কালের খেয়া

কালের খেয়া


সাইক্লোন

গল্প

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০১৯      

শাওন আসগর

আজ বাইশে অক্টোবর। একটি শক্তিশালী সাইক্লোন হয়ে গেল আজ। এটির সূত্রপাত ঢাকার কনকর্ড টাওয়ার থেকে। কিন্তু সময়ের ঘূর্ণিপাকে পড়ে খুব দুর্বল হয়ে মূল গতিপথ হারালেও প্রাকৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণে আবারও প্রবল শক্তিসহ নতুন করে ফোঁস করে ওঠে কক্সবাজার থেকে। আর তা দীর্ঘসময় অবস্থান করেছিল কক্সবাজারের পর্যটন মোটেলের ২১২ নাম্বার কক্ষে। সেখানে তার ক্ষিপ্রতা এতই তীব্র ছিল যে, কক্ষের আসবাবপত্র সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে এর অভ্যন্তরে থাকা মানুষের জীবনকে ভিন্নমাত্রায় পরিচিতি দিয়েছিল এবং মধ্যরাতে অনেকের সুখ নিদ্রায় আঘাত করেছিল।

কিন্তু এটি বেশি সময় ধরে সেখানে অবস্থান করেনি। সেটি ধীরে ধীরে স্থান পরিবর্তন করে এক সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটি বাসের সিট দখল করে বন-পাহাড়ঘেঁষা পথঘাট পিচের অবিস্তীর্ণ রাস্তাকে মাড়িয়ে এগোতে থাকে। পথে পথে সাইক্লোনটি গ্রামের কিছু পথ হাঁটবাজার, ট্রাফিক সিগন্যাল, জ্যাম সব অতিক্রম করে এগোতে থাকে ঢাকার দিকে।

রাজধানীর ভেতর প্রবেশ করে তখন এটি কিছুটা স্থিত হয় এবং একসময় দুর্বল হয়ে ফকিরেরপুল রহমানিয়া হোটেলের দশ তলায় অবস্থান নেয়। সাইক্লোনটি ঘুরপাক খায় কিছুক্ষণ। তারপর দেখা যায় এখানের একটি কক্ষে বসে থাকা দু'চারজন লোক ফিসফিস করে কথা বলছে আর দরোজার দিকে চোখ রাখছে। এরা সবাই একটি অপরাধ ও অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত। একজন সুন্দরী নারী যার নাম পরে জানা গেছে মিথিলা আহমেদ, সে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করে একজন পুরুষের সুঠাম শরীরের ওপর। তখন সময় প্রায় সন্ধ্যার কাছাকাছি। তবু অফিসের ভেতর কারেন্ট সেভার ঝলমলে বাতির আলো যেন উপচে পড়ে। নিচ থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ আসে। আসে সিটি করপোরেশনের ড্রেন থেকে ময়লা-আবর্জনার গন্ধও। একজন লোক কক্ষে প্রবেশ করল কিছু মোগলাই, পরোটা, চা-কলা আর বিস্কিট নিয়ে, অফিস পিয়ন হতে পারে। মিথিলা হয়তো এখানকার বড় কর্মকর্তা হবে। সে পুরুষটিকে আহ্বান করে চা আপ্যায়নে।

এভাবেই শুধু হয়েছিল ওই নারীর সাথে একজন পুরুষের সম্পর্কের বাঁধন এবং তার পরিণতি হয়েছিল ওদের শারীরিক সম্পর্ক পর্যন্ত। মিথিলা তার বুদ্ধিদীপ্ত কথামালার মাধ্যমে পুরুষটিকে বলেছিল- আজকাল লিভিং টুগেদার বা শারীরিক সম্পর্ক বড় কোনো ইস্যু নয়। প্রয়োজন শুধু দু'জনের মেন্টাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং। তবে হ্যাঁ, সম্পর্ক তৈরি হলে তাতে যে লেনদেন হয়, যার ভার বইবার ক্ষমতা থাকতে হয় পুরুষের। আপনার সে সামর্থ্য বা সাহস থাকলে আমি প্রস্তুত। আর এসব নিয়ে সামাজিক অসম্মান বা কোনো স্ক্যান্ডাল না হওয়া ভালো। একটু সাবধান থাকলে সারাজীবনই সুখে চলা সম্ভব।

মিথিলার কথায় সামাজিক বা আইনি বৈধতার বালাই ছিল না। সময় বয়ে গেলে পুরুষটিও ভাবে : আসলেই একটি ক্ষুদ্র কাগজ মানুষের জীবনকে আটকাতে পারে না। আসলে দু'জনের মানসিক একাত্মতাই প্রয়োজন। তখন তারা দু'জনই বিভোর ছিল শরীরে স্বপ্নে এবং ব্যবসার সাফল্য নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনায়।

সময় যখন আর বসে থাকার অবকাশ পেল না, তখন দিনে দিনে তারাও সম্পর্কের পরিধি বাড়াতে বাড়াতে বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন হোটেলে এবং অবশেষে নিজেদের আবাসিক গৃহেই জড়িয়ে থাকল জীবনের পরম সুখ পাবার আশায়। কিন্তু অর্থ আর খ্যাতির লোভ মানুষকে বেশি স্থিরতা দিতে পারে না। মিথিলা লোভী হয়ে লোকটির জীবনের সকল সঞ্চয়ের দিকে চোখ মেলে দেখে এবং তা করায়ত্ত করার অভিপ্রায়ে বিভিন্ন ফিকির করতে থাকে। বাহির জগতে অভ্যস্ত ও অভিজ্ঞ মিথিলার মেধা অতই শার্প যে, পুরুষটি বারবার তার পরিকল্পনার কাছে পরাজিত হয়ে নিজের পকেট খালি করতে থাকে। মিথিলা সত্যি সফল হয়, কারণ পুরুষটি তখন কেবলই পৃথিবীর সকল কিছু থেকে নিজেকে আলাদা করেছিল এবং কেবলমাত্র একজন নীতিবান ও শালীন প্রেম শরীরসঙ্গ- এসব আকাঙ্ক্ষা তাকে নেশায় বুঁদ করে দিয়েছিল এবং মিথিলাকে একান্তভাবে পাবার তীব্র ব্যাকুলতায় অস্থির হয়ে দিয়েছিল। এটি ছিল তার অকাতরে বিলিয়ে দেবার প্রেম প্রতিশ্রুতি।

পুরুষটি ভেবেছিল তার সঞ্চিত সমস্ত অর্থ আসলে নারীর জন্যই সে সংরক্ষণ করবে এবং তার জন্যই ব্যয় করবে। করেছেও সব তার কথা মতো। পুরুষটি মনে করত যাকে প্রেম দেওয়া যায়, যাকে নিয়ে সংসার ও জীবনের সব পরিকল্পনা করা যায় তাকেই বা তার জন্যই সব করা প্রকৃত কমিটমেন্ট। তাই সে মন থেকেই আরও গভীরভাবে মিথিলার প্রতি আরও আসক্ত হয়ে পড়ে। এভাবেই তার খ্যাতি এবং অর্থ, পদ-পদবি সব জলে ডুবতে থাকে।

এক সময় বোকা লোকটি বুঝতে পারে প্রেম আসলে মানুষকে মিথ্যাবাদী ব্যক্তিত্বহীন এবং অর্থহীন করে তখন সে নোংরা কুয়ো থেকে ওঠতে চায় কিন্তু তখনই মতবিরোধে শুরু হয় জীবনের অন্য এক অধ্যায়ের সূচনা। কারণ মিথিলা অর্থ লোভে পড়ে তার বিপদের বন্ধু প্রেমিকের প্রায় সবই কব্জা করে ফেলেছে, যা থেকে ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং তার আচরণের রুক্ষতায় পুরুষটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। সে যখন বলে- শোন পৃথিবীর সব পুরুষই তার প্রেমিকার জন্য তৈরি। প্রেমিকার জন্য সব ত্যাগ করে আর তুমি পারবে না? তাছাড়া তুমি কি আমাকে সব ফ্রি দিয়েছ, আমি কি এমনিতে সব পেয়েছি, আমার শরীর নাওনি? আমাকে পুরাতন করোনি?

মিথিলার আচরণে অকৃতজ্ঞতা অশালীনতার ছাপ স্পষ্ট হলে পুরুষটির মনে প্রচণ্ড ক্ষোভের সাথে ঘৃণার উদ্রেক হয়।

দুই.

একদিন সকালে যখন অসময়ে বাইরের পরিবেশ বৃষ্টিতে ভিজে সয়লাব। যখন এই শহরের পথঘাট মাণ্ডা, বাসাবো, ধানমন্ডি, কাজীপাড়া, তালতলার মতো প্রধান সড়কে নৌকা দিয়ে পথচারীদের পারাপারের ফিকির করছে কয়েক ধান্ধাবাজ পথশিশু ও কিছু বেকার যুবক, তখনই ঘরের ভেতর শান্ত পরিবেশটি আগুনের তাপে উত্তপ্ত হয়ে কুরুক্ষেত্র তৈরি হয় এবং তা ভদ্রতার সব খোলস খুলে সীমা ছেড়ে যথারীতি অশালীন আচরণের দিকে ধাবিত হয়। এক সময় যখন মিথিলা তার বর্তমান জীবনের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিলাসী এবং ফেসবুকে আরও সব ভাল্‌গার লোকদের বিষয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করে, তখন আর পুরুষ লোকটির মেজাজ ঠিক থাকে না। সর্বোপরি মিথিলার সম্প্রতি রাতবিরাতে ঘরের বাইরে বের হওয়া এবং তার প্রেমিকের অনুমতি ছাড়াই অনেক রাতে ফিরে আসা, তার অবস্থান বা আড্ডার বিষয়বস্তুর গোপনীয়তা পুরুষটিকে তিলে তিলে ধ্বংস করতে থাকে। সে যেন সত্যি আর নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে না। এসব বিষয়ে কথা হলে নারীটি নিজের চরিত্রের শুদ্ধতা নিয়েও অনেক অনেক যুক্তিতর্ক জুড়ে দেয়। নিজের চরিত্রকে মহামতি নারীদের সাথে তুলনা করে প্রেমিককে অবহেলার চরম অবস্থায় নিয়ে যায়।

একটা সময় খুব দ্রুততার সাথেই লোকটির ব্যাংক থেকে মিথিলা অর্থ উত্তোলন করে এবং খুব চাতুর্যের সাথে গল্প বানিয়ে নগদ অর্থ হাতিয়ে নিয়ে মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং নিজের গ্রামে তা বিনিয়োগ করে মানুষের কাছে মহান হয়ে ওঠে। কিন্তু ওই অকৃতজ্ঞ বেইমান লোভী নারীটি ভুলে যায় যে, অন্যায়ের ফলাফল তাকে একদিন ভোগ করতেই হবে। যখন লোকটি বলে- তুমি যে অন্যায় করছো আমার সাথে তোমাকে এর ফল ভোগ করতে হবেই।

মিথিলা জবাব তৈরি রাখে তার ঠোঁটের ডগায়- আরে যা যা, জানি জানি এসব নীতিকথা। আমি কি খোদারে ডরাই। দেখিস না এই দেশে চোর, বাটপার, ঘুষখোর, লুটেরায় ভরে গেছে! কোটি কোটি টাকা পাচার হলো, কই, কই তোর খোদা। কোনো বিচার আছে? আল্লাহ দেখে না এইসব? তাদের বিচার হয়?

লোকটি কখনও কোনোদিনই মিথিলার সাথে যুক্তিতর্কে পেরে ওঠেনি। তাই সে তাদের স্মৃতিময় প্রেমের দু-একটি ঘটনা বলে যায়। সে বলে নদীর কথা, বাগানের কথা, হোটেলে রাত কাটানোর সুখময় খুনসুটির কথা আর গ্রামের বাড়ির নারকেল, আম, জাম খোলা উঠোনের পাশে চেয়ার পেতে বসে বসে মুড়ি-মোয়া খাবারের কথা। সে বলে, গ্রামের সাধারণ মানুষের সাথে তাদের কিছু আবেগময় বাক্য বিনিময়ের কথা। বলে হতদরিদ্র পথশিশুদের জন্য কোনো এক মধ্যরাতে শীতবস্ত্র বিতরণের কথা। এসব প্রসঙ্গ বলে সে মূলত মিথিলার মন পাবার শেষ চেষ্টা করে। সে আবারও রাজধানী ছেড়ে আনন্দনগর বাথুলীর সরু পথে অগ্রসর হওয়া নারীটির পিতার কবরস্থানে স্মৃতিবিজড়িত বেদনাময় শ্বাস-প্রশ্বাসের কথাগুলো আওড়াতে থাকে; যেন এই লোভী নারীটির ভেতর বোধ জাগে, আবার যেন কৃতজ্ঞতায় তার মন ভরে ওঠে। এবং সর্বোপরি দেশে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ করুণ মৃত্যুর গল্প বলে যেন মিথিলার ভেতর নরম হয়, সে কৃতকর্মের ফলাফল সম্পর্কে একটু নতুন করে ভাবে, অনুশোচনা করে।

কিন্তু লোকটি যেভাবে অগ্রসর হয় তাতে 'চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী'র মতোই। লোকটি আর পারে না, কোনোভাবেই পারে না। তার মনের ভেতর গজানো প্রেমের পুষ্পগুলো নেতিয়ে পড়ে, তার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়, তার জীবন বিষময় হয়। তার ভেতর প্রতিশোধের লতাগুল্ম পেঁচাতে থাকে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ যেমন প্রতিরোধ করে, তেমনি সেও প্রতিরোধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তার ভেতর সচেতন আরেকটি মানুষ জাগ্রত হয় এবং ভেতরে দলানো-মুচড়ানো ক্রোধটি সাইক্লোনে রূপান্তরিত হয়। আর তা তীব্র গতিতে অগ্রসর হয়। তার কাছে এই ক'বছরের সকল প্রমাণপত্র ব্যাংকের চেকের পাতা মোবাইলে দেওয়া টাকার হিসাবপত্র এবং মিথিলার নামে পূর্বে অসৎ ব্যবসার কিছু কাগজপত্র নিয়ে ঝড়-সাইক্লোন তাণ্ডব চলতে থাকে। লোকটি ক্রোধের বসে যখন এসব নিয়েই অগ্রসর হয়, তখনই তার স্মৃতিগুলো তাকে দহন করে পোড়ায় অঙ্গের ভেতর সকল হাড় মজ্জা। তাকে আরও জেদি মনে হয়।

তিন.

সাইক্লোনটি তেজগাঁও থানা অতিক্রম করে ধীরে ধীরে মিথিলার ডিওএইচএসের বাসায় আঘাত হানে, সেখান থেকে তা অতিক্রম করে শ্যামলী, সাভার, আনন্দনগর, বাথুলী লণ্ডভণ্ড করে দেয়। সাইক্লোনটি তার সীমা অতিক্রম করে বাংলাদেশ বিমানের করিডোর পেরিয়ে চলে যায় মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায়, যেখানে মিথিলা তার সব গোপন সম্পদের পাহাড় জমা করেছে প্রেমের সুযোগ নিয়ে।

চার.

মিথিলা আহমেদ বুঝতে পারে সব, সে আফসোস করে কিন্তু সময় যে কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সাইক্লোনটি তার সকল লোভের ফসল তছনছ করে, তার অনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে প্রচণ্ডভাবে পিষে মারে।

সে এখন কাঁদে আর কাঁদে।