সচল জীবনকে ধারণ করতে পারার একটা বাসনা মানুষের মধ্যে ছিলো- সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই তো সিনেমার আবির্ভাব। মানুষের মনেও সেই গুহাজীবনের আগে থেকেই কাঙ্ক্ষিত বাস্তবতাকে দেখানোর একটা ইচ্ছা তৈরি হয়েছিলো। মানুষ যে বাস্তবতাকে দেখতে চাইতো; গুহার দেয়ালে, পাথরে, পাত্রে তার প্রতিকৃতি আঁকার মাধ্যমে, তার চিত্রায়নের নতুন নতুন পদ্ধতি আবিস্কারের মধ্য দিয়ে যে যুগের সূচনা করেছিলো- চলচ্চিত্রায়ন তারই পরম্পরা। নিজের স্বপ্ন-কল্পনা, চিন্তাকে মানুষের সামনে উপস্থাপনের একটা প্রবণতা অনেকেরই থাকে। আমার ভেতরেও হয়তো তেমন প্রবণতা শুরু থেকেই ছিলো।

আমার জীবনে সিনেমা- জীবনের অনেক কাকতালগুলোর মতোই একটি হলেও সিনেমা বানাবার স্বপ্ন বলা যায় কৈশোর থেকেই মনের মধ্যে তৈরি হয়েছিলো। সেই কৈশোরেই বিভূতিভূষণের 'পথের পাঁচালী' পড়ে যখন মনে হলো যে জীবনে যদি কখনও সিনেমা বানাই তাহলে এ বইটা নিয়েই বানাবো। কিন্তু তথ্য-যোগাযোগের সেই অপ্রতুলতার সময়ে আমার তখনও জানা ছিলো না; আমার চিন্তায় আসার বছর দু'য়েক আগেই 'পথের পাঁচালী' সিনেমা হয়ে গেছে! আর সেটা বানিয়েছেন বাঙালি চলচ্চিত্রের এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব, সত্যজিৎ রায়। অবশ্য এই সংবাদ জেনে প্রথমে মন খারাপ হলেও পরে আনন্দই হয়েছিলো বেশি। বিষয়টা আমার ভালোই লেগেছিল এই ভেবে যে, আমি এমন একটি বই নিয়ে ছবি করার কথা ভেবেছিলাম, যেটা নিয়ে অনেক বড় মাপের একজন পরিচালক ছবি বানিয়েছেন, তাহলে আমার ইচ্ছা নিশ্চয়ই খারাপ না। আমিও সত্যজিৎ রায়ের মতোই ভাবতে পারি তাহলে! আর একদিক থেকে এটা ভালোই হয়েছে, আমি কবে সিনেমা বানোবো, আদৌ বানাতে পারবো কি-না, তার তো ঠিক নেই! উনি বানিয়েছেন বলে ভালোই হলো। তবে সে সিনেমা তখন আর দেখতে পারিনি; আমার 'পথের পাঁচালী' দেখা হয়েছে আরও বহু বছর পরে।

২.

ছেলেবেলায় আমাদের বাসা ছিলো লালবাগের ওইদিকটায়, নদীর ধারে। মনে আছে, বুড়িগঙ্গার পাড়ে পর্দা টাঙিয়ে প্রজেক্টর দিয়ে পাকিস্তান নিউজের নানা তথ্যচিত্র দেখানো হতো। পাড়ার লোকজন ভিড় করে সেগুলো দেখতো। আমিও দেখেছি। মূলত পাকিস্তান সরকারের নানান উন্নয়নমূলক প্রচারণার অংশ হিসেবে জায়গায় জায়গায় এই ভিডিওগুলো তখন দেখানো হতো। পশ্চিম পাকিস্তানের ভিডিওই বেশি দেখাতো। তেবে আমি খুব চমৎকৃত হয়েছিলাম পর্দায় প্রথম সেসব প্রামাণ্যচিত্র দেখে। এগুলো দেখে আমি ভাবতে শিখেছিলাম যে, এটা একটা ভালো জিনিস, যেটার মাধ্যমে কিছু শেখা যায়, বলা যায় এবং শেখানো যায়। তবে সিনেমা হলে গিয়ে প্রথম সিনেমা দেখেছি সম্ভবত বাবার সাথে। বাবা গুলিস্তান সিনেমা হলে গিয়ে মাঝে মাঝে সিনেমা দেখতেন। তবে সেসব সিনেমা ছিলো ধর্মীয় ভাবধারার নানা কাহিনী নিয়ে বানানো। দরবার-ই-হাবীব নামে একটা সিনেমার কথা মনে আছে। এ ছাড়া ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে স্কুল থেকে আমাদের সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাওয়া হতো। কলকাতার চলচ্চিত্রগুলোও তখন ঢাকায় আসতো। উত্তম-সুচিত্রার তখন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। আমার বড় বোন আমার থেকে সাত বছরের বড়। স্বাভাবিকভাবেই চাচাতো-ফুফাতো বোন বা বান্ধবীদের নিয়ে সেসব রোমান্টিক সিনেমা দেখতে পছন্দ করতো। সবাই মেয়ে, কিন্তু সাথে তো একজন পুরুষ গেলে সুবিধা হয়- সেই পুরুষ লোক হিসেবে দেখা গেল যে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। আমার তখন কত! বয়স বারো-তেরও বোধহয় হয়নি। বুঝি বা না বুঝি, একটা কিছু ঘটছে- এটা বুঝতে পারতাম। তবে এ মাধ্যমটা সম্পর্কে ভেতরে ভেতরে আমার একটা আকর্ষণ তৈরি হচ্ছিলো তখন থেকেই। মনের মধ্যে কোথাও না কোথাও ছিলো যে, বড় হয়ে আমিও একটা সিনেমা বানাবো। এই স্বপ্ন কোনো ফিল্ম মেকার বা পরিচালক-টালক হবার জন্য না। বলা যায়, একটা খেলনার মতো যে আমিও দেখি কিছু একটা করা যায় কি-না! তবে এক সময় এ বিষয়টা থেকে হঠাৎ অনেকটা দূরে সরে গিয়েছি। বাবার মৃত্যুর পর আমি যখন গ্রামে চলে গেলাম; ১৯৫৭ সালের কথা বলছি। তখনকার গ্রামের প্রায় কেউই সিনেমার সাথে পরিচিত না। একশ' জনের মধ্যে কখনও কখনও হয়তো একজনও পাওয়া যেত না, যে সিনেমা দেখেছে। সিনেমার গল্প বললেও স্বাভাবিকভাবে তারা হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকতো- কী বললা এটা! তাজ্জব ব্যাপার! কিন্তু আমার ভেতরে কীভাবে যেন সেই সময়টাতেও সিনেমা ব্যাপারটা কাজ করতো। জন্ম ও শৈশব ঢাকায় হবার কারণে গ্রামে থাকতে খারাপ না লাগলেও সব সময়ই ভাবতাম- এই যে এখন আমি গ্রামে আছি, একদিন আমি এখান থেকে বেরিয়ে যাবো। উচ্চতর পড়াশুনা করবো। জগৎটা দেখবো এবং কোনোদিন যদি বড় হই আমি একটা সিনেমা বানাবো।

বিভিন্ন ধরনের অভ্যাসের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাসটা আমার দারুণভাবে ছিলো। কিশোরগঞ্জে মামার বাড়ি গিয়ে থাকবার সময় খুব বই পড়তে ইচ্ছা করতো। তাই মামা বাড়ি যেয়ে প্রথমেই খোঁজ করেছিলাম সেখানে কোনো লাইব্রেরি আছে কি-না। বই পড়ার প্রতি আগ্রহ দেখে মামা সেখানকার একমাত্র পাবলিক লাইব্রেরির খোঁজ দিয়েছিলেন। লাইব্রেরির সদস্য হতে গিয়ে আরেক সমস্যা দেখা দিলো। লাইব্রেরি থেকে বলা হলো, স্কুলে ভর্তি না হলে সদস্য করা যাবে না। সেদিনই স্কুলে ভর্তি হয়ে তারপর পাবলিক লাইব্রেরির সদস্য হয়েছিলাম। এমনও হয়েছে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে গফরগাঁওয়ে চাচাত ভাইয়ের বইয়ের দোকানে বই পড়তে চলে যেতাম। স্কুলের বইয়ের চেয়ে অন্যান্য বই পড়তেই আমার বেশি ভালো লাগতো।

মজার ব্যাপার হলো, কোনো বই পড়তে গেলেও অনেক সময় গল্পের দৃশ্যগুলো মনের পর্দায় ভেসে উঠতো।

ক্লাস এইটে যখন পড়ি, স্কুলের লাইব্রেরিতে একদিন পেলাম আবু ইসহাকের 'সূর্য দীঘল বাড়ী'। উপন্যাসটা পড়ে খুব ভালো লাগলো। মনে হলো, এই বইটা নিয়েও তো ছবি বানানো যায়। অষ্টম শ্রেণিতে বসে ভাবা সেই বই নিয়ে সত্যি একদিন সিনেমা বানাবো- তা তো ভাবিনি। এসব বিষয় আমি কাউকেই কখনও বলতাম না। নিজে নিজেই বই পড়তাম, ভাবতাম। ভাবতে ভালো লাগতো। পেশাদারভাবে সিনেমা বানাবো, তেমন ইচ্ছ কখনোই হয়নি। কারণ আমি জানতাম, আমার পেশা ঠিক করা আছে। পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলাম বলে বাবা-মা স্বপ্ন দেখতেন, বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবো। হলামও তাই।

৩.

আমার জন্ম এই ঢাকা শহরে; ১৯৪৮ সালে। সেই সময়টাতে বাবা-মা ঢাকায় থাকতেন। দেশভাগের আগে বাবা কলকাতায় খাদ্য বিভাগে চাকরি করতেন। '৪৭-এর পর বাবা ঢাকায় চলে আসেন। চার ভাইবোনের মধ্যে আমি ছিলাম দ্বিতীয়। আমার পড়াশোনা শুরু হয় ঢাকার আজিমপুর ওয়েস্টার্ন হাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শিক্ষাজীবনে আমার অনেক শ্রেণিতেই পড়া হয়নি। অবশ্য তাতে আমার লেখাপড়ার কোনো ক্ষতি হয়নি। ৫ম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় আমার একবার জ্বর হয়েছিল। তখন আমি পরীক্ষা দিতে পারিনি। পরের বছর আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম। এ ছাড়া আমাকে আমার দাদি নুরুন্নেছা লেখাপড়া শেখাতেন। দাদি ছিলেন সে সময়ের স্কুল শিক্ষিকা। আমার লেখাপড়ার হাতেখড়িও হয়েছিল দাদির কাছে। পড়তে ভালোবাসতেন তিনি। দাদিকে দেখে ছোটবেলা থেকেই আমার মধ্যে বই পড়ার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। দাদির নিজের একটি বইয়ের লাইব্রেরি ছিল। সেটার সব বই পরবর্তীকালে আমি পেয়েছি।

এইচএসসি পাস করার পর ইচ্ছা ছিল ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হবো। পরীক্ষা দিয়ে সুযোগও পেয়েছিলাম, কিন্তু ভর্তির আগে ঘটনা অন্যদিকে ঘুরে গেল। ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হতে যাওয়ার আগে একদিন বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান বুয়েট থেকে ফিরে আসছি, এমন সময় শুনতে পেলাম আমাকে কেউ একজন পিছন থেকে নাম ধরে ডাকছে। তাকিয়ে দেখি আমারই এক সহপাঠী আমিনুল। পরবর্তীকালে স্থপতি আমিনুল হক। সে আমাকে আর্কিটেক্‌চারে ভর্তি হতে বলল। আমি তখনও আর্কিটেক্‌চার সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমি ছবি আঁকতে পছন্দ করতাম, আমিনুল সেটা জানত। সে-ই আমাকে বললো, আমি এই বিষয়ে ভর্তি হলে ভালো করবো এবং আমাকে আর্কিটেক্‌চার বিষয়টা সম্পর্কে বুঝিয়ে বললো। তার উৎসাহেই আমি আর্কিটেক্‌চারে ভর্তি হয়েছিলাম। এ ধরনের কাকতাল আমার জীবনে বহুবার ঘটেছে।

ছবি বানানোর স্বপ্ন কৈশোর থেকে দানা বাঁধলেও ছবি তৈরির ব্যাপারে কিন্তু বড় হয়েও তেমন কিছু জানি না। বাংলাদেশে তখনও ফিল্ম তৈরি করার উপর কোনো প্রশিক্ষণ শুরু হয়নি। তারপরও এ বিষয়ের উপর কোনো লেখাপড়া করা যায় কি-না, সে ব্যাপারে সব সময় খোঁজ নিতাম। পড়ার জন্য চলচ্চিত্রের ওপর লেখা বই খুঁজছি। বই খুঁজতে গিয়েই সিনেমার এক জলজ্যান্ত বাতিঘরের সাথে আমার দেখা হলো- নাম মুহাম্মদ খসরু। তিনি তখন পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি। ঢাকা স্টেডিয়ামের পাশে লাইব্রেরি আইডিয়াসে আমি গিয়েছিলাম ফিল্ম সম্পর্কে লেখা কোনো বই আছে কি-না সে খোঁজ নেয়ার জন্য। সেদিনও যখন আমি বইয়ের খোঁজ করছিলাম, তখন সেখানে একজন এসে দোকানিকে বললো আমাকে 'ক্লাসিকস্‌ অব দ্য ফরেইন ফিল্ম' বইটি দেয়ার জন্য। কিন্তু দোকানি এর আগে আমাকে বইটি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন, এই বইটিই অন্য একজন পরিচালক এনে রাখার জন্য বলেছেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো, মুহাম্মদ খসরু দোকানদারকে বইটি আমাকেই দিতে বললেন। আমি পরে একদিন গিয়ে বইটি নিয়ে এসেছিলাম এবং জেনেছিলাম, তিনিই হচ্ছেন পরিচালক খসরু। ফিল্ম সম্পর্কে আমার আগ্রহের কথা শুনে তিনি আমাকে পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটির সদস্য করে নিয়েছিলেন। ফিল্ম সোসাইটির সদস্য হবার পর আমি সব ধরনের কাজ করেছি। সেই সময় আমাদেরই সব কাজ করতে হতো। কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা, দাওয়াত দেয়া, চিঠিপত্র তৈরি, স্ট্ক্রিপ্ট তৈরি- সব ধরনের কাজ আমরা নিজেরা করতাম।

আর্কিটেক্‌চার পাস করার পর ১৯৭৩ সালে আমি অ্যাসিস্ট্যান্ট আর্কিটেক্ট হিসেবে কয়েক মাস সরকারি চাকরি করেছিলাম। এক অনিয়মের প্রতিবাদ হিসেবে সে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম। তারপর কাজ করেছিলাম একটি ফার্মে। সেখানে কাজ করার সময়েই ছবি বানানো শুরু করি এবং ছবির কারণে সেই চাকরিটাও ছেড়ে দিতে হয়েছে।

'সূর্য দীঘল বাড়ী' সিনেমাটির আরেকজন পরিচালকের নাম শেখ নিয়ামত আলী। তার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটিতে। তিনি আমাকে বেশ স্নেহ করতেন।

১৯৭৫ সালে ফিল্ম সোসাইটির একটি পত্রিকায় লিখতাম। সেই পত্রিকারই একজন সদস্য ছিলেন শেখ নিয়ামত আলী। তিনি তার ছবি তৈরি করার ইচ্ছার কথা বলতেন, বিভিন্ন কাহিনীর চিত্রনাট্য তৈরি করে আমাকে দেখাতেন। আমি চিত্রনাট্যের ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা করতাম, কিন্তু কোনো চিত্রনাট্যই পছন্দ হচ্ছিলো না। কোথায় যেন একটা ঘাটতি! এমন করেই চলছিল শেখ নিয়ামত আলী আর আমার ছবি তৈরির পরিকল্পনা। তিনি সব সময় ভালো ছবি তৈরি করার কথা বলতেন। কিন্তু ভালো কোনো গল্প না পাওয়ায় আমাদের ছবি তৈরি করা হয়ে উঠছিল না। একদিনের ঘটনা; তখন আমি বাসায় ছিলাম না। আমার এক চাচাতো বোন জেবুন্নেছা আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিলো। মগবাজারের দিকে ওদের বাসা। আমাদের বাসায় বেড়িয়ে চলে যাবার সময় সে সাথে করে নিয়ে আসা একটা বই ভুল করে আমাদের বাসায় ফেলে যায়। সে বইটির নাম 'সূর্য দীঘল বাড়ী'। আমি বাসায় এসে পড়ে থাকা সূর্য দীঘল বাড়ী বইটি দেখে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, মা, এ বই কে এনেছে! সেদিন রাতেই দ্বিতীয়বারের মতো বইটি পড়ি এবং ছোটবেলার এই স্বপ্নের বইটি নিয়েই ছবি করবো বলে সিদ্ধান্ত নিই। বইটি দেখেই আমার মনে হলো, যদি শেখ নিয়ামত আলী ভাই এটি দিয়ে চিত্রনাট্য তৈরি করতে পারেন, তাহলে একটি ভালো ছবি তৈরি করা সম্ভব। আমি শেখ নিয়ামত আলীকে চিত্রনাট্য লেখার জন্য বইটি দিলাম এবং চিত্রনাট্য লিখে নিয়ে আসতে বললাম। তিনি পরদিন চিত্রনাট্যের খসড়া তৈরি করে নিয়ে এলেন। আমি তার চিত্রনাট্যের উপর ঢাকার ফতুল্লা এলাকার ভাষা দিয়ে ডায়লগ সাজালাম এবং আমাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করলাম যে আমরা ছবি বানাবো। 'সূর্য দীঘল বাড়ী'র শুরুটা ছিল এমনই। কিন্তু এবারের কাকতাল ঘটানোর কারিগর জেবুন্নেছা- তার সাথে তখনও আমার বিয়ে হয়নি। জেবুন্নেছা ও আমার বিয়ে হয় 'সূর্য দীঘল বাড়ী' বানানোর শেষদিকে, ১৯৭৯ সালে। সত্যি কথা বলতে, জেবুন্নেছা না থাকলে এই স্বপ্ন আমি বাস্তবায়ন করতে পারতাম না। ব্যক্তিজীবনে তার অনুপ্রেরণারও তুলনা নেই।

৪.

সূর্য দীঘল বাড়ী আমাকে আকর্ষণ করার অন্যতম কারণ হলো, শহরে জন্ম হলেও এক সময় আমি গ্রামে ছিলাম। আমি শহরের সাথে মিলিয়ে গ্রামকে দেখতে পেয়েছি। গ্রামের মানুষের জীবনের সাথে সূর্য দীঘল বাড়ী বইটির চরিত্রগুলোর মিল পেয়েছি। এর পটভূমি আমার মনে নানাভাবে দাগ কাটতে সক্ষম হয়েছিলো। সম্ভবত সে কারণেও ছবিটি করতে পেরেছিলাম।

কোনো গল্প দিয়ে যদি ছবি তৈরি করতে হয়, তাহলে লেখকের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু আমরা লেখকের অনুমতি না নিয়েই ছবিটির চিত্রনাট্য তৈরি করে ফেলেছিলাম। সূর্য দীঘল বাড়ী বইটির লেখক আবু ইসহাক তখন ঢাকা ছিলেন না। আমরা তাঁর কাছে অনুমতি চেয়ে চিঠি পাঠালাম, কিন্তু তিনি আমাদেরকে অনুমতি দিলেন না। আমরা কখনও ছবি বানাইনি বলে তিনি আমাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং তিনি জানালেন, এই গল্প নিয়ে ছবি করার জন্য আমাদের আগেই পরিচালক বাদল রহমান অনুমতি নিয়ে গেছেন। এ ঘটনায় আমরা খুবই ভেঙে পড়লাম। খুব কষ্ট করে চিত্রনাট্য তৈরি করেছি, আর আমার সারা জীবনের স্বপ্ন তো আছেই। ঠিক সেই সময়েই আমরা পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেখলাম। বিজ্ঞাপনটিতে লেখা ছিল ভালো ছবি তৈরির জন্য সরকারিভাবে কিছু টাকা অনুদান দেয়া হবে। সে জন্য চিত্রনাট্য আহ্বান করা হয়েছে। আমরা সেই সময় বাদল রহমানের কাছে জানতে চাইলাম, তিনি অনুদানের জন্য ছবির কথা ভাবছেন কি-না। বাদল রহমান আমাদের জানালেন, তিনি অনুদানের জন্য চিত্রনাট্য জমা দিতে যাচ্ছেন, তবে সেটা 'এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী'র চিত্রনাট্য। আমরা যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। আমি শেখ নিয়ামত আলী ভাইকে বললাম, এক কাজ করি। আমরা সূর্য দীঘল বাড়ীর চিত্রনাট্য জমা দিয়ে ফেলি। যদি ছবিটি অনুদানের জন্য নির্বাচিত হয় তখন আমরা আবার লেখকের কাছে ছবিটি করার জন্য অনুমতি চাইবো। সৌভাগ্যবশত আমাদের ছবিটিকে অনুদানের জন্য নির্বাচন করা হয়। আবার আবু ইসহাকের কাছে অনুমতি চেয়ে চিঠি পাঠালাম। এবার তিনি আমাদের না ফিরিয়ে অনুমতি দিয়ে দিলেন এবং বললেন, তিনি আমাদের সাথে দেশে এসে সরাসরি কথা বলবেন। তিনি ঢাকায় আসার পর আমরা তাঁর সাথে একটি চুক্তি করলাম। চুক্তিটি ছিল- আমরা ছবিটি তৈরি করে প্রথমেই যে টাকা পাব, সেটা তাকে দিয়ে দেব। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা তাকে সব টাকা দিতে পারিনি। কারণ ছবিটি করতে আমাদের যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়েছিল, সেই তুলনায় ছবিটি তেমন ব্যবসা করতে পারেনি। কিন্তু যা করতে পেরেছে তা আমার জন্য অবিস্মরণীয়। তা আমার সমস্ত জীবনের পাওনা।

সূর্য দীঘল বাড়ী মুক্তি পাওয়ার পর বাংলাদেশে যেমন ছবিটি জনপ্রিয় হয়েছিল তেমনি বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে গৌরবের একটি স্থান করে নিতে পেরেছে ছবিটি। ছবিটি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করেছি। আমি যখন পুরস্কার আনতে যেতাম, সব সময়ই এমন কিছু ঘটতো, যা আমার জন্য অভাবনীয়। সেগুলো আমি কখনও ভুলতে পারবো না।

আমি ঠাট্টা করে এ কথা অনেকবারই বলেছি যে, জীবনে পেশাগতভাবে বাড়ি বানিয়েছি অনেক, কিন্তু সিনেমায় বাড়ি বানিয়েছি একটিই- সূর্য দীঘল বাড়ী। ি

মন্তব্য করুন