বার্ধক্যজনিত কারণে শরীরে অন্য সব অঙ্গের মতো রেটিনাও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। চশমার দ্বারা দৃষ্টিশক্তির উন্নতি না হলে ও চোখে আঁকাবাঁকা এবং অস্পষ্ট দেখা অথবা কোনো ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে কমতে থাকলে রেটিনায় সমস্যা হয়েছে বলে ধারণা করা যেতে পারে


রেটিনা হচ্ছে চোখের ভেতরের একটি সংবেদনশীল পর্দা বা মেমব্রেন। যেখানে আমরা যা দেখি তার অবিকল ছায়া ধারণকৃত হয়।

আমরা যখন চোখে কম দেখি, তখন চোখের লেন্স অথবা ছানিজনিত সমস্যার কথাই মনে হবে। কিন্তু এ সমস্যাগুলো ছাড়াও চোখের একেবারে পেছনের অংশ রেটিনার সমস্যার কারণে চোখের কম দেখার বিষয়টি অনেক সময় আমরা বিবেচনায় আনি না।

রেটিনার রোগজনিত কারণে কম দেখার বিষয়টি যেভাবে বুঝতে পারবেন

আসলে রেটিনাজনিত কারণে চোখে কম দেখার বিষয়টি রোগীদের বুঝতে পারা বেশ কঠিন কাজ। রেটিনা বিশেষজ্ঞ ব্যতীত রোগটি অন্য কেউ সরাসরি ধরতে পারে না। চোখের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস চশমা দ্বারা উন্নতি না হলে, আঘাতজনিত কারণে চোখে কম দেখলে, চোখের সামনে কালো কিছু ভাসতে থাকলে, চোখের সামনে আলোর ঝলকানি দেখা দিলে, চোখে কালো পর্দার মতো কিছু পড়তে দেখলে এবং কোনো ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি হঠাৎ করে কমে গেলে রেটিনাজনিত চোখের সমস্যা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে রেটিনার জন্য দৃষ্টিশক্তি কমলে চোখে কোনো ব্যথা অনুভূত হয় না। রেটিনার রোগ বয়স ও কারণ ভেদে বিভিন্ন রকমের হতে পারে। কোনো কোনো রোগ জন্মের কিছুদিনের মধ্যে চিকিৎসা না করালে সারাজীবন অন্ধত্ববরণ করতে হয়। প্রিম্যাচিউর শিশু যারা নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই ভূমিষ্ঠ হয় অথবা জন্মের সময় ওজন দেড় কেজি বা তার কম হয়, সেসব শিশুর জন্মের ৩০ দিনের মধ্যে অবশ্যই রেটিনা পরীক্ষা করা জরুরি। নতুবা তারা রেট্রোলেন্টল পিসপ্লেশিয়া নামক মারাত্মক রেটিনার রোগে আক্রান্ত হয়ে অন্ধত্ববরণ করতে পারে। শিশুদের জন্য আরেকটি রোগ হলো, রেটিনার টিউমার।

সাধারণত তিন বছর অথবা তার নিচে শিশুরা চোখে কম দেখলে অথবা শিশুদের চোখের মণি সাদা দেখা গেলে তখন রোগটিকে সাধারণত জন্মগত ছানি বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। একই রকম উপসর্গ শিশুদের রেটিনা টিউমারে দেখা দিতে পারে। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসা না করলে সারাজীবনের জন্য অন্ধ হতে পারে, এমনকি শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আমাদের শারীরিক অনেক রোগ আছে যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা, বার্ধক্যজনিত সমস্যা ইত্যাদি কারণেও রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যাদের ডায়াবেটিস ৩০ বছরের আগে ধরা পড়ে এবং ইনসুলিন ছাড়া কন্ট্রোল হয় না, সাধারণত ২০ বছর পর এদের প্রায় প্রত্যেকেরই রেটিনার সমস্যা ধরা পড়ে। যাদের ডায়াবেটিস ৩০ বছরের পর ধরা পড়ে, তাদের ডায়াবেটিস ধরা পড়ার সময়েই চোখের রেটিনা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ তাদের শতকরা ২০ জনের কোনো না কোনো রেটিনার সমস্যা রোগ নির্ণয়ের সময় থাকে। এ ছাড়া ডায়াবেটিক রোগীর হঠাৎ করে দৃষ্টিশক্তি কমে গেলে অথবা চোখের সামনে কালো কিছু ভাসতে থাকলে দ্রুত রেটিনা বিশেষজ্ঞ দেখানো উচিত। উচ্চ রক্তচাপে রেটিনার রক্তনালিও বন্ধ হয়ে এর ক্ষতি সাধন হতে পারে। বার্ধক্যজনিত কারণে শরীরে অন্য সব অঙ্গের মতো রেটিনাও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। চশমার দ্বারা দৃষ্টিশক্তির উন্নতি না হলে ও চোখে আঁকাবাঁকা এবং অস্পষ্ট দেখা অথবা কোনো ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে কমতে থাকলে রেটিনায় সমস্যা হয়েছে বলে ধারণা করা যেতে পারে।

রেটিনা রোগীদের সব ধরনের পরীক্ষা যেমন- চোখের এনজিওগ্রাম, চোখের স্ক্যান এবং চিকিৎসা যেমন রেটিনার অস্ত্রোপচার, লেজার এবং বিভিন্ন ধরনের বিদেশি উন্নতমানের পরীক্ষা বর্তমানে বাংলাদেশে হয়ে থাকে। রেটিনার চিকিৎসা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষু বিভাগ, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল,

বারডেম হাসপাতাল এবং ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালসহ কিছু বেসরকারি হাসপাতালে রয়েছে। রেটিনা রোগীদের সচেতনতাই তাকে অনাগত দিনে রেটিনাজনিত অন্ধত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে।

[চক্ষু বিশেষজ্ঞ]

মন্তব্য করুন