কালের খেয়া

কালের খেয়া


মহাজীবনের পাঠ

বইয়ের ভুবন

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০১৯      

সৈয়দ কামরুল হাসান

মহাজীবনের পাঠ

সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মহাজীবনের প্রতিকৃতি, লেখক ::ফয়সাল আহমেদ, প্রকাশনী ::দ্যু প্রকাশন, প্রচ্ছদ ::মোস্তাফিজ কারিগর, মূল্য ::২৫০ টাকা

'বাঙালি ইতিহাসবিমুখ'- এ রকম একটা কথা বাজারে চালু আছে, অনেকে বলতে গিয়ে কথার পিঠে এ-কথাও জুড়ে দেন যে, ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষাও নিই না। এ-কথায় যে সত্যের ছিটেফোঁটা নেই সে দাবি করা চলে না। সত্যি বলতে কি এই বিমুখতা কিংবা বিস্মরণ এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার অপবাদের পেছনে যে আমাদের ইতিহাস চর্চার অর্থাৎ সঠিক ইতিহাসের রচনা, পঠন-পাঠন ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস পুনর্গঠনের ঘাটতি রয়েছে- সেটাই যে এসব অপবাদের মূল কারণ তা আমাদের মানতে হবে; আর তার দায়ও আমাদেরই নিতে হবে।

একাত্তরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে হাজার বছরের পরাধীন বাঙালি জাতি যে বিশ মানচিত্রে একটি আলাদা ভূখণ্ড নিয়ে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, তার ইতিহাস রচনার দায়ভার যে তাকেই নিতে হবে সে কথায় আর সন্দেহ কী! এখন প্রশ্ন হলো, এই দায়িত্ব আমরা কতটুকু পালন করতে পেরেছি? বাস্তবে এই প্রচেষ্টায় একাডেমিক পরিসরে সামান্য কিছু কাজ হলেও, ব্যাপকভিত্তিতে সৎ ও সংগঠিত উদ্যোগ তেমন একটা চোখে পড়ে না। সমালোচনা আছে- আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলতে ইতোমধ্যে যা রচিত হয়েছে, তা প্রধানত ব্যক্তি উদ্যোগের ফসল, মোটেও পূর্ণাঙ্গ নয়, খাপছাড়া ও খণ্ডবিখণ্ড, উপরন্তু তার অনেকখানি নানাবিধ পছন্দ ও প্রবণতায় প্রশ্নবিদ্ধ। যুদ্ধ-পরবর্তী জাতীয় জীবনের নানান মোচড়ে সংগ্রামী দিনের কুশীলবদের প্রতিকৃতি ও কীর্তিগাথা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। সময়ের আয়নায় ঝাপসা ও ধূসর হয়ে গেছে অনেক মুখ, অনেকের নাম ও ছবি। মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি, পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর কারাভ্যন্তরে নিহত চার নেতার একজন সৈয়দ নজরুল ইসলাম তেমনি একটি নাম। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও এ কথা আমাদের কুণ্ঠাভরে মেনে নিতে হচ্ছে যে, আজ অবধি সৈয়দ নজরুলের কোনো পূর্ণাঙ্গ জীবনীগ্রন্থ আমাদের কাছে নেই। এই প্রেক্ষাপটে নেহায়েত ব্যক্তিগত তাগিদে একজন তরুণ লেখক ও গবেষক ফয়সাল আহমেদ যে এগিয়ে এসেছেন এবং এই সংগ্রামী নেতার জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করে জাতিকে উপহার দিয়েছেন- তাঁর এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ না জানিয়ে উপায় নেই। ফয়সাল আহমেদ এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কেউ নন। কিন্তু তার রচিত 'সৈয়দ নজরুল ইসলাম : মহাজীবনের প্রতিকৃতি' বইটিতে তাঁর নিষ্ঠা, শ্রম ও সততার প্রয়াস সুস্পষ্ট। বিস্তর দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটে, বারবার সৈয়দ নজরুলের জন্মভিটা পরিদর্শন করে এবং মহান নেতার ঘনিষ্ঠজনদের সাথে কথা বলে তিনি এই তথ্যসমৃদ্ধ, বস্তুনিষ্ঠ গ্রন্থটি রচনা করেছেন। বলা প্রয়োজন, এ ক্ষেত্রে সৈয়দ নজরুল ইসলামের ওপর এটিই প্রথম প্রামাণ্য পুস্তক। দ্যু প্রকাশনকে ধন্যবাদ বইটি তারা সযত্নে প্রকাশ ও বাজারজাত করেছে। বইয়ের মনোরম প্রচ্ছদ এঁকেছেন মোস্তাফিজ কারিগর। ১৬৮ পৃষ্ঠার বইটিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামের জন্মস্থান ও পারিবারিক পরিচিতি, বংশপরিক্রমা, বিবাহ, আজীবনের প্রেরণার উৎস স্ত্রী সৈয়দা নাফিসা ইসলাম, শিক্ষাজীবন, ভাষা আন্দোলনসহ মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হওয়ার বিভিন্ন ধাপে সক্রিয় ভূমিকা, মুজিবনগর সরকার ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন, আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধুর সাথে সখ্য, সাপ্তাহিক নিউজউইকে ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সাক্ষাৎকার, যুদ্ধের দিনগুলিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভাষণসমূহ, রণাঙ্গনে ঈদ পালন, স্বাধীন দেশে বীরের মতো ফিরে আসা, চিঠি, যুদ্ধাপরাধী ও দালালদের বিচার, তিয়াত্তরে বাকশাল গঠন, ৩রা নভেম্বরের জেলহত্যা, জেলহত্যা মামলা ইত্যাদি বিস্তারিত খুঁটিনাটি দুই মলাটে বন্দি হয়েছে। লেখক-গবেষক ফয়সাল আহমেদ জন্মসূত্রে সৈয়দ নজরুলের জন্মস্থান কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা হওয়ায় এক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে হয়তো বা সঠিক তথ্য ও জীবনী রচনার দুর্লভ মালমসলা জোগাড় করা ও সেগুলো গ্রন্থে পরিবেশনের আগে একাধিকবার যাচাই-বাছাই করার বাড়তি সুযোগ ঘটেছে। আবার তাঁর নাড়ির টানও বুঝি অগ্রাহ্য করবার নয়! বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে প্রয়াত নেতার সহধর্মিণী সৈয়দা নাফিসা ইসলামকে।

ইতিহাস চর্চা যেমন জরুরি, তেমনি আরও জরুরি সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ ও লালন করা, বিকৃতির হাত থেকে ইতিহাসকে রক্ষা করা। অন্যথায় ইতিহাসের ধারাবাহিকতা আজ যেমন হুমকির মুখে পড়েছে, তৈরি হয়ে চলেছে নানান কূটচাল, যার পরিণামে স্বাধীনতার ফসল দুঃখী মানুষের বেহাত হয়েছে, তেমনি তমসাচ্ছন্ন দিগন্তে আলোর রেখার উজ্জ্বল আভা আমাদের অনায়ত্ত থাকবে আরও কতদিন কে জানে।