কালের খেয়া

কালের খেয়া


জীবনের চেয়ে বড়

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০১৯      

শরাফত আলী

জীবনের চেয়ে বড়

হুমায়ূন আহমেদের চিত্রকর্ম

যুগে যুগে সাহিত্যের জয়গান গাওয়া হয়েছে। আর নর-নারীর প্রেম? সে তো সাহিত্যের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মনে হয় বিশ্বসাহিত্যের অর্ধেকের বেশি রচিত হয়েছে এই নর-নারীর সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। সেই প্রেম কত রকম, মিলন, বিরহ, জিঘাংসা, দেহগন্ধময় কিংবা পেল্গটোনিক।

হুমায়ূনের লেখা মূলত আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজকে ঘিরে। হুমায়ূন ছিলেন এক অসাধারণ গল্প বলিয়ে। ঝরঝরে প্রাণবন্ত ভাষায় তার গল্প এগিয়ে চলে।

এমনই এক মধ্যবিত্ত সমাজের পটভূমিতে বন্ধুত্ব আর প্রেম নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের 'কবি' উপন্যাসটি।

আতাহার, সাজ্জাদ, মজিদ তিন বন্ধু। যৌবনে সব বাঙালি যুবকের মতো তিনজনই কবি হতে চায়। এই তিন বন্ধুকে ঘিরেই 'কবি' উপন্যাস আবর্তিত। কেন্দ্রীয় চরিত্র অর্থাৎ নায়ক হিসেবে আতাহারকে বেছে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।

উপন্যাসের শুরুতেই আমরা আতাহারের দেখা পাই। বাবা রশীদ আলী সাহেবকে (অবসরপ্রাপ্ত হেডমাস্টার বিদ্যাময়ী গার্লস স্কুল) এড়িয়ে সে বাইরে বেরিয়ে পড়তে ব্যস্ত, গন্তব্য সাজ্জাদের বাসা। সাজ্জাদের বোন মিতুকে দেখলেই আতাহার তার রূপ নিয়ে কটাক্ষ করবে। নাশতা না খেয়ে আসার জন্য আতাহারকে অপমানসূচক কথা বলবে, আবার নাশতা বানিয়েও দেবে। এখান থেকেই আতাহারের প্রতি নীতুর তীব্র ভালোবাসার কথা পাঠক জানতে পারে। নীতুর আত্মসম্মানবোধ প্রবল বিধায় ভালোবাসার কথা সে প্রকাশ করতে পারে না। তার আবেগ পরিণত হয় নীরব কান্নায়।

সমস্যা হলো হোসেন সাহেব, সাজ্জাদের বাবা। তার সামনে পড়লে দীর্ঘ বক্তৃতা শোনার ভয় রয়েছে।

তিন বন্ধুর মধ্যে সাজ্জাদের বাবাই বিত্তশালী। তার জীবনে রয়েছে গভীর ট্র্যাজেডি। শুধু দৈহিক চাহিদা পূরণ না হওয়ার কারণে তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যায়। সাজ্জাদ এক অভিমানী, কল্পনাপ্রবণ, স্বপ্নবাজ যুবক। কল্পনায় সে শহর সাজাতে চায় ফুলের বাগান দিয়ে। বাবার বন্ধুর সঙ্গে মায়ের অনৈতিক কার্যকলাপ শিশু সাজ্জাদ দেখে ফেলে। ফলে এক সময় সে মনোরোগীতে পরিণত হয়। সাজ্জাদের খালার মেয়ে লীলাবতী তার প্রেমে পাগল। অথচ তার নগ্ন অসম্ভব সুন্দর একটি ছবি পাঠায়। অপমানিত হয়ে লীলাবতী সব যোগাযোগ ছিন্ন করে। এখানে হুমায়ূনের অসম্ভব সুন্দর এপিগ্রাম- 'সাজ্জাদ দূর থেকে খুবই ভালো, কাছ থেকে খারাপ' এই তৈলচিত্র তৈরি করতে এসেই সাজ্জাদের সঙ্গে পরিচয় হয় নুড মডেল কণা। সাজ্জাদ তাকে পছন্দ করে। সহজিয়া গোত্রের একটি মেয়ে, সাজ্জাদও তাই। সাজ্জাদের বাবার প্রভাবে সাজ্জাদের চাকরি হয়। তবে এক দিনের বেশি সে চাকরি করতে পারে না। একদিন তার মাকে ফোন করে জানায়, সে বিবাহিত মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। তার মা বিস্ময় প্রকাশ করলে সাজ্জাদ তার মায়ের নিজের কক্ষ স্মরণ করিয়ে দেয়। এখানে পাঠক ক্রমশ বুঝতে পারে সাজ্জাদ একজন মনোরোগী। কৈশোরের তীব্র ঘৃণা ও অভিমান সাজ্জাদকে মাদকাসক্তির অন্ধকার জগতে ঠেলে দেয়। তার কাব্যচর্চায়ও এর প্রভাব পড়ে। জীবনানন্দ ও রবার্ট ফ্রস্ট তার প্রিয় কবি। তারা দু'জনই তার মতে অন্ধকারে কবি। হুমায়ূন ঠাসবুননে এই মনোজাগতিক বিশ্নেষণ তুলে ধরেছেন। পাঠকের কখনও ক্লান্তি আসে না। বেহিসাবি জীবনযাপনের খেসারত হিসেবে একসময় সাজ্জাদকে যেতে হয় মাদকমুক্তি হাসপাতালে।

আতাহারের বড় বোন মনিকা বিবাহিত। স্বামীর সঙ্গে সে আমেরিকায় থাকে। আতাহারের বাবা-মায়ের মৃত্যু হয়। মিলির বিয়ে হয়ে যায় মধ্যবিত্ত পরিবারে। মনিকা আমেরিকা থেকে আতাহার ও তার ছোট ভাই ফরহাদের জন্য টিকিট পাঠায়। তবে ফরহাদকে পাঠিয়ে দেয়, আতাহার নিজে যায় না। তার উপলব্ধি 'কবিরা দেশের আত্মা, আত্মা ছাড়া দেশ বাঁচে না।'

তিন বন্ধুকে আমরা একসঙ্গে পাই বেশ পরে। মজিদ নেত্রকোনা গার্লস কলেজে ইসলামের ইতিহাসের অধ্যাপক। সেখানে এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তি ওয়াদুদ সাহেবের বাড়ি থাকে। এলাকার কেউ তার কাব্য প্রতিভার কথা জানে না। ওয়াদুদ সাহেবের মেয়ে জাহেদাকে পড়ায়। জাহেদাকে সে অসম্ভব পছন্দ করে; কিন্তু ভালোবাসা প্রকাশ করার মতো সাহস নেই। তার ভালোবাসা সীমাবদ্ধ শুধু কল্পনায়। ওয়াদুদ সাহেবের বাড়িতেই সে থাকে। আতাহার আর সাজ্জাদ বেড়াতে আসে মজিদের কাছে। পূর্ণিমা রাতে তিন বন্ধু সিদ্ধির শরবত খেয়ে চূড়ান্ত মাতলামি করে। এখানে তিন বন্ধু যেন আউল-বাউল সহজিয়া সম্প্রদায় যা অনেকটা পাশ্চাত্যের বিট সম্প্রদায়ের প্রতিচ্ছবি। আর হূমায়ূনের জোছনাপ্রীতির কথা কে না জানে? তিন বন্ধুকে হয়তো তাই তিনি পূর্ণিমাতেই একত্রিত করেছেন। ওয়াদুদ সাহেবের দৃষ্টিতে এই মাতলামি ধরা পড়ায় মজিদের চাকরি যায়। ঠিক চলে আসার মুহূর্তে জাহেদা পানি নিয়ে আসে। অশ্রুসিক্ত চোখে মজিদের প্রতিশ্রুতি আদায় করে আর কখনও নেশা না করার এবং মমতাময়ী প্রেমিকার মতো মজিদকে জড়িয়ে ধরে। মজিদ থেকে যায়। তার জীবনের সঞ্চিত সব কবিতা সে ছিঁড়ে ফেলে। এখানেও এপিগ্রামে হুমায়ূন অনবদ্য- 'একটি প্রিয় জিনিস পেতে হলে আরেকটি প্রিয় জিনিস ছাড়তে হয়।'

উপন্যাসের প্রয়োজনে পত্রিকা সম্পাদক গনি সাহেব, চিত্রশিল্পী মোসাদ্দেক সাহেব, পা হারানো দোকানদার আব্দুল্লাহ সাহেব- তাদের চরিত্রও এসেছে। মাঝেমধ্যেই হুমায়ূন তাদের চারিত্রিক বর্ণনায় অসাধারণ। গনি সাহেব পত্রিকার সম্পাদক। তিন বন্ধুর কবিতা ছাপা না হলে তারা ক্ষিপ্ত হয়। তবে তার পড়ালেখায়ও মুগ্ধ হয় আতাহার।

চিত্রশিল্পী মোসাদ্দেক সাহেব। যার দেয়ালে ঝোলানো শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বাঁধানো চিঠি। প্রতিভার অব্যবহারে বিরক্ত হয়ে লেখা। দুই পা হারানো আব্দুল্লাহ সাহেব হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী। এক বৃষ্টির দিনে আশ্রয় নেওয়ার সূত্রে আতাহারের পরিচয়। উপন্যাসের শেষও সেখানে।

উপন্যাসের শেষ দিকে হুমায়ূন অসাধারণ ক্লাইমেক্স তৈরি করেছেন।

সাজ্জাদের বাবা একেবারেই ভেঙে পড়েন। মেয়ের কাছে তার ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেন। যদিও তাকে ব্যর্থতা বলা যায় না। সাজ্জাদ মানসিক হাসপাতালে, নীতুর ঠিক হয়ে যাওয়া, বিয়ে ভেঙে যাওয়া সব মিলিয়ে হতাশা চূড়ান্তভাবে গ্রাস করে তাকে। নীতু বাবার পাশে দাঁড়াতে চায়। সে আতাহারের পাশে দাঁড়াতে চায়। সে আতাহারকে পাগলের মতো খোঁজাখুঁজি করে ভালোবাসার কথা জানানোর জন্য। কিন্তু আতাহারের খোঁজ পাওয়া যায় না।

ছোট ভাই ফরহাদকে পেল্গনে উঠিয়ে আতাহার একা হয়ে যায়। হঠাৎ উদ্দেশ্যহীনভাবে উপস্থিত হয় আব্দুল্লাহ সাহেবের দোকানে। জ্বরে প্রায় অচেতন আতাহার নীতুকে ফোন করতে চায়; কিন্তু নম্বর মনে পড়ে না। তখন সে আব্দুল্লাহ সাহেবের স্ত্রীকে বলে- 'নীতুকে একটা কথা বলবেন। ওকে বলবেন, আমি যে দিনের পর দিন সাজ্জাদের পেছনে ঘুরতাম, ওদের বাড়িতে যেতাম, সকালে ঘুম থেকে উঠেই নাশতা খাওয়ার জন্য চলে যেতাম, সেটা শুধু ওকে দেখার জন্য। অন্য কিছু নয়।'

পর মুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দেয়, যদি সে বেঁচে যায়, তাহলে বলার দরকার নেই।

আতাহার, সাজ্জাদ, মজিদ তিন বন্ধুর জয়গানের এক অনন্য উপন্যাস 'কবি'।

প্রেম? মজিদ প্রেমে সফল। বিয়ের কার্ড পাঠিয়ে অনুরোধ করে বন্ধুদের- দয়া করে আসিস না।

সাজ্জাদ প্রেমেই পড়তে পারেনি। কৈশোরে মায়ের দেহগন্ধময় প্রেম মেনে নিতে না পেরে হয়েছে মনোরোগী। আতাহার প্রেমিকাকে বলতে পারে কি প্রেমের কথা। সে এক পেল্গটোনিক প্রেম। পাওয়া না পাওয়ার প্রেম। গভীর বন্ধুত্ব। কি নেই 'কবি'তে। আলো এবং অন্ধকার জীবনের পরিস্কার দুই দিক ধরা আছে এখানে। হুমায়ূন মূলত গদ্য লেখক হলেও তার হৃদয়ে ছিল কাব্যের প্রতি গভীর মমতা। যারা তার লেখালেখির সম্পর্কে অবহিত, তারা জানেন কবিতা দিয়েই তার লেখালেখি শুরু। তার হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা কবিমন তাকে এই উপন্যাস লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে বলে ধারণা করা সঙ্গত।

কিছুই কি সমালোচনার নেই 'কবি'তে? ১. মজিদের পারিবারিক জীবনের বর্ণনা পেতেই পারত পাঠক। ২. শেষ অংশে পাঠকদের রেখেছেন অতৃপ্ত। তবে খুলে দিয়েছেন কল্পনার বিশাল দিগন্ত। ৩. সাজ্জাদ কি সুস্থ হয়ে ফিরল? ৪. আতাহার আর মিলির কি দেখা হলো? তিন বন্ধু আবার কি একসাথে প্রাণখোলা হাসি আর আড্ডায় মেতে উঠল? ৫. সার্থক উপন্যাসের উদাহরণ হতে পারে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কবি'। যেখানে মৃত্যুর আগে জীবনের শেষ কথা বলে গেছেন- 'জীবন এত ছোট কেন রে বাহে!'

পরিশেষে বলা যায়, হুমায়ূনের অসাধারণ সব এপিগ্রাম এক নিঃশ্বাসে পড়ে যাওয়ার মতো, বন্ধুত্বের জয়গানসমৃদ্ধ, প্রেমের সব ধরনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগসমৃদ্ধ এক অব্যর্থ উপন্যাস; যাতে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় আছে উপচেপড়া জীবন- মানুষের জীবন। হুমায়ূনের ভাষার জাদুতে এই জীবন কখনও কখনও উপন্যাসের কাঠামো ছাড়িয়ে আরও বড় হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে মহাকাব্যিক।