কালের খেয়া

কালের খেয়া


আমার ছেলের গল্প

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০১৯     আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০১৯      

মূল ::পিটার হান্টকে।। অনুবাদ ::ফয়জুল লতিফ চৌধুরী

হঠাৎ করে কেউ আমাকে আমার নিজের ছেলে সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করলে তৎক্ষণাৎ আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়; তার সঙ্গে আমার মিল-মহব্বতটা এক লহমায় গুঁড়িয়ে যায়। এর চেয়েও খারাপ ব্যাপার হলো কেউ যখন আশা করে আমি তাকে আমার ছেলের গল্প শোনাব :'বলুন, ওর গল্প বলুন'- এমনতরো অনুরোধের ধরনটাই মেজাজ কড়কে দেয়। এই ঝামেলা থেকে পরিত্রাণের একটি উপায় হলো ওর সম্পর্কে ভয়ঙ্কর সব কথা বলা। বানিয়ে বানিয়ে ওর সম্পর্কে হিংসাত্মক গালগল্প তৈরি করা।

এমনকি ওর যখন বয়স অনেক কম তখন যদি ওর উপস্থিতিতে তৃতীয় ব্যক্তিকে ওর কথা বলতাম, তাহলে ও খুব মুষড়ে পড়ত, যেন ওর বাবা ওর সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করছে। ওর অনুপস্থিতিতেও আমার প্রায় একই রকম অনুভূতি হয় : আমি মনশ্চক্ষে পরিস্কার দেখতে পাই আমার ছেলে রাগে ফুলছে। নিজের ছেলের সম্পর্কে মুখ বন্ধ রাখার নীতিটার সূত্রপাত অনেকাংশে আমার মধ্য থেকে। অনেক আগে থেকেই আমার মনে হতো যে- সেটা আমার ছেলে রাগত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকুক বা না থাকুক- আমি যখন ওর কথা বলছি সেটা এক ধরনের পরচর্চার বই কিছু নয়।

আমিও কোনো বাবা-মাকে তাঁদের সন্তান সম্পর্কে প্রশ্ন না-করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে থাকি। যদিবা কখনো সৌজন্যের খাতিরে বা অনবধানবশত কিছু জিজ্ঞেস করেই ফেলি, তৎক্ষণাৎ তাদের সম্ভাব্য উত্তরের ব্যাপারে আমার মধ্যে অনীহা তৈরি হতে শুরু করে। তারা মুখ খোলার আগেই আমার ভেতর বিবমিষা পাকিয়ে ওঠে। কখনো-কখনো আমি খুব অবাক হয়েছি যে, তারা সোৎসাহে আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে এমনকি সেটা যদি কোনো মন্দ খবরও হয়। মনে হয় : কোনো কোনো বাবা-মা আছেন সন্তানের ব্যাপারে কথা বলার সুযোগ পেলেই কেবল যাদের বাকশক্তি খলবলিয়ে ওঠে। যদি তা না-ই হয় তবে ছেলেমেয়েদের প্রসঙ্গ এলেই তাদের কণ্ঠস্বর সাধারণ কথাবার্তার ধরন থেকে বিজয়বার্তা ঘোষণার উচ্চস্বরে পরিণত হবে কেন?

নিজের ছেলের ব্যাপারে কাউকে কিছু না-বলার আমার যে আপ্ত সিদ্ধান্ত সেটা কোনো সর্বজনীন নীতি মেনে চলে না। এটা কি একটু বাড়াবাড়ি না যখন কেউ আমাকে আমার ছেলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে ওর প্রথম নামে সম্বোধন করে? যেমন, 'ভালেন্তিন আজকাল কেমন করছে?'

ব্যাপারটা অবশ্য সম্পূর্ণ অন্যরকম যখন আমার অন্য কোনো আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে কিছু বলার প্রশ্ন আসে, যদিও কেউ আমাকে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে না। তখন আমি এ বিষয়ে কখনো-কখনো খুব স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কথা বলি এবং এমন একটা ভঙ্গিতে কথা বলি যেন অনেকগুলো কণ্ঠস্বর মিশে গেছে। আমি নিশ্চিত, আমার ছেলে আমার এ ভঙ্গিটা কেবল মেনেই নেবে না, এ বিষয়ে নিজ মনোভঙ্গিরও সমর্থন পাবে। আমার মধ্যে এই ধরনের গল্প বলার একটা বাতিক রয়েছে; তবে এর বহিঃপ্রকাশ বিরল; তার কারণ হলো আমার সামনে হয়ত কোনো বেঠিক শ্রোতা বসে আছে কিংবা সময়টা খুব যুৎসই নয় ('বেঠিক শ্রোতা' বলে কি কিছু আছে?)।

আবার লিখে গল্প বলার বিষয়টা সম্পূর্ণ আলাদা। প্রথমত এখানে কোনো নির্দিষ্ট শ্রোতা নেই; পাঠক আর আমার মধ্যে আমার কণ্ঠস্বরের হস্তক্ষেপ নেই; উপরন্তু কেবল সঠিক মুহূর্তে মুখ খোলার বাধ্যবাধকতাও অনুপস্থিত। এ সময় গল্পগুলো খুব সাবলীলভাবে চলে আসে যেখানে মুখে গল্প বলতে পারা নিছকই সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমার যা স্বভাব তাতে লিখিতভাবে গল্প বলাটা খাপ খেয়ে যায় বিষয় যাই হোক না কেন; এমনকি সেটা যদি আমার ছেলেকে নিয়েও গল্প হয়।

সারাজীবনে অসংখ্যবার এ রকম ঘটনা ঘটেছে যে, আমি একটা কোনো গল্প বলার জন্য মুখ খুলেছি অথচ শ্রোতাদের খুব একটা মনোযোগ দিতে দেখিনি; বরং তারা অসম্পৃক্ত বোধ করেছে এবং তাদের মজাটাই মনে হয় নষ্ট হয়ে গেছে। কোথায় গেল রসটা যেটা আমি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি? তবে যখন আমি লিখেছি আর পাঠক তা পড়েছে, বিষয়টা অন্যরকম হয়ে গেছে।

এ বছর যখন আমার ছেলে দক্ষিণ-পূর্ব ইয়োরোপ ভ্রমণ করতে গিয়েছিল, একা, এই প্রথমবার আমি তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করিনি। তবে 'সে কোনো অঘটনে পড়বে না'- কোনো এক মুহূর্তে এ কথা ভেবেই আবার আমার মধ্যে একটা অস্বস্তি দেখা দিয়েছে।

কিন্তু এ কথাটা সত্য যে, আগের বছরগুলোতে যখন আমি ভাবছিলাম বিপদে পড়ে যায় কি-না তখন তাকে নিয়ে আমার আটপৌরে দুর্ভাবনাগুলো উবে গিয়েছিল; পরিবর্তে একটা স্বস্তির অনুভূতির সঞ্চার হয়েছিল। সম্প্রতি যখন সে নানা বড় ধরনের বিপদাপদে জড়িয়ে পড়তে লাগল তখনই কি আমার ওকে নিয়ে অর্থাৎ আমার ঘনিষ্ঠতম আত্মীয়কে নিয়ে আমার দুশ্চিন্তার প্রবণতাটা নিস্তেজ হয়ে পড়েনি? আর ওকে নিয়ে যদি আমি দুর্ভাবনা না-ই করি তবে আমি ওর কে?

একটা দুর্ঘটনার কথা বলি। সেবার শহরের এক প্রান্তে সে কারও গাড়িতে রাইড নেওয়ার জন্য রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। একটা মোটরসাইকেল পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ওকে মাটিতে আছড়ে ফেলে টেনে নিয়ে যায়। দ্রুত সাহায্য না-এলে হয়তো অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সেদিন ও মারাই পড়ত। হাড় গুঁড়ো হয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা ছেলেকে রেখে আমি যখন মধ্যরাতে বাড়ি ফিরলাম- রাতের ওই গভীর সময়ে আমি খুব নিশ্চিত ও কৃতজ্ঞ বোধ করলাম এই ভেবে :যাই হোক শেষ পর্যন্ত এখন সব কিছু ঠিকঠাক। অথচ আমার জীবনের একটা অংশ ঝরে পড়ে গিয়েছিল- একটা অংশ যার আর কোনো উপযোগিতাই নেই। কেবল একজন বয়স্ক মানুষই ওরকম অবস্থায় ফুরফুরে, অবিচলিত থাকতে পারে। যাই হোক, ওই মুহূর্ত এবং পরবর্তী সময়গুলো ... যখন আমার ছেলের জীবন রীতিমতো সংশয়াপন্ন- আমার মধ্যে একটি পরিমিতিবোধ উপ্ত করেছিল।

এটা বলা পুরোপুরি সঠিক হবে না যে, ওর যুবক বয়সের বাবাকে অনুসরণ করতে গিয়েই ভালেন্তিন ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছিল। আমি একটা গল্প লিখেছিলাম যা হয়তো অনুপ্রেরণা জুগিয়ে থাকবে। ওর মেয়েবন্ধুর পরামর্শেই- বলা ঠিক হবে তার নিদের্শেই- ও বইটা পড়েছিল। ও অবশ্য সাহিত্যের ক্ল্যাসিকগুলো ভালোই পড়ত এবং আমার সমসাময়িক লেখক যেমন ফিলিপ কোবাল থেকে কাজুও ইশিগুরো পর্যন্ত, এবং পেটার থ্রিনি ও ম্যাক্স গোল্টও পড়া ছিল। এখন বাইশ বছর বয়সে সে বেশ একজন পড়ূয়া- হাজার জনের মধ্যে একজন- কিন্তু ওই বয়সে আমিও কি ওরকমই ছিলাম না? উপরন্তু সচেতনভাবে বিরতি করে গল্পের মূলধারাটা হারিয়ে ফেলেছে এবং অনেক পরে নতুন করে শুরু করেছে যেন একটা ট্রাভেল গাইড ... যতটা না ব্যবহার করছে তার থেকে বেশি মিলিয়ে দেখেছে ('অনেক ভুল মনে হয় ইচ্ছে করেই করা')।

আর ভ্রমণের জন্য যে টাকা দরকার পড়েছে তার প্রায় সবটাই ওর নিজের উপার্জন। তরুণ-তরুণীদের নাইট ক্লাবে ডিস্কজকি হিসেবে কাজ করে এবং নিজের আঁকা প্রথম ছবি বিক্রি করে কিছু কামাই হয়েছিল। আমার বোনের এস্টেট থেকে কিছু আসত; কিন্তু সেটা এত নগণ্য যে, ওর কাছে সেটা দুর্লক্ষণ মনে হয়েছিল। ছেলেটা মাঝেমধ্যে এত কৃচ্ছ্র করে আমার কাছে মনে হয় এটা ওর একটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যেমন কি-না ওর সময়ানুবর্তিতা।

জানুয়ারির এক তুষারাচ্ছন্ন দিনে ট্রেনে করে লুবিয়ানাতে পৌঁছাল ভালেন্তিন; সেখান থেকে বাসে চড়ে নোভা গর্সিয়া। প্রথম প্রথম যুগোস্লাভিয়া ছিল গ্রিসে যাওয়ার পথবর্তী একটি দেশ মাত্র। ওর পূর্বপুরুষদের কাছে যেমন, যুগোস্লাভিয়া ওর কাছে শুরুতে তেমনই অকিঞ্চিৎকর প্রতিভাত হয়েছিল। বিদেশি ভাষার ব্যাপারে ওর আগ্রহ ছিল। স্লোভেনিয়ার সবকিছুকেই ও দরাজ দিলে গ্রহণ করেছিল সাহিত্য বাদে, যেন সাহিত্য একটা চাপিয়ে দেওয়া কোনো কিছু। সঙ্গীত সেটা লোকসঙ্গীতই হোক আর উনিশ শতকের রুশ সঙ্গীতই হোক, ওকে বিকর্ষণ করত। ওর মনে হতো, Parallel fifth-এর ধ্বনি ওর রক্ত চুষে নিয়ে যাচ্ছে।

যা হোক এখন আর ওর কিছু করার ছিল না চোখ-কান খোলা রাখা ছাড়া। পিতার সঙ্গে ওর বড় পার্থক্য ছিল এই যে খুব দায়সারাভাবে কোনো কিছু দেখলেও ও তার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো সঙ্গে সঙ্গে চিহ্নিত করতে পারত। আমি প্রায়ই এসব চিন্তা করতাম যে ও গবেষক হতে চায়, কিন্তু গবেষকের গুণাবলি কি ওর আছে? হ্যাঁ, যে কোনো ঘটনা পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিশক্তি ওর আছে কিন্তু কোনো কিছুই ওকে তেমন বিস্মিত করে না। অনেক বিষয়ই সে আমার চাইতে ভালো বোঝে কিন্তু ওর আবেগের জায়গাটা কোথায়? ওর স্বপ্নটাই বা কি?

আমার ছেলেটা বছরব্যাপী ভ্রমণের জন্য অনেক প্রস্তুতি নিয়েই বেরিয়েছিল; কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা সামলে নেওয়ার জন্য যা কিছু দরকার ও সব সঙ্গে নিয়েছিল। তবে ওর প্রধান ব্যাগের মধ্যে ছিল গ্রিক ভাষায় লেখা পিথাগোরাসের প্রাচীন একটা জীবনী। তাতে যন্ত্রপাতি এবং পরিমাপ যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে তেমন কোনো নির্দেশনা ছিল না। বরং কোনো ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে স্মৃতিতে গেঁথে ফেলার উপযুক্ত কৌশলের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ছিল। পিথাগোরাস বলেছিলেন তাঁর শিষ্যরা সকালে ঘুম থেকে উঠেই গতকালের যা কিছু শেখা সব একটু মনে মনে ঝালিয়ে নেবে; তারপর তার আগের দিনের যা কিছু। এই যে গত পরশুর কাহিনী কোনো সাহায্য ছাড়া কেবল স্মৃতির ওপর নির্ভর করে স্মরণ করা পিথাগোরাসের জীবনী লেখক লামব্লিকসের মতে এটাই 'পিথাগোরিয়ান ডকট্রিনের' নির্যাস।

কোনো ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে স্মৃতিতে গেঁথে ফেলার চেষ্টা ও কখনো উদ্দেশ্যমূলকভাবে করেনি। একবার সে আমাকে বলেছিল, যদি তুমি চাও কোনো কিছু তোমার মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে যাবে, তাহলে কোনো অবস্থাতেই তুমি তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে না; বরং তুমি এটা অতিক্রম করে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে যদিও মনোযোগ থাকবে এবং তার ফলেই তোমার স্মৃতিতে নির্ভরযোগ্য এবং স্থায়ীভাবে সেটা গাঁথা হয়ে যাবে।

ভালেন্তিন যা করত সেটা হলো, কোনো একটা কিছু ঘটার পরেই ও ঘুমিয়ে পড়ত আর ঘুম থেকে উঠেই ঘটনাটা স্মরণ করত। আর দ্বিতীয়বার ঘুম থেকে উঠে সে ওই ঘটনাকে যেন পরিস্কার দেখতে পেত। এটা কি স্বপ্ন হিসেবে যথেষ্ট না? শীতের মধ্যে অপরিচিত একটি দেশে বাস-ভ্রমণের সময় অল্প সময়ের জন্য দু'দফা ঘুমিয়ে নেওয়া উপযুক্তই বটে।

বাসে করে ভ্রমণের বিবরণীতে ও কম কথাই জানিয়েছিল। তার মধ্যে একটা হলো ভ্রিনিকাতে স্বল্পসময়ের বিরতির সময় কীভাবে ওর নাক ঠাণ্ডায় জমে গিয়েছিল। বলেছিল, পথের ধারের গাছগুলো একেকটি একেক রকমের ধূসর। ধূসরতার হাজার রকমফেরের কথা ও উল্লেখ করেছিল। এটা নিয়ে পরবর্তীকালে বসন্তে লেক অরিদে অবস্থানের সময় ও একটা লেখাও শুরু করেছিল। শিরোনাম :'ধূসরতার নানা বর্ণ প্রসঙ্গে পর্যবেক্ষণ'।

বাসযাত্রার এক পর্যায়ে তুষারপাত হতে লাগল- ঠাণ্ডা খুব বেশি ছিল বলে এতক্ষণ তুষার পড়েনি। আরও পরে আদ্রিয়াতিক সাগরের উপকূলবর্তী নিম্নভূমিতে পৌঁছানোর পর বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বাস যখন নোভা গর্সিয়াতে পৌঁছাল তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত্রি হয়ে গেছে; ... উষ্ণ বাতাস বইতে শুরু করেছে, পামগাছের বনে ফড়ফড় শব্দ উঠছে। বাসস্টপ থেকে বেরিয়ে যাত্রীদের সবচাইতে বড় দলটা সঙ্গে হাঁটা শুরু করল ভালেন্তিন। আমি যেখানে ছিলাম সেই ঠিকানাটা ওর কাছে ছিল।

গ্রামীণ মানুষের সন্তান হলেও ওর মধ্যে গ্রাম্যতার কোনো ছাপ ছিল না। আমার মোটাসোটা আঙুল; ওর আঙুলগুলো ছিল সরু, দীঘল এবং অদ্ভুতভাবে নমনীয়। আমার মনে হয় না ওর বাবার হাতে যে শত-শত ক্ষতচিহ্ন রয়েছে সেগুলোর একটিও ওর হাতে কোনো দিন দেখা যাবে। আমার ঘাড় ছোটোখাটো যদিও ওর গ্রীবাদেশ লম্বা এবং সোজা ... ক্লান্ত হলেও ওর মাথা কখনো একদিকে কাত হয়ে পড়ত না যেমন আমার হয়। কিন্তু একই সঙ্গে ভালেন্তিনের পা ছিল আমার চাইতে বড়।

যাত্রার প্রথম মাসে ও কোনো কিছুরই খুব গভীরে সচরাচর প্রবেশ করত না। কখনো কখনো ওকে পেয়ে বসেছিল একাকিত্ব। আবার আমার মতো বা আমার প্রজন্মের অনেকের মতো বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং একাকিত্ব ওকে কোনো উচ্চকিত বাস্তবতাবোধ দেয়নি। জীবনে প্রথমবারের মতো ও আবিস্কার করল একটি সম্পূর্ণ অজানা বিদেশভূমি। কিন্তু তাতে তেমন যায় আসে না, কেননা সেখানে গিয়েছিল ও কোনো প্রয়োজন ব্যতিরেকেই। এটা ওর পৃথিবী নয়, ইয়োরোপ নয়। বলকানদের সম্পর্কে ওর সামান্যতম পূর্বধারণা ছিল না, এখানে এসেও কোনো ধারণার জন্ম হলো না। একটু বড় শহরগুলোতে জনমানুষের জমায়েত পরিব্রাজককে উদ্দীপ্ত করে; কিন্তু আমার ছেলের জন্য এ রকম কিছু ছিল না। ওর জন্য পৃথিবী ছিল নিজ দেশে মাথা গোঁজার আস্তানাগুলো। কিন্তু তাই বলে ফিরে যাওয়াও সম্ভব ছিল না। দেশে ও লোকজনদের এই ভ্রমণের কথা বলে এসেছিল এবং ভ্রমণ শেষ না-করে ফিরে গেলে ও তাদের কাছে কী করে মুখ দেখাবে? তবু প্রথম প্রথম প্রতিদিন সকালে উঠে সে যেদিক থেকে এসেছে বাসে চেপে, সেদিকে একটু ঘুরে আসত। ওর মনে হতো বাস থেকে নামবে না ... উত্তর দিকেই ফিরে যেতে থাকবে, ভ্রমণের ইতি টেনে পালিয়ে যাবে নিজস্ব পৃথিবীতে।

আমার যৌবনে অস্ট্রিয়া আমাকে খুব ভুগিয়েছিল। এ শব্দটা আমি ভেবেচিন্তে ব্যবহার করেছি। পরবর্তীকালে দেখতে পেয়েছি আমি একা না অনেকেই ছিল এ রকম ভোগান্তির শিকার। হ্যাঁ, আমরা অস্ট্রিয়ার ভোগান্তির শিকার হয়েছিলাম এবং আমার মনে হয় একজন জার্মান যেভাবে জার্মানির ভোগান্তির শিকার হয় তা থেকে আমাদের অভিজ্ঞতা ছিল আলাদা। আমাদের ভোগান্তি ছিল সারাজীবনের জন্য। ভালেন্তিন অনেকদিন যাবত অস্ট্রিয়াতে বসবাস করছিল যদিও তবু খুব কম জায়গা ছিল যেখানে যেতে ও পছন্দ করত। কিন্তু ওই কয়েকটি জায়গাই দেশ হিসেবে ওর জন্য যথেষ্ট ছিল। আমি যখন ওকে দেখতে যেতাম ... যদি সে আমাকে ওই সব জায়গায় নিয়ে যেত ... আমি ওর আকর্ষণের মূল বিন্দুগুলো আবিস্কার করতে চাইতাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম : ও চাইত ওর আগ্রহের বিষয়গুলো সম্বন্ধে আমার অনুমোদন থাকুক।

ওর বেশিরভাগ সময় কেটেছে শহরতলিতে বাবার সঙ্গে; এটা সে মেনে নিয়েছিল। ভিয়েনাতে কখনোই সে প্যারিসের মতো শহরতলির সন্ধান করেনি যেটা আমি করেছিলাম। ব্যক্তি হিসেবে ওর যে বিষয়টা আমাকে চমৎকৃত করে, তা হলো ও কোনো স্থায়ী ঠিকানার পত্তন করতে আগ্রহী ছিল না; বরং এখানে-সেখানে বিভিন্ন আস্তানায় জীবনটা পার করে দিতে আপত্তি ছিল না আদৌ। শহরের কেন্দ্রে বা বাইরে নয় বরং এ দুয়ের মধ্যবর্তী কোনো স্থানে ও আস্তানা গাড়তে ভালোবাসত। আমি কোনো কোনো জায়গায় হেঁটে বেড়াতে যেতে বিশেষভাবে পছন্দ করি, কিন্তু এটাও ওর কাছে প্রাসঙ্গিক কোনো বিষয় নয়, ছিল না। কিন্তু যখন সে এক আস্তানা থেকে আরেক আস্তানায় সরে যেত, সে এত দ্রুত হাঁটত যে, আমি ওর সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে পারতাম না।

শীতার্ত কয়েক মাসের বিষণ্ণতা কেটে গেল যখন সে গ্রিসে এসে পৌঁছাল। যুগোস্লাভিয়া ছিল শুধু একটা রাস্তা এবং তার বিপরীত দিক। এখানে অসংখ্য সম্ভাবনার দ্বার খুলে গেল। অবশ্য পরের দিনই খুব ঠাণ্ডা পড়েছিল। কিন্তু ওর বাবার যুগোস্লাভিয়ার চাইতে গ্রিসের ফ্লোরিনাতেই ও বেশি উষ্ণ বোধ করেছিল। ও আমাকে লিখে জানিয়েছিল :ওই যুগোস্লাভিয়া ঠিক ওর দেশ নয়, এখন অন্তত নয়, হয়তো পরে হবে কোনো দিন। ... বস্তুত ওইখানের মানুষগুলো সম্পর্কে ওর মনে ভালো ধারণা তখনও সৃষ্টি হয়নি।

ইস্টারের আগের দিন সে চলে গিয়েছিল থেসালোনিকিতে। অনেকদিন পরে ও এমন একটা জায়গায় এলো যেখানে আমার পদচিহ্ন ছিল ... আমার গল্প 'অজ্ঞতার পাথর'-এর নায়ক এখানে এসেছিল। এখান থেকে আবার শুরু হলো বাসভ্রমণ, পর্বতমালার ধার ঘেঁষে, আবার দীর্ঘ তুষারাচ্ছন্ন যাত্রা যেটা উপকূলবর্তী এলাকায় রাত্রিকালীন বৃষ্টিতে আক্রান্ত হয়।

কল্পনা আমার ছেলেকে দিকভ্রান্ত করতে পারে না। কল্পনা ও রেখে দেয় স্বপ্নের জন্য। যখন থেসালোনিকির নিকোলাস অরফানসো গির্জায় ইস্টারের উৎসব তুঙ্গে, তখন হঠাৎ করে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল অনাবৃত মেঝের ওপরে। আবার একটু পরেই উঠে বসলো। এই নিদ্রা এবং পিথাগোরাসের গতকালের-আগের দিনে তলিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে যা ঘটল তা খুবই খারাপ যত খারাপ হতে পারে ততটাই। কোথাও ওর ঠিকানা নেই, ওর কোনো বাবা নেই, ওর কোনো মা নেই, কোনো দিনই ওর বাবা-মা ছিল না। কেউ ছিল না যার সাহায্য ও চাইতে পারে। পৃথিবীটা শত্রুভাবাপন্ন শয়তানের আখড়া। এতদিন পর্যন্ত ও কোনোভাবে এদের খপ্পর থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে। যেন ঘুমের মধ্যে সে হাঁটছিল এতকাল, কিন্তু এখন সেই পর্ব শেষ।

এই হলো পুরো গল্পটা। আমার ছেলের একমাত্র গল্প। ও কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল; হয়তো-বা সবসময় হারিয়েই ছিল। কিন্তু এখন ও সেটা বুঝতে পারে। আর এক মহাদেশ দূরে ... আমার এই পড়ার ঘরে, আমার এই পড়ার টেবিলে বসে পাশের বাড়ির উঠোনে এক ছোট্ট শিশুর কান্নার চিৎকার কানে আসে। তখন অনেক দূরে আমার প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেটির ফোঁপানোর শব্দ আমি শুনতে পাই।

ভালো, ভালো। জীবনটা তো এ রকমই এবং তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, আমার আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে যাদের আমি সবচেয়ে কম জানি, সে হলো আমার সন্তান। আমার ছেলে সম্পর্কে ধরতে গেল আমি কিছুই জানি না।

[সংক্ষেপিত, অনেকাংশে ভাবানুবাদ]