ঘাস ফড়িং

ঘাস ফড়িং


গাছওয়ালা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০১৯      

প্রিন্স আশরাফ

নেহাদের স্কুলে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে একজন বিখ্যাত আর্টিস্ট আসবেন। ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা হবে। গাছপালা নিয়ে ছবি। নেহা মায়ের মোবাইলে ইউটিউব দেখে ছবি আঁকা অনুশীলন করলো। এমনিতেই সে ভালো ছবি আঁকে। গাছপালা ফুলপাখি লতাপাতা। কিন্তু মা কার্বন নিঃসরণ, ওজোন স্তর-টর কী যেন আঁকা শিখিয়ে দিলেন!

নেহা স্কুলে এসে দেখে আজ আর ক্লাস হবে না। আঁকিয়ে অতিথি আসবেন, তাই নিয়ে স্যারেরা ব্যস্ত। ক্লাস না থাকায় সবাই ক্লাসে হৈ-হল্লা করছে। অ্যাটেন্ডেন্স আন্টিরাও বেশি কিছু বলছেন না। সবাই ছুটির আমেজে আছে। মিশু খেলতে খেলতে বললো, 'আজ স্কুলে সবাইকে গাছ দেবে।'

নেহা কথাটা বুঝতে পারলো না। সে বললো, 'গাছ দেবে মানে?'

'তুই স্কুলে ঢোকার মুখে দেখিসনি? কতো গাছ এনে রেখেছে! যারা ছবি আঁকবে তাদের গাছ দেওয়া হবে।'

ওদের খেলার মাঝেই ক্লাস মিস এসে ঘোষণা দিলেন, 'যারা ছবি আঁকায় নাম দিয়েছো, তারা আমার সাথে এসো। অন্যরা ক্লাসে লক্ষ্মী হয়ে থাকো।'

নেহা ওর আর্টের সরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়ে গেলো। স্কুলের টানা বারান্দাতেই একটা সাদা কাপড় বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। নেহা দেখতে পেলো শুধু ক্লাস টুয়ের নয়, অন্যান্য বড় ক্লাসের ভাইয়া আপুরাও এসেছে। মেয়েদের মতো লম্বা চুলের আর্টিস্ট আঙ্কেল এলেন। একটা বড় ক্যানভাসে রঙতুলি দিয়ে দাগ টেনে মুহূর্তেই গাছ এঁকে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করলেন। ভলান্টিয়ার ভাইয়ারা এসে কাগজ, রঙ পেন্সিল হার্ডবোর্ড দিয়ে গেলেন।

ছবি আঁকা শেষ হতেই একজন একজন করে আর্টিস্ট আঙ্কেলের হাতে ছবি জমা দিলো। জমা দেওয়ার সময় ক্যামেরাম্যান ছবি তুললো সবার। আর্টিস্ট আঙ্কেল ছবি দেখেই বললেন, 'সবার ছবিই ভালো হয়েছে। সবাইকেই পুরস্কার দেওয়া হবে। আর সেই পুরস্কার হবে মহামূল্যবান গাছ।'

প্লাস্টিকের টবসহ বড় পাতাওয়ালা হাতখানিক লম্বা একটা গাছ পেলো নেহা। গাছটা কোলে নিয়ে স্কুলের বাইরে এলো। ড্রাইভার আঙ্কেলকে নেহা জিজ্ঞেস করলো, 'আঙ্কেল এটা কী গাছ?'

নেহার হাত থেকে গাছটা নিয়ে সাবধানে পেছনের সিটে রাখতে রাখতে তিনি বললেন, 'এটা বাদাম গাছ। বিলাতি বাদাম। অনেক বড় বাদাম হয় এই গাছে।'

অফিস থেকে ফিরে মা গাছ দেখে বিরক্ত স্বরে বললেন, 'কী শুরু করেছে তোমার স্কুল? বই দিলেও তো পারে; তা না গাছ! যতোসব আদিখ্যেতা। ফ্ল্যাটবাড়িতে মানুষ গাছ কই লাগাবে?'

নেহাও বুঝতে পারছে না গাছটা নিয়ে সে কী করবে। বাড়িওয়ালা আঙ্কেল সবসময় ছাদে তালা দিয়ে রাখেন। তা ছাড়া ছাদে কোনো গাছ নেই। ওখানে পার্টি হয়। সে নিচে নেমে এলো। দারোয়ান আঙ্কেলকে বলল, 'আঙ্কেল, আপনি কি আমার এই গাছটাকে গ্যারেজে রাখবেন?'

'এখানে তো রাখা যাবে না আম্মু। স্যারের নিষেধ আছে।'

ড্রাইভার আঙ্কেল গাড়ি পার্ক করছিলো। নেহা গিয়ে বললো, 'আঙ্কেল, আপনি আমার গাছটা নিয়ে যান না। আপনার বাড়িতে লাগাবেন।'

ড্রাইভার দুঃখের হাসি দিয়ে বললেন, 'আমি গাছ কীভাবে লাগাবো? মেসে থাকি তো!'

শেষমেশ হতাশ হয়ে নেহা বাসায় ফিরে এলো। 'আম্মু, বারান্দায় গাছ রাখলে কী হয়?'

'কী হবে? গাছটা মরে যাবে। বারান্দায় এসির আউটবক্স রাখা আছে না! ওটার গরমে কোনো কিছু বাঁচে?'

'তাহলে এখন আমার গাছটাকে বাঁচাবো কীভাবে?'

'আপাতত ঘরের এক কোণে রাখো। তারপর দেখি কী করা যায়।'

'আম্মু, স্কুুলে যাওয়ার পথে একটা জায়গা আছে না! জঙ্গলের মতো। ওখানে লাগিয়ে দিলে কেমন হয়? ড্রাইভার আঙ্কেলকে নিয়ে চুপিচুপি লাগিয়ে আসবো।'

মা ভাবলেন, ওটাও তো একজনের প্লট। এখনও কাজ শুরু করেনি বলে খালি পড়ে আছে। বাড়ির কাজ শুরু করলে সব পরিস্কার করে ফেলবে। কিন্তু সে কথা বলে মেয়ের মন ভাঙতে চাইলেন না। 'ঠিক আছে, সন্ধ্যার পর ড্রাইভারকে সাথে নিয়ে গাছটা লাগিয়ে দিয়ে এসো। আমি সোরাবকে বলে দেবো। এখন মাথা থেকে গাছের চিন্তা বের করে হোমওয়ার্ক করো।'

'আজ তো কোনো ক্লাস হয়নি। হোমওয়ার্কও নেই।'

'না থাকলে পুরনো পড়া পড়ো।'

সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসতেই ড্রাইভারকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো নেহা। গাছ লাগানোর আনন্দ আর উত্তেজনায় তার বুক কাঁপছে। গাছ লাগানো শেষ হতেই নেহা বললো, 'বাসা থেকে পানি আনলে হতো। গাছের গোড়ায় তো পানি দিতে হয়!'

ড্রাইভার বললেন, 'লাগবে না। ভেজা মাটি। আর বাদাম গাছ সব জায়গায় বাড়ে!'

পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে নেহা ড্রাইভারকে অনুরোধ করলো গাছটা দেখার জন্য। ড্রাইভার রাস্তার সাইডে গাড়িটা একটু থামালেন। নেহা বায়না ধরলো, নেমে দেখবে। ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে বলেন, 'গাড়ির জানালা দিয়েই তো দেখা যায়! স্কুলের দেরি হয়ে যাবে!'

নেহা গাড়ি থেকে নেমে গাছের কাছে গেলো। তার হাতে স্কুলব্যাগ থেকে নিল পানির বোতল। পুরো বোতলই গাছের গোড়ায় খালি করে দিলো। আজ টিফিনে আদিবার কাছ থেকে পানি ধার নেবে।

প্রতিদিনই নেহা নিয়ম করে স্কুলে যাওয়ার পথে একবার আসার পথে একবার গাছ দেখে যায়, পানি দিয়ে যায়। ক'দিনের মধ্যেই গাছটা লকলক করে বেড়ে উঠেছে। খুশিতে নেহার মন নেচে ওঠে।

সেদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে নেহা দেখতে পেলো গাছের ওখানে বড় বড় বালিভর্তি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। আর একটা দৈত্যের মতো যন্ত্র বিশাল দাঁত দিয়ে ওখানকার মাটি খুঁড়ছে। নেহা বলার আগেই ড্রাইভার গাছের কাছে গিয়ে গাড়ি থামালো। গাছটা তখনও আছে। নেহা ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বললো, 'ওরা কি আমার গাছটাকে মেরে ফেলবে?'

ড্রাইভার বললেন, 'চলো, নেমে দেখি।'

দু'জনই গাড়ি থেকে নামলেন। মাথায় হলুদ হেলমেট পরা একজন এগিয়ে এলো। নেহার গাছ শুনে শুকনো মুখে বললেন, 'কিন্তু এইখানে তো কিছুই থাকবে না মামণি। পুরো জায়গার মাটি খুঁড়ে ফেলবো। তোমার গাছ যখন, তুমি এখনই তুলে নিতে পারো। নাহলে জঞ্জালের সাথে ফেলে দিবো।'

'গাছ নিয়ে আমি রাখবো কোথায়?' নেহা কাঁদো কাঁদো মুখে বললো।

মাথায় গামছা বাঁধা একজন বয়সী শ্রমিক মাটি তুলছিলো। সে নেহার কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে বলে, 'তোমার এই বাদাম গাছটা আমি নিয়ে যাই মা। আমার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে লাগাবো। আর যখন গাছে বাদাম ধরবে তোমার জন্য অনেক বাদাম নিয়ে আসবো।'

নেহার চোখ জলে ভর্তি হলেও মুখে হাসি ফুটে উঠলো। সে ধুলোময়লা মাখা শ্রমিককে জড়িয়ে ধরে বললো, 'থ্যাঙ্কিউ আঙ্কেল।' হ