চারমাত্রা

চারমাত্রা


জ্বালাও মঙ্গল আলোক...

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      
প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের পক্ষ থেকে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে অনুষ্ঠিত মঙ্গল শোভাযাত্রা এবছর ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। নতুন বাংলা সন সামনে রেখে  মঙ্গল শোভা যাত্রা। লিখেছেন গোলাম কিবরিয়া

'আজি নবরূপে সাজিয়ে নাও, পূর্ণ কর প্রাণ/পুরাতন কালো ঝেড়ে ফেলে দাও শুদ্ধ পুষ্প ঘ্রাণ'। কর্মকার অনুপ কুমারের বর্ষবরণ কবিতার কথাগুলোর মতোই চারদিকে বাংলা বর্ষবরণের আমেজ পাওয়া যাচ্ছে। নতুনরূপে সেজে পুরনো জীর্ণতা-শীর্ণতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় বাঙালি পুষ্প ঘ্রাণ চারদিকে ছড়াবে। মানুষের মাঝে মঙ্গলবার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা থাকবে। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ আর মন্যুষত্বের টানাপড়েনে সামাজিক অবক্ষয় যে সময় নিশ্চিত হয়ে পড়েছে, ঠিক এমন প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আসন্ন পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে- 'মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি'। ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বর্ণিল করে তুলতে চারুকলা অনুষদ এখন বেশ কর্মমুখর। একপাশে চলছে মঙ্গল শোভাযাত্রার বিভিন্ন শিল্প কাঠামো নির্মাণের কাজ আর অন্যপাশে চলছে এ আয়োজনের ব্যয় নির্বাহের জন্য জলরঙের ছবি, পুতুল, সরাচিত্র ও মুখোশ বিক্রির কাজ। চারুকলার বর্তমান এমনকি প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও দিন-রাত অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন বর্ষবরণ দিনটিকে রাঙিয়ে তুলতে। এবারের বর্ষবরণ ১৪২৫ উদযাপনের মঙ্গল শোভাযাত্রার দায়িত্বে রয়েছেন চারুকলা অনুষদের ২০তম (সম্মান) ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। গত ১৫ মার্চ ছবি এঁকে শোভাযাত্রার প্রস্তুতি কাজের উদ্বোধন করেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী। চারুকলার ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ ইসলাম রাসেল বলেন, প্রতি বছরই নতুন একটি প্রতিপাদ্য নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়। গত বছর যেমন ছিল আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে। এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি'। এটা এক ধরনের শুভকামনা। পহেলা বৈশাখ যেহেতু বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। তাই সেই দিনটি যেন ভালো কাটে, সব বিষয়ের প্রতি শুভকামনা জানানো। আর তার ওপর নির্ভর করেই এই প্রতিপাদ্য। এর সঙ্গে যোগ করে চারু শিক্ষার্থী রাসেল বলেন, এবারও ফোক আইটেম থাকবে। লক্ষ্মী সরা, টেপা পুতুল, পাখি- এ রকম নানা কিছু যা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের মোটিফ। এ দেশ, এ দেশের ঐতিহ্যকে প্রতিনিধিত্ব করে- সেসব শিল্পকর্ম আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রায় থাকবে। সেই সঙ্গে সরা পেইন্টিং হচ্ছে, ওয়াটার কালার হচ্ছে। সব শিক্ষার্থীই কাজ করছেন। জানালেন, প্রথম বর্ষ থেকে শুরু করে শেষ পর্বের শিক্ষার্থী এমনকি মাস্টার্সের শিক্ষার্থীরাও দল বেঁধে বর্ষবরণকে রাঙিয়ে নিতে প্রস্তুতি পর্বে কাজ করছেন। শিক্ষকরাও গাইড করছেন। মঙ্গল শোভাযাত্রায় যে মুখোশ তৈরি হয় মজার বিষয় হলো, তা মুখে পরার জন্য নয়। এই মুখোশগুলো তৈরি হয় লাঠিতে ধরে র‌্যালি করার জন্য।



সে মুখোশ মঙ্গলের বার্তা পৌঁছে দেবে সবার কাছে, কোনো চরিত্রকে ঢাকার জন্য নয়। মঙ্গলের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য চারুশিক্ষার্থীর বেছে নিয়েছেন বাঘ ও পেঁচা। সঙ্গে থাকবে বিশাল সাইজের রাজা-রানী। এ ছাড়াও এবারের শোভাযাত্রায় রাজা-রানীর সঙ্গে থাকবে তার সেনাপতি, টেপা পুতুল, সূর্যদেবতা। ঐতিহ্যগতভাবে পহেলা বৈশাখের পরদিন ২ বৈশাখ যাত্রাপালা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজক চারুকলার শিক্ষার্থীরা এবার যাত্রাপালার আয়োজন করেছেন। চারুকলা প্রাঙ্গণে আয়োজিত এবারের যাত্রাপালার নাম 'বাগদত্তা'।

শোভাযাত্রার সবচেয়ে বড় শিল্প কাঠামো হবে হরিণ। সোনালি রঙের এ হরিণ নিয়ে শোভাযাত্রা করে সবাইকে সোনার মানুষ হওয়ার আহ্বান জানানো হবে।

জয়নুল গ্যালারির সামনের উন্মুক্ত স্থানে প্রতিবারের মতো এবারও বিক্রি হচ্ছে জলরঙের চিত্রকর্ম ও সরাচিত্র। বড় সরাচিত্র পাত্তয়া যাচ্ছে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকায়, ছোট সরাচিত্র ২০০ থেকে ৫৫০ টাকায়। পাখির টেপা পুতুল ১০০ থেকে ৩০০ টাকা। বাঘ ও পেঁচা এক থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে এই শোভাযাত্রা প্রস্তুতি পর্ব সমন্বয় করার জন্য। শিক্ষার্থীদের আঁকা জলরঙের চিত্রকর্ম দেড় হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় এবং শিক্ষকদের চিত্রকর্ম পাওয়া যাচ্ছে পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায়। প্রতি বছর মঙ্গল শোভাযাত্রা বাংলা বর্ষবরণে ভিন্নমাত্রা যোগ করে, যা বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। কখন, কবে থেকে এর আয়োজন তা জানতে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। আশির দশকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একই সঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে সর্ব প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রবর্তন হয়। সে বছরই ঢাকাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম এ মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন সারা দেশের অসাম্প্রদায়িক বাঙালির ঐতিহ্য-সংস্কৃতির ধারক ও বাহক যেন। আর বাঙালির এই মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ প্রাপ্তিতে চারুকলার সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীসহ দেশবাসীও উচ্ছ্বসিত। বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আবেদনক্রমে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কো অধরা বা ইন্ট্যানজিবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় ২৮ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর সংশ্নিষ্ট আন্তর্জাতিক পর্ষদ বাংলাদেশের সরকারের প্রস্তাবটি অনুমোদন করে। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ও প্রস্তুতি সম্পর্কে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, মানুষের সাধনা করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত খাঁটি মানুষ হয়ে ওঠা সম্ভব। এ কারণেই লালন সাঁইয়ের 'মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি' বাণীকে শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

চারুকলা প্রাঙ্গণ আর রুমগুলো ঘুরে দেখা গেল শিক্ষার্থীরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। মুখোশ, পুতুল তৈরিতে কেউবা এক মনে কাজ করে যাচ্ছেন। আবার কেউবা মাঠে বাঁশের চাটাই দিয়ে শিল্প কাঠামো বানানোতে ব্যস্ত। এ যেন গ্রামবাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যের লালন-পালন।

জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ কিংবা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সামাজিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে সংঘটিত হচ্ছে যখন হত্যা, গুম-ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধ; ঠিক সে সময় এই মঙ্গল শোভাযাত্রা মানুষকে দেখাবে মঙ্গলের পথ। শোনাবে মঙ্গলের বাণী। আর তাই তো লালন সাঁইয়ের মানুষের মুক্তি ও শান্তির পথ প্রদর্শনে কতই না প্রাসঙ্গিক- 'এই মানুষ ছাড়া মনরে আমার/পড়বি রে তুই শূন্যকার/ লালন বলে মানুষ আকার/ ভজলে তারে পাবি/মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।'