কালের খেয়া

কালের খেয়া


মনোহর

গল্প

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০১৯      

ফিরোজ আহমদ

কেবল শখের বশে অনুসন্ধানকারী হওয়া লোকেরা নয়; গল্পগাছায় বিজ্ঞজন বলে আমি যাদেরকে চিনতাম, তাদের একজন আমাকে একদিন বলেছিলেন- 'যা দেখছেন তা নয়, যা ভাবছেন তাই লিখুন। সেটাই লিখুন, যা আপনি রক্তের ভেতর বয়ে নিয়ে চলেছেন।'

তাই কিনা কে জানে, আমি আমার ভাবনার ভেতর আঁতিপাঁতি করে একটা গল্পকে খুঁজতে লেগে গিয়েছিলাম।

আর খুঁজতে খুঁজতেই আমার সাথে দেখা হয়ে গেল মনোহরের।

মনের ভেতর বাস করা সেই এক অদ্ভুত মানুষ। বহুকাল আগে যাদের পূর্বপুরুষেরা উত্তরের উঁচু জমি থেকে নেমে একটা ব-দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তজুড়ে যে আজদাহা বনভূমি ছিল; জোয়ারের নুন জলে দিনে দু'বার ধুয়ে যাওয়া সেই বনের প্রান্তে তারা বসতির খুঁটি গেড়ে দিল।

তারা ভেবেছিল, বনই হতে পারে তাদের আশ্রয় আর খাদ্য-রসদের যোগানদাতা। বনকে একটা মানবীর আদলে কল্পনা করে নিয়ে সকাল-বিকেল বনবিবির স্তবগান আর সন্ধ্যার শুরুতে বিরাট একটা আগুনের কুণ্ডলী তারা জ্বালিয়ে নিত।

আগুনের ভয়ে পশুরা সরে গিয়েছিল বনের গভীরতর অংশের দিকে। আর দু'পেয়েগুলোর কাঁধের সাথে ঝুলতে থাকা পা দুটোকে নিয়েও দারুণ ভয় ছিল তাদের মনে। আর মুনিষ্য ক'জনও তাদের ছুড়ে দেওয়া বল্লমের মাথায় গেঁথে শেষ করতে পারল না তৃণভোজী হরিণের দলকে। তারাও বাড়তে লাগল মানুষের সাথে পাল্লা দিয়ে। যেসব নিচু জায়গায় জোয়ারের পানি ঢুকত; নেমে যাওয়ার মুখে পাতা-ঝাতার বেড়াজাল দিয়ে মাছগুলোকে তারা আটকে দিত। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে নদী এবং খাল দিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস করা হাজার হাজার মানুষ খেয়ে শেষ করতে পারল না বনের প্রাচুর্য। তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে মুখে মুখে শুনে আসা পুঁথি মেরুদ সোজা করে বসে থেকে তারা দুলে দুলে পড়ত। এখন যতকিছু আমরা জানি, তত কিছু না জানলেও শিক্ষা ব্যবস্থা বলতে এই পুঁথিগুলো অন্তত তাদের ছিল।

তখনও সেই আধাজঙ্গুলে গাঁয়ের লোকেরা আরও কিছু শিখবার জন্য মোটেই প্রয়োজন বোধ করত না।

শিক্ষা সঞ্চালনের এই পদ্ধতি এবং এর বিষয়বৈচিত্র্য; এগুলো একেবারেই যেন লাগসই ছিল তাদের জন্যে। তাড়াহুড়ো না করে দুলে দুলে তারা পড়ত-

'তানা বানা নাইরে জানা তস্করেরো হাত

না পড়িলে না ফুবে তোমার হান্ডির ভাত।'

ছলচাতুরী আর চুরিবিদ্যা বাদে আর সবই জায়েজ ছিল সেই সমাজে। মানুষে আর প্রকৃতিতে, অথবা প্রকৃতি আর মানুষে যেন ভারি সংলগ্নতা ছিল কালঘূর্ণির সেই অধ্যায়টুকুতে।

কত শত বৎসর পূর্বে মনোহর জানে না তার পূর্বপুরুষেরা বুনো শুয়োর শিকার করতে করতে কিম্বা মাছ আর কচ্ছপ ধরতে ধরতে কতদূরে চলে যেত আর সন্ধ্যায় জ্বালানো আগুনের পাশে বসে বুড়োরা তাদের সমর্থ ছেলেরা যাতে নিরাপদে ফিরে আসে, সেই শুভকামনা করত। কার কাছে কামনা জানাতে হবে তাও তারা জানত না তেমন। শুধু আগুনের কাছে নিরাপদে বসে থাকতে থাকতে তাদের মনে হতে লাগল, এই আগুনই বুঝি মানুষের নিরাপত্তা বিধান করতে পারঙ্গম একমাত্র শক্তি। কালক্রমে এই আগুনকেই তারা বিধাতা বানিয়ে নিল।

আশেপাশের ঝোপ-জঙ্গল ভেঙে এই আগুনের খাদ্য যোগাড় করতে করতে তারা আবিস্কার করে ফেলল- তিনমুখো পাতাওয়ালা গাছগুলোর কাঁচা ডাল আগুনে দিলে উড়ো পোকারা পালিয়ে যায় দূরে। আর একটা সুগন্ধ হয় চারদিকে। তারা গাছটার একটা নামও দিল- ধুনো।



ধর্ম বলে মনোহর আজ যে বিষয়টাকে বিশ্বাস করে, তার গোড়াপত্তনও যেন সেই বৃদ্ধরাই করে দিয়ে গিয়েছিলেন। সহস্র বৎসর ধরে দেখে আসা চন্দ্র-সূর্যকেও বিধাতা বলে তারা মান্যিগণ্যি করতে শুরু করে দিয়েছিল মনে মনে। এই দুটো জিনিসের আপাত পরিবর্তনহীনতা তাদের চৈতন্যে প্রণতিমনস্কতার জন্ম দিয়ে ফেলেছিল যেন। ফলে চাঁদ-সূর্য-তারাও দেবতা হয়ে উঠতে পেরেছিল সেইসব মানুষের চেতনার ভেতর।

সর্বক্ষণের সঙ্গী ছায়াকে তারা মনে করত ভালোমানুষের ভূত। যারা দীর্ঘদিন আগে গত হয়েছেন সেই জ্ঞানী বৃদ্ধরা ছায়া হয়ে, সঙ্গী হয়ে তাদের সাথে আজও হেঁটেচলে বেড়াচ্ছেন যেন। তারাই হচ্ছেন ওই ছায়াভূত। আর বেঁচে আছে যারা; এই জ্যান্ত মানুষগুলো হচ্ছে অদ্ভুত। মনোহর জানে-

এখন আর চালু না থাকলেও দিনে অন্তত একবার সবার অলক্ষ্যে সবাই নিজেদের সেই পোষা ভূতগুলোকে একমুঠো অন্তত অন্ন নিবেদন করত।

সেই প্রথা চালু হবার পর থেকে দেখা গেল লোকালয়গুলোর ওপর পাখিরা উড়ছে।

বেশি বেশি বনমোরগের উপস্থিতি তারা লক্ষ্য করতে পেরেছিল তাদের চতুর্দিকে।

তারপর থেকে ক্রমাগত বাড়তে থাকা মানুষের চাপে পড়ে সেই বনভূমি পিছিয়ে যেতে থাকল সেই বহুত দূরের একটা অদেখা সমুদ্দুরের দিকে। নিজেদের দরকারেই মানুষেরা মৌয়ালি, বাওয়ালি, মেছো কিম্বা হুনুরি, কর্মকার, জোলা, নাপ্তি, পাল- এসব ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে বিশেষত্ব অর্জনের দিকে ধাবিত হয়ে পড়ল। আর সেই বনভূমি আরও পিছিয়ে গেলে উন্মুক্ত হয়ে গেল ধান চাষের জন্য উপযুক্ত একটা বিশাল প্রান্তর। ধানের ফলন আরও বেড়ে গেলে নতুন নতুন অভাবের সাথে পরিচিত হতে থাকা মানুষেরা নৌকা বোঝাই ধান নিয়ে পৌঁছে গেল অপেক্ষাকৃত উঁচু অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছে। ব্যবসায়ী হয়ে উঠতে লাগলে তাদের বলা হতে লাগলো বৈশ্য আর এক দল মনের কথা বলতে চেয়ে হয়ে উঠল কবি।

সেইসব মানুষের যাবতীয় প্রবণতার পরম্পরা মনোহর যেন আজও দেখতে পায় নিজের রক্তের ভেতর উলুটি-পালুটি করতে। বিশাল চওড়া কাঁধ আর ছড়ানো পায়ের পাতা মেলিয়ে বসে থেকে যখন সে রোদ পোহায়; কে যেন বাতাসে বাতাসে তার নাম ধরে ডাকে। তার দীর্ঘ বাহুগুলো নিশপিশ করতে থাকে। কাঁধ থেকে কেমন যেন একটা অদৃশ্য শিকল বহু দূরে ছুড়ে ফেলে দিতে। তবে বহুকিছুর মতো এটাও সে দিক করতে পারে না শিকলটা কিসের! অদৃশ্য, অস্পৃশ্য এবং জটিল একটা অদ্ভুত শিকল ছুড়ে ফেলে দেওয়া যায় না বলেই মানুষ ক্রমশ যেন কুঁজো হয়ে আসে।

এখন যেখানে মনোহর আর তার কালো রংয়ের তাগড়া জোয়ান বউটা বাস করে আদ্দিকালের সেই বনভূমি সেখান থেকে পিছিয়ে গেছে প্রায় ১০ মাইল দূরে। বছরে একবার এখন খাজনাওয়ালা লোকেরা এসে আদায় করে নিয়ে যায়। মনোহর ভেবে বার করতে পারে না, যে জমিন তার পূর্বপুরুষেরা জ্বলন্ত চ্যালাকাঠ হাতে করে বাঘের কাছ থেকে কেড়ে রেখেছিল; ছাগল মুখে করে পালানো কুমিরের লেজ জাপ্টে ধরে যে মানুষেরা প্রতিষ্ঠা করেছিল তাদের বসত; তারা কেন দুই দিনের পথ হেঁটে যশোহর যেয়ে সংগ্রহ করে আনবে সিলমোহর মারা পত্তননামা!

তাদের এই চিরকালের জমি... তার সঙ্গে এক টুকরো কাগজের কী সম্পর্ক- মনোহর দিক করতে পারে না এই কাগজ দেনেওয়ালা কারা! কোথায় ছিল তারা এতদিন!

গোমড়া মুখে ফিরে এসে মনোহর তাই বসে ছিল দাওয়ার সুঁদুরী গাছের খুঁটিতে হেলান দিয়ে। মাঠ থেকে ভীষণ স্বাস্থ্যবতী একটা দুধেল গাইয়ের দড়ি হাতে করে লীলাবতী উঠোনে উঠেই দেখতে পেল মনোহরকে। বের করে রাখা পায়ের সামর্থ্যবান গোছাগুলো চকচক করছিল ঘাম আর রোদে। হাঁকড়ে উঠল মনোহর- 'হেই নীলে, তুই বল দিনি সেই হোগলার খাল অব্দি এই জমিন কার?'

লক্ষ্মী নামের বকনা বাছুরটা একটা খুঁটার সাথে গেরো দিতে দিতে লীলাবতী বলল, 'কেন, তুমার- তুমাইগে বাপ-দাদাইগের।'

'না'- ক্রুদ্ধ স্বরে মনোহর বলে চলল-

'না, সেসব জমিন এখন নাকি আর আমাইগের না, সপ জমি নাকি জমিন্দারের- বছরচুক্তি চষতি হলি নাকি তিন ভাগের এক ভাগ খাজনা নাকি, কী যেন ক'লে তাই দিতি হবে। প্যাদা দেখলাম পাকড়ি মাথায়, খাজনা না দিলি নাকি খেচায় ভরে নে যাবে কোনদিকি... এইরাম নাকি সরকারি আইন হুয়েচে... মনে হয় ঢাল-সড়কি লামাই আবার।'

'আচ্চা লামাতি হয় পরে লামালি হবে- এখন তুমি এই মিঠেই-পানিডুক খাইয়ে পুকুরিত্থে ডুবকি দিয়ে আইসো ... আমি এই চাইল কয়ডা চড়ায়ে দেলাম... এতধুর হাঁটা পথ!' লীলাবতী বলল।

সেই বহু বহু বহুকাল আগে পশ্চিমের পাহাড়ি উঁচু দেশ থেকে গিরি-খন্দ পেরিয়ে গৌর বর্ণ উঁচু নাকের যেসব লোকে এসে ক্রমশ ছড়িয়ে গিয়েছিল চতুর্দিকে- একটা রচনা করা জ্ঞানগ্রন্থ বগলে করে তারা হাঁটত। সিদ্ধান্ত আর সমাধান দেওয়া সেই গ্রন্থ তারা কাউকে ছুঁতে পর্যন্ত দিত না। অচেনা অস্পৃশ্য সেই গ্রন্থটা দেখিয়ে একটা ভিনদেশি যুদ্ধপটু দীর্ঘ মানুষের দল এই জোলো-জঙ্গুলে জায়গাগুলোসহ সংলগ্ন সারা বিস্তৃত ভূ-ভারতে দেবতার বংশধর বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিল। তাদেরই কোনো এক শততম বংশধর ছিল মনোহরের গুরুবাবা। শুধু কাঁচকলার ভর্তা দিয়েই তিন থালা ভাত আর এক ঘটি জল খেয়ে নিয়ে মনোহর চলল- তারে দেখা দিতে। মাটির তেলতেলে কালো হাঁড়িতে ঝোলানো এক হাঁড়ি দুধ তার হাতে। লক্ষ্মীর ভাগে কম পড়লেও আজ ব্রাহ্মণের কব্জি ভিজবে দুধে।


পরের বছরগুলোতে কমতে লাগল মনোহরের গোলার ধান এবং জমিন্দারের দারুণ রঙিন দালানগুলো সাদাতে-লালেতে খিলানে-কপাটে- ছবির মতন আঁকা হয়ে যেতে লাগল।

গুরুমার হাতে দুধের হাঁড়িটা সঁপে দিয়ে মনোহর জানতে পারল- বাবা বাড়িতে নেই। সেই জমিন্দার বাড়িতেই গেছেন তিনি- লক্ষ্মীদেবীর পূজা দিতে। আসতে তার বিলম্ব হবে।

গোবা-হাবা মনোহর দুদ্দাড় পা চালিয়ে ফিরে আসতে লাগল নিজের বাড়ির দিকে। একটা এজমালি পুকুরের ঘাটে এসে আঁজলা ভরে পানি খেয়ে নিল সে। মাথাটা ঠান্ডা হলে তার জ্ঞান হলো যে-

বাবাঠাকুর গেলেন জমিন্দারের ঘর, পুজো দিয়ে লক্ষ্মী বশ হলে শ্রীবৃদ্ধি হবে জমিন্দারের- দক্ষিণে মিলবে বাবাঠাকুরের- দু'জনেরই লাভ!

এই প্রথম মনোহরের আধাবুনো মনের মধ্যে একটা প্রশ্নের উদয় হলো- তাহলে লোকসানটা কার হবে? এই প্রথম সে টের পেল একজনের লাভ মানেই কারও না কারও লোকসান। এই প্রথম তার চিন্তা হলো, সেই-ই কি তবে ক্ষতির ভাগে!

জীবনে এই প্রথম বঞ্চিত হবার অনুভূতি হলো মনোহরের। একদম নতুন, অচেনা, অভূতপূর্ব একটা অনুভূতি!

বহুদিন পর মনোহরের মনে হলো আবার সেই কে যেন বহুদূর থেকে তার নাম ধরে ডাকছে। হারিয়ে যাওয়া পূর্বপুরুষদের গলার মতো মনে হয় সেটা। কোণঠাসা বাঘের সামনে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার বিজয়ী প্রপিতামহেরা এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য যেন ডাকছে মনোহরকে। সে গিয়ে অংশ নিলেই যেন এই যুদ্ধের বিজয়। সেই নির্জন পুকুরঘাটলাটায় পরম্পরাতাড়িত একজন মানুষের কাঁধ আর পিঠের পেশিগুলো যেন সক্রিয় হয়ে ওঠার জন্য নিশপিশ করা শুরু করে দিল।

দীর্ঘ পথ হেঁটে নিজের বসতিতে ফিরে মনোহর দেখতে পেল উদ্দেশ্যহীন হেঁটে বেড়ানো লীলাবতীর বাবা এসে বসে রয়েছেন। খানিকটা অগোছালো বাউন্ডুলে মানুষ তিনি। দু'দিকে সমুদ্দুর আর দু'দিকে হিমালয় এবং সুলেমান পর্বতশ্রেণি দিয়ে ঘিরে রাখা এই বিশাল বিস্তৃত ভূ-ভাগ ... মানুষের মনে আবহমানকালের যে চিন্তাশীলতার উদ্রেক করে দিয়েছিল, তিনি ধরে রেখেছিলেন সেই পরম্পরার সুতোটা। প্যলেস্টিনে একজন কথা বলা শিশু জন্মাবার হাজার বছর আগ্‌ থেকে উদ্দালক, বৌধায়ন, বরাহমিহির, ব্রহ্মগুপ্ত, ভাস্করাচার্য- এদের যে ক্রমধারা, তিনি সেই ধারায় জন্মানো একজন ভবঘুরে মাত্র। নিজের মনে বসে ভাবতে থাকাই যাদের কাজ... সেই পীতেম্বর বুড়ো মেয়ের বাড়িতে এসে তবু উঠোনে চাটাই পেতে আকাশে উদীয়মান তারাগুলোর দিকে চেয়ে থেকে ভাবছিলেন- তিনি কে? তিনি এখানে কেন? কেন সেই সুদূরবর্তী কোন নীহারিকায় তিনি জন্মালেন না? ভূ-ভারতে এত লোকের মধ্যে আরও একজন লোক হিসেবে তার বিশেষত্ব কোথায়? লীলাবতীর মা এখন কোনখানে? মহাকাল কারে কয়? মধ্যে মধ্যে তার মনে কেউ একজন বলে ওঠে- আমিই মহাকাল! কে তিনি? মন কী? মৃত্যুর সাথে মনের সম্পর্কের ধরন কেমন? মন কী তবে- শরীরের অভ্যন্তরের রসসমূহের বিক্রিয়ার ফল?

এতকিছু তিনি বোঝেননি। আর যতটুকু বুঝেছেন; সেটাও কেউ বুঝতে পারে না।

হেই নীলে.. হেই নীলে বলতে বলতে যখন মনোহর বাড়িতে ঢুকল, বুড়োটার মনে দুঃখ হলো খুব। আচার্য ভাস্করের মেয়ে লীলাবতীর নামটাও তার গোঁয়ার, চাষাড়ে জামাইটা শুদ্ধ করে বলতে পেল না ভেবে। বুড়োকে দেখে মনোহর শুধু বলল,

'বাবা, এয়েচো!'

অগম্য তার মনটাকে নিয়ে বুড়ো পীতাম্বর ফিরে চলে গেলেন পরদিন প্রভাতে। তার মনে চিরকালের এই একটা দুঃখ যে, তার জামাইটা তার মনে ডুব দিতে পারল না কোনোদিন- আবার খুশি হলেন এতটুকু ভেবে- তার শরীরখানা এতটাই সমর্থ যে দশ হাত জলের তলা থেকে নিজের সমান লম্বা কামুটে বোয়াল বগলে চেপে ধরে সে উঠে আসতে পারে। বুড়ো দেখতে পেলেন গাছে-আগাছায় এক সাজানো বাগান ... উদাসীন মালিকের কাছে শুধু গাছ নয়, আগাছাগুলোও যেন সমান প্রিয়!

বৃদ্ধ হাসলেন মনে মনে। কেউই হাঁটতে চায় না যে পথে; সেই পথ ধরে তিনি ফিরতে লাগলেন।

মানুষের চলে যাওয়া-ফিরে আসা... এইসব অতিসাধারণ নৈমিত্তিক ঘটনার মধ্য দিয়ে চলতে চলতে একবার প্রকৃতির ভেতর কী একটা খেই হারানো বিদ্রোহের জন্ম হলো, কে জানে! পরপর দু'বছর সে ফসল জন্মাবার সময়ে বৃষ্টি দিল না। ন্যাড়া মাথা সূর্য ঝুড়ি ভরা উত্তাপ মাথায় করে বয়ে এনে উপুড় করে দিতে লাগল মনোহরের চাষের জমিতে, বসতভিটেয় আর তার সারা শরীরে। মরে যাওয়া তার দুটো আঁতুড়ে ছেলেমেয়ের মতন বছর দুটোও তার কাছে ভারি, শূন্যতাময় আর বিভ্রান্তিকর ঠেকতে লাগল।

শস্যশূন্য মাঠের মতন লীলাবতীও তার নিষ্ম্ফল আক্রোশ যখন-তখন, যেখানে-সেখানে ... লক্ষ্মী, মনোহর,

নিচু করে বাঁধা পুঁইমাচাটার ওপরে উগরে উগরে দিতে লাগল। আতাড়ি-পাতাড়ি শাকগুলো খুঁটে এনে কুটে-বেছে তবু দু'একদিন তার রাঁধতেও ইচ্ছা হলো না। একথালা মাত্র ভাত নুন-তেল দিয়ে মেখে খেয়ে মনোহরের খিদে না কমে যেন বা আরও বেড়ে ওঠার শক্তি পেয়ে গেল বেশি। এবং দু'বছরের খাজনা বাকি হলো তার।

আদায়কারীরা এলে সড়কি হাতে খেঁকিয়ে উঠে মনোহর বলল,

'খাজনা নি, যে চারডে ধান ফলিছে তা আমার বছর-খোরাকি, খাজনা হব্যান না আর।'

ভয় পেয়ে উশুলকারীরা ফিরে গিয়ে সবকিছু সবিস্তার নিবেদন করল জমিন্দারের ঠাঁই।

তারপর এক উচ্ছন্নে যাওয়া দুপুরবেলা লীলাবতীর পিঠে দু'ঘা বসিয়ে দিয়ে বল্লম হাতে মনোহর চলল রংওঠা পুরোনো ন্যাকড়ার মতো দেখতে ধেনো মাঠটার দিকে। আর সেই দিনই জনাচারেকে বরকন্দাজ সাথে করে জমিদার ঘোড়ায় চেপে এসে পড়লেন দিক-দর্শনে। একজন পাইক দূর থেকে আঙুল উঁচু করে দেখিয়ে দিল-

'ওই যে বাবু- উয়ার নাম মনোহর, খাজনা স্বীকার নাই দুই বচ্ছর। বলে, খাজনা নি..

সারারাত কারণসুধার তালে থাকা রাজার মেজাজ! জমিদার চিল্লে উঠলেন-

'ঘরে আগুন দে শালার ...'

এক মুহূর্তের ভিতর কী হলো কে জানে! একটা অচেনা অসুর এসে ভর করল মনোহরের ওপর। অচেনা, গোঁয়ার, একচোখা, আগুনমুখো একটা অসুর- তান্ত্রিকের মন্ত্রজাল থেকে এক্ষুনি যার মুক্তি হয়েছে; সে এসেই সেঁধিয়ে গেল মনোহরের উঁচু কিন্তু শুকিয়ে আসা চওড়া শরীরটার ভেতর। খানিকটা দৌড়ে এসেই চোখের নিমিষে বহু বহু দূর থেকে বল্লমটা ছুড়ে দিল সে।

জানা যায়, রাজাদের কপাল প্রশস্ত আর উজ্জ্বল হয়ে থাকে!

আর নিক্ষেপকারীদেরও ভারি সুবিধে হয় উজ্জ্বল ও প্রশস্ত কিছুকে ভেদ করতে ..
উত্তর পর্ব

মনোহর ফেরার হলো যেদিন; কেন কে জানে, অনেক দিন বাদে সেদিন বৃষ্টি হলো খুব। গুম হয়ে যাওয়া ... নিখোঁজ হওয়া বিদ্রোহীদের শোকে কিনা, সে কথা কেউ বলতে পারল না। নাবাল গড়িয়ে যাওয়া ছেলের মার্বেলের মতন সময় গড়িয়ে গেলে আজ আর কেউ মনেও করে না- সেদিন সেই ঘন বাদলার রাতে লীলাবতীর বমি হয়েছিল খুব ... আঁতুড়ে মরা তার ছেলে দুটো স্বপ্নে ফিরে এসে মা মা করে এক্কেবারে হুলস্থূল বাধিয়ে তবে ছেড়েছিল। ইতিহাস থেকে নিষ্ফ্ক্রান্ত হয়ে যাওয়া মনোহর নাবাল উজিয়ে এসে ঠাঁই করে নিয়েছিল লীলাবতীর ক্ষণকালীন গর্ভে।

চলে যাওয়া আর ফিরে ফিরে আসার সেই একই গল্পটা শুধু পড়তে পারলেন পীতাম্বর, যার কোনো হা-হুতাশ নেই। তার সেই চিরকালের অভ্যাসবশত তিনি শুধু হাসলেন মনে মনে। সেবারও লীলাবতীর ছেলে হয়েছিল এবং মানুষের সব থেকে আশ্চর্যজনক আবিস্কার 'অক্ষর'গুলোকে সে এক্তিয়ার করে নিতে পেরেছিল অতিশয় দ্রুত এবং বইয়ে দিতে পেরেছিল পরম্পরার স্রোতে। অতঃপর সেইসব সামন্ত রাজার মতো একই স্বপ্ন নিয়ে ইংরেজরা এদেশে পৌঁছে গেলে মনোহরের সন্তানেরাই তাদের চাকুরে হলো।

নির্যাতিতরাই বদলে গেল নির্যাতনকারীতে- অটল-অনড় বয়ে চলল শুধু মহাকাল!

পীতাম্বর বুড়ো থাকলে অভ্যাসবশত আবার হয়তো তিনি হাসতেন মনে মনে। মহাকালের মতো দীর্ঘায়ু হলে হয়তো তিনি দেখতে পেতেন, সেই মনোহরের সন্তানেরাই ফের বিদ্রোহী হয়ে মঙ্গল পাণ্ডে, দীনেশ, বাদল, বিনয়, ক্ষুদিরাম হয়ে হয়ে ফিরে আসছে- এবং তাদেরই উত্তরপর্বে ... মুকেশ আম্বানি হাজার কোটি রুপি খর্চা করে ছেলেদের বিয়ে দিচ্ছে।

পীতাম্বর থাকলে আজকের খবর কাগজে প্রকাশিত নিবন্ধটা পড়ে হয়তো মনে মনে নয়; হয়তো তিনি আজ অট্টহাসিই হাসতেন- সমুদ্র আর পর্বতবেষ্টিত এই ভূ-ভাগেই ঋণগ্রস্ত কৃষকের আত্মহত্যার হার পৃথিবীর যে কোনো দেশের থেকে, যে কোনো সময়ের থেকে বেশি।

হাসি থামিয়ে পীতাম্বর হয়তো মনে করিয়ে দিতেন- সত্য নাদাল কিংবা সুন্দর পিচাই .. এরাও মনোহরেরই সন্তান।

এবং মনোহরের সন্তানেরাই আজকাল আইপিএল মাতিয়ে তুলেছে ...।