কালের খেয়া

কালের খেয়া


নিজের মুদ্রাদোষে

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০১৯      

শোয়াইব জিবরান

সকল লোকের মাঝে বসে 
আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা?
-বোধ, জীবনানন্দ দাশ

প্রকৃতিতে নিজেকে প্রকাশের তীব্র বাসনা আছে প্রায় সকলেরই। ফুল তার রঙ আর সুবাস ছড়িয়ে ভ্রমরকে আকৃষ্ট করতে চায়, মৌমাছিও ফেরোমেন ছড়িয়ে আকৃষ্ট করতে চায় শক্তিমান পুরুষ মৌমাছিকে, ময়ূর পেখম মেলে কি শুধুই বৃষ্টি আবাহন-উদযাপন করতে চায়, নাকি অন্যকিছু, সে প্রসঙ্গে না গিয়েও বলা যায় পাখি সমাজে প্রেম প্রকাশের তীব্র বাসনা দেখতে পাই বাবুই পাখির। সে তার সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করতে কত খড়কুটো দিনের পর দিন মুখে তুলে নিয়ে সুন্দর বাসা বানায়, যাতে তার সঙ্গীটি সে শিল্পকর্মে মুগ্ধ হয়ে একত্রে বাস করতে সম্মত হয়। আর মানুষ? 

এ কথা বলা হয়, মানুষের সভ্যতার সবচেয়ে বড় তিনটি আবিস্কার হচ্ছে- আগুন, চাকা আর ভাষা। এর মধ্যে ভাষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কার। কেননা, এই ভাষা আবিস্কারের ফলে মানুষ পৃথিবীতে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। না হলে পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় প্রাণী নীলতিমি আর পানির পরিমাণও যেহেতু  ভূমির চেয়ে বেশি- সাম্রাজ্য করার কথা ছিল তারই; এক সময় যেমন ডায়নোসর করেছে। কিন্তু মানুষ যেদিন ভাষা আবিস্কার করল, সেদিনই সে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের উপায় পেয়ে গেল। কেননা, ভাষার মাধ্যমে সে তার জ্ঞানকে অন্যের সাথে বিনিময় করতে পারে, সংরক্ষণ করতে পারে এমনকি পারে পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও রেখে যেতে। সে ভাষা আবিস্কারের বয়সও কয়েক হাজার বৎসর পার হয়ে গেল। ততোদিনে এ ভাষাব্যবস্থাটি হয়ে উঠেছে কত সমৃদ্ধ আর শক্তিশালী। তারপরও ভাবুন, একজন মানুষ যখন প্রেমে পড়ে- তার ভাবটি আরাধ্যজনের কাছে জানাতে চায়, তখনে সে ভাষাটির শক্তিও কত সীমিত হয়ে যায় তার কাছে। কেমনে বলিব তারে ভালোবাসি?

ফুল, পাখি বা মৌমাছির প্রকাশটি প্রকৃতি নির্ধারিত। কিন্তু মানুষের প্রকাশ তার স্বনির্ধারিত। ভাষাটি তার নিজের। ফলত কোনো তীব্র আবেগ প্রকাশে তো বটেই যে কোনো প্রকাশেই মানুষের সামনে প্রশ্নটি দাঁড়ায়- কী বলব, কীভাবে বলব? কী বলব সেটা পরিস্থিতি, প্রয়োজনই ঠিক করে দেয়। কিন্তু কীভাবে বলব সেটি মানুষের একেবারেই নিজের শিল্প কৌশল নির্বাচন। ভাব জাগলেই মানুষ প্রথমেই ভাবে, কীভাবে বলব? এ বলার ভঙ্গি নির্বাচনের, ঠিক করার মাধ্যমেই ঠিক হয়ে যায় বক্তার ব্যক্তিত্ব, স্বাতন্ত্র্য। 

একাকী গহন বনে প্রশ্নটা আদি কবির মনেও জেগেছিল- এ বেদনা বাক্য লইয়া আমি কী করিব? নারদ তাকে বলেছিলেন, তুমি আখ্যান কাব্য রচনা করো। বাল্মীকি সত্যযুগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তার ভাগ্য ভালো। বিপদে পড়লে ঐশী বাণী আসত। অখনে সে সকল দিন নাই। আপনার বিপদ আপনার। থুতনির কাছেও শুধাবার জো অবধি নাই। 

ফলত এ বিপদে বিশ শতকের আধুনিক কবি জীবননান্দ পড়েছিলেন। তাঁর সময়ে রবীন্দ্রনাথ আকাশে জ্বলোজ্বলোমান। নজরুল ধূমকেতুর জুৎসই উপমার মতোই বিদ্রোহের আগুন নিয়ে কবিতায় উপস্থিত হয়েছেন। তখনে জীবনানন্দ কোন ভাষা, কার ভাষা নেবেন? তিনি ঘোষণা করলেন, 'কেউ যাহা জানে নাই- কোনো এক বাণী-/আমি বহে আনি;/একদিন শুনেছ যে-সুর-/ফুরায়েছে,-পুরনো তা-কোনো নতুন-কিছুর/আছে প্রয়োজন,/তাই আমি আসিয়াছি,- আমার মতন/আর নাই কেহ।' সন্দেহ নেই তার প্রথম সেই কাব্যগ্রন্থ নজরুল প্রভাবিতই ছিল। আলাদা হতে তাঁরও ঢের সময় লেগেছিল। 

অখনে ঘোর মুদ্রাকাল। মানুষ মুদ্রার, শুধুমাত্র মুদ্রার জন্য ছুটছে। জগতে  ইহা ভিন্ন আর কোনো কড়কড়ে কৃষ্ণ, আরাধ্য দেবতা নাই। তবুও ঘোরে, আফরায় পাওয়া মানুষ মুদ্রার সাধনায়। মুদ্রা মানুষ ভালোবাসে। কিন্তু মুদ্রাদোষ? মুদ্রাদোষ মানুষ নিন্দার্থেই বলে। কোনো মানুষই চায় না তার মুদ্রাদোষ থাকুক। সে হোক সামান্য নখ বা নাক খুঁটার। অথচ শিল্পসাহিত্যে মানুষ এই মুদ্রাদোষ অর্জনেরই সাধনা করে। নিজস্ব মুদ্রা। নিজস্ব শৈলী। 

বিজ্ঞান বলে, পৃথিবীতে বস্তুর পরিমাণ ধ্রুব। এর কম বেশি বা বিনাশ নাই। শুধু রূপান্তর ঘটতে পারে। এক বস্তু অন্য বস্তুতে রূপান্তরিত হতে পারে। কিন্তু তার পরিমাণ মহাবিশ্ব সব সময়ই সমান। আর রুশ ফর্মালিস্টরা বলেন, সাহিত্য হলো টেকনিকের ইতিহাস। তার মানে তারা বলছেন- ভাবগুলো সব সময়ই এক রকমই ছিল- নতুনত্ব হচ্ছে সব প্রকাশের ভঙ্গিতে। 

শিল্পসাহিত্যে প্রকাশের ভঙ্গিটি কীভাবে নির্ধারিত হয়? কেউ কেউ বলেন, ভাবই ভঙ্গিকে ঠিক করে। এ বিষয়ে সাধারণ ধারণা হল তীব্র আবেগ আক্রান্ত ব্যক্তিক আবেগ, মন্ময় উপলব্ধি সাধারণত গান বা কবিতার আকারে, আর যৌক্তিক বক্তব্য গদ্যে প্রকাশ করা হয়। এগুলো উপরিতলের কথা। তার গভীরতলে আরও কথা আছে তা না হলে চিত্রকলায় কীভাবে ঠিক হয় রঙ, রেখা ও ক্যানভাসের পরিসর? কবিতায় কীভাবে ঠিক হয় গীতিকবিতা আর মহাকাব্য? গদ্যে প্রবন্ধ, গল্প আর উপন্যাস? তারই ভেতরের প্রশ্ন কীভাবে নির্ধারিত হয় সে আকরণগুলোর প্রকাশভঙ্গি-ভাষা?

আমরা এ সবগুলো প্রশ্নের উত্তর সরাসরি দিয়ে দিতে পারবো না। আমরা শুধু নিজের অভিজ্ঞতাটির গল্প পাঠককে  শোনাতে পারি। তাতে হয়ত পাওয়া যাবে কিছু কিছু উত্তর। 

০২.

যেমনটি হয় বালক বয়সে, কবিতা দিয়েই শুরু। প্রশ্ন জাগবে, কবিতা দিয়ে কেন? সংরূপটি আবেগই ঠিক করে দিয়েছিল। আশির দশকের উপান্তে, কোন ক্লাসে পড়ি? অষ্টম বা নবম। গোঁফ সবে গজাতে শুরু করেছে। মফস্বলের স্কুল, ভরদুপুর, বাইরে ঘুঘু ডাকছে। একদম সেই গানের মতো- 'ঘুম ঘুম ক্লাশ রুম/পাশে খোলা জানালা/ডাকছে তোমাকে দূরের আকাশ।' সেই ক্ষণে কালীপ্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্লাসরুমের গমগম আওয়াজ এড়িয়ে ক্লাসের বাইরে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিমুলগাছটি আমাকে আক্রান্ত করে। ঠিক কী লিখেছিলাম মনে নেই। কিন্তু অখনে অনুমান করি সেটি নিশ্চয় আহসান হাবীব বা শামসুর রাহমান ধাঁচের কোনো কবিতাই হবে। কলেজ অবধি সে ধারার কবিতাই রচনা চলে। কেননা, তখনে আধুনিক বাংলা কবিতা বলতে মফস্বলে শামসুর রাহমানই নমুনা। কলেজ জীবনে এর সাথে যুক্ত হয় নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজ এমনকি মোহন রায়হানের কবিতার পাঠ। তখনে এরশাদবিরোধী শিল্পসাহিত্য আন্দোলন তুঙ্গে। ৭১-এর পর কবিতা আবার রাজনীতিলগ্ন হতে শুরু করেছে। ফলত সে সকল কবিতাই অধিক প্রিয় হচ্ছে তরুণদের কাছে, যেগুলোর ভেতর দ্রোহ আছে, উদ্দীপনা আছে। সে সময়ে বাম রাজনীতিলগ্নতার কারণেও এ রাজনীতিমুখী লেখাগুলোই অধিক পাঠ অভিজ্ঞতায় আসছে। কবিতার এ ঘোরলাগার প্রাথমিক দিনগুলোতে চিন্তার জগৎ খানিকটা জাগ্রত হয় দুজন মানুষের সংস্পর্শে এসে। তার একজন ড. সফিউদ্দিন আহমদ আর অপরজন কবি দিলওয়ার। সফিউদ্দিন মানুষের জন্য শিল্পধারার চিন্তার লেখক। আর দিলওয়ার খানিক উল্টো- অনেকটাই কলাকৈবল্য ধারার কবি। অর্থাৎ শিল্পের জন্য শিল্প। এ দুই বিপরীত ধারার মানুষের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসার ফলে বিষয় চিন্তার ক্ষেত্রে দ্বিমুখী ধারার চিন্তার একটি অভিঘাত নিজের মধ্যে সৃষ্টি হয়। আর সবচেয়ে বড় অভিঘাত ঘটে তাঁদের মাধ্যমে বিপরীত ধারার চিন্তার লেখকদের বই পড়ে। একই সাথে কার্ল মার্কস আর পুশকিন অপরদিকে সার্ত্রে নিৎসে। ফলত চিন্তার জগতে আলোড়ন ঘটে। কিন্তু প্রকরণ সচেতনতা তখন অবধি আসেনি। এ ধাক্কা খাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে। মফস্বলে যে ছেলেটি পুরোদস্তুর কবি লেখক হয়ে উঠেছিল, ঢাকায় এসে সে ছেলেটি আবিস্কার করে সে অচল পদ্য লেখে। তার পদ্যগুলো অচল হওয়ার মূল কারণ প্রকরণ। আজিজ মার্কেট তখন অবধি নির্মিত হয়নি। মাত্র একতলা উঠেছে। ছাদ ঢালাই হয়েছে। এরই মধ্যে আমাদের সবার কাছে পরিচিত বিজু ভাই পাঠক সমাবেশ এক কোণায় শুরু করেছেন। ফকিরাপুল থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেখানে না গেলে পেটের ভাত হজম হয় না। সেখানে গিয়ে ভাগ করে ছোলামুড়ি খাওয়া হয় আর আস্তে আস্তে এ বুঝ আসে যে, বিষয় নয়, প্রকাশভঙ্গির কারণেই আমার এত দিনের লেখাগুলো অচল। এ বিষয়ে প্রথম মন্তব্য করেন নাট্যকার সেলিম আল দীন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির মৌখিক পরীক্ষায়। তিনি আমার কবিতাগুলোর ঝাঁপি থেকে নিয়ে সে পরীক্ষা কমিটির সামনেই আমার কবিতা পড়ে অন্যদের শুনিয়ে বলেন, ওর কবিতাগুলোর বিষয় শক্তিশালী। কিন্তু প্রকাশভঙ্গি পুরাতন। তাঁর এ মন্তব্য আমাকে ধাক্কা দেয়। চূড়ান্ত ধাক্কা খাই শাহবাগের এক লিটলম্যাগাজিন সম্পাদকের কাছে। তিনি কবিতা পড়ে বলেন, আপনার লেখা আমাদের টেম্পোর সাথে যায় না। এটা আমাকে আহত করে। তখনে মফস্বলের সে মানের নয়, এই সম্পাদকের মানের একটি লিটলম্যাগাজিন প্রকাশের জেদ চাপে। 'শব্দপাঠ' প্রকাশের চিন্তা এখান থেকেই। এ শব্দপাঠ প্রকাশ করতে গিয়ে লেখালেখির চিন্তাটি নতুন মোড় নিতে শুরু করে। প্রকরণ সচেতন হয়ে উঠতে শুরু করি। তখনে শাহবাগের লিটলম্যাগাজিনের জগতে প্রবল অহংকার নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে গাণ্ডীব, পেঁচা, প্রান্ত প্রভৃতি পত্রিকা। এ লিটলম্যাগাজিনের লেখাগুলো সত্তরের ধারার লেখার একদম বিপরীতমুখী। বিষয়চিন্তার ক্ষেত্রে এগুলো জনলগ্নতার বদলে অন্তর্মুখী, আত্মকুণ্ডলায়িত। প্রকরণের দিক থেকে প্রচল স্লোগানধর্মিতা, ক্যাটালগি, ফেনায়িত ভাবের তরলায়িত খুকু ভাষার বদলে নিরীক্ষাধর্মী। ততোদিনে কবিতায় জয় পার হয়ে উৎপল, বিনয়; কমলকুমার, অমিয়ভূষণ, সুবিমল মিশ্ররা গদ্যে আমার পাঠ অভিজ্ঞতায় আসতে শুরু করেছেন। বিশেষত কমলকুমারের রচনার পাঠ আমাকে প্রকরণ সচেতনার দিক থেকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। এ বোধ আসে, লেখা সমসাময়িক হয়ে ওঠে যতটা না বিষয়ের কারণে তার চেয়ে অধিক প্রকরণের কারণে। অবশ্য বিষয়চিন্তার ক্ষেত্রেও ঢাকায় তখন নতুন চিন্তা আসতে শুরু করেছে। উত্তর ঔপনিবেশিক, উত্তর আধুনিক চিন্তার প্রবল চর্চা শাহবাগে শুরু হয়েছে। মনে আছে, শব্দপাঠ দ্বিতীয় সংখ্যায়ই ডি-কন্সট্রাকশন নিয়ে একটি বড় অনুবাদ ছেপেছিলাম। প্রথম সংখ্যাতেই ছেপেছিলাম গদ্য ও পদ্যের দ্বন্দ্ব ও সীমারেখা নিয়ে গদ্য। ততোদিনে পশ্চিমের নিরীক্ষাধর্মী, প্রকরণ সচেতন মাস্টারপিসগুলোও পাঠ অভিজ্ঞতার ভেতর আসতে শুরু করেছে। ফলত বিষয় ও প্রকরণ চিন্তার নতুন নতুন ভাবনার জগৎ উন্মেচিত হতে থাকে। সাথে সাথে নিজস্বতাস্পন্দিত একটি রচনাশৈলী নির্মাণের প্রবল তৃষ্ণাও জাগ্রত হতে থাকে। 'কাঠ চেরাইয়ের শব্দ' কাব্যগ্রন্থের কবিতা আর সে সময়ে বিভিন্ন লিটলম্যাগে লেখা গদ্যগুলো সে তৃষ্ণারই ফসল।

যে কোনো লেখকের জন্যই তার লেখার নিজস্ব ভঙ্গি খুবই জরুরি বিষয়। এ নিজস্বতা দিয়েই আমরা লেখককে চিনতে পারি। লেখার নিজস্বতাই একজন লেখককে অন্যদের চেয়ে, অন্য সময়ের চেয়ে আলাদা করে। ফলত আমরা শেকসপিয়র আর স্যামুয়েল বেকেটের যে কোনো সংলাপ শুনেই বুঝতে পারি, এ দুটো সংলাপ নিশ্চিত দুজন নাট্যকারের লেখা।  যে কোনো মনোযোগী পাঠককে যদি নাম মুছে দিয়ে দুটো গদ্য পড়তে দেয়া হয়, তাহলে তার চট করে চিনে ফেলার কথা কোনটি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আর কোনটি সৈয়দ শামসুল হকের গদ্য। তাঁদের প্রকাশের নিজস্বতাই তাঁদের তীব্রভাবে আলাদা করেছে। কবিতার ক্ষেত্রেও তাই। মনোযোগী পাঠক হলেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা সাথে জীবনানন্দের কবিতার নয়, বাংলা কবিতার সমসাময়িক দু'জন কবি মাসুদ খান আর শান্তনু চৌধুরীর কবিতার মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারার কথা। এদের প্রত্যেকের নিজস্ব মুদ্রাই তাঁদের আলাদা করেছে। 

কীভাবে তৈরি হয় এই নিজস্বতা? প্রথমত চিন্তার নিজস্বতাই প্রকাশভঙ্গির নিজস্বতা তৈরি করে। এক একটি সময়ে চিন্তার প্রকাশের একটা যৌথতা তৈরি হয়। এটাকে ইয়ুংয়ের পরিভাষার প্ররোচনায় বলা যেতে পারে, কালেকটিভ স্টাইল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় লক্ষ্য করলেই দেখবেন- বাংলা কবিতার প্রতিটি দশকের স্টাইলের এক ধরনের মিল আছে। কিন্তু প্রচলতার মধ্যে সে কবিই টিকতে পেরেছেন, যিনি সেটাকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন বা আলাদা হতে পেরেছেন। এই আলাদা হতে পারার অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে প্রচল প্রকাশভঙ্গিকে, প্রচল ভাষাকে অস্বীকার করা। মার্সেল প্রস্তুকে উদ্ধৃত করে একবার কমলকুমার বলেছিলেন, যে ভাষাকে আঘাত করে সে ভাষাকে বাঁচায়। এক একটা প্রকাশভঙ্গি ও ভাষা একসময় ভোঁতা হয়ে আসে। কবিতার ভাষায়- 'ব্যবহূত হতে হতে শুয়োরের চামড়া' হয়ে যায়। সৃজনশীলতার সম্ভাবনা কমে যায়। যেমন লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বড়মাত্রায় বাংলা সাহিত্যে তিনবার সৃষ্টির জোয়ার এসেছিল। প্রথমত চর্যাপদের সময়। সে সময় বাংলা ভাষা সবে গঠিত হচ্ছিল। তারপর মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্যধারার দীর্ঘ ক্লান্তি। এ ধারায় পরিবর্তন আনেন বিদ্যাপতি। মৈথিলী আর বাংলার মিশ্রণে তৈরি ব্রজবুলী ভাষায়। তারপর আধুনিকতার সূচনায় জোয়ার আসে উনিশ শতকে বাংলা গদ্যে। উইলিয়াম কেরির বাইবেলের আর বিদ্যাসাগরের শকুন্তলার গদ্য তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। 

ত্রিশের কবিদের কাব্যভাষা আর রবীন্দ্রনাথ-প্রমথ চৌধুরীর তৈরি করা গদ্যের বয়স ব্যবহূত হতে হতে প্রায় অর্ধশত বৎসর পার হতে চলল। সময় এসেছে এগুলোকে আঘাত করে বদলানোর। আঘাত কেউ কেউ করছেনও ছোট ছোট হাত দিয়ে। বদলানোর সে হাতগুলোই হাতুড়িতে রূপান্তরিত হবে, যে হাতগুলো প্রবলভাবে নিজস্বতা স্পন্দিত। সে সময় ও শক্তির ব্যাপার। বলাবাহুল্য সে হাতগুলোর নিন্দে করবে প্রচলতায় অভ্যস্ত সমকাল। কিন্তু  কেউ কেউ এরই মধ্যে তৈরি করছেন সে নিজস্ব মুদ্রা। আলাদা হচ্ছেন প্রচলতা থেকে নিজেরই মুদ্রাদোষে।