জুয়ানা মারিয়া

নির্জন দ্বীপে একাকী ১৮ বছর

সংগ্রাম

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০১৯      
নির্জন দ্বীপে একাকী ১৮ বছর

চিত্রশিল্পী হলি হারমনের আঁকা জুয়ানা মারিয়ার দ্বীপবাসের গল্প

ক্যালিফোর্নিয়ার নির্জন দ্বীপ সান নিকোলাস। জুয়ানা মারিয়া নামের এক নারী ঘটনাক্রমে সেখানে আটকা পড়েন আর একা একা কাটান ১৮ বছর। তার সংগ্রাম আর একাকিত্বের গল্প জানাচ্ছেন সৌমিক মহাজন

ড্যানিয়েল ডিফোর কালজয়ী উপন্যাস রবিনসন ক্রুশো। পথ হারিয়ে বছরের পর বছর দ্বীপে একা কাটানো এক নাবিককে কেন্দ্র করে লেখা এ উপন্যাস এখনও শিহরিত করে তোলে সবাইকে। তবে এটি শুধুই একটি উপন্যাস; সত্য নয়। কিন্তু আজ জানাব বাস্তবের এক নারীর কথা, যিনি দীর্ঘ ১৮ বছর একাকী সংগ্রাম করেছেন নির্জন দ্বীপে। একাকী এই নারীর নাম জুয়ানা মারিয়া। তবে এটি তার আসল নাম নয়, সভ্য সমাজ তাকে এই নাম দিয়েছিল। তার আসল নাম জানা যায়নি কোনো দিন।

ক্যালিফোর্নিয়ার একটি নির্জন দ্বীপ সান নিকোলাস। এই দ্বীপে বাস করত নিকোলেনো উপজাতি সম্প্রদায়। প্রায় ১০ হাজার বছর ধরে বাস করলেও বহিরাগতদের আক্রমণে দিন দিন তাদের সংখ্যা কমতে থাকে। ১৮৩৫ সালে এই সংখ্যা এসে দাঁড়ায় মাত্র ২০ জনে। পরবর্তী সময়ে কোনো এক অজানা কারণে ওই ২০ জনকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মারিয়া ও তার ছেলে বাদ পড়ে যায়। এমনও শোনা যায়, ছেলে হারিয়ে যাওয়ার কারণে তাকে খুঁজতে নৌকা থেকে নেমে পড়েছিলেন মারিয়া। যদিও সত্য ঘটনা কী তা আজও জানা যায়নি!

এদিকে মারিয়ার জন্য অপেক্ষা না করে নৌকা ফিরে যায় সভ্য সমাজে। অন্যদিকে বুনো পশু হত্যা করে মারিয়ার ছেলেটিকে। ফলে এই নির্জন দ্বীপে একাকী পড়ে রইলেন মারিয়া। তবে হাল ছেড়ে দেননি। শুরু করলেন বেঁচে থাকার লড়াই। তিমির হাড় দিয়ে তৈরি করলেন একটি কুঁড়েঘর। সিল মাছ, বুনোহাঁস শিকার করে খেয়েছেন বেঁচে থাকার তাগিদে। পোশাক হিসেবে ব্যবহার করেছেন চামড়া এবং গাছের পাতা। প্রতিনিয়ত চালিয়ে গেছেন সংগ্রাম। আর এভাবেই দীর্ঘ ১৮ বছর একাকী কাটিয়ে দিলেন এক জনমানবহীন দ্বীপে।

১৮৫৩ সালে দীর্ঘ সময় পর আবার জাহাজ নোঙর করল সান নিকোলাসের তীরে। জাহাজের ক্যাপ্টেন অন্য ক্রুদের নিয়ে নামলেন নির্জন দ্বীপটিতে। পঞ্চাশোর্ধ্ব হাস্যোজ্জ্বল মারিয়া এগিয়ে গেলেন তাদের দিকে। অবশেষে দীর্ঘ ১৮ বছর পর উদ্ধার করা হলো জুয়ানা মারিয়াকে। অনেক আশা নিয়ে সভ্য সমাজে ফিরলেন মারিয়া। কিন্তু না, খুঁজে পেলেন না নিজ গোত্রের কাউকে। পাবেন কী করে? সভ্য সমাজে তাল মিলাতে না পেরে অনেক আগেই মৃত্যু হয়েছিল তাদের। মারিয়ার ঠাঁই হলো সান্তা বারবারা মিশনে। তবে মারিয়ার দুর্বোধ্য ভাষা বুঝে উঠতে পারল না কেউ। কারণ বোঝার মতো অবশিষ্ট কেউ বাকি ছিল না এই পৃথিবীতে। জানা গেল না কীভাবে তিনি কাটিয়েছেন এতটা সময়? কীভাবে তিনি রয়ে গিয়েছিলেন দ্বীপটিতে? সবকিছু অজানাই থাকল। তবুও মারিয়া বলে যেতেন। বলে যেতেন অনেক কথা। কখনও তিনি গান গাইতেন নিজ ভাষায়, কখনও নাচতেন আদিবাসী ভঙ্গিমায়। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ দেখতে আসতো মারিয়াকে। মনের ভাষায় সবার সঙ্গে সহজেই মিশে যেতেন তিনি। সবার মধ্যে বারবার খুঁজে ফিরতেন আপনজনকে। কিন্তু সব সময় একরাশ নিরাশা সঙ্গী হতো তার।

সভ্য সমাজে আসার সাত সপ্তাহ পর মারিয়া ডিসেন্ট্রিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। হয়তো নতুন পরিবেশে অভিযোজন করার মতো সামর্থ্য ছিল না তার। ১৮৫৩ সালের ১৯ অক্টোবর মৃত্যু হয় নিকোলেনোদের শেষ বংশধরের। মৃত্যুর পর মারিয়ার জীবন অবলম্বনে লেখা হয় 'আইল্যান্ড অব দ্য ব্লু ডলফিনস' নামে একটি উপন্যাস। তার জীবন সংগ্রাম নিজের চোখে দেখতে না পারলেও উপন্যাসটি পড়ে উপলব্ধি করা যায় অনেক কিছুই। তবে ভাষার মতো তার রহস্যময় জীবনের প্রকৃত গল্প শুধু তিনিই জানতেন। কিন্তু জানিয়ে দিতে পারেননি পৃথিবীকে। তার আগেই সব রহস্য নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন না ফেরার দেশে!

পরবর্তী খবর পড়ুন : হাতির পিঠে সাফারি

অন্যান্য