চারমাত্রা

চারমাত্রা

আমাদের ক্ষমা করুন সোহেল...

স্মরণ

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০১৯

জাহিদুর রহমান

বাড়ির আঙিনায় যত্ন করে একটি শিমুল গাছ লাগিয়েছিলেন সদ্য প্রয়াত বনানীর অগ্নিবীর সোহেল রানা। সেই শিমুল ছায়াতেই শায়িত হলেন তিনি। ৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জের কেরালা গ্রামে সোহেলের মরদেহ যখন কবরে নামানো হচ্ছিল, তখন যেন কেঁদে ওঠে আকাশটাও। অঝোর ধারার বৃষ্টি একাকার করে দেয় স্বজনদের চোখের জল। কাঁদবেই বা না কেন- সোহেল রানা যে ছিলেন পুরো পরিবারের ভরসা।

সোহেলের বাবা নুরুল ইসলাম পেশায় কৃষক। বয়সের ভারে তিনি এখন আর কাজ করতে পারেন না। তার চার ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সোহেল দ্বিতীয়। টিনের দোচালা ঘরে গাদাগাদি করে থাকেন সবাই। ২০১০ সালে এসএসসি পাস করে টাকার অভাবে আর লেখাপড়া চালাতে পারছিলেন না সোহেল। অটোরিকশা চালিয়ে আর প্রাইভেট পড়িয়ে এইচএসসি পাস করেন ২০১৪ সালে। পরের বছরেই যোগ দেন ফায়ার সার্ভিসে। তার আয়েই চলত পরিবারের ভরণপোষণ ছাড়াও ছোট তিন ভাইয়ের পড়ালেখার খরচ।

গত ২৮ মার্চ বনানীর এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আটকেপড়া মানুষকে উদ্ধারে জীবন বাজি রেখেছিলেন সোহেল। আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কর্তব্য আসলেই কী? প্রাণ উৎসর্গ করে প্রমাণ করেছেন- 'মানুষ মানুষের জন্য'। একটি দায়িত্বশীল প্রাণ ঝরে গেল অকালেই, এই যে অপূরণীয় ক্ষতি, সেই ক্ষতি পোষানো হবে কী দিয়ে? কী দিয়ে শোধ হবে সোহেল রানার পরিবারের ঋণ? হয়তো কিছু ক্ষতিপূরণ, কিন্তু যারা এই আগুন লাগার সঙ্গে জড়িত, যারা অবৈধভাবে ভবন তৈরি করেছে, পুরো ভবনটিকে একটি 'মৃত্যুকূপ' বানিয়েছে- তারা কি বিচারের আওতায় আসবে বা তাদের শাস্তি কি হবে?

সোহেলের মৃত্যু বেশ কিছু সাধারণ অথচ নির্মম প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। আগুনের লেলিহান শিখায় যখন মানুষ অঙ্গার হচ্ছে, তখন আমরা কেউই জীবন বাজি রাখতে পারিনি। অত বড় কলিজা সবার থাকে না। জীবন বাজি রেখে আগুনের সঙ্গে যুদ্ধ করে ফায়ারফাইটার সোহেল রানা বাঁচিয়েছিলেন অনেককে। কংক্রিটের এই নগরীতে গ্রামের কুঁড়েঘর থেকে আসা রানার করুণ মৃত্যুর দায় কি আমরা কেউই এড়াতে পারব? আমরা সবাই কি অপরাধী না? আমাদের নিজের বিবেককে একটু জাগ্রত করলেই সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাব।

সোহেল রানার মৃত্যু কি দুর্ঘটনা নাকি দক্ষ সরঞ্জাম সংকটের ফল? প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক সরঞ্জামের এই ঘাটতি কেন? আমাদের ফায়ার সার্ভিসের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হবে কবে?

যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবেগ বিতরণ করছি, তারা কি নিজেদের বসতবাড়ি ও কাজের জায়গাটি সুরক্ষিত রাখছি? অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্রুত নেমে আসার সিঁড়ি আছে কয়টি ভবনে? দমকলের গাড়ি সহজে আসতে পারবে এমন কয়টি গলিপথ আছে এই শহরে? আমরা কি আমাদের বাসভবন কিংবা অফিস ভবনের ফায়ার এক্সিটসহ বিভিন্ন লাইন নিয়মিত পরীক্ষা করাই? আমরা সবাই আমাদের বাড়িঘরগুলো গ্রিল দিয়ে খাঁচা বানিয়ে রেখেছি। আপদকালে আমরা বের হবো কীভাবে? চারতলার ভিত দিয়ে তৈরি করে ফেলছি দশতলা। টাকা, ক্ষমতার দাপট আর লোভের খাতিরে অনিয়মের ফাইলে স্বাক্ষর দিয়েছি।

সোহেল রানার মতো অনেক প্রাণ গেছে লোভের আগুনে, অনিয়মের আগুনে, নৈরাজ্যের আগুনে, অপব্যবস্থার আগুনে। যে যেভাবে পারি, লুটে নিতে চাইছি। আমাদের দরকার শুধু টাকা। কিন্তু লোভের আগুন আত্মঘাতীই হয়ে থাকে এবং সেটা থামাতে না পারার অর্থ হচ্ছে গাছের যে ডালে বসেছি, সেই ডাল নিজেই কেটে ফেলার ব্যবস্থা করা। আপনি, আমি, আমরা যে কেউই থাকতে পারতাম সোহেল রানার মরদেহের সারিতে। সোহেল রানা আমাদের সবাইকে অপরাধী করে গেলেন। আপনি সত্যিই এক সাহসী অগ্নিমানব। আমরা বিবেকহীন, লজ্জাহীন, আমাদের ক্ষমা করুন। আপনার কাছে, আপনার পরিবারের কাছে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।