কালের খেয়া

কালের খেয়া


বহু-দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বইয়ের ভুবন

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০১৯      

শুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়

বহু-দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

'যেথায় যত আলো', লেখক ::বেগম আকতার কামাল, প্রকাশনী ::অবসর, প্রচ্ছদ ::সব্যসাচী হাজরা, মূল্য ::৩২৫ টাকা

আমাদের সাহিত্য-শিল্প-দর্শনের এমন কোনো স্থান নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথ নেই। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গান কোন সৃজনকর্মটিকে আলোকিত করেননি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর! ছবিও এঁকেছেন। বাংলা সাহিত্য তার হাত ধরে স্পন্দিত হয়েছে এবং হয়ে চলেছে যুগের পর যুগ। তাই একেকটা সময়ে থেমে থাকেনি সময়ের আয়নায় বসে তাকে আবিস্কারের প্রচেষ্টা। গভীর থেকে গভীরে তাঁকে উদ্ঘাটনের প্রয়োজনীয়তা আজও অক্ষুণ্ণ। দেশ-বিদেশের পাঠক-বোদ্ধা সমালোচকের মনন ও নান্দনিক উদ্যম তাঁকে ঘিরে আজও আবর্তনশীল। বহুমাত্রিক দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথকে বিশ্নেষণ এবং উন্মোচিত করার প্রয়াস পেয়েছেন অনেকেই। বেগম আকতার কামাল তেমনই একটা নাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই অধ্যাপক স্বতন্ত্র এক চিন্তাশৈলীতে আবারও অলঙ্কৃত করেছেন যেন বিশ্বকবিকে। 'রবীন্দ্রনাথ :যেথায় যত আলো' বইটিতে তাঁর চেতনা, সত্তা ও রচনাকর্মের নানা প্রান্তে দৃষ্টিপাত করে তাঁকে আরও একবার নির্মাণ করতে চেয়েছেন স্বতন্ত্র চিন্তায় ও ভঙ্গিতে। রবীন্দ্রনাথের বিপুল সৃষ্টিভাণ্ডারে রয়েছে বহুমাত্রিক পঠন-পাঠন এবং চিন্তার স্বাদ। বেগম আকতার কামালের এ গ্রন্থে সভ্যতা, সাহিত্য-সংস্কৃতি-দর্শনের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের মতাদর্শিক অবস্থান ও বয়ান-কাঠামোকে বিশ্নেষণ করেছেন। একাডেমিক পাঠের আলোকেও তাঁর কবিতা-উপন্যাস-নাট্যসাহিত্যের সৃজনশীলতা নিরূপণের চেষ্টা করেছেন ষোলটি পৃথক প্রবন্ধে।

'আত্মপরিচয় :স্বরূপ দর্শনের শিল্পকথা' শিরোনামের প্রথম প্রবন্ধে লেখক রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবন এবং তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তাঁর চিন্তাকাঠামো ও সৃষ্টিশীলতার স্বরূপ সন্ধান করার চেষ্টা করেছেন। বলেছেন 'ব্যক্তিজীবনে, সৃষ্টিশীল রচনায়, দার্শনিক চিন্তনে প্রথম থেকেই রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সৌন্দর্য-আনন্দ-প্রশান্তি-কল্যাণ সন্ধানে নিরলস। সেই সঙ্গে ছিল চিত্তের শানিত অস্থিরতা, ছিল সংঘাতক্ষুব্ধ যন্ত্রণাবিদ্ধ বাস্তব দেশ-বিশ্বজগৎ। নিজ মনোজাত নৈঃসঙ্গ্য-হতাশা অপূর্ণতা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ছিল তীব্র।' প্রবন্ধে সৃষ্টিকর্মের আলোতে রবীন্দ্রনাথের আত্মপরিচয়ের স্বরূপ নিরূপণ করতে গিয়ে বেগম আকতার কামাল রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তা ও ধর্মচিন্তার ওপর আলোকপাত করেছেন। এ ক্ষেত্রে লেখক নির্ভর করেছেন, পহেলা বৈশাখ ১৩৫৪ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত কবির 'আত্মপরিচয়' গ্রন্থটির ওপর। সে গ্রন্থেও শেষ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিসত্তা ও ধর্মসত্তার সম্মিলিত রূপকে নিজেই ব্যক্ত করেছিলেন। সেই আলোকে বেগম আকতার কামাল বলেন, 'তাঁর মুখ্য পরিচয় তিনি কবি। জ্যোতিস্বরূপা শুভ্র নিরঞ্জন যখন রূপের মধ্যে বহুবিচিত্র হন, তখন তিনি আপনাকে বর্ণের আলোকরশ্মিতে বিচ্ছুরিত করেন, বিশ্বকে রঞ্জিত করেন, তিনি সেই বিচিত্রের দূত।'

তারপর এ গ্রন্থটিতে সন্নিবেশিত হয়েছে একে একে আরও পনেরটি প্রবন্ধ। বিশ্বশান্তি তত্ত্ব, সাহিত্যচিন্তা, সংস্কৃতিভাবনা, মিথচেতনা শীর্ষক প্রবন্ধগুলোতে রবীন্দ্রনাথের মানব-চেতনা এবং সেই সাথে মানুষের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মিথচেতনার স্বরূপ নির্ণয় করেছেন। তারপর আছে 'উত্তর-উপনিবেশবাদের নিরিখে', 'রবীন্দ্রকবিতা :প্রকাশ ও সৃজনের দ্বৈতাদ্বৈত', 'গীতাঞ্জলির ভাবকল্পের ইশারা ও উত্তরণ', 'জন্মের-স্মরণ-পূর্ণ বাণী', 'পলাতকা : মুক্তির পরিসর', 'শেষের কবিতা : আধুনিক কথাকাব্য', 'দুই বোন : নারীর ভাবমূর্তি', 'মালঞ্চ :অস্তিত্বের শিকড়ায়ন', 'নাট্যকবিতা ও কাব্যনাট্য প্রসঙ্গে', 'রবীন্দ্রনাথের এক্সপ্রেশনিজম', 'মিথতত্ত্বের আলোকে মুক্তধারা' শিরোনামের প্রবন্ধগুলো। এই প্রবন্ধগুলোতে সৃজন ও ব্যক্তিগত চিন্তাকাঠামোর একান্ত আলোকে রবীন্দ্রনাথকে নানাভাবে বিচার-বিশ্নেষণের নিবিড় প্রচেষ্টা চালিয়েছেন বেগম আকতার কামাল। একাডেমিক পাঠের বাইরে গিয়ে বিশ্বচিন্তা ও মানআত্মার বহুবিধ সংকটের বিচিত্রতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে সৃষ্টিজগৎ রেখে গেছেন এবং গড়েছেন বাংলার এক অশেষ সাহিত্য-ভাণ্ডার- তারই আলোকে আন্তরিক প্রচেষ্টায় ধরবার চেষ্টা করেছেন। চিন্তাশীল পাঠককে রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র সৃজন সম্পর্কে আরও একবার ধ্যানী করে তুলতে যা প্রকৃতই প্ররোচনা জোগাবে।