চারমাত্রা

চারমাত্রা

কোপাই নদীর আয় আয় ডাক

ভুবন ভ্রমিয়া

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০১৯

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কোপাই নদী। এ নদীকে ঘিরে আছে রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য স্মৃতি। লিখেছেন 'আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে'র মতো বিখ্যাত ছড়া-কবিতা। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন হাঁসুলি বাঁকের উপকথা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার শান্তিনিকেতনের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ময়ূরাক্ষীর এই উপনদী ঘুরে এসে লিখেছেন আশিক মুস্তাফা


নদী ডাকে। প্রিয় মানুষের মতো। চোখ বন্ধ করে মন বাড়িয়ে দিলে দূর থেকে নদীর ডাক কানে আসে। আয় আয় ডাক। পাহাড় ডাকে। ডাকে জোছনাও। নদী-পাহাড় আর জোছনার ডাক যাদের মনের কানে এসে লাগে; তারা ঘরে থাকতে পারে না। বেরিয়ে পড়ে নদীর খোঁজে। বৈশাখী ঝড় শুরু হয়েছে প্রকৃতিতে। এর মধ্যে নতুন করে জেগে ওঠার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে নদী। চৈত্রের অঝোর ধারা সেই স্বপ্নকে যেন আরও উসকে দিচ্ছে। এই উসকে দেওয়া নদীর ভাব দেখার সুযোগ হয়েছিল শান্তিনিকেতনে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় আর বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদের আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনে গিয়েছি শিশুসাহিত্যের ওপর একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করতে। যে গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের কোপাই নদী নিয়ে লেখা প্রিয় সেই কবিতাটির কথাও তুলে ধরেছি।

আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে

কোপাই। ছোট্ট একটি নদী। স্থানীয়দের কাছে শাল নামে পরিচিত। ময়ূরাক্ষী নদীর এই উপনদী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার শান্তিনিকেতন, বোলপুর, কঙ্কালীতলা ও লাভপুরের পাশ দিয়ে চলে গেছে। যেতে যেতে বলে গেছে নানা কথা। এই কথা ধরতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর নদীতে উতলা হয়ে লিখেছেন-

'আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে

বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।'

হাঁসুলি বাঁকের উপকথা

কোপাই ভাবিয়েছে তারাশঙ্করকেও। তারা বাবু এই নদীর পাড়ে বসেই হয়তো তারা গুনতেন আর নদীপাড়ে বেড়ে ওঠা মানুষের জীবন দেখতেন মানবিক মন দিয়ে। আড়চোখে দেখতেন বাঁশবাদী গ্রামের কন্যাদের! আপাত শান্ত এই কোপাইয়ের বাঁক অনেকটা হাঁসুলির আকৃতিবিশিষ্ট। তারাশঙ্কর এই নদীকে ঘিরে লিখেছেন বিখ্যাত উপন্যাস হাঁসুলি বাঁকের উপকথা।

কনে দেখা আলোয় কোপাইয়ের রূপ

এই নদীর অববাহিকায় মাটির রঙ লাল। ভূমিক্ষয়ের ফলে সৃষ্টি হয়েছে ছোট ছোট খাদ, যা খোয়াই নামে পরিচিত। পাড়ে আছে খোয়াই বন। বনের ভেতর বসে হাট। নাম খোয়াই বনের অন্য হাট। হাট জমে বিশেষ দিনে। অন্য আট-দশটি হাটের মতো নয়। মন রাঙানো জিনিসপত্রে ভরে ওঠে হাট। তবে শেষ বিকেলে মানুষ এখনও আসে কোপাইয়ের রূপ দেখতে। ক্লান্ত মানুষ সারাদিন খেটে বাড়ি ফেরার পথে কোপাইয়ের হাঁটুজলে শরীর ভিজিয়ে নেয়। সূর্যটাও ডুবে যেতে যেতে নানা কথা বলে যায় কোপাইয়ের জল ছুঁয়ে। শেষ বিকেলের আদুরে আলো অন্যরকম ঘোরলাগা ছড়িয়ে দেয় কোপাইয়ের শরীরে। কনে দেখা আলোয় ডাগর কোপাই দাঁড়িয়ে থাকে তার সব রূপ গায়ে মেখে। তবে আগে যারা কোপাইয়ের রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাদের অনেকেই বুক চাপড়ান। কোপাইয়ের সেই রূপ যে আর নেই! হারিয়ে গেছে। মানুষ খেয়ে ফেলেছে! নদী খেয়ে ফেলে মানুষ। নদীর রূপও! হ