অপমানের বৃষ্টি আর গায়ে লাগে না

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০১৯      

সৈয়দ ইকবাল

সময় পেরুলে হয়তো এ রকমই হয়! হাঁস যেমন ওয়াটারপ্রুফ হয়ে যায় তেমনি কিছু মানুষ অপমানপ্রুফ হয়ে যায়। আমি যেমন হয়ে গেছি। বেশিরভাগ মানুষের কিন্তু এ রকম হয় না। খুব কম মানুষের হয়। বেশিরভাগ মানুষেরই তো মাথাভর্তি পেটভর্তি মান। মান থাকলেই তো অপ! মানে অপমান। আমার দাদি জেবুন্নেসা মা-বাবার সঙ্গে যুদ্ধ করে নাম রেখেছিলেন ইকবাল। তখন জমজমাট পাকিস্তানকাল, পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা আল্লামা কবি ইকবাল গানে-মানে উজ্জ্বল নক্ষত্র। দাদি এতো সব বাঙালি সুপার হিট কবি বাদ দিয়ে কেন যে আল্লামা ইকবালের ভক্ত ছিলেন, আজও ঠিক বুঝতে পারিনি। আল্লামা ইকবাল এক বিশাল কবি, তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তবে তখনকার আগডুম-বাগডুম অনুবাদে কতটুকুই বা বাংলায় দাদি ইকবাল সাহেবের কবিতা বুঝতেন কে জানে! হয়তো ভাবতেন, নাতিও বড় হয়ে বড় কবি-লেখক হবে, স্বপ্ন দেখবে। এমনও হতে পারে, নতুন দেশের স্বপ্ন দেখবে। যেমন ছোট্ট সিঙ্গাপুরের মতো চিটাগং বা চট্টগ্রাম। এসব বায়বীয় স্বপ্ন খেলেছিল হয়তো ওনার মাথায়!

তবে বড় হয়ে জিনিসটা যা হয়েছি! আল্লামাহ-টাল্লাহমা দূরে থাক, ইকবাল মানে সৌভাগ্য, তাও ঠিকঠাক হতে পারিনি। প্রথম ভাগটা বাদ দিয়ে শেষ ভাগটাই হয়ে দাঁড়িয়েছি। গোটা শিশুকাল এমনকি বালককালে দাদি হাজারো গল্প শুনিয়েছেন। আমাকে গল্প শুনিয়ে যে শান্তি তিনি পেতেন, তা অন্য কিছুতেই হয়তো পেতেন না! আজ জোড়াতালি দিয়ে যা একটু গল্প-উপন্যাস লিখি, তাতে এই গল্প শুনে-শুনে বড় হওয়ার প্রভাব আছে। দাদি বলতেন, দুঃখ-কষ্টের দিনে ঘাবড়ে যেও না। এরও একটা কোটা থাকে! শেষ হলে শুরু হয় সুখ-আনন্দ সময়। সুখ-আনন্দেরও একটা কোটা আছে। আরও বলতেন, সারা জীবন মানুষ অপমান করতে চাইবে। বৃষ্টিতে যেমন ছাতা বা বর্ষাতি (রেইনকোট) নিলে ভেজে না! তেমনি অপমানের বৃষ্টিতে তুমি মনে মনে বর্ষাতি পরে থেকো; অপমান তোমার কিচ্ছু করতে পারবে না।

চারুকলায় পাঠ নেব বলে বাবা বিতাড়িত করেছিলেন চট্টগ্রাম বাড়ি থেকে। সদ্য বালকত্ব হারানো অতি তরুণ আমি নিজের দায়িত্ব নিজে নিয়ে রাজধানী ঢাকায় চলে এসেছিলাম। গুরুজন মহান শিল্পী হাশেম খানের কৃপায় একা আমি নই সঙ্গে চারজন নারী ও তিনজন পুরুষের খাতায় এঁকে লিখে দিয়ে পাস হয়ে ভর্তি হয়েওছিলাম। খাওয়া জুটতো না ঠিক সময় মতো। দিন দিন শুকিয়ে চামচিকার মতো অবস্থা হচ্ছিল। পেট ভরাতে খাওয়া চাইতে খুবই অপমান লাগতো। মনে হতো, খাদ্যভিখারী এতো সহজে হওয়া যাবে না। পেটে খাদ্য নেই অথচ কবি আবুল হাসান, কবি নির্মলেন্দু গুণদের সঙ্গে ফুলবাড়িয়া মেথরপট্টিতে অন্যের টাকায় বাংলা মদ বা গুণদার সঙ্গে হাইকোর্টের মাজারের বাইরে নূরা পাগলার আসরে গাঁজা চিলম হাতে নিতাম ঠিকই, অপমান লাগতো না। কেন এমন হতো কে জানে! আঁকার চেয়ে ঝোঁক ছিল বেশি গল্প লেখার। কারণ রঙতুলি কিনতে তখনো অনেক টাকা লাগতো। লিখতে কিচ্ছুই লাগতো না। রাহাত ভাই (খান)-এর ইত্তেফাক অফিসে যত ইচ্ছা নিউজপ্রিন্টের লেখার প্যাড ঝোলায় ভরতে পারতাম; কলম মানে বলপেনও। আবদুল মান্নান সৈয়দ ভীষণ পছন্দ করতেন আমার গল্প। 'ফিরে যাওয়া' নামে একটি গল্প লিখে ওনাকে পড়তে দেওয়ায় উনি না জানিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের হাতে দিলেন 'কণ্ঠস্বর' পত্রিকার জন্যে। সায়ীদ ভাইয়েরও এতো ভালো লাগলো যে, তিনি আল মাহমুদ ও সাজ্জাদ কাদীরের গল্পের সঙ্গে ছাপলেন 'কণ্ঠস্বরে'। পরের সংখ্যার জন্যেও গল্প দিতে বললেন। ভাবলাম, চট্টগ্রামের নিউ পতেঙ্গা জেলেপাড়ার পটভূমিতে তাদের যুদ্ধ নিয়ে লিখবো; তখনো গুরুত্বপূর্ণ হরিশংকর জলদাস নাজিল হননি। বিপ্রদা মানে বিপ্রদাশ বড়ূয়া জেলেদের নিয়ে সাগর নিয়ে দারুণ সব লেখা লিখছেন। বিপ্রদা ছ'দিন ছ'রাত আমাকেসহ বঙ্গোপসাগরে জেলেদের সঙ্গে ভাসলেন। নৌকার পাটাতনে বমি করতে করতে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। জেলে সর্দারের পুত্র মণীন্দ্র হেসে বলেছিলো- ও কিচ্ছু না। একটা রাত পার হলে বাবু অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। সমুদ্রে ভাসমান সকাল দেখলাম। তখনকার টালমাটাল অবস্থার সঙ্গে টেগ করে দিলাম মণীন্দ্রকে, হয়ে দাঁড়ালো গল্প 'মণীন্দ্র অসুস্থ'। এটিও ছাপা হলো 'কণ্ঠস্বরে' যা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদনা করতেন। এসব কথা বলছি যেহেতু অপমানিত হবার ভয়ে অনেক বড় কাজ ভালো কাজ আর করে হয়ে ওঠে না মানুষ। আমি যেমন হিসেব নেই কতবার যে ঢুকেছি দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক আহসান হাবীবের রুমে, হাতে লেখাও আছে অপমানের ভয়ে ওনাকে দিতে পারি নাই। আমার ভুল ধারণা যে ছিল ভালো লেখা পড়েই উনি অপমান করবেন! ভেঙ্গেছে অনেক পরে এই ভুল ধারণা।

অপমান নিয়ে এখন যেমন ভয় নেই, এমনটা ছিলো না আগে। অপমানে জ্বলে উঠে অনেক বড় বড় কাজ করে ফেলেছেন অনেকে। আমি তেমন একটা বড় কিছু করতে না পারলেও একটা ভালো টার্নিং পয়েন্ট পেয়েছিলাম। তা পরে বলছি। আগে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের 'কণ্ঠস্বর'; তখন খুবই অভিজাত সাহিত্য পত্রিকা। কারো কবিতা ছাপা হলে ধরে নেওয়া হতো, তিনি কবি হবেন। নির্মলেন্দু গুণ, গুণদা এই পত্রিকার জন্যে হন্যে হয়ে সাইকেল চালিয়ে বিজ্ঞাপন জোগাড় করেছেন। মহাদেব সাহা এই পত্রিকার আহ্বানে পাবনা থেকে ঢাকা এসেছেন। আল মাহমুদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসরা গল্প লেখেন। আমার কোন ভূতে পাবে নিজের লেখা দেবো বিশ্রীভাবে অমনোনীত হয়ে অপমানের জ্বালায় পুড়তে। সবচেয়ে বড় কথা, এই রিজেকশনের পর সায়ীদ ভাইয়ের গ্রিন রোড স্টাফ কোয়ার্টারের বাসায় আড্ডা দিতে যাবো কীভাবে? কারোর দিকে চোখ তুলে তাকাতেই তো পারবো না। ভাগ্যিস আমাকে না জানিয়ে মান্নান সৈয়দ আমার গল্পটি সায়ীদ ভাইকে দেওয়ায় ব্যাপারটার একটা কিনারা হয়। পর পর দুটো গল্প ছাপা হওয়ায় ভালো গল্প লিখিয়ের সিল কপালে পড়লো। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো, সায়ীদ ভাইয়ের স্ত্রী ভাবীর নজরে এলো আমি ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছি, চোখ দুটো গর্তে ঢুকে পড়ছে। কারণও তিনি জেনে নিলেন। আচমকা এক সকালে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আমার হাত চেপে ধরে রিকশায় চড়ালেন। সোজা বিটপী বিজ্ঞাপনী সংস্থার তোপখানা রোড অফিসে নাট্যজন রামেন্দুদার রুমে। সায়ীদ ভাই নিয়ে গেছেন চাকরি একটা তো দিতে হবে। তবে আমাকে দেখে রামেন্দুদা আঁৎকে উঠে বললেন- একে তো গুণের কাছে আসতে দেখেছি। অফিসে বসেই সিগারেটে তারা গাঁজা খেয়েছে। বিটপীর কর্ণধার রেজা আলী গুণদার বাংলা কপি রাইটিং চাকরি এই কারণে খেয়েছেন। তবু কাজটা হয়ে গেলো। কারণ আর্ট সেকশনে কাজের ভীষণ চাপ। আর্ট ডিরেক্টর শিল্পী আবদুল মুক্তাদীর, তার পাশে শিল্পী নিতুন কুণ্ডু বললেন, রেখে দাও, চললে ভালো। না চললে ভাগিয়ে দিও। সেই প্রথম আমি মগবাজার নয়াটোলায় বাসা নিলাম। রঙ কিনলাম, তুলি ব্রাশ কিনলাম। হাঁড়ি-পাতিল, টেবিল-চেয়ার, শোয়ার চৌকি কিনলাম। পেলাম বন্ধু আবু সঈদ জুবেরী, আহমেদ বশীরের মতো লেখক প্রতিবেশী। ফুলটাইম কাজ, না হয় চাকরি নেই! তাই চারুকলার ক্লাস বাদ দিতে হলো। হাশেম ভাই বা স্যার কলেজ থেকে ৭৫ টাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। তবে তা দিয়ে কি বেঁচে থাকা সম্ভব? যে কারণে বাড়ি ছাড়লাম সেটাই বাদ দিতে হলো। অপমান থেকে টার্নিং পয়েন্টের যে কথা বলেছিলাম তা হলো। বিটপীর বিজ্ঞাপনের কাজ ছাড়া বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইন করি, শিশুদের বইয়ের ছবি আঁকি, এমনকি নাটকের পোস্টারও করি! শুধু ক্যানভাসে ছবি আঁকি না। বিয়ের পর আমার স্ত্রীর খুব ইচ্ছে আমার ও ক্যানভাসে আঁকা ছবির প্রদর্শনী হবে। সে শাড়ি মাথায় ফুল দিয়ে অতিথিদের ক্যাটালগ ফুল হাতে তুলে দেবে।

এতো করে বুঝাই, সব শিল্পী ক্যানভাসে ছবি আঁকে না। বেজার মুখে স্ত্রী মেনে নেয় আমার কথা। ফয়েজ আহমেদ সাহেব শিল্পাঙ্গন নামে ধানমণ্ডি ৫নং সড়কে আর্ট গ্যালারি করলেন। পেইন্টিং বেশ দামে বিক্রি হতে শুরু হলো, আর্ট মার্কেটিং শুরু হলো। প্যারিস থেকে আসা শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের নাকি কার যেন জমজমাট প্রদর্শনী উদ্বোধনী দিনে আমার স্ত্রী শাড়ি পরে সেজেগুজে গেলো আমার সঙ্গে। গিজ গিজ করছে শিল্পীরা, অতিথিরা। চা-কপি-কোক হাতে নিয়ে কথা চলছে সবার সঙ্গে সবার। আমার স্ত্রী আমার এক শিল্পী বন্ধু দম্পতিকে বলেই ফেলল- আমার খুব ইচ্ছা ইকবালেরও এ রকম প্রদর্শনী হলে আমি সবাইকে অভ্যর্থনা জানাতাম। শিল্পী বন্ধুর স্ত্রী ও শিল্পী দু'জনেই বাঁকা হেসে বললেন- ও তো ছোট্ট ছোট্ট বুক কাভার আর বাচ্চাদের বইয়ে কার্টুন আঁকতে পারে। ক্যানভাসে এত্ত বড় বড় ছবি আঁকতে গেলে আরেকটা জীবন লাগবে। কথাগুলো পাশে দাঁড়িয়ে আমিও শুনলাম। আমার স্ত্রী কিন্তু বোঝেনি আমি শুনেছি। সে শুধু আমার পাঞ্জাবির হাতা টেনে বলতে লাগলো- ভালো লাগছে না। চলো বাসায় যাই। আমি তখন সবে রাহাত ভাই (খান) থেকে টু ডোর পাবলিকা গাড়ি কিনেছি, ম্যানুয়াল গিয়ারের গাড়ি ফার্স্ট গিয়ারে দিয়ে ক্লাস তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিলে চিতার মতো লাফিয়ে ওঠে। টয়োটা পাবলিকার লম্ম্ফের সঙ্গে চোখ বড় বড় করে মনে মনে বললাম- বন্ধু এবার আঁকবো বড় ছবি! দেখি কত বড় ছবি আঁকা যায়। দেখি দেশে-বিদেশে এই জীবনে কয়টা ছবির প্রদর্শনী করা যায়। মাত্র এর আট মাস পর ১৯৯৪ সালে কানাডার ইমিগ্রেশন নিয়ে দেশ ছাড়ার আগে ডু অর ডাই মনোভাবে প্রদর্শনী করে বেরুবো বদ্ধপরিকর! শিল্পী বাদল চক্রবর্তী সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করলো; শিল্পী নাজিব তারেক তার প্রদর্শনী তারিখ পিছিয়ে এনামুল করীম নির্ঝরের সেন্ট্রাল রোডের 'যোযন' গ্যালারিতে স্পেস ছেড়ে দিলো। নির্ঝর ও তার টিম এক হাত নয় দুই হাত বাড়িয়ে সহযোগিতা করে দাঁড় করিয়ে ফেলল আমার প্রথম বড় ছবির প্রদর্শনী। স্ত্রী তখন ঢাকার বিশ্বব্যাংকে কাজ করত, সেই সূত্রে কান্ট্রি চিফ ল্যান্ডেল মিলস্‌ ও হাশেম খান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সবাই প্রধান অতিথি। ঘাবড়ে গেলাম। টুপ-টাপ করে ছবি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। 'মর্নিং অব ফিফটিন অগাস্ট' সিরিজের ছবিগুলো কাড়াকাড়ি করে শেষ। প্রায় সব দৈনিক পত্রিকায় কাভারেজ, বিচিত্রায় কাভারেজ, একমাত্র টিভি চ্যানেল বিটিভিতে নিউজ। ভাবলাম, বাহ্‌ কী বোকা ছিলাম, ছোট্ট ছোট্ট বুক কাভার করে জীবন পার করছিলাম! নেশা পেয়ে গেল। কানাডা এসে পরের বছর মন্ট্রিয়ল শহরে লাভাল শেরাটন হোটেল গ্যালারিতে দ্বিতীয় একক করলাম। মন্ট্রিয়ল মেয়র প্রধান অতিথি হয়ে আসলেন। এর পর থেকে চলছে, এই অক্টোবরের ২৬ তারিখ টরন্টোতে আছে বড় ছবির ১৮তম একক প্রদর্শনী, টরন্টো মেয়র জন টোরি আসার কথা। এসব বলার মানে একটা অপমান কী চরমভাবে উস্কে দিতে পারে বাসনা তার বিবরণ হিসেবে।

অন্য ধাঁচের অপমানের কথা বলে শেষ করি। কানাডার প্রধান শহর টরন্টোতে দুটি বেগমপাড়া আছে। এক বনেদি বেভিউ রাস্তায় মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলারের এক-এক বাড়ি, অন্যটি টরন্টোরই অঙ্গ শহর, নতুন গড়ে উঠছে রিচমন্ড হিল সেখানে। দুই বেগমপাড়ায় বেগমরা সন্তান-সন্তানাদি নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করেন এসব মিলিয়ন ডলারের বাড়িতে। দেশী অনেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্যদের বাড়ি আছে যেমন, তেমনি নামিদামি ব্যবসায়ীদের স্ত্রীর নামে, সরকারি উচ্চ পদস্থদের। টরন্টোর সাধারণ বাঙালি প্রবাসীদের সঙ্গে এরা খুব কম যোগাযোগ রাখেন। এদের মধ্যে অনেকে দেশে আমার ছবি নিয়েছেন, প্রর্দশনীতেও এসেছেন বলে টুকটাক জানা আছে। এই সব বেগমরা বাংলাদেশের পিকনিক, গানের অনুষ্ঠান, মেলা-টেলায় তেমন আসেন না। আবার মিসিসাগা, ব্রামটন সাউথ এশিয়ান পার্টিতে বলিউড তারকা আগমনে ফেস্টিভ্যালে নিয়মিত যান। এ রকম এক পার্টিতে আমার ভারতীয় কানাডিয়ান শিল্পীবন্ধু কজন বল্লো- ঐ দেখো উনি তোমার দেশের বেগমপাড়ার বেগম। বয়স হলেও খুব সুন্দরী, শরীরের অবয়বও দারুণ। কাউকে পাত্তা দেন না। বল্লাম- দেখি একবার। সঙ্গে তার বান্ধবীরা ও বাঙালি, সুন্দর ইংরেজিতে কথা বলছেন। সামনে গিয়ে সালাম দিয়ে বললাম, ত্রিশ সেকেন্ড কথা বলতে পারি! তিনি ঘাড় বাঁকিয়ে অদ্ভুতভাবে হেসে বল্লেন- অফকোর্স। বল্লাম- আমিও বাংলাদেশি। এখানে নগণ্য শিল্পী। শুনলাম আপনি বাঙালি তাই গর্ববোধ হলো বলতে এলাম আপনি এমন নারী যাকে পাল্টে দ্বিতীয়বার দেখতে বাধ্য হয় মানুষ। উনি বান্ধবীদের সঙ্গে হাঁ করে শুনলেন। আমার কার্ড রাখলেন। আর একটিও কথা হয়নি সেদিন। তার সেই সূত্রপাত। এরপর তিনিই টুকটাক লিখে পাঠাতেন ফোনে। টরন্টোর প্রেস্টিসিয়াম আর্ট ডিস্ট্রিক্ট ইয়র্কভিলের এক গ্যালারিতে ওপেনিংয়ে আমন্ত্রণ জানালাম। তিনি এলেন। এরপর তিনি তাদের বান্ধবীদের হলিউন পার্টিতে ভূতের সাজ সাজ সবাই সেখানে ডাকলেন। এরপর পাল্টাপাল্টি এ রকম চল্লো বেশ কয়েক মাস। ভালো বন্ধু হলেন। আমার টরন্টোতে অনেক নারী বন্ধু আছেন, যারা আমার কাছে নারী-পুরুষ নয়, মানুষ বন্ধু হিসেবেই কাছের।

বেগম সাহেবকেও তেমনি ভেবে ছিলাম। যদিও সারাক্ষণ প্রতিপত্তি সম্পদের অহঙ্কার তার কথায় লেগেই থাকত। যেমন এখানে পাকিস্তানি কানাডিয়ান শিল্পী বন্ধু আসমা মাহমুদ ও তার স্বামী আরশাদ মাহমুদ শহর থেকে দূরে অন্টারিও লেক মাসকুকা বিচের সঙ্গে লাগোয়া বাড়ি করেছে। আরশাদ বাড়িটি তৈরির সময় নিজে খেটেছে, নিজের মতো করে নিজের হাতে তৈরি করার মজা নিতে। মাঝে মধ্যে সামারে বারবিকিউ পার্টি আয়োজন করে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে থাকে দুই তিন রাত থাকে সবাই। বেগম সাহেবরাসহ গেলাম একবার তিনি তো সারাক্ষণ শুধু বোঝাতে চাইলেন এত্তো ছোট এটা কী এমন বাড়ি হলো। আমাদের গাজীপুরে চার একরের মাঝে যে বাগানবাড়ি আছে, সেটি যদি দেখতেন। মোট কথা অহঙ্কার এই বেগমদের মগজ ছেয়ে থাকে সারাক্ষণ। এই সব বেগমদের সব আছে এখানে ওখানে। শুধু স্বামী কাছে নেই। টাকার কুমির থলথলে ওজনদার স্বামীরা কতটা ফিট কে জানে। এখানে ক্ষণিক সঙ্গী পেতে টাকা দিলে পুরুষ কিংবা নারী পেতে তো অভাব নেই। কালো ষাঁড়ের মতো কালো পুরুষ নিয়ে যে কোনো দামি হোটেলে ফাঁকফোকরে সময় কাটিয়ে আসলে কে জানবে! তবে সেই সাহসও এই বেগমদের বেশিভাগের নেই। দুর্ভাগ্য বলব নাকি সৌভাগ্য বলব, বুঝে উঠতে পারছি না বেগম সাহেবা কেন যে আমার মতো বয়স্ক আউলি ঝাউলি মানুষকে পছন্দ করে গ্রিন ফ্ল্যাগ নাড়েন আকারে-ইঙ্গিতে! এমনিতে ওনার সঙ্গ ঠিক আছে। ওনার সেভেন সিরিজে লেটেস্ট বিএমডব্লিউ ড্রাইভ করে লং ড্রাইভও আমার পছন্দ। কোনো পেইন্টিং শোর ওপেনিংয়ে নিয়ে গেলে এখানকার শিল্পী বন্ধুরা জিজ্ঞেস করে, উনি কী গোল্ড বা ডায়মন্ড শপের মালিক? কারণ এতো অলঙ্কার এখানে সাধারণত কেউ পরে না। সেটিও মেনে নেয়া যায় তবে এর চেয়ে বেশি বাড়তে গেলে ইচ্ছায় বাধে। অন্তর থেকে টান উৎপত্তি যদি না হয়, তাহলে কিচ্ছুই হয় না। এদের রুচি ভদ্রোচিত সীমাবলয় থাকুক আর নাই বা থাকুক অঢেল অর্থ আর প্রতিপত্তি আছে। এসব থাকলে ইগো বা অহং থাকে পায়ের তলায় থেকে মাথার চান্দি পর্যন্ত। টরন্টোর ফ্রন্ট স্ট্রিট এক্কেবারে সমুদ্রের মতো অন্টারিও লেকের পাড় ঘেঁষে। পুব থেকে পশ্চিমে যাওয়া এই রাস্তায় ঠিক ডাউন টাউনে টরন্টোর সর্ব প্রথম পাঁচ তারা হোটেল রয়েল ইয়র্ক। এখানে কুইন এলিজাবেথ কিশোরী বয়সে এসেছিলেন। আবার প্রিন্স চার্লসের ছয় মাস বয়সেও এসেছিলেন। এখন তো কত পাঁচ-সাত তারা হোটেল তবে রয়েল ইয়র্কের অভিজাত্য এখনো অটুট। এই রয়েল ইয়র্কে এক ভরা দুপুরে যখন বেগম ডাকলেন, ভেবেছিলাম ক্যাফেকে আড্ডা দিতে, কাপিচিনো অতুলনীয় রয়লের! পৌঁছে ফ্রন্ট ডেস্কে জানতে চাইতে তারা ৪৪৯ রুমে পাঠিয়ে দিল।

দরজায় টোকা দিতেই বেগমের কণ্ঠ শুনলাম- খোলা। খোলা শুধু দরজাই নয়। আগ্রাসী রূপ বেগমের! আমি যে সাত্বিক ঠিক তা নয়! তবে বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হাচ্ছিল না স্থূলো মাথার অহঙ্কারী বেগমের দিকে পা বাড়াতে। ইউ টার্ন নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে দরজা ঠেলে বন্ধ করতে গণ্ডারের মতো গর্জে উঠলেন বেগম। - ঐ বুড়ো খট্টাশ। নপুংশক কোথাকার। পালাচ্ছো কই? তোর সাত জন্মের ভাগ্য যে আমি এই আমি তোকে ডেকেছি। প্রাথমিকভাবে এসিডের মতো জ্বালা ধরিয়ে দিলো গায়ে। বুড়ো তবে খট্টাশ নই। আর নংপুশংক তো নই। নিজকে নিজে তো বুঝি। দুই পক্ষ পছন্দ সই হলে খোকা বাবুর জেগে উঠতে ট্যাবলেট প্রয়োজন হয় না আমার।

ঊর্ধ্বশ্বাসে দশ মিনিটি হেঁটে হার্বারফ্রন্ট উত্থাল-পাত্থাল জলে ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাতাস খুব আছড়ে পড়ছে অন্টারিও লেকের জলরাশি। আমার দাদীর কথা মনে হলো- অপমান বৃষ্টির মতো তোমাকে ভিজিয়ে যেন না দেয়। ছয় ডলার দিয়ে টিকিট কেটে ফেরিতে উঠে পড়লাম শত মানুষের সঙ্গে। বিশ মিনিটে সেন্টার আইল্যান্ড পৌঁছে যাবো। শ'কয়েক বছর আগে প্রচণ্ড ভূমিকম্পে টরন্টো মেইনল্যান্ড থেকে ভেঙে ছিটকে সরে এসে অন্টারিও লেকে ছোট দ্বীপ তৈরি হয়েছে। নাম সেন্টার আইল্যান্ড। সামারে শত শত টুরিস্ট বোঝাই করে বিশাল ফেরি অনবরত আসা-যাওয়া করে। মধ্য পথে হুলস্থূল ঢেউ খেলানো অন্টারিও লেকের জলে থু! করে থুথুর সঙ্গে ফেলে দিলাম। দেশের দুই নম্বর ধনীর স্থুল মগজের বেগমের অপমান বাক্য! সামারের নীল গগনে উজ্জ্বল সূর্যের মতো মন আবার হেসে উঠলো। আসলেই অপমানের বৃষ্টি আর গায়ে লাগে না।

অন্যান্য