কালের খেয়া

কালের খেয়া


বিষ্ণু মাস্টারের বউ

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০১৯      

ধ্রুব এষ

বিষ্ণু মাস্টারের বউ শিপ্রা মাস্টারনি।

বিষ্ণুপদ দাস, শিপ্রা রানি দাস।

১১ বছর ধরে বিবাহিত তারা। ছোট পরিবার সুখী পরিবার স্লোগানের সমর্থক। তাদের এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলে অম্বুর বয়স ৯ বছর। মেয়ে অন্তিকার ৬।

শিপ্রা মাস্টারনির শ্বশ্রূমাতা রেণুবালা দাসী এখনও জীবিত। বয়স চার কুড়ি অতিক্রম করেছে। ছোটখাটো মানুষ, ত্থুত্থুড়ে হননি, শক্তপোক্ত আছেন যথেষ্ট। চশমা ছাড়া দেখেন, তবে ভালো দেখেন না বলে চশমা পরে থাকেন। নাতি-নাতনি দুটা তার ন্যাওটা বলতে ন্যাওটা, ঠাম্মাকে ছাড়া তাদের মুহূর্ত চলে না। চোখে হারায়। ঠাম্মার সঙ্গে শোয় দুটাই।

বিষ্ণু মাস্টারের বাবা ভগবান তারাপদ দাস। জুবিলী ইশকুলের হেড পণ্ডিত ছিলেন। জুবিলী ইশকুল টাউনের সেরা হাই ইশকুল। এই হিসাবে বলতে হবে অবনতিই হয়েছে বিষ্ণু মাস্টারের। সে হয়েছে প্রাইমারি ইশকুলের মাস্টার। শহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তারাপদ দাস সংস্কৃত ভাষা এবং হিন্দু ধর্ম শিক্ষা পড়াতেন ছাত্রদের। বিষ্ণু মাস্টার পড়ায় ইংরেজি। একেক ক্লাসের একেক সেকশনেই ৪০-৪২ জন করে ছাত্র। পিরিয়ড ৪৫ মিনিট। কতজনের পড়া ধরা যায় আর? পড়াশোনারও যা বহর তার ছাত্রদের!

'এই, ইউ, ব্যাকবেঞ্চার, স্ট্যান্ড আপ। হোয়াট ইজ ইয়োর নেইম, বল।'

'হরেকৃষ্ণ বণিক, স্যার।'

'ইংরেজিতে বল। বল আমার নাম হরেকৃষ্ণ বণিক।'

'আমার নাম হরেকৃষ্ণ বণিক।'

'গাধা। গর্দভ। ইংরেজিতে বল।'

'মাই নেইম... মাই নেইম... মাই... নেইম হরেকৃষ্ণ বণিক।'

'ইজ কই গেল রে গর্দভস্য গর্দভ। বল, মাই নেইম ইজ...।'

'মাই নেইম ইস... ইস হরেকৃষ্ণ বণিক।'

'হুঁ। ইংরেজি ট্রান্সলেশন কর দেখি, আমার বাবার একটি গরু আছে।'

'মাই... মাই... মাই বাবা...।'

'ইংরেজিতে বল।'

'মাই ফা-ফাদার উজ এং কাউ।'

'উজ' মানে 'ওয়াজ'। 'এং কাউ' মানে 'এন কাউ'। 'এ' না 'এন'!

গাধার গাধাদের ধরে বেদম পেটাতে ইচ্ছা করে বিষ্ণু মাস্টারের। কিন্তু এ আরেক জমানা। কঠোর সরকারি নির্দেশ জারি করা আছে, ছাত্রছাত্রীদের মারধর করা যাবে না। তাদের জমানা আরেক রকম ছিল। সিদ্দিক আলি স্যার, আলতাফ হোসেন স্যার, আবদুল খালেক স্যার প্রমুখ জীবন্ত কিংবদন্তি ছিলেন টাউনের। কেন? এরা বিশ্বাস করে পেটাতেন, মানুষ বানাবেন গাধার বাচ্চাদের।

তবে মারধর উঠে গেছে বলে বিষ্ণু মাস্টার বেজার না মোটেও; বরং খুশি। রাগের মাথায় কখনও-সখনও ভাবে এই যা। না হলে যথেষ্ট শান্ত-সভ্য সে। শান্ত-সভ্য শিপ্রা মাস্টারনিও। শান্ত-সভ্য বলতে তারা নিরীহ। কারও সাতপাঁচ-নয়ছয়ে নাই। শিপ্রাও প্রাইমারি ইশকুলের মাস্টারনি। জয়কলস সরকারি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়। টাউন থেকে বাসে যেতে হয়। ৪০-৪৫ মিনিট লাগে। ইশকুল থাকলে এ জন্য সকাল ৭টায় বের হয়ে যেতে হয় শিপ্রা মাস্টারনিকে। সে ঘুম থেকে উঠে আরও আগে। খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ে রাত ১১টার মধ্যেই। আপাতত এটাই একমাত্র প্রাইভেট সমস্যা বিষ্ণু মাস্টারের। বিরাট সমস্যা।

দিন যায়, তবে শুকনা দিন যায়। দিন না, রাত। 'না' হয়ে আছে শিপ্রা মাস্টারনি। না, না, না। অথচ শরীরে ভাটা কি ধরেছে? তা তো না। মনে ধরে গেছে। কথায় কথায় বয়স হয়ে গেছে বলে। ৩৬ বছর আজকাল কোনো বয়স! মাধুরী দিক্‌শিতের বয়স এখন ৫২। বিষ্ণু মাস্টার অবশ্যই বলছে না শিপ্রা মাস্টারনি মাধুরী দিক্‌শিত। কিন্তু যখন তাজা ছিল শিপ্রা মাস্টারনি। ছিল, নাই আর! আফসোস। মনের দুঃখ মনে গোপন রেখে হাঁটাচলা করতে হয় বিষ্ণু মাস্টারকে। হাঁটতে-চলতে খুবই স্বাভাবিক, এর তার বউ-ঝির দিকে চোখ যায়। প্রভা বৌদি, নমিতা বৌদি। প্রভা বৌদি ডেঞ্জারাস জিনিস। লাল শাড়ি, লাল ব্লাউজ, লাল জুতা, লাল হ্যান্ডব্যাগ। এবং লাল টিপ, লাল লিপস্টিক। শুক্রবার মুক্তি কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ে ছিল ফরিদের যমজ মেয়ে লুসি-টুসির। বিষ্ণু মাস্টার ও শিপ্রা মাস্টারনি ছেলেমেয়ে নিয়ে গিয়েছিল। লাল প্রভা বৌদিকে দেখে মাথা ঘুরে গিয়েছিল, চনমনে আগুনের শিখা। বিষ্ণু মাস্টারের কী মনে হয়েছিল, নিজেকে? আগুনে ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত পতঙ্গ।

শিপ্রা মাস্টারনি এমনি নিরীহ হলেও সময়মতো এবং দরকারে মহা কঠিন। ঘুমিয়ে পড়ার আগে ধরেছিল ঠিকই, 'বুড়া হয়ে গেছো, নোলা যায় নাই। প্রভা বৌদিকে দেখে যা করলে!'

'কী করলাম?'

'আবার বলে কী করলাম। রাধামাধব হে! রাধামাধব! তুমি তুমি... তুমি একটা হ্যাংলা।'

'রাধামাধব? হ্যাঁ, রাধামাধব হ্যাংলাই একটু।'

'রাধামাধব হ্যাংলা! কোন পাপমুখে এই কথা বলো তুমি? আমি তোমাকে হ্যাংলা বলেছি। তুমি হ্যাংলা।'

আচ্ছা, হ্যাংলা। বিষ্ণু মাস্টার হ্যাংলা। কিন্তু সে কি বুড়া হয়ে গেছে? ৪৩ বছর বয়সে কেউ বুড়া হয়ে যায়? এটা বিরাট একটা অন্যায্য কথা হলো। আগুনে পেট্রোল ঢালল শিপ্রা মাস্টারনি, 'তুমি হ্যাংলা, তোমার বাবা হ্যাংলা।'

'বাবাকে নিয়ে কথা বলো না।'

'আমি বলি না। মা-ই বলেন। আমাকে বলেছেন ১৩ হাজার ১ বার, অম্বু-অন্তিকে বলেছেন ১ হাজার ১৩ বার।'

'মা বলেছে বাবা হ্যাংলা।'

'হ্যাংলার চূড়ান্ত। হি! হি! হি!'

শিপ্রা মাস্টারনি হাসলে এখনও সব আবরণ খুলে যায় তার। মাস্টারনিসুলভ কঠিন হাবভাব। হার্ট অ্যাটাক হয় বিষ্ণু মাস্টারের। কলেজ লাইফে তারা অনেক শুনেছে গানটা। অলিভিয়া নিউটন জনের। হার্ট অ্যাটাক, ইউ আর গিভিং মি আ হার্ট অ্যাটাক...।

প্রগলভা বউয়ের হাসি মুহূর্তে দারুণ আশাবাদী করে তুলেছিল বিষ্ণু মাস্টারকে। উদ্যোগ আয়োজনের কথা ভাবছিল সে। শিপ্রা মাস্টারনি পিতলের এক ঘটি জল ঢেলে দিয়েছে আশায়। উঁহু, ওসব হবে না!

সন্ধ্যার পর ফরিদের স্টেশনারি দোকানে আড্ডা দেয় তারা। বিষ্ণু মাস্টার, লন্ডনী শামীম, শুভংকর প্রফেসর এবং 'লুয' ক্যারেকটার মাসুদ। প্রাইমারি স্কুল থেকে তারা বন্ধু। লন্ডনি শামীমের ইদানীংকালে খুব মাথা ধরে, জ্বর জ্বর ভাব হয়, বুক ধড়ফড় করে, মাথা ঘুরায়। বিশ্বকুটনা দারা থাকে ঢাকায়। নিয়মিত বন্ধুদের ফোন দেয় এবং কুটনামি চর্চা করে সে। কাল রাতেই বিষ্ণু মাস্টারকে বলেছে, 'লন্ডনির লক্ষণ ভালো না। কিসের মাথা ধরা, জ্বরজারি রে। তোরা তার এইসব ভুং-ভাং-এর অনুবাদ কর। আরেকটা বউ দরকার লন্ডনির। মাসুদের মতো খলিফা না সে। চাকরানির হেরেম বানাতে পারবে না। আবার বিয়ার কথা বললে যে খেপে যায় এটাও লক্ষণ- ভালো-না বলার মতো একটা বিরাট লক্ষণ। তোরা সামি রুমিকে বল। আচ্ছা, আমিই কল দেব সামিকে। রোগীর সঙ্গেও কথা বলব।'

শামীমের ভাই সামি রুমি। সামির সঙ্গে কথা বলেছে কুটনা? হয়তো বলেছে, হয়তো বলেনি। তবে রোগীর সঙ্গে কথা বলেছে নিশ্চিত। আজ দুপুরে লন্ডনিকে কল দিয়ে বলেছে, 'মাস্টার বলল সবই তোর ভুং-ভাং। বিয়া করলেই তোর আর মাথা ধরবে না, পেট-খারাপ হবে না।'

সন্ধ্যায় ফরিদের দোকানে ঢুকেই তোপের মুখে পড়েছিল বিষ্ণু মাস্টার। তোপ স্বয়ং লন্ডনি শামীম।

'এই আমি তোর খাই না পরি? আমি তোকে কখনও বলেছি আমার মাথা ঘুরায়, রক্তচাপ বেড়ে যায়? দারাকে তুই কী বলেছিস? সব আমার ভুং-ভাং! আমি বিয়া করব বলে খেপেছি!'

শালা কুটনা। বহু কষ্টে ম্যানেজ করতে হয়েছে লন্ডনি পাগলাকে। না হলে আজ ১৩ই ডিসেম্বর। আজকের দিনটা কেমন গেছে বলা যায়? ভালোই। ভালো। সমাপনী পরীক্ষার খাতা দেখার টাকাটা আজ পাওয়া গেছে। ১৩শ' খাতা, ২৬শ' টাকা। লন্ডনির সঙ্গে রফা করতে গিয়ে কিছু খরচাপাতি করতে হয়েছে। 'দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডারের' চমচম, কোল্ড ড্রিংকস এবং সিগারেট বাবদ। লন্ডনি ও ফরিদ আবার মামুর দোকানের স্পেশাল পানও খেয়েছে। ২৭৬ টাকা গেছে একুনে। ব্যাপার না। অভিসন্ধিমূলকভাবে প্রাণে ধরে আরও ৩০০ টাকা খরচ করেছে বিষ্ণু মাস্টার। আধা কেজি ক্ষীরতোয়া, ৬টা লবঙ্গ আর ৬টা নিমকি কিনেছে 'দেশবন্ধু' থেকে। ক্ষীরতোয়া ও লবঙ্গ খুবই পছন্দের মিষ্টি শিপ্রার। নিমকিও খায়।

শীত সন্ধ্যার পর থেকে পড়েছে জাঁকিয়ে। ৮টা না বাজতেই মানুষ কমে গেছে রাস্তায়। বাবুলাল সুইপার কলোনি পর্যন্ত 'লুয' ক্যারেকটার মাসুদ ছিল সঙ্গে। টাউনের মিস ওয়ার্ল্ড কানিজ সম্পর্কে সে বিস্তর আকথা-কুকথা বলেছে। ব্রা-পেন্টির সাইজ বলেছে কানিজের। সাদা পেন্টি, গোলাপি ব্রা পরে কানিজ।

'এসব কথা কানিজ তোকে বলেছে?'

'বলার কিছু নাই রে, বাবু। যা বললাম সব দেখার। দেখতে হয়। রুবি ৩৪, নীলা ৩৪, কাকলী ৩৮ ডি কাপ, সাবরিনা ৩৬, পদ্ম ৩৪, বুলার নাই। ২৬-২৭ হতে পারে। দেখাই যায় না। খিক! খিক! খিক! টাউনের আর কার সাইজ বলব, বল।'

অশালীন।

বাবুলাল কলোনির অর্ধেকটা থেকে অ্যাবাউট টার্ন করেছে 'লুয' ক্যারেকটার। বাজারে যাবে আবার, কিনা কনডম কিনবে, ভুলে গেছে সে। অসভ্য!

বিষ্ণু মাস্টার থাকে মড়ার টিলা রোডে। রহমান ডাক্তারের বাসা থেকেই সব ঝাপসা হয়ে গেছে কুয়াশায়। রাস্তা, গাছগাছালি, মানুষের ঘরদোর। অথচ রাত ৯টাও হয়নি। এত কুয়াশা কখন পড়ল?

ঘরে ঢুকে বিষ্ণু মাস্টার এক দিক থেকে একটা বিরাট সুসংবাদ শুনল। রেণুবালা, অম্বু ও অন্তিকে নিয়ে গেছে লাভলী। কাল দিয়ে যাবে। বিষ্ণু মাস্টারের খুড়তুতো বোন লাভলী। বিয়ে হয়েছে টাউনেই। তরণী মোক্তারের নাতি তুষারের সঙ্গে। তুষার উপজেলা মৎস্য অফিসার। বিষ্ণু মাস্টারদের বছর চারেকের জুনিয়র।

লাভলী তার জেঠিমা এবং ভাইপো-ভাইঝিকে নিয়ে গেছে, এটা একদিক থেকে বিরাট সুসংবাদ কারণ, এমন একটা জুতসই মওকা দরকার ছিল বিষ্ণু মাস্টারের। আবার ছেলেমেয়ে দুটা থাকলে ক্ষীরতোয়া, লবঙ্গ খেতে পারত এখন; অতএব, আফসোসের ব্যাপারও নিশ্চয়ই এটা। আচ্ছা, ক্ষীরতোয়া, লবঙ্গ, নিমকি কোনোটাই নষ্ট হবে না; কাল ফিরেও খেতে পারবে তারা। এই সান্ত্বনায় আফসোস কিছুটা প্রশমিত হলো বিষ্ণু মাস্টারের। তার উদ্দেশ্য সাধনে মনোযোগী হলো সে। সতর্ক ট্রিটমেন্ট। খুব কাজে লাগল ক্ষীরতোয়া-থেরাপি। বেজায় খুশি হলো শিপ্রা। খাবে সে, তবে রেণুমালা অ্যান্ড কোং ফিরলে। হতোদ্যম বিষ্ণু মাস্টার বলল, 'একটা খাও।'

শিপ্রা বলল, 'না গো। আমার গলা দিয়ে নামবে না।'

'আচ্ছা তাহলে অর্ধেকটা খাও। তুমি অর্ধেকটা, আমি অর্ধেকটা।' বলে একটা ক্ষীরতোয়া ভাগ করল বিষ্ণু মাস্টার। অর্ধেকটা মুখে তুলে খাইয়ে দিল শিপ্রাকে।

রাত ১০টার মধ্যে ভাত খেয়ে ফেলল তারা। মড়ার টিলার করুণ শিয়ালরা ডাকল। মড়ার টিলা বলতে গোরস্তান। মড়ার টিলা বলে টাউনের মানুষ। অনেক মানুষের কবর এবং অনেক শিয়ালের আবাস। শীতে কাবু তারা হুক্কা হুয়া করছে।

মগা কবিরাজ গোষ্টগোপাল বাবুর মদো মাতাল গলা শোনা গেল একবার, 'আমি কোন শালার খাই-পরি রে!'

রহমান ডাক্তারের বাসার কুকুরটা একটানা অনেকক্ষণ ধরে ডাকল। আহনাফের কুকুর। রহমান ডাক্তারের মেয়ে রুবানার ছেলে আহনাফ, শীতে সে জ্যাকেট পরিয়ে রাখে তার কুকুরকে। কুকুরের জ্যাকেট। অস্ট্রেলিয়া থেকে রুবানার দেবর মুফতি এনে দিয়েছে।

রাত আরও বাড়ল। পাড়া সুনসান। ঘরের টিনের চালে শিশিরের টুপটাপ। তারা ঘরের লাইট নিভিয়ে দিয়েছে। কম্বলের নিচে মাস্টার-মাস্টারনি। শিপ্রা মাস্টারনির নাকের ডগায় একটা ছোট্ট কামড় দিল বিষ্ণু মাস্টার। শিপ্রা মাস্টারনি হি হি করে হাসল। আর পায় কে বিষ্ণু মাস্টারকে? উষ্ণ হলো সে। উন্মত্ত হলো। উষ্ণ হলো শিপ্রা মাস্টারনিও। কত দিন পর! কত দিন পর! নিসূতা তারা এখন। ও না, সম্পূর্ণ নিসূতা না, কোমরে তাগা পরে শিপ্রা মাস্টারনি। এটা দারুণ!

শিপ্রা মাস্টারনি কি ৩৮ ডি কাপ, না ৩৬- বিষ্ণু মাস্টার অবগত না। ডুবে গেল সে আন্দাজের মাপে। সক্রিয় হলো তার হাত-পা, সক্রিয় হলো সমস্ত রক্তকণিকা। শিপ্রা মাস্টারনি হি হি, হিসহিস করল, 'এই! এই! এই!... এ-ই!... অসভ্য!'

ঘরের সব দরজা-জানালা আটকানো। তারা মশারির নিচে, কম্বলের নিচে। উষ্ণতর হচ্ছে তাদের অন্ধকার। টিনের চালে শিশির এখনও ঝরছে। টুপটাপ। টুপটাপ।

'মাস্টারনি ও মাস্টারনি! ভূগোল পড়াও! ও মাস্টারনি! বাংলা পড়াও!'

দুই হাতে বিষ্ণু মাস্টারের গলা পেঁচিয়ে ধরল শিপ্রা মাস্টারনি। এ কী! হুঁশজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে নাকি? পাগল হয়ে গেছে? কী করছে শিপ্রা মাস্টারনি? গলা টিপে ধরেছে বিষ্ণু মাস্টারের। আরে! হাসছে কেন আবার? আরে! দম আটকে যাচ্ছে বিষ্ণু মাস্টারের। সে কিছু করতে পারছে না। ইস্পাতের সাঁড়াশির মতো শক্ত শিপ্রা মাস্টারনির হাত দুটা। কী করছে সে? মেরে ফেলতে যাচ্ছে বিষ্ণু মাস্টারকে! কেন? বিষ্ণু মাস্টার তাকাল এবং কম্বলের নিচের অন্ধকারে দেখল। কী? যাকে দেখল শিপ্রা মাস্টারনি না সে। ক্রুর, কমলা রঙের দুই চোখের মণি তার। ঝিকোচ্ছে কম্বলের নিচের অন্ধকারেও। শিপ্রা মাস্টারনি না, কে এটা? জমে গেল বিষ্ণু মাস্টার। মরে যাচ্ছে সে। হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেল তার। প্রাণপণ এক ঝটকা দিল সে। কম্বলসুদ্ধ মশারি ছিঁড়ে নিচে পড়ল, 'ও মা গো!'

ধাতস্থ হতে কতক্ষণ লাগল? উঠে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে হাতড়ে লাইটের সুইচ দিল বিষ্ণু মাস্টার। চোখ কটকট করে উঠল তার। খাট দেখল সে। খাটে কেউ নাই।

'বিষ্ণু! ও বিষ্ণু!'

পাশের ঘর থেকে রেণুবালা ডাকলেন। বেণুবালা!

বিষ্ণু মাস্টার বলল, 'মা।'

'কী হয়েছে বাবা? ঘুম ভেঙে গেছে? বাইরে যাবি?'

'না, মা। তুমি ঘুমাও।'

'তুইও ঘুমারে বাবা। রাধামাধব, হে রাধামাধব! রক্ষা করো! রক্ষা করো!'

'মা, শিপ্রা-?'

'কেন রে বাবা, তোকে বললাম না, লাভলী নিয়ে গেছে শিপ্রাকে। অম্বু আর অন্তিকেও নিয়ে গেছে সন্ধ্যায়। কাল দিয়ে যাবে।'

বিষ্ণু মাস্টার শুধু বলতে পারল, 'অ।'