চারমাত্রা

চারমাত্রা

মানসীর চোখে বাংলাদেশ

তারুণ্য

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০১৯

তিনি একজন ডাক্তার। নাম মানসী সাহা তুলি। নেশা স্কুটি চেপে বন্ধুদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে বেড়ানো। ঘুরে ঘুরে তিনি বিভিন্ন স্কুলের কিশোরীদের নানা বিষয়ে সচেতন করে তুলছেন। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। নিজের সংগঠন ও সংগঠনের কাজ নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

মানসী সাহা তুলি। পেশায় চিকিৎসক। জন্ম নড়াইলে হলেও খুলনায় বেড়ে ওঠেন। সম্প্রতি দেশের ৬৪ জেলা তার ভ্রমণ শেষ হয়েছে। দর্শনীয় স্থান দেখা আর লোভনীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া, ভ্রমণ বলতে মানুষ এমনটাই বুঝে। তবে মানসীর কাছে ভ্রমণ অন্যরকম। তিনি স্কুলের কিশোরীদের নিয়ে কাজ করেন। বয়ঃসন্ধিতে করণীয়, আত্মরক্ষার কৌশল, মুক্তিযুদ্ধ, ইভটিজিং ইত্যাদি তাদের বুঝিয়ে বলেন, সচেতন করে তোলেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর বান্ধবী হিসেবে পেলেন সাকিয়া হককে। তার বাড়িও খুলনায়। সাকিয়া অনেক জেলা বেড়িয়েছেন ততদিনে। মানসীকে সেই সাহস দিলেন। বান্ধবীরা মিলে বেড়াতে গেলেন কুয়াকাটা। একসময় ভাবলেন, নিছক ঘোরাঘুরি নয়, ঘুরতে গিয়ে মানুষের জন্য কিছু করা দরকার। যেহেতু চিকিৎসক। তিনি দেখতেন, বয়ঃসন্ধিতে নানা সমস্যায় পড়ে মেয়েরা। কাউকে খুলেও বলে না। যতক্ষণ না সমস্যা জটিল হয়।

মানসী সাকিয়ার সঙ্গে আলাপ করলেন। ভ্রমণে তো আমরা যাই-ই, এবার না হয় স্কুলগুলোতে যাওয়া যাক। মেয়েদের পাশে দাঁড়ানো যাক। সাকিয়া একমত হলেন। ততদিনে দু'জনে অনেক জেলা ঘুরে দেখেছেন। ৬৪টি জেলায় যাবেন। প্রতি জেলায় একটি স্কুলে গিয়ে কথা বলবেন। কখন কোন স্কুলে যাবেন, স্কুল কর্তৃপক্ষকে রাজি করানো, স্থানীয় পর্যায়ে অনেক কাজ। ঢাকায় বসে যা করা যাবে না। সময় লেগে যাবে বেশ। এ জন্য সংগঠন দরকার, বললেন মানসী।

২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর। দু'জনে গড়ে তুললেন ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ। নারীদের ট্রাভেলিং গ্রুপ। নারীদের জন্য ভ্রমণের আয়োজনের পাশাপাশি সচেতনতামূূলক কাজ করবেন তারা। সংগঠনের ভলান্টিয়ার আছে দেশব্যাপী। তারা স্কুটি ঠিক করে রাখবে। স্থানীয় পর্যায়ের সব কাজ করবে। শুরুতে এমনটাই পরিকল্পনা আঁটা হয়।

এত যানবাহন থাকতে স্কুটি কেন? মেয়েদের জন্য বাইক স্পেশাল কিছু না। অন্য সব কাজের মতো তারাও বাইক চালাতে পারেন। মেয়েরা বাইক চালালে তালের আঁটির মতো চোখ বড় করে দেখার কিছু নেই। এমনটা বোঝাতেই আমরা স্কুটি বেছে নেই- বললেন মানসী। ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল মানসী আর সাকিয়ারা চালু করলেন কর্ণফুলী প্রেজেন্টস নারীর চোখে বাংলাদেশ প্রজেক্ট। উদ্দেশ্য ৬৪টি জেলা ভ্রমণ। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করা। এর মধ্যে অধিকাংশ জেলা তারা ভ্রমণ শেষ করেছেন। শুরুতে কর্ণফুলী গ্রুপ দুটি স্কুটি কিনে দেয়। প্রথম কর্মসূচি ছিল ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল। স্থান নারায়ণগঞ্জ ইউনাইটেড স্কুল অ্যান্ড কলেজে।

ভ্রমণের অনেক অভিজ্ঞতাই মানসীকে নাড়া দেয়। একেক জেলার মানুষ, ভাষা, খাবার একেক রকম। কোনো বিষয়েই মিল নেই। তবে বাংলাদেশের মানুষ অতিথিপরায়ণ। এটাই সবচেয়ে বড় মিল বললেন মানসী সাহা। ঠাকুরগাঁওয়ে দলিতদের গ্রাম। দলিতরা সুবিধাবঞ্চিত। মূল সমাজে তাদের ঠাঁই নেই। অথচ এসব মানুষই ফুল দিয়ে মানসীদের বরণ করে নেয়। রক্ষণশীলতা যে সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছেন সেটা নোয়াখালী গিয়ে হাড়ে হাড়ে টেন পান মানসী। স্কুলে কথাই বলতে দেওয়া হচ্ছিল না।

স্কুটিতে মানসী ৫৭টি জেলা ভ্রমণ শেষ করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে ভ্রমণ মিলিয়ে যা মোট ৬৪টি জেলায় দাঁড়ায়। বাংলাদেশে সাকিয়া হক আর মানসী সাহা হবেন প্রথম দুই নারী, যারা বাংলাদেশে প্রথম স্কুটিতে করে ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করেছেন। তার জন্য তাদের আর মাত্র ৭টি জেলা স্কুটিতে ভ্রমণ করতে হবে। ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ কেবল ফেসবুক গ্রুপ নয়। এটি একটি সংগঠন। প্রায় ৫০টি সফল ট্যুরের আয়োজন করেছে তারা। কিশোরী থেকে বৃদ্ধা। সব বয়সের নারী ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশের সঙ্গে ভ্রমণে যাচ্ছে। বললেন মানসী। কিছুদিনের মধ্যেই নারীর চোখে বাংলাদেশ প্রজেক্ট সমাপ্ত হবে। এরপর পরিকল্পনা কী? যারা ভলান্টিয়ার হিসেবে জেলায় জেলায় স্কুল ঠিক করেছে এতদিন। এবার তারা তার জেলায় স্কুলগুলোতে গিয়ে কথা বলবে। এমনটাই পরিকল্পনা- বললেন ডা. মানসী সাহা তুলি। হ