চারমাত্রা

চারমাত্রা

শতবর্ষী বৈশাখী মেলা

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০১৯

বছর ঘুরে আবারও দুয়ারে এসেছে বৈশাখ। বাংলার চিরন্তন এই উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হয় অসংখ্য বৈশাখী মেলা। এই মেলার অনেকগুলোর বয়স আবার একশ' বছরেরও বেশি। বাংলার বেশ কয়েকটি শতবর্ষী বৈশাখী মেলা ঘুরে লিখেছেন ইমরান উজ-জামান

রুদ্র রূপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বর্ণিল রঙে প্রকৃতিকে সাজাতে আগমন বৈশাখের। বৈশাখের রূপের দোলা লাগে মানুষের মনেও। বৈশাখের রঙ ধরতে দেশব্যাপী চলে নানা আয়োজন। এই আয়োজন শুরু হয় চৈত্রের খরতাপের মধ্য দিয়ে। চৈত্রের শেষ সপ্তাহজুড়ে থাকে বর্ষবিদায়ের আয়োজন, যাকে নীলপূজা বলা হয়।

নীলপূজা মানে অনেকগুলো পূজার একত্রিত রূপ। গম্ভীরাপূজা বা শিবের গাজন দিয়ে শুরু, তার পর হয় 'বুড়োশিব' পূজা, থাকে কুমিরের পূজা, জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর হাঁটা, কাঁটা আর ছুরির ওপর লাফানো, বাণফোঁড়া, শিবের বিয়ে, অগ্নিনৃত্য, চড়কগাছে দোলা বা চড়কপূজা। সব শেষে দানো-বারানো বা হাজরা পূজার মাধ্যমে শেষ হয় নীল পূজার আনুষ্ঠানিকতা। আর এভাবেই নতুনের আবাহনে বিদায় জানানো হয় পুরনো বছরকে। ভূতপ্রেত ও পুনর্জন্মবাদের ওপর বিশ্বাসীরা এই সব পূজায় অংশ নেন। পুরনো জীর্ণতাকে পরিহার করে, পহেলা বৈশাখের প্রথম দিন নতুনভাবে পথচলার অঙ্গীকার নিয়ে শুরু হয় একটি নতুন দিন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি হয় বর্ণিল আয়োজনের মাধ্যমে। সারাদেশ মাতে উৎসবে। চৈত্রসংক্রান্তি ও বৈশাখ উপলক্ষে সারাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা এমনকি গ্রাম পর্যায়েও মেলা বসে। সারাবছর দেশে প্রায় ৫ হাজার মেলা আয়োজিত হয়। আর শুধু বৈশাখকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হয় প্রায় ২০০ মেলা। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা এসব মেলার মধ্যে অনেক মেলা আছে, যার বয়স শত বছর পেরিয়ে গেছে। এমন সব মেলা নিয়ে এই আয়োজন।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের বৈশাখী মেলার প্রধান আকর্ষণ বলীখেলা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রে লালদীঘি মাঠে বসে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কুস্তি খেলাকে বলীখেলা বলা হয়। ১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন।

তার মৃত্যুর পর এই আয়োজন জব্বারের বলীখেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। বলীখেলাকে কেন্দ্র করে লালদীঘি মাঠের আশপাশে তিন কিলোমিটারজুড়ে বৈশাখী মেলা বসে, যা বৃহত্তর চট্টগ্রাম এলাকার সবচেয়ে বৃহৎ বৈশাখী মেলা। শতবর্ষী এ মেলায় মাটির তৈরি তৈজসপত্র থেকে শুরু করে কাঠের আসবাবপত্র সবই পাওয়া যায়। ছোটদের জন্য থাকে খেলনা, জিলাপি, আঙ্গুলি, কদমা, মুড়ির মোয়া। বিনোদনের জন্য আছে চড়কা, নাগরদোলা।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার মাদার্শা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী মেলা মক্কার বলীখেলা। এই বলীখেলা উপলক্ষে বসে বৈশাখী মেলা। ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসে এই বৈশাখী মেলা। মেলায় পাওয়া যায় শিশুদের খেলনাপাতিসহ খাবার, কাপড়চোপড়। এ ছাড়া রয়েছে বাঁশ-বেত, মাটি ও কাঠের তৈরি জিনিসপত্র। এই খেলায় বিচারক হিসেবে থাকেন এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

আনোয়ারায় আছে বর্ষীয়ান বলীখেলার আয়োজন এবং এ উপলক্ষে বৈশাখী মেলা। তৈলার দ্বীপের এরশাদ আলী সরকার এই বলীখেলার প্রচলন করেছিলেন। প্রায় শত বছর প্রাচীন এই বলীখেলা ও বৈশাখী মেলার আসর বসে আনোয়ারা উপজেলার তৈলারদ্বীপ গ্রামের এরশাদ আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা মেলা বৈশাখের ৪ তারিখ থেকে শুরু হয়। মেলায় নাগরদোলা, হস্তশিল্প, কৃষি সরঞ্জাম, আসবাবপত্র, নিত্যপ্রয়োজনীয় মালপত্র, ছোটদের খেলনা ও বাহারি সামগ্রীর জমজমাট আয়োজন থাকে।

বৃহত্তর চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় স্মরণকালে কক্সবাজারে প্রচলিত হয়েছে ডিসি সাহেবের বলীখেলা এবং এ উপলক্ষে বৈশাখী মেলা। কক্সবাজার বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামে ঐতিহ্যবাহী ডিসি সাহেবের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলার বয়স তাও কয়েক যুগে পা রেখেছে। ১৯৮৪ সালে কক্সবাজার মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হয় এবং জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে বলীখেলার প্রচলন হয়। এই খেলা ডিসি সাহেবের বলীখেলা নামে পরিচিত। বৈশাখী মেলায় নাগরদোলা, হস্ত, কুঠি, তাঁত, মৃৎশিল্পসহ দেশীয় পণ্যের আড়ং বসে।

টাঙ্গাইলের রসুলপুরে প্রতিবছর সনাতন পঞ্জিকা অনুসারে ১১, ১২ ও ১৩ বৈশাখ বাছিরন নেছা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজন করা হয় জামাই মেলা। এই মেলা উপলক্ষে রসুলপুরসহ আশপাশের প্রায় ৩০টি গ্রামের লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। বৈশাখ উপলক্ষে মেলা বসলেও এর নাম 'জামাই মেলা'। মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকার সব জামাই শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে আসেন, তারাই মেলায় কেনাকাটা করেন। এই হলো 'জামাই মেলা'র হেতু। মেলার বয়স শতেকের ওপরে, ব্রিটিশ আমলে মেলাটি বৈশাখী মেলা হিসেবে পরিচিত ছিল। পরে মেলায় জামাইদের উপস্থিতির আধিক্য থেকে এর নামকরণ করা হয় জামাই মেলা।

প্রতিবছর বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে নড়াইলের কালিয়ায় হয় চড়ক মেলা। কালিয়া পৌর ভবনের সামনে ঠাকুরবাড়িতে চৈত্রের শেষ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় এই চড়ক। আলোচিত এ চড়ক মেলায় প্রায় ৪৫ ফুট লম্বা চড়ক গাছের ওপরে বাঁশ বেঁধে চার কোনা আকৃতির চড়কি বানানো হয়। চড়কির চার কোনায় চারটি দড়ি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ঝোলানো প্রতিটি দড়ির সঙ্গে কাপড় বেঁধে বিশেষ কায়দায় চারজনের পিঠে বাঁধা হয়। তারপর শুরু হয় চড়কি ঘোরানোর কাজ। নিচ থেকে বাদ্য বাজনার সঙ্গে সঙ্গে ২৫-৩০ যুবক চড়কি দ্রুতবেগে ঘোরাতে থাকে।

প্রচলিত আছে, প্রায় শত বছর আগে চড়ক মেলা শেষে ওই চড়ক গাছটিকে সেখানকার গঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। তারপর চৈত্র মাসের ৩০ তারিখে ১০ জন লোক নদীর কাছে গিয়ে বাদ্যযন্ত্র বাজালে কিছু সময় পর চড়ক গাছটি নিজে নিজে পানির ওপরে ভেসে উঠত। তখন দড়ি দিয়ে গাছটিকে টেনে ওপরে আনা হতো। আবার মেলা শেষে চড়ক গাছকে ঠাকুরবাড়ির পুকুরে ডুবিয়ে রাখা হতো। এই চড়কপূজার মেলা বৈশাখের প্রথম দিন রূপ নেয় বৈশাখী মেলা হিসেবে। কালিয়ার এই মেলার বয়স প্রায় ২০০ বছর।

চড়কপূজা উপলক্ষে প্রাচীন মেলা বসে যশোরের অভয়নগরের সুন্দলী ইউনিয়নের সুন্দলী গ্রামে। গ্রামের মাঝখানে বিশালাকার একটি জায়গায় অবস্থিত শুড়িরডাঙ্গা সিদ্ধাশ্রম ও মহাশ্মশান। ধানক্ষেত মাড়িয়ে মাঠ থেকে একটু উঁচু জায়গায় এই আশ্রম ও শ্মশান। এই শ্মশানে প্রতিবছর বাংলা সনের চৈত্র মাসের শেষ দু'দিন অনুষ্ঠিত হয় চড়কপূজা। পূজা উপলক্ষে বসে মেলা। ২৯ ও ৩০ খেজুর ভাঙা ও চড়কপূজার পার্বণ পালিত হয়। একই জায়গায় পহেলা বৈশাখে শুরু হয় বৈশাখী মেলা। সুন্দলীর মেলায় ২০ হাজারেরও বেশি লোকসমাগম হয়।

কুমিল্লার বুড়িচংয়ের ময়নামতি ইউনিয়নের সাহেববাজার এলাকায় ঐতিহ্যবাহী রানী ময়নামতি বাংলোকে ঘিরে বসে শত বছরের পুরনো বৈশাখী মেলা। মেলায় মৃৎশিল্প, বাঁশ ও বেতশিল্প, নকশিকাঁথা, শতরঞ্জি, হাতপাখা, গহনা, ঝিনুকপণ্য, পুঁথির মালা সবই পাওয়া যাচ্ছে। ৭ বৈশাখ থেকে আরম্ভ হয়ে মাসব্যাপী চলে এই মেলা। মেলা উপলক্ষে বসে নাগরদোলা, মুড়ি-মুড়কি, বাচ্চাদের চরকি গাড়ি, জিলাপি, চটপটি-হালিম, বাঁশি, মেয়েদের প্রসাধন সামগ্রী, বটি-দা, কুড়াল, মাছ শিকারের জন্য ঝাঁকি জাল, হাতপাখা, ঘুড়ি ও বিভিন্ন কাঠের সামগ্রী। শতবর্ষ পুরাতন এ মেলাটি ব্যস্ততম কুমিল্লার এই অঞ্চলের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। মেলা উপলক্ষে ময়নামতি রানীর প্রাসাদের পাশে অবস্থিত ময়নামতি কালীমন্দিরে হাজারো পুণ্যার্থীর মিলন ঘটে।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে ঐতিহ্যবাহী পাউলদিয়ার বটতলায় বসে বৈশাখী মেলা। মেলায় উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের হাজারো মানুষ ভিড় করে। এই মেলার বয়স প্রায় শত বছর বলে জানা যায়।

বৈশাখ উপলক্ষে জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে বসে গোপিনাথপুর মেলা। এই মেলার বিশেষত্ব হলো ঘোড়ার হাট। সারি করে ঘোড়া সাজানো থাকে। মানুষ তার পছন্দমতো ঘোড়া কিনে বাড়ি ফেরেন। পাশ দিয়ে হাঁটলেই কানে আসে ঘোড়াগুলোর বাহারি সব নাম। ঘোড়ার মালিকরা ডাকেন বিজলি, কিরণমালা, রানী, সুইটি এমন সব বাহারি নামে। দেশের একমাত্র ঘোড়া বেচাকেনার হাট এটি, বৈশাখকে কেন্দ্র করে সেই হাট বিশালাকার ধারণ করে। এই মেলা প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো বলে জানা যায়। স্বাধীনতার পরও মেলায় নেপাল, ভুটান, ভারত, পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে উন্নত জাতের ঘোড়া আসত এই মেলায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে অতি প্রাচীনকাল থেকে উপজেলার সদরে নিজসরাইল গ্রামে সাধক গাজী, কালু নামে বৈশাখ মাসে বসে বৈশাখী মেলা। নিজসরাইল গ্রামে বৃহৎ বটবৃক্ষের তলায় চৈত্র মাসের শেষের দিকে গাজী, কালুর নামে কাপড় মোড়ানো রঙিন বাঁশ দাঁড় করানো হয়। মেলায় রেলগাড়ি, বাঁশ, বেত, শিল্পকাঠ, মাটির তৈরি খেলনা, চড়কি, পুতুলনাচসহ নানা রকমের আয়োজন থাকে। প্রায় ৩০০ বছর আগে থেকে এই মেলা আয়োজিত হয়ে আসছে বলে মানুষের ধারণা।

সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলায় হালির হাওরপাড়ে এবং ফেনারবাঁক ইউনিয়নে ছয়হারা খোজারগাঁওয়ে বসে ঐতিহ্যবাহী চড়কপূজা। শিব চতুর্দশীতে চড়কপূজার আয়োজন থাকে, যা কি-না পৌরাণিক নিয়মে হয়। চড়কপূজা সনাতন ধর্মের একটি অন্যতম উৎসব। মানুষের পিঠের চামড়ায় এক ধরনের লোহার হুক বা বড়শি লাগিয়ে রশি দিয়ে বেঁধে মানুষটাকে উঁচু খামের চড়কগাছে ঝুলিয়ে ঘোরানো হয়। চড়কপূজায় সব ধর্মের হাজারও মানুষের ঢল নামে। চড়কপূজা ও মেলা শেষে পহেলা বৈশাখ বসে বৈশাখী মেলা। ২০০ বছর আগে থেকে এই মেলার প্রচলন হয়েছে বলে জানা যায়।

সাভারের নামার বাজারের পঞ্চবটীর অশ্বত্থমূলে বসে বৈশাখী মেলা। পঞ্চবটীর আশ্রমের আয়োজনে শতবর্ষী বটগাছকে কেন্দ্র করে বসে মেলা। ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের অনেক কিছুই পাওয়া যাবে এখানে। বিশেষ করে মাটির জিনিসের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। এখানে বেশ কয়েক রকমের কলকি পাওয়া যায়। কাঠের, কাঁসা-পিতল, লোহাসহ নানা পদের পণ্য পাওয়া যায় এখানে। আছে মুড়ি-মুড়কি, নাড়ু, সন্দেশ, কদমা, বাতাসা, জিলাপি, পিঁয়াজু ও পাপড়সহ নানা খাবার। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা অশ্বত্থতলে চলে কীর্তনের আসর।

বৈশাখে নোয়াখালীর কালিতারা বাজারে বসে লোকমেলা। মেঘনা নদীতে বিলীন হওয়া পুরনো নোয়াখালী শহরের পাশে কালিতারা বাজারে মেলাটি প্রথম বসে বাংলা ১৩২০ সনে। এ মেলা স্থানীয়ভাবে 'গডিয়া' হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া শতবর্ষী মেলার মধ্যে বিক্রমপুরের লঞ্চঘাটের গলিয়ার মেলা, আবদুল্লাহপুরের লালকাঁচ ও বৈশাখী মেলা, কালিয়াকৈরের বৈশাখী মেলা, বেথুয়ার বৈশাখী মেলা, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ির বৈশাখী মেলা, দুর্গাপুরের বৈশাখী মেলা।