরাশক্তি দ্বয়ের প্রতিযোগিতা। এ ধরনের অস্থির প্রতিযোগিতার কারণে স্বাভাবিকতায় যে অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি হয়েছিল। কিন্তু এসব অর্জন মানব জাতির অর্জন বলে স্বীকৃত হয়নি। প্রত্যেকে নিজেদের জয় বলে পতাকা উড়িয়েছে। মহাকাশ অভিযান তো মূলত মানব জাতির সম্প্রসারণ। এখানে জয়-পরাজয়ের স্থান নেই। আমরা যদি এর প্রারম্ভের দিকে যাই, দেখব তা কতটা সংগ্রামের, কতটা ত্যাগের এই অভিযান।

বর্তমানে মহাকাশযানগুলো সৌরজগতের দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ রকেটের প্রথম নকশার পরিকল্পনা করেন ফাঁসিতে ঝোলার মাসখানেক আগে রুশ বিপ্লবী নিকোলাই কিবালচিচ, দ্বিতীয় আলেক্সান্দারকে হত্যাচেষ্টায় দায়ী করে যাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। আর একেবারে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে, ১৮৯৫ সালে প্রথম যে বইয়ে মহাশূন্য ভ্রমণের কথা উল্লেখ করা হয় তার রূপকার ছিলেন ৎসিওলকোভস্কি; উল্লেখ্য, তখন কোনো উড়োজাহাজও ছিল না। ১৯০৩ সালে ৎসিওলকোভস্কি মহাশূন্যে রকেট মহাকাশযানকে কীভাবে নিয়ে যাবে তার ওপর মৌলিক রচনা প্রকাশ করেন, গাণিতিক সূত্র দেন। দারিদ্র্য আর বিরুদ্ধ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তিনি এগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি। তবে পরবর্তীকালে তা বাস্তবে রূপ দেন মার্কিন বিজ্ঞানী রবার্ট গডার্ড। একই রকম কষ্ট আর লাঞ্ছনা নিয়ে তিনি তার কাজ করে যান। ১৯২৬ সালের ২৬ মার্চ তার তৈরি প্রথম রকেটটি মাত্র চার ফুট উপরে ওঠে। সেই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় রুশরা তাদের তৈরি রকেট ৬০ মাইল উঁচুতে ওঠাতে সক্ষম হয়। অবশেষে ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা এক হাজার ৪৬৩ পাউন্ড ওজনের ২২.৮ ইঞ্চি ব্যাসবিশিষ্ট রকেটের সাহায্যে কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুৎনিক-১ পৃথিবীর কক্ষে স্থাপনে সক্ষম হন।

এরপর ১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর লাইকা নামের একটি কুকুর মহাকাশের উদ্দেশে যাত্রা করে। কোনো জীবের পক্ষে মহাকাশে গিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব কি-না, তা যাচাই করার জন্যই মূলত লাইকাকে মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল। মহাকাশ গবেষণার জন্য ভালো কোনো জাতের কুকুরের বদলে বেওয়ারিশ কুকুরকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার নীতি অনুসরণ করছিলেন। কেননা রাস্তায় বেওয়ারিশ হিসেবে টিকে থাকতে গেলে বেঁচে থাকার ক্ষমতা অপেক্ষাকৃত বেশি এবং চাহিদা থাকতে হয় কম।

কিন্তু বানর রেখে মহাকাশে কুকুর কেন নির্বাচন করা হলো? তার ওপর বানর মানব প্রজাতির কাছের একটি প্রাণী। তাকে রকেটে চড়িয়ে মহাশূন্যে পাঠানোর চেষ্টা করেও তা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছে। মহাশূন্যে কুকুর পাঠানোর পেছনে অবশ্য আরও একটি কারণ ছিল। রুশ স্নায়ু বিজ্ঞানী আইভ্যান পাভলভের কুকুর নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা সেরে ফেলেছিলেন। তিনি কুকুরের হজমশক্তি থেকে শুরু করে তাদের স্নায়ুতন্ত্রের ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কে বিস্তর গবেষণা করেছিলেন। এর জন্য নোবেল পুরস্কারও পেয়েছিলেন। ফলে কুকুরের শারীরতত্ত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই অনেক কিছু জানতেন।

উল্লেখ্য, কোপার্নিকাস, টাইকো ব্রাহে, জোহানস কেপলার, জিওর্দানো ব্রুনো, গ্যালিলিও গ্যালিলি হয়ে প্রথম তাত্ত্বিকভাবে কৃত্রিম উপগ্রহের চিন্তা করেছিলেন আইজ্যাক নিউটন। এসব ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে দেখা যাবে বেশিরভাগ আবিস্কার, প্রাযুক্তিক উদ্ভাবনের সঙ্গে মানুষের অকল্পনীয় কষ্ট আর দারিদ্র্য নিষ্পেষণ জড়িয়ে আছে। অথচ পরবর্তীকালে দেখা যায়, এসব আবিস্কার আর উদ্ভাবনের বেশিরভাগের ব্যবহার মানুষের সঙ্গে মানুষের যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞান প্রযুক্তির মোড়কে ভোগের বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহারে আমরা নিজেদের ভারসাম্য রাখতে ব্যর্থ হচ্ছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে শিল্পকলার সমন্বয় ঘটাতে না পারলে আমাদের এ অবস্থা আরও খারাপ দিকে যাবে। অথচ বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ও প্রতিভাধর বিজ্ঞান ঔপন্যাসিক ইভান ইয়েফ্রেমভ দুই হাজার বছর পরের পৃথিবীকে নিয়ে লেখা বিজ্ঞান উপন্যাস 'অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকা'-এর পাঠকরা স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণের এই দিনটিকে মহাবৃত্তীয় যুগের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করে লেখককে অভিনন্দন পাঠিয়েছিলেন। এ উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল ১৯৫৬ সালে, অর্থাৎ ভূ-উপগ্রহ স্থাপনের এক বছর আগে।

কৈশোরে ইউরি গ্যাগারিন মহাকাশ এবং গ্রহ সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং তার মহাকাশ যাত্রা নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল ভোস্তক-১-এ চড়ে সেই স্বপ্নকে সার্থক করেন। তার পথ ধরে বহু নর-নারী মহাকাশে পাড়ি জমিয়েছেন। আমরা পদার্পণ করেছি মহাকাশযুগে। মহাকাশে বসতির প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে স্পেস স্টেশন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ রকম একটি স্পেস স্টেশন থেকে সিরীয় মহাশূন্য অভিযাত্রী তার অনুভূতিকে ব্যক্ত করেছিলেন, 'যখন আপনি মহাশূন্য থেকে সমগ্র জগৎ বা পৃথিবীকে দেখবেন সেখানে আপনি আমাদের পাবেন না, পাবেন না তাদেরকেও, পাবেন না কোনো রাজনীতি।' চলুন সর্বশেষ চাঁদে পদার্পণকারী ইউজেন এ সারনানের কথা মাথায় রেখে বলি- 'আমরা হলাম পৃথিবীবাসী। জাতিগত বিদ্বেষ ও ভেদাভেদ ভুলে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ছি।' স্বপ্ন হচ্ছে গ্রহ-গ্রহান্তরে বসতি গড়া। সেই বিশ্বাসকে লালন করার আহ্বান জানাচ্ছি নব প্রজন্মের কাছে।