কালের খেয়া

কালের খেয়া

'জেন্ডার ইজ অ্যা পারফরম্যান্স'

ভেতর ও বাহির: দুই সত্তার দ্বন্দ্ব

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০১৯     আপডেট: ১৬ মার্চ ২০১৯

হাবীব সোহাগ

আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীর মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান, তাদের ক্ষমতায়ন, লৈঙ্গিক সমতা ইত্যাদি বিষয়কে প্রতিপাদ্য হিসেবে নিয়ে ১৯১১ সালের ৮ মার্চ থেকে প্রতি বছর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এখানে মূল মুখপাত্র হিসেবে নারীকে আহ্বান করা হলেও সচেতন কিংবা অবচেতনভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে অন্যান্য সত্তাকে; যারা কিনা দৈহিক গঠনগত দিক থেকে নারী না হলেও নারী সত্তাকে ধারণ করে। কিংবা কোনো পুরুষ সত্তা, যে বন্দি হয়ে আছে নারী শরীরে। অথচ তাদের যাপিত জীবন, আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক আচারবিধিতে যার বহিঃপ্রকাশ সুতীব্রভাবে সহজাত। কিন্তু বর্তমান সময়ের পটভূমিতে আমরা এই লৈঙ্গিক ধারণার সংজ্ঞায়ন বা তার স্বীকৃতিকে কখনও আমাদের শাসক শ্রেণির রোষানলে পড়ে অথবা কখনও পবিত্র গ্রন্থাদির বিধিনিষেধের ভিত্তিতে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করতেও দ্বিধাবোধ করছি না। সামাজিক কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদেরকে ট্যাবু হিসেবে চিহ্নিত করা কি শ্রেণিকরণ, নাকি শ্রোণকরণের নামে প্রহসন, সেটাই আজ প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০১৯ সামনে রেখে অ্যাপিফানিয়া ভিজ্যুয়ালস গত ৮ মার্চ আয়োজন করে 'জেন্ডার ইজ অ্যা পারফরম্যান্স' শীর্ষক চিত্রপ্রদর্শনী। ঢাকার লালবাগে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে দেশ-বিদেশের মোট ছয়জন শিল্পীর শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। এ প্রদর্শনীর মূল প্রতিপাদ্য- ব্যক্তি এসএম সুলতানের লৈঙ্গিক অবস্থান ও বাংলাদেশের শিল্প ইতিহােেস তার নির্মাণ। গবেষক এ অবস্থানের পুনর্বিবেচনা করতে চেয়েছেন প্রশ্নের সংস্কৃতির জগতে সবাইকে আহ্বান করে। তবে একটা বিষয় লক্ষণীয়, শিল্পী এসএম সুলতানের পরিধেয় পোশাক-পরিচ্ছদের মধ্যে শাড়ি পরিধান করার ব্যাপারটা ইতিহাসে বেশ জোরালোভাবেই এসেছে। বাংলাদেশের অনেক শিল্পবোদ্ধা যাকে সুলতানের রাধা পর্ব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আবার কারও মতে, সুলতান এটা করেছিলেন নিজেকে বিতর্কিত করার জন্য অথবা সম্পূর্ণ খামখেয়ালিপনার বশে। তবে এমনটা কি হতে পারে না, এটা এক সুলতানের ভেতর আরেক সুলতান, বাহ্যিক সত্তার সঙ্গে অন্তর্নিহিত সত্তার দ্বন্দ্ব! তবে ইতিহাসে তা কেন উপেক্ষিত হয়ে রইল? কিংবা কেন তাকে এড়িয়ে গিয়েছি আমরা? সেটার বহিঃপ্রকাশ ঘটলে সুলতানের শিল্পকর্মের আবেদন কি গ্রহণযোগ্যতা হারাত, নাকি তাতে নতুন এক মাত্রা যোগ করত- বিষয়টা আজ প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

গবেষক দীপ্তি রাণী দত্ত তার গবেষণাকর্মের মাধ্যমে বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে একদিকে যেমন লৈঙ্গিক তারল্যের পরিপ্রেক্ষিতে যৌনতার প্রচলিত বাস্তবতাকে প্রশ্ন করেছেন, তেমনি শিল্পী সুলতান ও তার কাজের মাধ্যমে ব্যক্তির জীবনবোধকে তুলে এনেছেন নতুন আঙ্গিকে। তিনি প্রশ্ন করেছেন যৌনতার প্রচলিত সংজ্ঞায়নকে। তারও আগে তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন দর্শকদের উদ্দেশে-

নারী ও পুরুষের যে লৈঙ্গিক বাইনারি বা দ্বৈতাদ্বৈত এবং তার সঙ্গে উৎপাদনের যে ধারণা বিদ্যমান, সেখানে আপনার অবস্থান কী?

যদি যৌনতা ও উৎপাদনের ধারণাকে আমরা ধ্রুব বা চিরন্তন বাস্তবতার বলে ভেবে থাকি, তাহলে বাইনারির বাইরের অবস্থানকে কেন প্রতিবন্ধকতা হিসেবে ভাবা হয়?

যে কোনো কিছু কি চিরন্তন হতে পারে? বিশ্ব কি একরৈখিক? মাতা কি পিতৃতান্ত্রিক? পিতৃতন্ত্র কী?

গবেষক দীপ্তি রাণী দত্তের সঙ্গে এ প্রদর্শনীতে সহযোগী হিসেবে আছেন শেখ ফায়জুর রহমান ও মুনমুন আলম খান।

শিল্পী এসএম সুলতান ছাড়াও এ প্রদর্শনীতে উপস্থিত ভারতীয় শিল্পী কৌর চিমুক ও ট্যাক্সি। বাংলাদেশ থেকে রাসেল রানা ও জর্ডান আসওয়াদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেনিয়া কোতসোপোলোও ও রেনু হোসাইন।

ভারতের শিল্পী ট্যাক্সি, কিশোরী নিশার কল্পনার জগৎ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আরেকটি কল্পনাপ্রসূত জায়গা বা অদেখা এক ভুবন তৈরি করেছেন। এর গঠন, আকৃতি এবং রঙ নিশাকে এমন এক স্বপ্নের ভুবনে নিয়ে যায়, যেখানে সে নিজেকে বা সে যা হতে ইচ্ছুক, তা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারে। ট্যাঙির কাজের মাধ্যমে গবেষক দীপ্তি রাণী দত্ত আলোকপাত করেছেন লৈঙ্গিক পক্ষপাতিত্ব ও তার স্বরূপ নিয়ে। যেখানে নারী অবলীলায় গ্রহণ করতে পারে যে কোনো পোশাক, কিন্তু পুরুষের বেলায় তা সর্বক্ষেত্রে সম্ভব নয়। অন্যদিকে নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন শিল্পী আসওয়াদ।

গবেষক দীপ্তি রাণী দত্ত মাউন্ট বোর্ডের বড় ফ্রেমের অভ্যন্তরে শিল্পীর মিনিয়েচারধর্মী কাজগুলো রেখে কুয়্যার ইস্যুতে বাংলাদেশের সমান্তরাল দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরেছেন, যেখানে হাজারো বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও শুধু ফ্রেমিংয়ের কারণে আড়ালে থেকে যান বাইনারির বৃত্ত ভেঙে বের হয়ে আসা শিল্পীরা। কৌর চিমুক কাজ করেছেন ক্রমপরিবর্তনশীল সত্তার নানামুখী সংগ্রাম নিয়ে। অরৈখিক চিত্র ও লিপির সমন্বয়ে তিনি স্পষ্ট করতে চেয়েছেন সংবেদনশীলতার নানা স্পর্শকাতর বিষয়। যেমন লৈঙ্গিক পরিচয় ও তার কার্যক্রম ব্যতিরেকে সর্বনামের অভাব, একই সঙ্গে বহু জীবনের যাপন, তার আইন ও সক্রিয়তা, সমষ্টিগত সচেতনতা এবং নন-বাইনারি সম্প্র্রদায়ের অধিকার। চিমুক সচেতনভাবেই ভাষাকে একটি গোপন সংকেত হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার এই কাজগুলো শুধু নাগরিক জীবনের বিপরীতধর্মী বাস্তবতাকেই তুলে ধরে না, বরং বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত 'জেন্ডার ইজ অ্যা পারফরম্যান্স', এই বিতর্ককে বিভিন্নভাবে সামনে নিয়ে আসে।

রেনু হোসাইন ভারতীয় বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। তার স্বর্গের রাণী (কুইন অব হেভেন) সিরিজটি একটি মহাকাব্য, রাজকীয় আবেশে ছন্দ ও শ্বাসরুদ্ধকর অনুভূতির মিশেলে ধারণ করা একটি ইলেকট্রিক ওডিসি। এখানে ইরাকীয় নৃত্যশিল্পী এলিনা আল বাদরির কণ্ঠকে ব্যবহার করা হয়েছে। ইরানের খুব সাধারণ এবং জনপ্রিয় 'দ্য বিউটি অব লং হেয়ার' কবিতাটি এখানে এলিনা আবৃত্তি করেছেন তার নিজস্ব ভাষায়। তিনি ব্যক্ত করেছেন নিজস্ব মতামত- ইরাকি নাচের মূল ভিত্তি হলো লম্বা চুল। আর বার্লিন? এখানেও তা একই রকম। বাগদাদের সঙ্গে তার কোনো অমিল নেই!

এই গানটি রেনুর 'দে ড্যান্স ইন দ্য ডার্ক' সিরিজের দ্বিতীয় কাজ, যেখানে তিনি তার ব্যক্তিজীবন, বিশেষ করে এক অদ্ভুত কুয়্যার ভুবনে আরেক অদ্ভুত কুয়্যার নারী হওয়ার গল্প বলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের আরেক শিল্পী ফেনিয়ার কাজে প্রকাশ পেয়েছে চিরায়ত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীকে যেভাবে গ্রহণ করে তার ব্যঙ্গাত্মক প্রতিফলন। তথাকথিত নারী শরীর বা প্রাকৃৃতিক শরীরে ফিরে যাওয়ার আর্জি নয়, অথবা নারীকে তিনি বলছেন না প্রসাধনী ছেড়ে দিতে বা শরীরের লোম দূর করা ছেড়ে দিতে। কিন্তু সুন্দরী বা চাহিদাসম্পন্ন নারী হওয়ার জন্য শরীরের বিভিন্ন জায়গার লোম দূর করার যে দীর্ঘ ক্লান্তিকর অভ্যাস, তার সঙ্গে তিনি একমত নন। শিল্পী বরং লোমকে শরীরের অংশ ভাবতেই ভালোবাসেন। তার দুটি ভিডিও চিত্রে তিনি বর্ণনা করেছেন নিজ শরীরের ইশতেহার। বলছেন, 'শরীর আমার কাছে নিজ প্রয়োজন ও দরকার অনুসারে রূপান্তরের এক ধ্রুব মন্দির। আমি নিজেই এ শরীরের মালিক এবং তাকে নিয়ে আমি যা চাই, তা করার অধিকার আমার আছে।'

আবার শিল্পী রাসেল রানার কাজে ফুটে উঠেছে সমাজের প্রথাগত দৃষ্টিতে মানুষের কণ্ঠ ও লৈঙ্গিক সম্পর্কের বিচার। বিস্ময়কর এক পরিস্থিতির কাছে শিল্পী প্রশ্ন করছেন- কণ্ঠস্বর বা অঙ্গভঙ্গি দিয়ে কি কাউকে বিচার করা বা তার লিঙ্গ নির্ধারণ করা উচিত হবে? পরবর্তী সময়ে শিল্পী নিজেই বলছেন তার পরিচয়ের ইশতেহার- 'আমি মানুষ'।

সর্বোপরি 'জেন্ডার ইজ অ্যা পারফরম্যান্স' শীর্ষক প্রদর্শনী কাজগুলো মাধ্যমগত দিক থেকে যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমন ধরনগত দিক থেকেও রয়েছে তাদের ভিন্নতা। শিল্পীর ব্যক্তিসত্তা কিংবা আকাঙ্ক্ষা বারবার ছাপিয়ে গেছে তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে। আবার কারও কাজে এসেছে পরিধেয় আচ্ছাদন, যা হতে পারে নারী কিংবা পুরুষ যে কারও এবং সেটা গ্রহণ করার সহজাত প্রবণতা। শিল্পের বিষয়বস্তু নির্বাচনের দিক থেকে এবং আঙ্গিকগত ভিন্নতার কারণে আয়োজিত এই প্রদর্শনীটি বাংলাদেশের শিল্পচর্চার পথকে আরও সুগম ও সমৃদ্ধ করবে বলে আশা করি। ৮ মার্চ শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে ১৮ মার্চ পর্যন্ত।