চারমাত্রা

চারমাত্রা

আহা মিষ্টি!

হরেকমাত্রা

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০১৯

বাঙালির খাওয়া-দাওয়ায় মিষ্টি অতি জনপ্রিয় উপকরণ। কোনো উপলক্ষ-অনুষ্ঠানই মিষ্টি ছাড়া পূর্ণতা পায় না। বাংলাদেশে মিষ্টিকে পণ্য করে গড়ে উঠেছে অগণিত নামিদামি মিষ্টি বিক্রয়কেন্দ্র। সেই আদি যুগের লাড্ডু থেকে শুরু করে সন্দেশ, কালোজাম পেরিয়ে আজ মিষ্টির প্রকারভেদে শিল্পের পর্যায়ে। মিষ্টির ইতিহাস আর হরেক রকম বৈচিত্র্যের কথা জানাচ্ছেন গোলাম কিবরিয়া

উপমহাদেশে মিষ্টির ইতিহাস

ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রাচীন মিষ্টি মতিচুরের লাড্ডু। বয়স দুই হাজার বছরেরও বেশি। আধুনিক সন্দেশ, রসগোল্লার বয়স দুই-আড়াইশ' বছর। বাঙালি ছানা তৈরি করতে শিখেছে পর্তুগিজদের কাছ থেকে। তাদের কাছ থেকে বাঙালি ময়রা ছানা ও পনির তৈরির কৌশল শেখে। ভাস্কো দা গামা কালিকট বন্দরে এসেছিলেন ১৪৯৮ সালে; ভারত ত্যাগ করেন ১৫০৩ সালে। উপমহাদেশে ছানা তৈরির প্রণালি বিস্তার অনেক পরের ঘটনা।

প্রথমদিকে ছানা ও ছানার মিষ্টি পরিত্যাজ্যই ছিল ধর্মীয় কারণে। বৈদিক যুগে দুধ ও দুধ থেকে তৈরি ঘি, দধি, মাখন ইত্যাদি ছিল দেবখাদ্য। বিশেষ করে ননি ও মাখন অত্যন্ত প্রিয় ছিল শ্রীকৃষ্ণের। এ জন্য দুধ থেকে রূপান্তরিত ওইসব খাদ্য শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু ছানা তৈরি হয় দুধ বিকৃত করে। এ জন্য মনুর বিধানমতে, ছানা ছিল অখাদ্য।

এ সম্পর্কে সুকুমার সেন তার 'কলিকাতার কাহিনী' বইয়ে লিখেছেন, ক্ষীর-মাখন-ঘি-দই এগুলো কাঁচা দুধের স্বাভাবিক পরিণাম, কৃত্রিম অথবা স্বাভাবিক। কিন্তু কোনোটিই দুধের বিকৃতি নয়। 'ছানা' কিন্তু ফোটানো দুধের কৃত্রিম বিকৃতি। বাঙালি অন্য দ্রব্য সংযোগ করে দুধ ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে, যাতে সারবস্তু ও জলীয় অংশ পৃথক হয়ে যায়। এভাবে দুধ ছিন্নভিন্ন করা হয় বলেই এর নাম হয়েছিল বাংলায় 'ছেনা'; এখন বলা হয় 'ছানা'।'

সন্দেশ ছানা আবিস্কারের আগে ছিল। আগে সন্দেশ তৈরি হতো বেসন, নারকেল ও মুগ ডালের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে। নীহাররঞ্জন রায় তার 'বাঙালির ইতিহাস' বইয়ে বাঙালির মিষ্টিজাতীয় যে খাদ্যের বিবরণ দিয়েছেন, তাতে সঙ্গত কারণেই ছানার কোনো মিষ্টির উল্লেখ নেই। সন্দেশের উল্লেখ আছে, তবে সেই সন্দেশ ছানার নয়। তিনি বলেছেন, 'কোজাগর পূর্ণিমা রাত্রে আত্মীয়-বান্ধবদের চিপিটক বা চিড়া এবং নারিকেলের প্রস্তুত নানা প্রকারের সন্দেশ পরিতৃপ্ত করিতে হইত এবং সমস্ত রাত বিনিদ্র কাটিত পাশা খেলায়।' চিনির সঙ্গে ছানার রসায়নে আধুনিক সন্দেশের উদ্ভাবন অষ্টাদশ শতকের শেষে। এই আধুনিক সন্দেশ রসগোল্লার আবিস্কর্তা হুগলির হালুইকররা। পরে তারা কলকতায় এসে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একে জগদ্বিখ্যাত করে তোলেন। প্রথমদিকে ছানার সন্দেশকে বলা হতো 'ফিকে সন্দেশ'। কারণ, এ সন্দেশে আগের দিনের সন্দেশের চেয়ে মিষ্টি কম। শাস্ত্রসম্মত নয় বলে ছানার সন্দেশ অনেকে খেতে চাইত না। কলকাতার ময়রাদের সৃষ্টিতে মুগ্ধ শঙ্কর তার 'বাঙালির খাওয়া দাওয়া' বইয়ে কড়া পাক, নরম পাক, কাঁচাগোল্লা, চন্দন সন্দেশসহ হাজার রকম সন্দেশের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, 'এঁরা আমেরিকান বিজ্ঞানীদের মতো পাইকিরি হারে মিষ্টিশাস্ত্রে নোবেলজয়ী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।' তিনি জানান, সন্দেশ এত বৈচিত্র্যময় যে, শীতকালের সন্দেশ আর গ্রীষ্ফ্মের সন্দেশে তো পার্থক্য আছেই, এমনকি সেপ্টেম্বর আর অক্টোবরের সন্দেশও নাকি এক রকম নয়। রসগোল্লার নাম আদিতে ছিল গোপাল গোল্লা। রসের রসিক বাঙালি চিনির সিরায় ডোবানো বিশুদ্ধ ছানার গোল্লাকে নাম দিয়েছে রসগোল্লা। পরে ছানা ও চিনির রসায়নে নানা আকৃতি ও স্বাদে নানা নামে মিষ্টির সম্ভার হয়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময়। ছানার মিষ্টি এপার-ওপার উভয় বাংলায় বিপুল জনপ্রিয় হলেও বঙ্গের বাইরে, এখনও ছানার মিষ্টি তেমন তৈরি হয় না। এ কারণেই দিল্লির মসনদ এখনও লাড্ডুর দখলে।

হরেক রকম মিষ্টি

বাংলার মিষ্টিকে দু'ভাগে ভাগ করেছেন সুকুমার সেন। প্রথম ভাগে আছে একক উপাদানে তৈরি মিষ্টি। এ ধরনের মিষ্টিতে গুড় বা চিনির সঙ্গে আর কিছু মিশ্রিত থাকে না। দ্বিতীয় ধরনের মিষ্টিকে আরও দু'রকমে ভাগ করা চলে। গুড় বা চিনির সঙ্গে দুগ্ধজাত কোনো উপকরণ ছাড়া অন্য দ্রব্য সহযোগে তৈরীকৃত মিষ্টান্ন। যেমন নারকেল ও তিলের নাড়ূ ইত্যাদি। দুগ্ধজাত দ্রব্যযোগে তৈরি নানা ধরনের মিষ্টি রসিক ও মিষ্টিপ্রিয় বাঙালির সুপরিচিত। চিনির সঙ্গে ছানার সংযোগে তৈরি হয় সন্দেশ ও মণ্ডা। ছানা রসে মাখিয়ে তৈরি হয় রসগোল্লা, দুধে ডোবালে রসমালাই। বেসনের ছোট ছোট দানা ঘিয়ে ভেজে তৈরি হয় বুন্দিয়া, যা দেখতে ছোট বিন্দুর মতো। কড়া পাকে প্রস্তুতকৃত বুন্দিয়াই মতিচুর, লাড্ডুর কাঁচামাল।

নামে রাজত্ব

নামের দিক দিয়ে যথেষ্ট আভিজাত্যপূর্ণ মিষ্টি জন লেডিকিনি। এটি পানতোয়া বা গোলাপজামেরই অন্য নাম। এ মিষ্টি বড়লাট-গিন্নি লেডি ক্যানিংকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। এর পর আরও যেসব নাম করতে হয় তা হলো, ভিক্টোরিয়া সন্দেশ, লর্ড রিপন সন্দেশ। তবে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নামে 'আশুভোগ' সন্দেশ টিকে আছে। মিষ্টির ইতিহাসে প্রথম সরকারি রেজিস্ট্রি করা খাবারের নাম 'আশুভোগ'। এর আগে কোনো মিষ্টি কেউ রেজিস্ট্রি করেনি। মহারানী ভিক্টোরিয়া স্মরণে তৈরি হয়েছিল একটি আধমণ ওজনের গজা, যার নাম এমপ্রেস গজা। আরও রয়েছে ভিক্টোরিয়া সন্দেশ, লর্ড রিপন সন্দেশ। শেষ পর্যন্ত টিকে আছে ওই লেডিকিনিই।

বাংলাদেশের বিখ্যাত মিষ্টি

টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, কুমিল্লার রসমালাই, বিক্রমপুর ও রসগোল্লা, বগুড়া ও গৌরনদীর দই, যশোরের খেজুরগুড়ের সন্দেশ, শাহজাদপুরের রাঘবসাই, পানতোয়া, মুক্তাগাছার মণ্ডা, খুলনা ও মুন্সীগঞ্জের আমৃতি, কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি, নওগাঁর প্যাড়া সন্দেশ, ময়মনসিংহের আমৃতি, যশোরের জামতলার মিষ্টি, যশোরের খেজুরের নলেনগুড়ের প্যাড়া সন্দেশ, যশোরের খেজুররসের ভিজা পিঠা, মাদারীপুরের রসগোল্লা, রাজশাহীর তিলের খাজা, সিরাজদীখানের পাতক্ষীরা, রাজবাড়ীর শংকরের ক্ষীরের চমচম, নওগাঁর রসমালাই, পাবনার প্যারাডাইসের প্যাড়া সন্দেশ, পাবনার শ্যামলের দই, সিরাজগঞ্জের পানতোয়া, কুষ্টিয়ায় মহিষের দুধের দই, মেহেরপুরের সাবিত্রী, কুষ্টিয়ার তিলে খাজা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখি, মানিকপুর-চকরিয়ার মহিষের দই, ইকবালের সন্দেশ, বোম্বাইয়াওয়ালার ক্ষীর, মহাস্থানের কটকটি, গাইবান্ধার রসমঞ্জুরি, কুষ্টিয়ার স্পেশাল চমচম, ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউর পূর্ণিমার জিলাপি, গুলশানের সমরখন্দের রেশমি জিলাপি, দেওয়ানগঞ্জ-জামালপুরের রসগোল্লা, মহেশখালীর মোষের দই, রাজশাহীর রসকদম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের চমচম, প্যাড়া সন্দেশ, কিশোরগঞ্জের তালরসের পিঠা।