বাঘে ছুঁলে কত ঘা তার একটা হিসেব আছে। পুলিশে ছুঁলে কত ঘা তাও অনুমান করা যায়। কিন্তু সজনী ছুঁলে জখম যে কোন পর্যায় পর্যন্ত যাবে, আগাম বলা তো সম্ভবই নয়; জখম থেকে কখন চোখের সামনে রক্ত ঝরছে, সেই রক্তক্ষরণ কখন যে শেষ হবে তাও বলা সম্ভব নয়।

গজেন্দ্র কুমার মিত্র 'কলকাতার কাছেই' উপন্যাসটির জন্য আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। বাঙালি পাঠক অবশ্যই খুশি হয়েছেন। সজনীকান্ত দাস 'অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছেন'। এবার দেখুন সজনীর আনন্দের নমুনা :

'তবে তিনি (গজেন্দ্রকুমার মিত্র) যদি মনে করেন রচনার উৎকর্ষ বিচারে তিনি পুরস্কৃত হইয়াছেন তাহা হইলে ভুল করিবেন। দিল্লির মা সরস্বতী প্রেমেন কাত বা গজেন মাত হইবার মত সাহিত্যবুদ্ধিসম্পন্না নহেন। হইলে বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল), বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, সুবোধ ঘোষ প্রভৃতি গজেন্দ্রকুমারের অগ্রণী হইতেন। গজেন্দ্র বিজয়ী হইয়াছেন নাম-মাহাত্ম্যে।'

অতঃপর গজেন্দ্রের ওপর বেশ ক'টি আঁচড় কেটে একেবারে নিরপেক্ষ উপসংহার টানলেন :

"গজেন্দ্রের গ্রন্থখানিকে 'কল্‌কা তারকা ছেই' (The book deals with machines and wires - কল ও তার বিষয়ক) ধরিয়া লইয়াই বিচারকেরা রায় দিয়াছেন। বনফুলের 'জলতরঙ্গ' সাবমিটেড হইলে 'জ্বলতা রঙ'(The paint is burning-iO R¡j‡Q) এই নাম-মাহাত্ম্যে গজেন্দ্রের বইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে পারিত।"

এই গুরুত্বপূর্ণ বিশ্নেষণধর্মী সাহিত্য সংবাদ শনিবারের চিঠি, অগ্রহায়ণ ১৩৬৬ সংখ্যায় প্রকাশিত।

চরম পাপিষ্ঠ সুধীন্দ্রনাথ দত্ত গুরুদেবের নারীসঙ্গ বাসনা নিয়ে কী কুৎসিত প্রবন্ধই না রচনা করেছেন! 'সুধীন্দ্রনাথের মতে রবীন্দ্রনাথ আর তাঁহার বৌঠান বেপরোয়াভাবে পরস্পরের প্রেমে পড়িয়াছিলেন। কেলেঙ্কারি ঢাকিবার জন্য অভিভাবকগণ রবীন্দ্রনাথের বিবাহের ব্যবস্থা করেন, কিন্তু অবস্থা ক্রমশই খারাপ হইতে লাগিল, অবশেষে রবীন্দ্রনাথের বৌঠান আত্মহত্যা করেন।... কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যাকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জড়াইয়া সেই যুগে মহর্ষি পরিবারের শত্রুগণ যে কুৎসা রটনা করিয়াছিলেন তাহারই পূর্ণাহুতি দিলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কবির শতবার্ষিক মহোৎসবে।'

সুধীন্দ্রনাথের ইংরেজি রচনাটি ত্রৈমাসিক 'কোয়েস্ট' পত্রিকায় প্রকাশের পর তিনি আর দীর্ঘায়ু হননি। শনিবারের চিঠি, জ্যৈষ্ঠ ১৩৬৮ সংখ্যায় সজনীকান্ত কলম ধরলেন :'কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত লোকান্তরিত হইয়াছেন। মৃতের সঙ্গে কোন্দল করা অশোভন। কিন্তু সুধীন্দ্রনাথ মৃত্যুর পূর্বে এমন একটি অপকর্ম করিয়া গিয়াছেন যাহার প্রতিবাদ না করিলে আমরা কোনদিনই নিজেদেরই ক্ষমা করিতে পারিব না।' বলাই বাহুল্য, মৃত্যুর পর সকলেই সজনীকান্তকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। বুদ্ধদেব বসু শনিবারের চিঠির গুরুত্বপূর্ণ এক টার্গেট। সজনীকান্ত দাস তাঁকে বাগে পেয়ে গেলেন। লিখলেন :

বুদ্ধদেববাবু পৌষের কল্লোলে একটা 'ছেলেমানুষী' করিয়াছেন। গল্পচ্ছলে একটা স্বীকারোক্তি করিয়া ফেলিয়াছেন। তিনি লিখিতেছেন-

'যে সব লোক ষোল বছর বয়েস হওয়া মাত্রই শাড়ির আঁচলের পেছনে ছুটে ছুটে হয়রান হয়ে পড়ে, সত্যি কথা বলতে কি, আমি নিজেও সেই শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত।'

Ever Twelve বুদ্ধদেববাবু চার বছর চুরি করিলেন কেন?

বুদ্ধদেব বসুর প্রতিভা (এ প্রতিভা মেধাজাত নয়, সুন্দরী স্ত্রী প্রতিভা বসু) নিয়ে সজনীকান্তের বিদ্রুপ ছিল সার্বক্ষণিক। বুদ্ধদেব বসু প্রগতিতে লিখলেন :

আমাদের দেশে আজকাল নবীনদের যে সাহিত্য প্রচেষ্টা চলছে, তার বিরুদ্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ গালিগালাজ ঈষৎ বিষাক্ত হুল বিশিষ্ট ভীমরুলের মত নানাদিক থেকে ছুটে আসছে এবং তার কেন্দ্র হচ্ছে একটি মাসিক পত্রিকা, যার নাম মুখে আনতে আমার কালো কলমও লজ্জায় লাল হয়ে উঠছে।

এবার সজনীবাবুর জবাব :

হায়রে 'শনিবারের চিঠি'র উদ্দেশ্য বুঝি বৃথা যায়! কি করিতে কি হইল! আমরা ভাবিয়াছিলাম, যদি কোনও রকমে বুদ্ধদেববাবুর বদনখানি লাল করিয়া তুলিতে পারি তাহা হইলে অন্ততঃ কিছুকালের জন্য তাহার admirer মহলে কিঞ্চিত পুলকসঞ্চার হয়। কালিমা শেষে কলমের ডগার উপর দিয়াই গেল।

সজনীকান্ত নিশ্চয়ই এখানেই যবনিকা টানবেন না। কবিতা পত্রিকার রচনা ও রচয়িতার বাপ-বাপান্ত করেও (বিষ্ণু দে? তার কবিতা নিশ্চয়ই বৈষ্ণবেরা বুঝবেন, জীবনানন্দ দাশ? সিঁড়ি দেখে যেমন কাশী চেনা যায় ধানসিঁড়ি কিংবা নির্জন পেঁচা দেখে নিশ্চয়ই জীবনানন্দকে চেনা যাবে) ক্ষান্ত হননি, সজনীকান্ত রীতিমত স্বপ্ন দেখে ফেললেন :

স্বপ্নে দেখিলাম, যিশু খ্রীষ্ট কলিকাতায় আসিয়াছেন, মোড়ে রসোমালাই খাইয়া এস্‌প্লানেডের আটচালায় মিনিট কয়েক দাঁড়াইয়া তিনি বাংলা সাপ্তাহিক মাসিক ও ত্রৈমাসিকগুলি দেখিয়া লম্বা লম্বা পা ফেলিয়া সোজা অক্টার্লনী মনুমেন্টের চূড়ায় গিয়া উঠিলেন এবং অকস্মাৎ তারস্বরে চিৎকার করিয়া গদ্য কবিতায় বলিতে লাগিলেন :

লাঞ্ছিত কর তাহাদের যাহাদের উন্মাদ প্রলাপ

তিন মাস অন্তর কবিতা হয়।

শূলে দাও তাহাদের যাহাদের অগ্রগতি

দুস্কৃতির নামান্তর।

করুণা কর তাহাদের যাহাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার

আঘাত কর তাহাদের যাহাদের বর্তমান ঝরঝরে।

বর্জন কর তাহাদের যাহাদের বাতায়নের অন্তরালে

বারাঙ্গনার মূর্তি।

ক্ষমা কর তাহাদের যাহাদের পূর্বাশায়

করাল ছায়া।

যিশু খ্রীষ্ট হিংস্র হইয়া উঠিয়াছেন। এ স্বপ্নের কোন মানে নাই।

শনিবারের চিঠির চাবুকে জর্জরিত সাহিত্যিকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুল ইসলাম তো রয়েছেনই, দু'চারজন রক্তাক্তও হয়েছেন।

শনিবারের চিঠি প্রথম বাজারে আসে সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে ১০ শ্রাবণ ১৩৩১। সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর যোগানন্দ দাস। ২৭ সপ্তাহ শনিবারের চিঠি নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। তারপর মাসিক শনিবারের চিঠি, তখন সম্পাদক নীরদ সি চৌধুরী, অটোবায়োগ্রাফি অব অ্যান আননোন ইন্ডিয়ান খ্যাত, পরে বিলেতবাসী। তারপর এলেন সজনীকান্ত দাস। নীরদ চৌধুরীর সাথে সজনী ছিলেন সহকারী সম্পাদক, কিন্তু দুজনের সম্পর্কটি সদ্ভাবের নয়, ল্যাং মারামারির। পরিমল গোস্বামীও পাঁচ বছর (১৯৩২-৩৭) শনিবারের চিঠি সম্পাদনা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সজনীকান্ত আর শনিবারের চিঠি সমনামিক (সিনোনিমাস) হয়ে আছে।

সজনীকান্ত স্বনামে হুল ফুটিয়েছেন; ছদ্মনামেও। ছদ্মনামা যাদের মধ্য দিয়ে সজনী হুল চর্চা করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন :গাজী আব্বাস বিটকেল, ভাবকুমার প্রধান, অরসিক রায়, গোলকচন্দ্র ধাঁধা, বটুক লাল ভট্ট, কেবলরাম গাজনদার, ক্ষীণেন্দ্র ধ্রুপদ গায়, অনুপ্রাস রঞ্জন সেন, গণদাস বণিক প্রমুখ।

মারি ত গণ্ডার লুটি ত ভাণ্ডার। শুরুটা এভাবেই। কবি জীবনানন্দ দাশগুপ্ত 'প্রগতি' ও 'ধূপছায়া'তে দুটি গণ্ডারমারী কবিতা লিখেছেন। ধূপছায়ায় প্রকাশিত ১৩০ লাইনের কবিতায় ৫৭টি 'মত' আছে, দ্বিতীয় পৃষ্ঠার ২৪ লাইনে ১৯টি 'মত'। প্রগতির কবিতায় ২০টি। মানুষের মত, নক্ষত্রের মত, মৃত্যুর মত, যোদ্ধার মত, সেনাপতির মত, সিন্ধুর মত, বর্ণের মত, বীণার মত, পাতার মত, পাখীর মত, শাখার মত, বাতাসের মত, অঙ্গারের মত... কিন্তু দুটি কবিতার একটিতে 'হাঁদার মত' উপমাটির যে প্রয়োগ হয়নি, সেই আফসোসই করেছেন সজনীকান্ত দাস।

'বিচিত্রা' পত্রিকা সম্পর্কে লিখা হচ্ছে :

বিচিত্রায় রবীন্দ্রনাথের দৌহিত্রের মৃত্যুতে শোকোচ্ছ্বাস পাঠ করিয়া আমরা বিস্মিত হই না, কারণ বিচিত্রা প্রবাসী নয়- সাহিত্যের নামে এমন কুৎসিত মোসাহেবী পেশাদার মোসাহেবদেরও কল্পনার অতীত। বিচিত্রা যে সাহিত্যিক পত্রিকা বলিয়া এখনও উল্লেখিত হয় ইহাই বাংলা ভাষাভাষীদের পক্ষে কলঙ্কের কথা।

বিচিত্রা এত অল্পতেই নিস্কৃতি পেতে পারে না। সজনীকান্ত আরও যোগ করলেন :

বিচিত্রার সম্পাদকীয় বিভাগ 'নানা কথা'। শ্রাবণের 'নানা কথা'য় 'দেশের কাজ ও বিশ্বভারতী' শীর্ষক প্রসঙ্গে যাহা লিখিত হইয়াছে তাহা বাতুলের প্রলাপ বলিয়া উড়াইয়া দিলেও মনের ক্ষোভ দূর হয় না। সাহিত্য সেবার নামে, পত্রিকা পরিচালনার নামে, এমন কদর্যতা যেখানে সম্ভব, একজন কবিকে দেবতা কল্পনা করিয়া মনুষ্যত্বের যে অবমাননা ইঁহারা করিয়াছেন তাহা মোহান্তদের ঘরেই সম্ভব। রবীন্দ্রনাথকে পূজা করিতে বসিয়া দেশকে এই কুৎসিত অপমান, এই জঘন্য মিথ্যাচার, দেশটা বাংলাদেশ বলিয়াই লোকে এমন অকুতোভয়ে করিতে সাহস করে।

আবার জীবনানন্দ দাশ- বাংলা কবিতার এই নিরীহ মানুষটিকে সজনীকান্তের শনিবারের চিঠি কতভাবে যে বিব্রত করেছে, তার একটি নমুনা :

কবি জীবনানন্দ (জীবনান্দ নহে) দাশকে আর ঠেকাইয়া রাখা গেল না। রসের যে তুরীয়লোকে তিনি উত্তরোত্তর উত্তীর্ণ হইতেছেন বুদ্ধদেব বসু অথবা সমর সেনের প্রশংসা সেখানে আর পৌঁছিবে না। জলসিঁড়ি নদীর ধারে যেখানে ধানসিঁড়ি ক্ষেত তাহারই পাশে জামহিজলের বনে তাহার মন এতকাল পড়িয়া ছিল। নাটোরের বনলতা সেন সেখান হইতে তাহাকে উদ্ধার করিয়া কাঁচাগোল্লা খাওয়াইয়া অনেকটা দুরস্ত করিয়া আনিয়াছিলেন। কিন্তু

কতক্ষণ থাকে শিলা শূন্যেতে মারিলে।

কতক্ষণ জলের তিলক রহে ভালে

- জাল ছিঁড়িয়া তিনি আবার ভাগিয়াছেন চিতাবাঘিনীর ঘ্রাণে ব্যাকুল ঘাই হরিণের মত। আর তাহাকে ফিরিয়া পাওয়া যাইবে না।

১৯১৩ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত 'ভারতবর্ষ' চালু ছিল। দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে ১৯৩৯-এ মৃত্যু পর্যন্ত ভারতবর্ষের সম্পাদক ছিলেন খ্যাতিমান জলধর সেন।

ডিএল রায়কে সম্পাদক করেই পত্রিকাটির যাত্রা শুরু। প্রথম সংখ্যাটির প্রুফ দেখার সময় ডিএল রায় অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন। তার পুত্র দিলীপকুমার রায় সঙ্গীতজগতের এক দিকপাল। তিনি যখন লেখায় হাত দিলেন শনিবারের চিঠি ক্ষেপে উঠল- "দিলীপকুমার রায় নিশ্চয়ই ভারতবর্ষের বড় শেয়ার-হোল্ডার নতুবা 'এতখানি অবিমিশ্র জঞ্জাল' একটি পত্রিকার কাঁধে চাপানো যায় না।

স্বর্গীয় দ্বিজেন্দ্রলাল কোন অসতর্ক মুহূর্তে পুত্রের ভবিষ্যৎ চিন্তা না করিয়াই না হয় এই পত্রিকার জন্ম দিয়াছিলেন। কিন্তু শুধু তাহার জোরেই কি পুত্র দিলীপকুমারের মাসে মাসে 'ভারতবর্ষে'র অতখানি সুফলা জমির উপর মৌরসী স্বত্ব জমিয়া যাইবে? আমাদের তো তাহা মনে হয় না। আরও কোন গুরু কারণ আছে।"

শনিবারের চিঠিতে প্রকাশিত সজনীকান্ত লিখিত সংবাদ সাহিত্যে রস ও কখনও কখনও নির্মমতারও ঘাটতি নেই। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে রচিত তার সংবাদ-সাহিত্য সংকলনভুক্ত করেছেন তারই পুত্র রঞ্জন কুমার দাস। এই নিবন্ধের গৃহীত এপিসোড/সজনী/টিপ্পনীগুলো 'শনিবারের চিঠি :সংবাদ সাহিত্য সংকলন'ভুক্ত।

বাংলাদেশের কটিয়াদী 'অজানা ভারতীয়' নীরদ চৌধুরীকে নিয়ে সজনী-টিপ্পনীটি উল্লেখ করতেই হয় (স্মর্তব্য, নীরদ চৌধুরী সজনীকান্তের বস ছিলেন, এই পত্রিকাতেই- শুরুতে নীরদ চৌধুরী তখন সম্পাদক এবং সজনীকান্ত তার সহকারী) :

দৈত্যকুলে যেমন প্রহদ্মাদ, ভারতকুলে তেমনই নীরদ সি চৌধুরী। ঠিক রাতারাতি নয়- অনেক নিশীথ রাত্রের সাধনায় তিনি ভারতবর্ষের মাটিতে ইংরেজ বনিয়া যাইতে সক্ষম হইয়াছেন। লঙ্কার বিভীষণের সঙ্গে তাঁহার তুলনা আরও লাগসই হয়। রাক্ষুসে দেশে ইনিই একমাত্র রামভক্ত, শুধু কালাপানি পার হইয়া ও-পার পর্যন্ত এখনও পৌঁছিতে পারেন নাই। বুদ্ধত্ব (ইংরেজত্ব) লাভের পর তিনি 'অটোবায়োগ্রাফি অব অ্যান আননোন ইন্ডিয়ান' লিখিয়াছেন। এই নামের আননোন কথাটি ব্যঙ্গার্থে প্রযুক্ত হইয়াছে, কারণ লেখক ভালই জানিতেন যে পুস্তকটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে 'আননোন ইন্ডিয়ান' 'নোন ইংরেজিনবিস' হইয়া খ্যাতি অর্জন করিবেন। হইয়াছেও তাহাই। গরু খাইয়া অনেক হিন্দু মুসলমান-সমাজে প্রতিষ্ঠা অর্জন করিয়াছেন। স্বদেশের বদনাম করিয়া নীরদ সি. চৌধুরীও ইংরেজ-মহলে খ্যাত্যাপন্ন হইলেন। সুতরাং ইনি যদি 'স্টেটসম্যানে' বাংলা-সাহিত্যকে হেয় প্রতিপন্ন করিবার চেষ্টা করিয়া থাকেন, তাহাতে অবাক হইবার কিছু নাই- যাহারা চেল্লাচিল্লি করিতেছেন, তাহারাই মূর্খ।

এমনি ছিলেন সজনীকান্ত দাস, এমনই ছিল শনিবারের চিঠির সাহিত্য সংবাদ। সজনীকান্ত ধারাল ছুরি কেবল লেখকদের শান দিতেন এমন নয়, চিত্রশিল্পী ও ভাস্করদেরও রেহাই ছিল না। ভাস্কর ও চিত্রকর চিন্তামণি কর লিখেছেন, শনিবারের চিঠিতে 'কষাঘাতি শিল্প-সমালোচনা' হত। তিনি লিখছেন :

'ভারতবর্ষ' পত্রিকায় অবনীন্দ্রনাথ-প্রবর্তিত শিল্পধারায় আঁকা রঘুবংশের ইন্দুমতির মৃত্যু বিষয়ক আমার একটি ছবির রঙিন প্রতিলিপি ছাপা হয় 'অজ বিলাপ' নামে। শনিবারের চিঠিতে লেখা হলো, ছবিটির নাম 'অজ বিলাপ' না হইয়া 'ছাগবিলাপ' হইলে ঠিক হইত।

ক্ষুব্ধ শিল্পী শনিবারের চিঠির দপ্তরে গিয়ে কৈফিয়ৎ চাইলেন। সজনীকান্ত বললেন, 'এর আবার কৈফিয়ৎ হয় না-কি! আমাদের ভালো লেগেছে, এ ছবি ভালো- এসব লিখলে কি কোন পাঠকের ছবিটি দেখবার ইচ্ছে জাগত? দেখুন না, ঐ ছাগবিলাপ কেন হবে সেই রহস্য বুঝতে এখন কত লোক আপনার অজবিলাপ, ভারতবর্ষ পত্রিকা নেবার পয়সা না থাকলেও পরের কাছে ধার নিয়ে দেখছে। আরে মশাই, আপনাকে ফেমাস শিল্পী করে ছাড়লুম আর আপনি কি-না রেগে টং। এখন বসে গরম চা খেয়ে মাথা ঠাণ্ডা করে ফেলুন।' (স্মৃতি চিহ্নিত, চিন্তামণি কর)

রবীন্দ্রনাথকে কম গাল দেননি সজনীকান্ত। কিন্তু তাঁর জীবনে অন্যতম কীর্তি রবীন্দ্রনাথ নিয়ে দুটি গ্রন্থ রচনা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তাঁর পথের পাঁচালীর কোন প্রকাশক পাচ্ছিলেন না, স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এগিয়ে আসেন সজনী। নিজেরও আর্থিক সংকট। এর মধ্যেই পাঁচজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পথের পাঁচালীর প্রকাশক হন এবং বিভূতিভূষণকে তিনশত পঁচিশ টাকা রয়ালটিও দেন। তারপর বিভূতিভূষণকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি (কলেজ স্ট্রিটে সত্তর বছর, সবিতেন্দ্রনাথ রায়)। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যও এভাবে নিজের কাঁধে বোঝা নিয়েছেন সজনীকান্ত দাস (১৯০০-১৯৬২)। এই সজনীই লিখেছেন :

খাল কাটিয়া বান ঢোকালে সরস্বতীর অন্দরে

এখন কেন নাক ডাকিয়া হাঁকছ, 'লাগে গন্ধ রে।'

বয়স-ভুলে করলে কি

টানলে কোলে সব মেকি!

ভিড়ল তোমার সোনার তরী হায়, বেনামি-বন্দরে।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত লিখেছিলেন 'মেঘনাদবধ-কাব্য'। সজনীকান্তকে তাই লিখতে হয়েছে 'মাইকেলবধ-কাব্য'। া



মন্তব্য করুন