মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু শারীরিক পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য করা যায়। চুল পাকা, চুল পড়া, ত্বকে বলিরেখাসহ দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি কমতে থাকে। বয়স্কদের চোখে ছানি পড়া সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রুচি আর ঘুম কমে যায়

বিশ্বব্যাপী বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে বার্ধক্যজনিত রোগগুলোর প্রকোপও বেড়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখের বেশি প্রবীণ রয়েছেন। আগামী ২০২৫ সাল নাগাদ তা প্রায় এক কোটি ৮০ লাখে দাঁড়াবে। মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু শারীরিক পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য করা যায়। চুল পাকা, চুল পড়া, ত্বকে বলিরেখাসহ দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি কমতে থাকে। বয়স্কদের চোখে ছানি পড়া সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রুচি আর ঘুম কমে যায়। স্মৃতিশক্তিও কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। হাড়গুলো ক্ষয় হতে থাকে। কমে যায় লিভার ও কিডনির কার্যক্ষমতা। ডায়াবেটিস থাকলে তা হয়ে পড়ে অনিয়ন্ত্রিত।

অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, কায়িক পরিশ্রমের ঘাটতি, ওষুধ খেতে ভুলে যাওয়া প্রভৃতি কারণে ডায়াবেটিসের মাত্রা ওঠানামা করে। রক্তে সুগারের মাত্রা কমে গিয়ে দেখা দিতে পারে হাইপোগ্লাইসেমিয়া, যা বয়স্ক ব্যক্তিদের বেলায় অত্যন্ত বিপজ্জনক। বয়স্কদের সাধারণত সিস্টোলিক হাইপারটেনশন দেখা দেয়। আবার অনেকের ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণ হতে চায় না। তাই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বয়স্কদের বিশেষভাবে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। রক্তনালি সরু হতে থাকে। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক বা মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ ইত্যাদি হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় হাড় ক্ষয় হওয়ার প্রবণতা। একে অস্টিওপোরেসিস বলে। সাধারণত অস্টিওপোরেসিস আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো ধরনের শারীরিক সমস্যা অনুভব করে না। হাড় ক্ষয়ের ফলে সামান্য আঘাতে যখন হাড় ভেঙে যায়, তখনই কেবল অস্টিওপোরেসিসের সমস্যা ধরা পড়ে। এ ছাড়া অস্টিও আর্থাইটিসের কারণে বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতে ব্যথা হয় ও কার্যক্ষমতা কমে যায়। অনেকেই এই ব্যথা-বেদনার জন্য দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ বা এনএসআইডিএস খেয়ে থাকেন; যা কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে। অন্ত্রে করে ক্ষত, অনেক সময় অন্ত্র ফুটো হয়ে গিয়ে ঘটতে পারে মহাবিপত্তি।

বয়স্ক পুরুষদের প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে প্রস্রাবের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ঘন ঘন প্রস্রাব লাগা, প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা, প্রস্রাব করতে কষ্ট হওয়া প্রভৃতি সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া বয়স্ক নারীদের প্রস্রাবে ইনফেকশন হতে পারে। প্রকৃতিগতভাবেই মাসিক বন্ধ হয়ে গিয়ে এ সময় মাসিক-পরবর্তী নানা জটিলতা যেমন হঠাৎ করে মাথা দিয়ে গরম ভাপ বের হওয়া, অস্থির লাগা, হঠাৎ ঘাম দেওয়া প্রভৃতি সমস্যা দেখা দেয়। ব্রেইন এট্রোফির ফলে মস্তিস্কের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। আলঝেইমারস বা ডিমনেশিয়াতে আক্রান্ত হলে স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়।

বিচার-বিবেচনা, চিন্তা ক্ষমতা, বোধশক্তি, আবেগ-অনুভূতির পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। এ সময় অনেকেই শিশুসুলভ আচরণ করেন। এ ছাড়া মাথা ঘোরানো, হাত-পা কাঁপা প্রভৃতি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বয়স্ক মানুষের খুব সহজেই পানিশূন্যতা বা লবণের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এর ফলে হাত-পা অবশ, অস্থিরতা, এমনকি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট পর্যন্ত হতে পারে। তাই ডায়রিয়া, বমি হলে প্রচুর পরিমাণে পানি, স্যালাইন, ডাবের পানি খাওয়ান। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন। এ ছাড়া বয়স্ক মানুষের নানা ধরনের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এই সময় দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে শুরু করে; তাই যে কোনো ধরনের ইনফেকশন খুব সহজেই বাসা বাঁধে। বয়স্কদের নিউমোনিয়া বা শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, প্রস্রাবে ইনফেকশন প্রকৃতি থেকে সেপটিসেমিয়া মাল্টি অরগান ফেইলিওরের মতো জীবন সংহারী সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই যে কোনো ধরনের ইনফেকশনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।

[কনসালট্যান্ট, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন রোগ বিভাগ, সিডব্লিউসিএইচ ও ইমপালস হাসপাতাল, তেজগাঁও, ঢাকা ]



কিছু বিষয় মেনে চলতে হবে

- স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন পদ্ধতি অনুসরণ করুন। নিয়মিত শরীরচর্চা করুন অথবা হাঁটুন। শুধু শারীরিক সমস্যা নয়, মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগ দূর করতেও শরীরচর্চার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

-চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ওষুধ সেবন করবেন না। এই সময় কিডনি ও লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে বিভিন্ন ধরনের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়।

-ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা শারীরিক সুস্থতা অনুভব করলেও নির্দিষ্ট সময় অন্তর চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন।

-নির্দিষ্ট সময় পরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করুন।

- সময়মতো ও নিয়মমতো স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস মেনে চলুন। কোনো অবস্থাতেই দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকবেন না।

- সব সময় হাসিখুশি ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার চেষ্টা করুন।

- বাত-ব্যথার সমস্যায় অনেকেই বিভিন্ন ব্যথানাশক খেয়ে থাকেন। শ্বাসকষ্ট, চুলকানি প্রভৃতি সমস্যাজনিত কারণে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবন করেন; যা পরবর্তী সময়ে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

- কোনো ধরনের শারীরিক সমস্যাকে ছোট মনে করবেন না বা লুকিয়ে রাখবেন না। চিকিৎসক ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তা শেয়ার করুন।

- এই সময় হাড় ক্ষয় হয়ে ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায় বলে পিচ্ছিল জায়গা পরিহার করুন। বাথরুম, গোসলখানা সব সময় শুকনো রাখুন। হাঁটার সময় প্রয়োজনে লাঠি ব্যবহার করুন। সিঁড়ি ব্যবহারের সময় রেলিং ধরে নামবেন।



পরিবারের অন্য সদস্যদের ভূমিকা

অনেক সময় পারিবারিকভাবে প্রবীণরা অবহেলা, অযত্নের শিকার হয়ে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বোঝা মনে করে পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন। আবার অনেক প্রবীণ নিজেই কারও ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাচ্ছেন না, দূরে সরে যাচ্ছেন। তাই পরিবারের অন্যান্য সদস্যের দায়িত্ব ও ভূমিকা রয়েছে প্রবীণ সদস্যদের প্রতি।

- পরিবারের অন্য সদস্যরা প্রবীণদের যথাযথ মূল্যায়ন করুন। তাদের সময় ও সম্মান দিন।

- বয়স্কদের কোনো ধরনের শারীরিক সমস্যাকে অবহেলা করবেন না।

- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া তাদের কোনো ওষুধ খেতে দেবেন না।

- তাদের নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও ওষুধ সেবনের প্রতি অধিক যত্নবান হোন।

-নির্দিষ্ট সময় অন্তর স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

- বিভিন্ন সামাজিক-পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রবীণদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিন, যাতে তারা নিজেদের কোনোক্রমেই অপ্রয়োজনীয় মনে না করেন।

- পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিন।

প্রবীণদের সমস্যাটা আসলে বহুমাত্রিক। প্রবীণদের অবহেলিত, উপেক্ষিত, পরিবার ও সমাজে বোঝাস্বরূপ না ভেবে তাদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করি। ভালোবাসা ও সময় দিয়ে তাদের মূল্যায়ন করি। তাদের প্রতি অধিকতর যত্নবান হই।

মন্তব্য করুন