কালের খেয়া

কালের খেয়া

আমাদের 'রঙিন' কবি

শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০১৯

ফারুক মাহমুদ

আমাদের 'রঙিন' কবি

রবিউল হুসাইন [৩১ জানুয়ারি, ১৯৪৩-২৬ নভেম্বর, ২০১৯]

ঢাকা শহরে বেশ ক'জন 'রঙিন' মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। রঙিন বলতে, চলনে-বলনে, পোশাকে-আচরণে রঙিন। কবি রবিউল হুসাইন ছিলেন সেইসব রঙিন মানুষের একজন। কয়েক বছরের বয়স-ব্যবধান থাকলেও, সম্পর্কটা ছিল অগ্রজ-অনুজের, বন্ধুত্বের। তার সঙ্গে কত বছর থেকে পরিচিত ছিলাম, কবে, কোথায় প্রথম দেখাটি হয়েছিল, আজ আর মনেও নেই। আমার ঢাকার জীবনে, নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগটি স্থাপিত ছিল কয়েকজন হাতেগোনা মানুষের মতো রবিউল হুসাইনের সঙ্গেও। তার মৃত্যুতে আমার ঢাকার জীবনের, বলা যায়- শেষ রঙিন মানুষটির প্রীতিস্থানটুকু বিলুপ্ত হলো।

অনেকের মতো আমি তাকে রবিদা বলে সম্বোধন করতাম। কেন এ সম্বোধন, জানি না। রবিদা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছেন, ক'দিন আগেই জেনেছিলাম। দেখতে যাব, মনস্থির ছিল। প্রফেসর ডা. হারিসুল হক আর আমি একই গ্রামের বাসিন্দা। তিনি কবি, এ কারণে চেনাজানা কারও অসুস্থতা সম্পর্কে খোঁজ নিতে প্রথমেই তার শরণাপন্ন হই। আমার জানা হয়ে গেছে, সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের অধিকাংশই ছোট-বড় অসুখ হলে হারিসুল হকের কাছে যান। তিনি মনের আনন্দে তাদের চিকিৎসাসেবা বা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ক'দিন আগে আমার চিকিৎসাবিষয়ক পরামর্শের জন্য হারিসুল হকের কাছে গিয়েছিলাম। তার কাছ থেকেই জানলাম, রবিউল হুসাইন ধীরগতিতে হলেও সুস্থতার দিকে যাচ্ছেন। হাসপাতালে ভিড় করার চেয়ে রোগীর সুস্থতা কামনা মুখ্য। রবিদাকে দেখতে আর হাসপাতালে যাইনি। কোনোভাবেই মনে আসেনি, আমাদের প্রিয় রবিদার বেঁচে থাকা ফুরিয়ে আসছে। রবিউল হুসাইনের বহু বর্ণ পরিচিতি।

তার নামের আগে 'কবি' শব্দটি বসাতেই আমরা বেশি পছন্দ করি। তিনি মূলত কবি। কবিতার সমান্তরালে তিনি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, শিশু-সাহিত্য রচনা করেছেন। পেশায় ছিলেন স্থপতি। স্থাপত্যবিদ্যার গতানুগতিকতা অতিক্রম করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন 'স্থাপত্যশিল্পী'। স্থাপত্যবিষয়ক লেখালেখির সংখ্যা অসংখ্য। ইট-পাথর, রড-সিমেন্টের রসকষহীন একটি বিষয়কে তিনি নান্দনিকতার মোড়কে সহজ সৌন্দর্যে স্থাপন করেছেন। শুধু পেশার দায়িত্ব নয়, তার কাজের মধ্যে সৃজনশীলতার বিষয়টি অক্লেশে শনাক্ত করা যায়। স্থপতি রবিউল হুসাইনের ঝোঁক ছিল ইটের কাজের দিকে। তার নকশায় বেশক'টি নির্মিতি স্থাপত্যের শিল্প-সৌকর্যের স্বাক্ষর বহন করছে। এসবের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএআরসি) ভবন। তিনি অনেক লেখায়, সাক্ষাৎকারে এবং আলাপচারিতায় এই স্থাপনাটির কথা উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়াও তার সৃজনশীল স্থাপত্যের চিহ্ন রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তি ও স্বাধীনতা তোরণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় গেট, ভাসানী হল, বঙ্গবন্ধু হল, শেখ হাসিনা হল, খালেদা জিয়া হল, ওয়াজেদ মিয়া, সায়েন্স কমপ্লেক্স, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়াম ও একাডেমিক ভবন কমপ্লেক্স ইত্যাদি। বহু বছর এসব স্থাপনা ও নির্মিতিতে তার কর্মস্পর্শ বেঁচে থাকবে। বিজ্ঞাননির্ভর নকশা করার তার ছিল পাকা হাত, কিন্তু সৃজনশীল শিল্পগুলোয় তার পাঠদক্ষতা ছিল। শিল্প সমালোচক হিসেবে তিনি ছিলেন উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যের সঙ্গে তার গ্রন্থিবন্ধন ছিল শৈশব থেকেই। তার লেখার প্রবণতা ছিল 'ছোট কাগজ'-এ। ষাটের দশকের শুরু থেকেই তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষাধর্মী ছোট কাগজে লিখেছেন। সাহিত্য আন্দোলন শুরু করেছিলেন। প্রতিষ্ঠাননির্ভর পত্র-পত্রিকার পাশাপাশি ছোট কাগজে সানন্দে লিখতেন। 'বিপুলপ্রজ' লেখক বলতে যা বোঝায়, রবিউল হুসাইন হয়তো তা ছিলেন না। কিন্তু লেখালেখি নিয়ে 'আভিজাত্যের ভড়ং' তার ছিল না। নিয়মিতই লিখতেন। লেখা চেয়ে কেউ পায়নি, এমন নজির নেই। লেখালেখির গতিধারার তুলনায় রবিউল হুসাইনের প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা কম। দেখেছি, বই প্রকাশের পাগলামো তার মধ্যে ছিল না। বলতেন, 'সাহিত্যে বর্জ্য বাড়িয়ে কী লাভ।' অর্থাৎ কোন লেখা মলাটবন্দি করা যায়, এমন বিবেচনাবোধই লেখকের থাকতে হয়। রবিউল হুসাইনের দীর্ঘ লেখালেখির মলাটবন্দি হওয়া কাজের মধ্যে রয়েছে- 'কী আছে এই অন্ধকারের গভীরে', 'আরও উনত্রিশটি চাঁদ', 'স্থিরবিন্দুর মোহন সংকট', 'কর্পূরের ডানাঅলা পাখি', 'অমগ্ন কাটাকুটির খেলা', 'বিষবরেখা', 'দুর্দান্ত', 'অমনিবাস', 'কবিতাপুঞ্জ', 'স্বপ্নের সাহসী মানুষেরা', 'যে নদী রাত্রির', 'এইসব নীল', 'অপমান', 'অপ্রয়োজনীয় প্রবন্ধ', 'দুর্দান্ত কিশোর', 'বাংলাদেশের স্থাপত্য সংস্কৃতি', 'নির্বাচিত কবিতা', 'গল্পগাথা', 'ছড়িয়ে দিলাম ছড়াগুলি' ইত্যাদি।

অনেকেরই তেমনটি থাকে না; রবিউল হুসাইনের ছিল একটি স্বচ্ছ, আদর্শিক অবস্থান। তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার পেশাগত সংগঠন থেকে শুরু করে অবদান রেখেছেন শিশু-কিশোর সংগঠনেও। 'বাংলাদেশে স্থপতি ইনস্টিটিউট', 'জাতীয় কবিতা পরিষদ', 'কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা', 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট', 'বঙ্গবন্ধু জাদুঘর', একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি', 'মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর', 'আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচক সংস্থা' ইত্যাদি সংগঠনে তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে আজীবন কাজ করে গেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-চেতনা, বঙ্গবন্ধু, গণতন্ত্র, উদার মানসিকতা ইত্যাদি গ্রন্থে তার ছিল দৃঢ় এবং আপসহীন অবস্থান। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষই হচ্ছে সকল শিল্পের পটভূমি। সাহিত্যে মূল্যবান অবাদন রাখার জন্য তিনি পেয়েছেন 'একুশে পদক', 'বাংলা একাডেমি পুরস্কার', কবিতালাপ সাহিত্য পুরস্কার', 'জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কারসহ পেয়েছেন আরও কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা।

সৃজনশীল মানুষ কল্পনা, চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি নিয়ে কাজ করেন সত্য, কিন্তু তাদের সৃজনকর্মে বাস্তবতার গভীর নিরিখটি আগপাশতলা উপেক্ষিত থাকতে পারে না। সংবেদনশীল কবির পক্ষে তো তা একেবারেই অসম্ভব। কয়েক বছরের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া দুটি বিশ্বযুদ্ধ মানুষের চেতনা এবং মূল্যবোধে বিরাট ধাক্কা দিয়েছিল। মানব সভ্যতা ও প্রগতিশীলতা-বিষয়েও আবশ্যিকভাবে শুরু হয়েছিল নতুন চিন্তা-ভাবনা। বিশ্ব প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি দেশীয় প্রেক্ষাপটেও ভাঙন-নির্মাণে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হলো। এর মধ্যে সাতচল্লিশের দেশভাগ উপমহাদেশের রাজনীতি, আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতকে নানা প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছিল। পাকিস্তানের পূর্বাংশে অর্থাৎ সেই সময়ের পূর্ব বাংলায় তৈরি হতে শুরু হয় নতুন জাতীয়বাদী চেতনা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর তা স্পষ্টত এক চেতনার ধারণা তৈরি করল। পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাটের দশকে এসে এদেশের অন্যান্য ক্ষেত্রেও যত সাহিত্য-শিল্প, সংস্কৃতিতে ঘটল স্বাধীনতার উন্মেষ। সেই বাঁকবদলের স্রোতধারার জাতক ছিলেন রবিউল হুসাইন। এলো মুক্তিযুদ্ধ, এলো স্বাধীনতা। তিন বছর সময় অতিক্রম করতে না করতেই ঘটল মধ্য আগস্টের বিষাদ-বর্বরতা। শুরু হলো মুক্তিকামী মানুষের চেতনার চাকা উল্টো দিকে ঘোরানোর অপচেষ্টা। ইতিহাসের এমন কালপর্বের পর্যবেক্ষক হলেন রবিউল হুসাইন। তার কবিতায়, তার অন্যান্য লেখায় কখনও প্রত্যক্ষ, কখনও পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ঘটনাপ্রবাহের ঢেউ। এ জন্য তার কবিতায় প্রচলিত পেলবতার চেয়ে বাস্তবতার ধূসর ধ্বনিটি শনাক্ত করা যায়। নতুন এক কাব্যভাষায় তিন লিখেছেন তার পর্যবেক্ষণ, উপলব্ধি, সম্ভাবনা এবং আশার কথাটি।

অনেক ঘটনা-স্মৃতি জড়িয়ে আছে রবিউল হুসাইনের সঙ্গে। কৃত্রিম দেখানোপনার চেয়ে গাঢ় ছিল তার হৃদয়ের উত্তাপ। বিভিন্ন কাগজে জড়িত থাকার সূত্রে এই কবি-প্রবন্ধিক-গল্পকারের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কটি ছিল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার। তিনি ছিলেন আমার একজন নির্ভরশীল লেখক। যখন যে লেখা চেয়েছি, যথাসময়ে পেয়েছি। শত ব্যস্ততার মধ্যেও আমাকে বিমুখ করেননি কখনও। অনেক সাফল্যের সঙ্গে তার জীবনে যুক্ত ছিল কিছু বেদনাপ্রবাহ। কিন্তু চিরকাল থেকেছেন হাসি ঝরানো। আনন্দ আড্ডা কত সময় যে তার সঙ্গে কেটেছে, এর কোনো সংখ্যা নেই। একসময় তার ধানমন্ডির বাড়িটি ছিল কবি-লেখকদের মিলনকেন্দ্র। বহু আড্ডার উজ্জ্বল অংশ কবি শামসুর রাহমান, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রফিক আজাদ স্মৃতি ছায়ায় জেগে আছেন। রবিউল হুসাইনের জন্মদিনে নবীন-প্রবীণ কবি-লেখকদের উচ্ছলতায় রবিদার বাড়িটি মুখর হয়ে উঠত। কত ঘটনা, কত আনন্দ!

রবিউল হুসাইনের 'প্রয়াণ'কে অকালে যাওয়া বলা যায় না। তারপরও খুব তাড়াহুড়ো করে গেল। যে মনে সান্ত্বনার কোনো ভাষা নেই, সে তো এমন কথা বলবেই। আমরাও বলছি, রবিদা, আরও কিছু দিন কবিতার সঙ্গে থাকলেই পারতেন। তারপরও বলি, বাংলা কবিতায় আপনার উপস্থিতি আমরা টের পাব। যখন মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গে বলব, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-চেতনা-স্মৃতি নিয়ে কথা বলব, নিশ্চিত, আপনার কথা বলব। ভাষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে আপনার অবদান আমরা মনে ধরে রাখব। অনন্তজীবনে ভালো থাকুন। চিরপ্রিয় রবিদা, শোকার্ত বিদায় কবি রবিউল হুসাইন।