কালের খেয়া

কালের খেয়া


নন্দিত নরকে খুঁজি নির্জন নদী

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০৭ নভেম্বর ২০১৯      

শেখ রোকন

নন্দিত নরকে খুঁজি নির্জন নদী

হুমায়ূন আহমেদের চিত্রকর্ম

হুমায়ূন আহমেদের নদীগুলো কেমন? তিনিও কি নদীর মতো 'সিরিয়াস' বিষয়ে লিখেছেন? তিনি তো বরং নদী নিয়ে মজা করেছেন। যেমন হুমায়ূন আহমেদের কাছে অনেকেই সন্তানের নামের জন্য আসত। সেই নামের 'তাৎপর্য' নিয়ে আবার কারও কারও থাকত নানা বায়না। একজন এসে বলেছিলেন, তার সন্তানের নাম শুরু হতে হবে মায়ের নামের আদ্যাক্ষর 'আ' দিয়ে আর শেষ হবে বাবার নামের আদ্যাক্ষর 'ল' দিয়ে। আবার নামের অর্থ হতে হবে 'নদী'। হুমায়ূন বললেন- তাহলে নাম রাখুন 'আড়িয়াল খাঁ'। আড়িয়ালের আগে-পরে আ ও ল বর্ণ রয়েছে। অর্থও নদী। (ফাউন্টনপেন)।

হুমায়ূন আহমেদের হালকাচালে সিরিয়াস প্রশ্ন তোলা কিংবা তথাকথিত সিরিয়াস প্রশ্নাবলি যে আসলে হাস্যকর ছাড়া কিছু নয়, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আমরা নদীর ক্ষেত্রেও দেখি। একই বইয়ে তিনি প্রশ্ন তুলছেন 'এক হাজার মাইল লম্বা নদী ব্রহ্মপুত্র। সবাই তাকে ব্রহ্মপুত্র ডাকছে। কে রেখেছিল আদি নাম?' তার সন্ধ্যার আড্ডায় এক 'হামবড়া' ভাষাতত্ত্ববিদকে জব্দ করতে এ প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্নটি কি আসলেই ভাবায় না? বলা বাহুল্য নয়, নদীর ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদের অবদান এই ভাবনা উসকে দেওয়ায় কেবল সীমিত নেই।

আমাদের সাহিত্য পাড়ায় 'বাজারি লেখক' হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের যে একটা 'সমালোচনা' আছে, সেটা নিজেও বিলক্ষণ জানাতেন। এ নিয়ে রীতমতো লিখিতভাবে ঠাট্টা-মশকরা করেছেন। যেমন নিজেকে নিয়ে, তেমনি তার ভাষায় 'কালজয়ী' লেখকদের নিয়ে। আমাদের জীবন ও সমাজ যে এমন বৈপরীত্যে ভরা; পারিপার্শ্বিক যাতনার মধ্যেও যে জলজ সুখ খুঁজে নেওয়া যায়; সম্মান ও সমালোচনা যে এখানে হাত ধরাধরি করে চলে; যিনি 'নন্দিত নরক' দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন, তার চেয়ে বেশি কে জানবে? এই জীবনবোধ আসলে নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত। নদী মানেই ভাঙা-গড়া, হাসি-কান্না, সংকটের মধ্য দিয়ে সভ্যতার এগিয়ে যাওয়া। হুমায়ূন আহমেদের জীবন কিংবা নদীবোধ এখানেই স্বাতন্ত্র্য। অন্যান্য লেখক যেখানে নদীকে ঘিরে মানব-মানবীর জীবন ও সমাজ আঁকতে চেয়েছেন, তিনি সেখানে যেন তুলে ধরতে চেয়েছেন বিশুদ্ধ নদী। যেমন তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'হাঁসুলী বাঁকের উপকথা' উপন্যাসে আমরা যতখানি না কোপাই নদী পাই, তার চেয়ে বেশি পাই সেখানকার সমাজ। কিংবা হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় উপন্যাসগুলোর একটি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ইছামতী' যদি দেখি, শুরুটা ওই নদী দিয়ে হলেও গোটা গল্প আসলে অন্যকিছুর। হুমায়ূনের নদী অনেকটা 'নির্জন'। মানবিক অনুষঙ্গ ছাড়া নদী কেবল নদীই হয়ে ওঠে। অনেকটা সাহিত্যে প্রচলিত তত্ত্ব 'শিল্পের জন্য শিল্প' যেন। নদীর জন্য নদী, আর কিছু নয়। নদী বিষয়ে এমন 'র‌্যাডিক্যাল' অবস্থান অনেকের পছন্দ নাও হতে পারে, আমরা যারা নদী নিয়ে কাজ করি তাদের কাছে নদীর এই প্রাধান্যই প্রাধিকার।

হুমায়ূন আহমেদের জীবনও নদীময় হিসেবে দেখা যায়। আমরা জানি, তার জন্ম হয়েছিল মাতামহের বাড়িতে, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে ধলাই নদীর অববাহিকায়। পৈতৃক বাড়ি একই জেলার কেন্দুয়ায়, গুনাই নদী অববাহিকায়। কিন্তু এই দুই নদী দিয়ে তার পছন্দ-অপছন্দ বোঝার উপায় নেই, নিয়তি মাত্র। নদীর প্রতি হুমায়ূন আহমেদের প্রীতি বোঝা যায় কনিষ্ঠ কন্যার নাম দিয়ে- বিপাশা। বিপাশা সিন্ধু অববাহিকার নদীর নাম, বিয়াস নামেও পরিচিত। তিনি নিজেই এই নাম রাখার প্রেক্ষাপট হিসেবে নদীটির প্রতি ভালোবাসার কথা একাধিকবার বলেছেন। আরও দুই মেয়ের নামের ক্ষেত্রে নদীর কথা বলেছেন কিনা জানা নেই। নাম রাখার সময় আদৌ নদীর কথা ভেবেছেন কিনা, তাও জানি না। কিন্তু কী কাকতাল, মেজ মেয়ে শিলার নামেই বাংলাদেশে অন্তত দুটি নদী রয়েছে। একটি ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে, সুতিয়া নদীর স্বল্প পরিচিত শাখা। অপরটি বেশি পরিচিত, আমি নিজেও ওই নদী দেখতে গেছি, সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে। বড় কথা, এই নদী 'আন্তর্জাতিক'। বাংলাদেশ-ভারত স্বীকৃত ৫৪ নদীর একটি। রইলেন বাকি বড় মেয়ে নোভা। সন্দেহ সামান্য যে, তিনি হয়তো নক্ষত্র থেকেই নিয়েছেন নামটি। কিন্তু কানাডা ও ব্রাজিলে এই নামে একটি করে নদী রয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের নিজের ডাক নামের ক্ষেত্রেও এই সূত্র খাটে। মুন্সীগঞ্জে রয়েছে কাজল রেখা নদী, আর মেহেরপুরে কাজলা।

শৈশবের নদীস্মৃতি হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন লেখায় নিজের বা নিজের নির্মিত চরিত্রের মুখ দিয়ে অনেকবার অনেকভাবেই এসেছে। সবচেয়ে প্রত্যক্ষ তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ 'আমার ছেলেবেলা'। আমার কাছে তার যে স্মৃতি সবচেয়ে জীবন্ত মনে হয়, তা শঙ্খ নদীর। পুলিশ কর্মকর্তা পিতার চাকরিসূত্রে বান্দরবানে ছিলেন। তারও আগের অবস্থান রাঙামাটি থেকে হাটহাজারীতে এসে শঙ্খ নদী বেয়ে বান্দরবানে পৌঁছেছিলেন। ওই অঞ্চলের বর্তমান সড়কপীড়িত যোগাযোগ ব্যবস্থার চাপে এখন হারিয়ে গেছে সেই নৌপথ। অথচ কেবল যাতায়াতের জন্য নয়, পর্যটন হিসেবেও উঁচু পাহাড়ঘেরা স্বচ্ছতোয়া নদীর ওই পথ কতই না উপভোগ্য হতে পারত!

শঙ্খের স্মৃতি হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, হাটহাজারী থেকে সারারাত নৌকায় করে শঙ্খ নদী বেয়ে ভোরবেলা নতুন 'শহর' বান্দরবানে পৌঁছেছিলেন। নদীটিকে তার আপন মনে হয়েছিল। তাই তো স্কুলে শিক্ষকের অপমান সইতে না পেরে প্রতিবাদে ক্লাস থেকে বের হয়ে তিনি শঙ্খের দিকেই ছোটেন। তীর ধরে দৌড়ান। ওই ঘটনার জের ধরে পুত্রের আত্মসম্মান রক্ষায় স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নেন পিতা। তখন তার সঙ্গী গল্পের বই ও নদী। হুমায়ূন লিখেছেন- 'আমি সারাদিন পড়ি। মাঝে মাঝে অসহ্য মাথার যন্ত্রণা হয়। সেই যন্ত্রণা নিয়েও পড়ি। বিকেলে শঙ্খ নদীর তীরে বেড়াতে যাই।' শঙ্খ নদীর তীরেই একটি মর্মান্তিক ঘটনার মুখোমুখি হন তিনি। নদীতীরেই পরিচয় হয়েছিল 'নিশিদাদা' তথা নিশিনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে। তিনি পড়াশোনায় যেমন তেমন, ম্যাট্রিক পাসের চেষ্টারত, শরীরচর্চায় দিগগজ। হুমায়ূন লিখেছেন- 'নদীতীরে তিনি ঘণ্টাখানক দৌড়ান। ডন-বৈঠক করেন। শেষ পর্যায়ে সারাগায়ে ভেজা বালি মেখে নদীর তীরে শুয়ে থাকেন।' ধারণা করি, তিনি শুকনো মৌসুমের শঙ্খের কথা বলছেন। শান্ত, সৌম্য, শঙ্খ। ওই নিশিদাদার সঙ্গেই মাছ ধরতে গিয়ে বর্ষার রুদ্র শঙ্খের দেখা পেয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন- 'নিশিদাদার সঙ্গে ছাতা মাথায় আমি রওনা হলাম। নদীর তীরে এসে মুখ শুকিয়ে গেল। বর্ষার পানিতে শঙ্খনদী ফুলে ফেঁপে উঠেছে। তীব্র স্রোত। বড় বড় গাছের গুঁড়ি ভেসে আসছে। এই শঙ্খ নদী আগের ছোট্ট পাহাড়ি নদী না- এই নদী মূর্তিমতি রাক্ষসী।' নিশিনাথ খেপজাল ফেললেন, আর কিশোর হুমায়ূনের মনে হলো যেন শঙ্খনদী তাকে হাত বাড়িয়ে টেনে নিয়ে গেল। আর ভেসে উঠলেন না। হুমায়ূন চিৎকার করতে করতে ছুটতে ছুটতে বাসায় ফেরেন। লাশ পাওয়া যায় সন্ধ্যায়, সাত মাইল ভাটিতে। পাহাড়ি নদীর এটাই চরিত্র। কিন্তু আমরা জানি, শঙ্খের সেই চিরায়ত চরিত্র এখন হারিয়ে গেছে।

প্রসঙ্গত বলা চলে, শঙ্খের চরিত্র প্রথম নষ্ট করেছিল ইংরেজ সার্ভেয়াররা। তারা যেহেতু স্থানীয় নাম 'শঙ্খ' উচ্চারণ করতে পারত না, এর নাম দিয়েছিল 'সাঙ্গু'। আমাদের সরকারি নথিপত্রে এখনও এই নদীর নাম সাঙ্গুই। আমাদের লেখক, পর্যটকরা সেই নামই লেখেন ও বলেন দেখেছি। হুমায়ূনের স্বাতন্ত্র্য, তিনি আদি নামই ব্যবহার করছেন। আমরা বরাবরই সাঙ্গুর বদলে শঙ্খ বলার নিবেদন, আবেদন জানিয়ে আসছি। হুমায়ূন আহমেদ যেন নিজে থেকেই এভাবে আমাদের আন্দোলনের শরিক হন।

হুমায়ূন যদিও শৈশবে রাঙামাটিতে ছিলেন, ওই অংশে নদীর চিত্র পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থা বোঝার জন্য সেটা হতে পারত অমূল্য নথি। কারণ তখনও রাঙামাটি 'লেক' তৈরি হয়নি। এই লেক যে আসলে কর্ণফুলী নদীর প্রতি মনুষ্য অত্যাচারের চিহ্ন, সেটা আমরা অনেকেই জানি না। ষাটের দশকে কাপ্তাইতে জলবিদ্যুৎ বাঁধ তৈরির ফলে উজানের অংশ ফেঁপে তৈরি হয়েছে কাপ্তাই লেক। পুরোনো রাঙামাটি শহর, রাজবাড়ি, গ্রাম ও জনপদ তলিয়ে যায় কাপ্তাই লেকের তলে। প্রথমবারের মতো ওই অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিজভূমে পরবাসী হতে থাকে। সেখানকার সংঘাত, সহিংসতা ও উত্তেজনার ইতিহাস খোদ কর্ণফুলীর এই 'সলিল সমাধি' বাদ দিয়ে রচিত হতে পারে না। হুমায়ূন আহমেদ যখন পরিবারের সঙ্গে রাঙামাটিতে শৈশব কাটিয়েছেন, হিসাব করে দেখছি তখনও নদীটি অক্ষুণ্ণ ছিল। তিনি যদি রাঙামাটির স্মৃতি আরও বিশদে লিখতে পারতেন, সেখানে নিশ্চয়ই অবিকৃত কর্ণফুলীকেও পেতাম আমরা।

রাঙামাটিরও আগে হুমায়ূন আহমেদের শৈশব কেটেছে দিনাজপুরে। সেখানে সমতলের নদীর চিত্র দেখা যায়। সিলেট থেকে বদলি হয়ে তার বাবা যে এলাকায় গিয়েছিলেন, তার নাম 'জগদল'। আজকের বীরগঞ্জ উপজেলা, দিনাজপুরের। দেশভাগের জের ধরে পরিত্যক্ত ও অধিগৃহীত এক বিশাল রাজবাড়ি থানার পুলিশ প্রধানের বাসভবন। হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন- 'বাড়ির সামনে বিশাল বন। একটু দূরেই নদী। যে নদীর পানি কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ। নদীর তীরে বালি ঝিকমিক করে জ্বলে। নদীটিই পাকিস্তান এবং ইন্ডিয়ার সীমানা।' এখানে তিনি সম্ভবত একটু গুলিয়ে ফেলেন। কারণ বীরগঞ্জ ঠিক সীমান্তবর্তী উপজেলা নয়। সেখানে সীমান্ত নদীও নেই। তিনি সম্ভবত ঢেপা নদীর কথা বলছেন। জগদল এলাকা দিয়ে প্রবাহিত এই নদীতে এখন আর কাকচক্ষু দূরে থাক, ঘোলা জলও ঠিকমতো থাকে না।

নদীর নাম ঠিকুজি নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও হুমায়ূন আহমেদের বর্ণনায় উপভোগ্য মুহূর্তগুলো স্পষ্ট- 'সারাক্ষণ অপেক্ষা করতাম কখন দুপুর হবে- নদীতে যাব গোসল করতে। একবার নদীতে নামলে উঠার নাম নেই। তিন ভাইবোন নদীতে ঝাঁপাঝাঁপি করছি; বড়রা হয়তো একজনকে জোর করে ধরে পাড়ে নিয়ে রাখল। আনতে গেল অন্যজনকে। এই ফাঁকে পাড়ে যে আছে সে লাফিয়ে নামল।'

দিনাজপুর থেকে পঞ্চগড়ে বদলি, কিন্তু নদী আছেই। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী ছাড়া আছেই বা কী? পঞ্চগড় তড়াই ভূমির আরও কাছে। সেটাই সমতলের বাসিন্দাদের কাছে 'পাহাড়'। শিশু হুমায়ূনকে সেই নদী দেখাতে নিয়ে যান তার বড় মামা। তিনি লিখেছেন- "একদিন সাইকেলে সামনে বসিয়ে আমাকে নিয়ে গেলেন পাহাড়ি নদী দেখতে। প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা সাইকেল চালায়ে নালার মতো একটা জলধারা পাওয়া গেল। মামা বললেন, তুমি ঘুরে বেড়াও। আমি এই ফাঁকে একটা কবিতা লিখে ফেলি। মামা নদীর পাড়ে বসে রোলটানা খাতায় কবিতা লিখতে বসলেন। দীর্ঘ কবিতা লেখা হল। কবিতার নাম মনে আছে 'হে পাহাড়ি নদী'। বড় মামার এই কবিতা স্থানীয় একটি পত্রিকায় ছাপাও হল।" সেই নদীর নাম তিনি লেখেননি। পঞ্চগড়ের আশপাশের চার-পাঁচ ঘণ্টার সাইকেল যাত্রায় যেসব নদী পড়তে পারে তার মধ্যে রয়েছে করতোয়া, মহানন্দা, গোবরা, তালমা, শালমারা প্রভৃতি। এর মধ্যে কোনটি হুমায়ূন আহমেদের শৈশবের 'পাহাড়ি নদী'?

শৈশবের স্মৃতি সারাজীবন মানুষের মনে গেঁথে থাকে। নানাভাবে ও উপলক্ষে নতুন নতুন মাত্রা নিয়ে উদ্ভূত হতে থাকে। সৃষ্টিশীল মানুষের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভবত আরও বেশি। আমরা দেখব হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প 'পাপ' একটি নদীর পটভূমিতে লেখা। নদীর নাম 'কাঞ্চন'। সেখানে যুদ্ধে পাক বাহিনীর নৌকাডুবি ঘটে। এক তরুণ, সদ্য গোঁফ ওঠা সেনা কর্মকর্তা কোনোরকমে তীরে উঠে এক গৃহবধূকে 'বহেনজি' ডেকে প্রাণভিক্ষা চায়। কিন্তু তার স্বামী নানাদিক ভেবে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে খবর দেয়। তাকে মেরে কাঞ্চন নদীতেই ভাসিয়ে দেওয়া হয়। হুমায়ূন আহমেদ বলছেন, কাঞ্চন নদী মাধবখালী ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। বাস্তবে আমরা দেখি, মাধবখালী পটুয়াখালী অঞ্চলের একটি জনপদ। ওই তল্লাটে 'কাঞ্চন' নদী নেই। বরং দিনাজপুর অঞ্চলে পুনর্ভবা নদীর একটি অংশের নাম 'কাঞ্চন'। দিনাজপুর অঞ্চলে শৈশব কাটানো হুমায়ূনের স্মৃতিতে কি সেই নদীই প্রবাহিত হয়েছে?

যে নদীর সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের সবচেয় হৃদয়বিদারক সম্পর্ক, তার নাম সম্ভবত বলেশ্বর। পিরোজপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এই নদীই উজানে গৌরী, গড়াই, মধুমতী, কালীগঙ্গা এবং ভাটিতে কচা ও হরিণঘাটা নামে পরিচিত। এক নদীর সাত নামের এমন নজির আর নেই। পিরোজপুরে কর্মরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাদের পরিবারের মর্মান্তিকতম অঘটনটি ঘটে। সেখানে তাদের বাড়ি ও বইয়ের বিপুল সংগ্রহ, হুমায়ূন লিখেছেন- 'পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নির্দেশে পিরোজপুরের একদল হৃদয়হীন মানুষ লুট করে নিয়ে যায়। বাবাকে ধরে নিয়ে যায় বলেশ্বর নদীর তীরে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারণে তাকে গুলি করে হত্যা করে। ভরা পূর্ণিমায় ফিনকি ফোটা জ্যোৎস্নায় তার রক্তাক্ত দেহ ভাসতে থাকে বলেশ্বর নদীতে। হয়তো নদীর শীতল জল তার রক্ত সে রাতে ধুয়ে দিতে চেষ্টা করেছে। পূর্ণিমার চাঁদ তার সবটুকু আলো ঢেলে দিয়েছে তার ভাসন্ত শরীরে। মমতাময়ী প্রকৃতি পরম আদরে গ্রহণ করেছে তাঁকে।'

এখানেই হুমায়ূন আহমদের শক্তি ও স্বাতন্ত্র্য। তিনি নিজের পিতার মৃত্যুর দৃশ্যকেও এভাবে জল ও জ্যোৎস্নায় সিক্ত করতে পারেন। এরই নাম হয়তো 'নন্দিত নরক'। হুমায়ূন আহমেদের নদীগুলোও যেন নরকের মধ্যে নন্দিত হয়ে উঠতে চায়। কল্পনাতেও কীভাবে নিজের মনের মতো নদী তৈরি করা যায়, তিনি দেখিয়েছেন হিমু সিরিজের 'ময়ূরাক্ষী' উপন্যাসে। কেবল উপন্যাসের নাম হিসেবে নয়, তার লেখায় নানা প্রসঙ্গেই 'ময়ূরাক্ষী' নদী এসেছে। যদিও তিনি নদীটিকে খুব সম্ভবত সরাসরি দেখেননি।

প্রথম নদীটির নাম কীভাবে তার মাথায় আসে, সেই ক্লাস সিক্সে শিক্ষকের মারের ভয়ে, সেটা বলেছেন হিমুর জবানিতে। কে না জানে, হিমু আসলে তারই অভিজ্ঞতা ও আকাঙ্ক্ষার মিশেলে তৈরি একটি চরিত্র। শিক্ষক একটি নদীর নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বলছিলেন 'আড়িয়াল খাঁ'। এমন নাম শুনে রাগান্বিত শিক্ষক আরেকটি 'সুন্দর' নদীর নাম জানতে চেয়েছিলেন। তখন কীভাবে যেন তার মাথায় 'ময়ূরাক্ষী' আসে। যদিও তিনি ও তার শিক্ষক নিশ্চিত ছিলেন না যে, এই নামে আদৌ কোনো নদী আছে কিনা। হুমায়ূন আহমেদ পরে লিখেছেন- 'ময়ূরাক্ষী নদীকে একবারই আমি স্বপ্নে দেখি। নদীটা আমার মনের ভেতর পুরোপুরি গাঁথা হয়ে যায়। অবাক হয়ে লক্ষ্য করি কোথাও বসে একটু চেষ্টা করলেই নদীটা আমি দেখতে পাই। তার জন্যে আমাকে কোনো কষ্ট করতে হয় না। চোখ বন্ধ করতে হয় না, কিছু না। একবার নদীটা বের করে আনতে পারলে সময় কাটানো কোনো সমস্যা নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমি নদীর তীরে হাঁটি। নদীর হিমশীতল জলে পা ডুবিয়ে বসি। শরীর জুড়িয়ে যায়। ঘুঘুর ডাকে চোখ ভিজে ওঠে।' এ ধরনের বর্ণনার কারণে কেউ কেউ লিখেছেন, হুমায়ূনের ময়ূরাক্ষী একটি 'কাল্পনিক নদী'। বাস্তবে ময়ূরাক্ষী ভারতের ঝাড়খ রাজ্যে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম ও মুর্শিদাবাদ হয়ে গঙ্গায় পড়েছে।

হুমায়ূন আহমেদ এভাবে নদী নিয়ে কল্পনা করেন ও করান, ভাবেন ও ভাবান। বৃহত্তর পরিসরে এ নিয়ে আরও সুনির্দিষ্ট অথচ বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। আমার বেদনা একটাই, আমাদের কালের এই কিংবদন্তির সঙ্গে নদী নিয়ে কথা বলার সুযোগ হয়নি। যেমন ব্রহ্মপুত্র নিয়ে তার প্রশ্নের উত্তরটি আমার কাছে ছিল- নদীর নাম এক স্থানে একটি গোষ্ঠীই দেয়। সভ্যতা যেহেতু নদীপথ ধরে ভাটি বা উজানের পানে ধায়, সেই পথরেখা ধরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে নামটিও। ব্রহ্মপুত্রের ক্ষেত্রে যে কারণে আমরা দেখি- চীনে এর নাম সাংপো। কারণ সেখানকার সভ্যতা ও সংস্কৃতি ভিন্ন। অরুণাচলে এর নাম একই কারণে সিয়াং। আর বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র প্রবেশের পর যখন প্রধান স্রোত অন্য একটি খাত ধরে প্রবাহিত হয়েছিল, নাম হয়েছিল 'যমুনা'। যমের বোন। ভূমিকম্প ও বন্যায় রাতারতি যে নদী জনপদের পর জনপদ নিশ্চিহ্ন করেছে, সে যমের বোন ছাড়া আর কী? া