শীতের সকাল।

রাস্তার পাশে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে আবুল হাসেম। গলায় মাফলার। মাথায় উলের ক্যাপ। হাসেম এলাকার নামকরা রসিক! সহজ-সরল। গ্রামের বাজারে তার ডালপুরির দোকান। দারুণ স্বাদ। নিজে সবসময় আমোদ-ফুর্তিতে থাকে। তার দোকানে ভিড় হওয়ার পেছনে এটাও একটা কারণ। এমন মজার কথা বলে হাসেম- ডালপুরির সঙ্গে সবাই হেসে লুটোপুটিও খায়!

সেই হাসেমকে বিমর্ষ অবস্থায় দেখে থমকে দাঁড়ায় মন্টি। জগিং করতে বেরিয়েছিল সে। ভেবেছিলো, হাসেমের দোকান থেকে ডালপুরি নিয়ে বাড়ি ফিরবে।

হাসেমের দিকে এগিয়ে যায় মন্টি। বলে, 'হাসেম ভাই, কেমন আছো? ভালো?'

হাসেম কথা না বলে ওপর-নিচ মাথা নাড়ায়।

ভাবনায় পড়ে যায় মন্টি। ঘটনা কী? হাসেম ভাই কথা বললো না কেন?

সে হাসিমুখে বলে, 'বাহ্‌ হাসেম ভাই, তোমার মাফলারটা খুব সুন্দর। টকটকে লাল রং। আর টুপিটাও দারুণ। তোমাকে দেখতে সিনেমার হিরোর মতো লাগছে। হা হা হা...'

হাসেম ছোট্ট করে বলে, 'অ'। 'কী ব্যাপার হাসেম ভাই, তোমার কি মন খারাপ?'

'না।' 'ঠিক আছে। জগিংটা শেষ করি। যাই।'

'হুঁ'। মন্টি জগিং করতে করতে ভাবে, আচ্ছা, হাসেম ভাই কেন হাসে না?

২.

জানালা দিয়ে এতক্ষণ হাসেম আর মন্টিকে দেখছিলো টুশি। তাদের ঘরটা রাস্তার পাশেই। মন্টি চলে যেতেই বেরিয়ে আসে টুশি। তার হাতে দড়ি। সে দড়িলাফ খেলতে খেলতে এসে দাঁড়ায় হাসেমের সামনে।

'হাসেম চাচ্চু, অনেক্ষণ ধরে দেখছি তুমি এখানে একা একা দাঁড়িয়ে আছো। কেন?'

হাসেম ছোট্ট করে বলে, 'এমনি'।

'তাহলে আসো, দড়িলাফ খেলি। তাতে ব্যায়ামও হবে, শীতও কম লাগবে।'

'না।' টুশি দড়িটা এগিয়ে দেয়, 'আরে নাও তো। দড়িলাফ খেললে তোমার পেটের ভুঁড়ি কমবে। হি হি হি...।'

হাসেম ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। হাসেও না। নড়েও না। কিছু বলেও না।

'আচ্ছা দাঁড়াও, আমি তোমার জন্য পিঠা নিয়ে আসি।' 'হুঁ'।

টুশি বাড়ির দিকে যেতে যেতে ভাবে, হাসেম চাচার কী হয়েছে? উনি হাসেন না কেন?

৩.

ইকরাম যাচ্ছিলো সাইকেল চালিয়ে। হাসেমকে দেখে ব্রেক কষে। ক্রিং ক্রিং বেল বাজায়।

'হাসেম ভাই, বাজারের দিকে যাবেন নাকি?'

'না।' 'আমি ওদিকেই যাচ্ছি। উঠুন, আপনাকে নিয়ে যাই।' 'না।' 'ভয় নেই। আমি ভালো সাইকেল চালাতে পারি।' হাসিমুখে বলে ইকরাম।

হাসেম চুপ।

'হাসেম ভাই, এরকম গম্ভীর হয়ে আছেন কেন? কী হয়েছে?'

ততোক্ষণে মন্টি আর টুশিও চলে এসেছে।

টুশি বলে, 'হাসেম চাচ্চু, এই নাও পিঠা। এবার বলো, তোমার কী হয়েছে? হাসছো না কেন?'

হাসেম বিড়বিড় করে বলে, 'সত্যি বলতে, কী যে হয়েছে, নিজেই বুঝতে পারছি না।'

মন্টি, ইকরাম আর টুশি পরস্পরের দিকে তাকায়। কী আজব! নিজেই বুঝতে পারছে না কী হয়েছে। এমনও হয় নাকি?

মন্টি ভ্রু কুঁচকে বলে, 'সত্যি বলছো? নিজেই বুঝতে পারছ না কী হয়েছে?'

হাসেম মাথা নাড়ায়, 'না, মানে হ্যাঁ, বুঝতে পারছি না। হাসতে গেলেই ব্যথা পাই...'

ইকরাম চোখ বড় বড় করে বলে, 'কী! হাসতে গেলে ব্যথা পান? এটা কেমন কথা?'

'খুবই চিন্তার কথা। হাসেম ভাই হাসতে গেলে ব্যথা পায়।' মন্টি ভাবনায় পড়ে যায়, 'টুশি, তুমি বুঝতে পারছো কিছু?'

টুশি নিজের ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে গম্ভীর হয়ে যায়, 'হাসেম চাচ্চু হাসতে গেলে ব্যথা পাচ্ছে। কেন ব্যথা পাচ্ছে! ওহ, আমার ঠোঁট দুটো কেমন খসখসে হয়ে গেছে। ইকরাম ভাইয়া, তোমার কাছে কি পেট্রোলিয়াম জেলি আছে?'

ইকরাম পকেটে হাত দেয়, 'হ্যাঁ, আছে। এই নাও।'

টুশি জেলি নিয়ে নিজের ঠোঁটে লাগায়। তারপর তাকায় হাসেমের দিকে, 'আচ্ছা হাসেম চাচ্চু, হাসতে গেলে তুমি কোথায় ব্যথা পাও? দাঁতে?'

'না'।

'তাহলে কি গালে?' মন্টি জানতে চায়।

'না'।

'তাহলে কোথায়? ভুঁড়িতে?' বলেই হেসে ফেলে টুশি।

ইকরাম আর মন্টিও হো হো করে হেসে ওঠে।

হাসেমও হাসতে গিয়ে থেমে যায়, 'উফ্‌, ব্যথা। হাসলেই ব্যথা পাই ঠোঁটে।'

টুশি, ইকরাম আর মন্টি আবার পরস্পরের দিকে তাকায়।

ইকরাম বলে, 'বুঝে গেছি। আমি বুঝে গেছি হাসেম ভাই কেন হাসে না।'

'কীভাবে? তুমি কি ডাক্তার?' ইকরামকে প্রশ্ন করে হাসেম।

'এটা বুঝতে ডাক্তার হওয়া লাগে না।' ইকরাম মুচকি হাসে, 'হাসেম ভাই, আপনার দুই ঠোঁট কেমন ফেটে গেছে দ্যাখেন...।'

হাসেম ঠোঁটে আঙুল বোলায়, 'কই, ঠোঁট ফাটেনি তো। তবে কেমন কেমন যেন লাগছে।'

'হ্যাঁ, শীতকালে ঠোঁটের চামড়া শুস্ক আর খসখসে হয়ে যায়।' টুশি বললো।

ইকরাম কথা কেড়ে নেয়, 'শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি হলে শরীর থেকে জলীয় অংশ কমে যায়। ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে যায়। তখন হাসলে ঠোঁটের চামড়ায় টান পড়ে। ফলে ব্যথা লাগে।'

হাসেম অবাক হয়, 'তাই নাকি? দেখি তো একটু হেসে... হি...হি...হি...! ওহ! উফ্‌! তাই তো, ঠোঁটেই ব্যথা পাচ্ছি। এখন উপায়?'

টুশি পেট্রোলিয়াম জেলির কৌটাটি এগিয়ে দেয় হাসেমের দিকে, 'শীতকালে ঠোঁট নরম রাখার জন্য পেট্রোলিয়াম জেলি লাগাতে হয়। তাহলে ঠোঁট ফাটে না। ধরো, এখনি লাগিয়ে নাও।'

হাসেম দুই ঠোঁটে ঘষে ঘষে জেলি লাগায়। তারপর বলে, 'আহ! এখন বেশ আরাম লাগছে। হা হা হা...। আর হাসলেও তো এখন ব্যথা পাচ্ছি না। হা হা হা...!'

মন্টি বলে, 'তাই বলে হাসতে হাসতে আবার জেলি খেয়ে ফেলো না যেন!'

মন্টির কথা শুনে হেসে ওঠে সবাই। হাসতে থাকে হাসেমও।

মন্তব্য করুন