কালের খেয়া

কালের খেয়া

ঘোরমত্ত জীবন

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০১৯

আহমাদ মোস্তফা কামাল

কত রকম ঘোর নিয়ে যে জীবন কাটে আমাদের! তরুণ বয়সে রূপ দেখে ঘোর লাগে, চোখে ও হৃদয়ে। তার কোনোটি প্রেম, কোনোটি স্রেফ ভালোলাগা, কোনোটি শারীরিক আকর্ষণের। কোনটি যে কী, তা অনেক সময়ই বুঝে ওঠা যায় না। এ বড় বিহ্বল অভিজ্ঞতা, বড় অনিশ্চিত।

আমার এক বন্ধু তীব্রভাবে ভালোবাসত এক প্রিয়দর্শিনী তরুণীকে, যার আপাত ব্যক্তিত্ব ছিল পাহাড়ের মতো অটল। মেয়েটি আমার বন্ধুকে নিয়ে খুব দ্বিধায় ভুগত- সে কি সত্যি ভালোবাসে? প্রেমে পড়েছে? নাকি অন্য কিছু? দ্বিধা যে আমার বন্ধুটিরও ছিল না, তা নয়। হয়তো একদিন তারা মীমাংসায় পৌঁছানোর জন্য আলাপ করার প্রয়োজন বোধ করে। হয়তো আলাপচারিতার একপর্যায়ে প্রসঙ্গটি ওঠে, আর আমার বন্ধুটি মুখ ফসকে বলে ফেলে-

তুমি আমার প্রেম নও!
প্রেম নই? তাহলে কী?
অবসেশন। তুমি আমার অবসেশন।

অবসেশন, মানে ঘোর, জানি আমরা। এই কথোপকথনের পরই তাদের সম্পর্ক ভেঙে যায়।

ঘটনাটি আমি জানতে পারি বছর-কয়েক পর। বন্ধুটি বলেনি আমাকে কিছুই। বলেছিল মেয়েটিই। কাকতালীয়ভাবে আমাদের দেখা হয়ে গিয়েছিল এক মফস্বল শহরে। সহৃদয় মেয়েটি তার প্রিয় শহরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল আর কথা বলছিল অনর্গল। আলাপচারিতার একপর্যায়ে আমি জানতে চেয়েছিলাম, কেন তাদের প্রেমটি হতে হতেও হলো না! মেয়েটি এতটুকু দ্বিধা না রেখে উত্তর দিয়েছিল-

আমি ওকে ভালোবাসতাম, কিন্তু সে বাসেনি। তার কাছে আমি ছিলাম অবসেশন। স্রেফ একটা ঘোর।

অবসেশন হলেই বা ক্ষতি কী?
ভালোবাসা হারায় না, প্রেম মরে না, ঘোর কেটে যায়। - দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিল মেয়েটি।

আমি তার সঙ্গে পুরোটা একমত হতে পারিনি। ঘোর একসময় কেটে যায় বটে, কিন্তু ভালোবাসাও হারায়, প্রেমও মরে যায়। এ রকম আমি অনেক দেখেছি। অবশ্য কোনটা যে প্রেম আর কোনটা যে ঘোর, তার মীমাংসা করা খুব কঠিন। যাকে আমরা বলি প্রেম, তা কি সত্যিই প্রেম? নাকি বোঝার ভুল? আমার বন্ধুরা বা বন্ধুপ্রতিম অনুজরা যখন প্রেম থেকে বিয়ের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে আর বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে এসেছে আমার সঙ্গে, আমি বরাবরই সবাইকে একটি প্রশ্নই জিজ্ঞেস করেছি- প্রেম আছে এখনও নাকি অবলিগেশন বা দায়বোধ থেকে এই সিদ্ধান্ত? চমকে ওঠে, বিহ্বল কণ্ঠে তারা আমাকে জানিয়েছে- প্রেম কমে এসেছে, বেশিরভাগটুকুই অবলিগেশন। এত দিনের একটা সম্পর্ক, কীভাবে ভেঙে ফেলি?

যে প্রেম শেষ পর্যন্ত অবলিগেশনে পরিণত হয়, তা কি প্রেম? নাকি ওটাও আসলে ঘোর ছিল?

প্রেম আসলে চূড়ার সম্পর্ক। আর সংসার সমতলের। অনেক কষ্ট স্বীকার করে মানুষ পাহাড়চূড়ায় ওঠে বটে, জয়ের নেশা আর ঘোর থাকে বলেই উঠতে পারে, কিন্তু সেখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। চূড়ায় স্বস্তি নেই, শান্তি নেই, আছে জয়ের আনন্দ। কিন্তু স্বস্তি ছাড়া কেবল আনন্দ নিয়ে থাকা যায় নাকি? মানুষকে তাই সমতলে নেমে আসতে হয়। আর নেমে আসা মানেই ঘোর কেটে যাওয়া। ঘোর কাটলে কি প্রেম থাকে? যদি থাকে তাহলে বলতেই হবে সেটিই আসল প্রেম, খাঁদ নেই সে প্রেমে।

কিন্তু এও সত্যি, ঘোর না থাকলে প্রেমই হয় না। একজন সাধারণ মানুষকেও অসামান্য, নিখুঁত আর অনিন্দ্যসুন্দর মনে হয় কেবল চোখে আর মনে ঘোর তৈরি হলেই। নইলে সব মানুষই তো দোষত্রুটিযুক্ত, সময়-বিশেষে অসাধারণ হলেও অধিকাংশ সময়ে নিতান্তই সাধারণ, আর কোনো রূপই অনিন্দ্য নয়, ভালো করে দেখলে তাতে অনেক খুঁত ধরা পড়ে। ঘোর থাকে বলেই না এসব খুঁত আর ত্রুটি আড়ালে পড়ে যায়। ভালোবাসতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে প্রেমে পড়তে।

যেভাবে প্রেম আর ঘোরের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলে চলেছি তাতে মনে হতে পারে, অন্য কোনো বিষয় নিয়ে ঘোর তৈরি হতে পারে না। আসলে তো তা নয়। আমাদের জীবনে নানা বিষয় নিয়ে আমরা ঘোরগ্রস্ত হই, এমনকি মহাপুরুষরাও হন। গৌতম বুদ্ধের কথাই ধরা যাক। তার জীবনের সব প্রধান ঘটনা ঘটেছিল পূর্ণিমার রাতে। ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে 'লুনাটিক', বাংলায় বলা যায় 'চাঁদে পাওয়া' বা 'চন্দ্রঘোরগ্রস্ত' বা 'চন্দ্রগ্রস্ত'। বুদ্ধ কি লুনাটিক ছিলেন? এ রকম প্রশ্ন মনে জাগে, কারণ একজন মহাপুরুষের জীবনে এতসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কেবল পূর্ণিমার রাতেই কেন ঘটে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। রাজা শুদ্ধোধনের স্ত্রী রানী মায়া একদিন স্বপ্নে দেখলেন- স্বর্ণের পর্বতে পরিভ্রমণরত ছয় দাঁতবিশিষ্ট একটি সাদা হাতি কোনো ব্যথা না দিয়েই তার শরীরের বাঁ পাশ দিয়ে ঢুকে পড়ল। তিনি জেগে উঠলেন, রাজাকে জাগিয়ে স্বপ্নটা জানালেন। রাজা স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে রাজ্যের সব জ্যোতিষীকে ডাকলেন। জ্যোতিষীরা ব্যাখ্যা দিলেন- রানী এমন একজন পুত্রের জন্ম দেবেন, যিনি হয় জগতের সম্রাট হবেন অথবা হবেন জাগ্রত ও আলোকিত এমন একজন মানুষ, যিনি মানবজাতির মুক্তির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করবেন। রানী যে রাতে স্বপ্নটি দেখেছিলেন, সেটি ছিল পূর্ণিমার রাত। নির্দিষ্ট সময়ে কোনো বেদনা ছাড়াই রানী একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন। একটি ডুমুর গাছ আনত হয়ে তাকে সহায়তা করল। শিশুটি যে রাতে ভূমিষ্ঠ হলো, সেটিও ছিল পূর্ণিমার রাত। শিশুটির নাম রাখা হলো সিদ্ধার্থ। তারপর নানা ঘটনাপরম্পরা শেষে এক জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাতে তিনি রাজ্য-রাজপ্রাসাদ, স্ত্রী-পুত্র, মা-বাবা, বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন কোনো এক অজানা সত্যের সন্ধানে। যে রাতে তিনি ঘর ছাড়লেন, সেটিও ছিল পূর্ণিমার রাত। এরপর তিনি কঠোর তপস্যায় নিয়োজিত হলেন। তপস্যার একপর্যায়ে তিনি একবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। স্বর্গের দেবতারা ভয় পেলেন যে তিনি হয়তো মারা গেছেন! একটি বানর মধু দান করে তাকে বাঁচিয়ে তুলল। সেটিও ছিল পূর্ণিমার রাত। সাধনা করতে করতে এলো এক দীর্ঘ রাত। এই রাতের পরই সিদ্ধার্থ আর সিদ্ধার্থ থাকলেন না, হয়ে গেলেন বুদ্ধ। জগতের সকল প্রাণীর দুঃখ নিজ কাঁধে তুলে নিয়ে যিনি সবার জন্য সুখ কামনা করলেন। যে রাতে তিনি এই বুদ্ধুত্ব অর্জন করলেন বা নির্বাণ লাভ করলেন, সেটিও ছিল পূর্ণিমার রাত। শুধু তাই নয়, তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গনও করেছিলেন পূর্ণিমার রাতে। ঘটনাগুলো সত্যিই পূর্ণিমার রাতেই ঘটেছিল কি-না, এ প্রশ্নও অবশ্য কেউ কেউ তুলতে পারেন, তবে সেটি আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, বুদ্ধ এভাবেই তার জীবনের ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছেন। এর মানে কী? আমার তো মনে হয়, বুদ্ধ ছিলেন পুরোপুরি চাঁদে পাওয়া একজন মানুষ। চন্দ্রঘোরগ্রস্ত মানুষ। এ ধরনের মানুষগুলো চাঁদ দেখলে ভাবুক হয়ে যায়, পূর্ণিমায় হয়ে পড়ে ঘোরগ্রস্ত। সম্ভবত বুদ্ধও হতেন। কোনো এক পূর্ণিমার রাতে তার ঘর ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। ঘর ছাড়ার প্রবণতা তার মধ্যে আগে থেকেই ছিল, জ্যোৎস্না হয়তো তাকে এ ব্যাপারে আরও বেশি ইন্ধন জোগাত, আর পূর্ণিমা তাকে করে তুলত ঘোরগ্রস্ত-পাগলপ্রায়। জীবনের কোনো একসময়ে এই ঘোর এত নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে যে ঘর-সংসার-স্ত্রী-পুত্র-পরিজন-রাজ্য-রাজপ্রাসাদ সবই তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়, তিনি ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। শুধু তাই নয়, তার জন্ম-মৃত্যু ও বুদ্ধুত্ব লাভ সবই ঘটেছিল পূর্ণিমায়- এমনকি বৌদ্ধদের সব ধর্মীয় উৎসব কোনো-না-কোনো পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করেই ঘটে। পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্মে তো চাঁদের এই আধিক্য দেখা যায় না!

শুধু বুদ্ধ কেন, এ রকম চাঁদে পাওয়া মানুষ আমাদের আশপাশেও দেখতে পাওয়া যায়। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে সুনামগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান (তখন 'মেয়র' বলা হতো না) ছিলেন মমিনুল মউজউদ্দীন নামের এক চন্দ্রগ্রস্ত মানুষ। পূর্ণিমার রাতে শহরে কয়েক ঘণ্টার জন্য ইলেকট্রিসিটি বন্ধ দিতেন তিনি- যেন নাগরিকরা প্রাণ ভরে পূর্ণিমার রূপ দেখতে পারেন। নাগরিকরা পূর্ণিমা দেখবে কি-না, সেটি তো তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার, চেয়ারম্যান সাহেবের এ নিয়ে এত আগ্রহ কেন? তিনি কেন এ ব্যবস্থা করেন? বলা বাহুল্য যে, তিনি ওই পূর্ণ চাঁদ আর তার ভরা জ্যোৎস্নার প্রেমে পড়েছিলেন। প্রেমে নাকি ঘোরে? এ প্রেম আবার এত গভীর যে একা একা সেই রূপ দেখে সাধ মেটে না, শহরের সব মানুষকে তা দেখাতে ইচ্ছে করে। শহরবাসীও যে ব্যাপারটি আনন্দের সঙ্গেই গ্রহণ করেছিল, সেটিও বোঝা যেত মউজউদ্দীন সাহেবের অভাবিত জনপ্রিয়তা দেখে।

আরেক শ্রেণির মানুষ আছেন, যারা সদা-সর্বদা ঘোরগ্রস্ত হয়েই থাকেন। এরা লেখক, কবি, শিল্পী, সুরস্রষ্টা। ঘোরের মধ্যে থাকেন বলেই এঁদের জীবন সহজ-স্বাভাবিক-সামাজিক ধারায় প্রবাহিত হয় না। যেন তারা দলছুট মানুষ, বেমানান মানুষ, অচেনা মানুষ। সমাজের আর দশটা লোক তাদের বুঝতে পারে না, চিনতেও পারে না। কেবল বুঝতে পারে- এরা অন্য রকম। যদিও জীবনের প্রয়োজনে, বেঁচে থাকার প্রয়োজনে, ক্ষুন্নিবৃত্তির প্রয়োজনে আর দশটা মানুষের মতোই তাদের কাজ করতে হয়, চাকরিবাকরি করতে হয়, বাজারে যেতে হয়, সংসার করতে হয়, সামাজিক নানা আয়োজনে অংশগ্রহণ করতে হয়- তবু তারা যেন কোথাও থাকেন না। সংসারে তারা থাকেন এমনভাবে, যেমন একটি স্পর্শক লেগে থাকে একটি বৃত্তের সঙ্গে, একটি মাত্র বিন্দুতে কোনোরকমে স্পর্শ করে। তাদের হৃদয় ও মস্তিস্কজুড়ে সারাক্ষণ জেগে থাকে কোনো লেখার চিন্তা ও পরিকল্পনা। হয়তো একটিমাত্র পঙ্‌ক্তি নিয়ে ভাবতে ভাবতে দিন কেটে যায়। সকলের মধ্যে থেকেও তাই তারা থাকেন না কোথাও। সত্যি কথা বলতে কি, এই ঘোর না থাকলে সব ধরনের শিল্পচর্চা বন্ধ হয়ে যেত। কারণ, একটু সচেতন হয়ে, যুক্তির পথ ধরে হেঁটে শিল্পচর্চার কার্যকারিতা বা উপযোগিতা নিয়ে কেউ একটু ভাবলেই তাকে থেমে যেতে হবে। এসব লেখালেখি-আঁকাআঁকি বৈষয়িক কিছুই দেয় না একজন শিল্পীকে। কোনো স্বীকৃতি নেই, কোনো প্রাপ্তি নেই, কোনো প্রতিদান নেই এসব কাজের জন্য। তবু আয়ুক্ষয়ী এই কাজগুলো একাগ্রচিত্তে, গভীর আনন্দ নিয়ে করে যান শিল্পীরা। কেউ তাদের করতে বলেনি, তবু করেন। একজন কবি কেবল কবিতার ঘোরেই জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন, একজন মিউজিশিয়ান সুরের ঘোরে জীবন পার করে দিতে পারেন, একজন শিল্পী রঙতুলির রহস্য বুঝতে বুঝতেই উপনীত হতে পারেন জীবনসায়াহ্নে। যদি ঘোর না থাকত, তাহলে কীভাবে রচিত হতো অমর পঙ্‌ক্তিমালা, কালজয়ী সুর, জগৎজয়ী পেইন্টিংস? অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে, শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে, ঘোর ব্যাপারটা খুব দরকার, এমনকি প্রেমের চেয়েও ঘোরের গুরুত্ব এখানে বেশি।

শিল্পীদের জন্য ঘোর যেমন অনিবার্য, তেমনই অন্যদের জন্যও। পার্থক্য হয়তো এই, শিল্পীরা সেটি উপলব্ধি করেন তীব্রভাবে, অন্যরা ততটা ভাবেন না। ব্যাপারটা বোঝা যায় সহজেই। একটু বয়োজ্যেষ্ঠ কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, ছোটবেলায় তিনি কী হতে চেয়েছিলেন- মজার সব উত্তর পাবেন। কিন্তু উত্তরটি শুনে শুধু মজা পেলেই চলবে না, সেটি নিয়ে আরেকটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে- তিনি তা-ই হতে চেয়েছিলেন, যা তিনি হতে পারবেন না, তবে ওই হতে চাওয়ার মধ্যে অনেক আকাঙ্ক্ষা পূরণের এবং অনেক না-পাওয়াকে পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কেবল ছোটবেলার সরল ইচ্ছে বা খেয়াল বলে একে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার কিছু নেই। আমরা আসলে জীবনভর ওটাই করি। আমরা সেটিই হতে চাই, যা হতে পারব না, সেটিই পেতে চাই, যা পাওয়া যাবে না। এমন নয় যে আমরা জানি না- কী পাওয়া যাবে বা যাবে না, কী হওয়া যাবে বা যাবে না; তবু যে ও রকম আকাঙ্ক্ষা করি, তার কারণ হয়তো এই যে আমরা এও জানি- কী হলে ভালো হতো, সুন্দর হতো, আনন্দময় হতো। হয়তো এই আপাত-অসম্ভবকে চাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ঘোর। এই ঘোর আছে বলেই মানুষ ভালোবাসে, প্রেমে পড়ে, জীবন বাজি রেখে স্বপ্নঘোরগ্রস্ত হয়ে দেশের জন্য যুদ্ধে যায়, ঝুঁকিপূর্ণ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্দি্বধায়, উত্তরসূরিদের জন্য রেখে যেতে চায় একটি সোনালি ভবিষ্যৎ। স্বপ্নভঙ্গ হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, ঘোর কেটে যায়, বাস্তবতার তীব্র কশাঘাতে জর্জরিত হতে হতে হঠাৎ দেখা যায়- বেলা পড়ে এসেছে।

তারপর পড়ন্ত বেলায় এসে ঝাপসা চোখে আমরা পেছন ফিরে তাকাই। দেখতে পাই, যা কিছু চেয়েছি, তার প্রায় সবই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। অল্প কিছু অর্জন, অল্প কিছু প্রাপ্তি সেই ফেলে আসা পথের নানা বিন্দুতে প্রদীপ হয়ে জ্বলছে। আমরা ঘোরলাগা চোখে সেইসব দীপশিখার দিকে তাকিয়ে থাকি, আর ভাবি, ওই জীবন কি কখনও আমার ছিল?