কালের খেয়া

কালের খেয়া


বিচ্ছিন্নতাবোধ ও বিমূর্ততার গালগল্প

প্রদর্শনী

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯      

দীপ্তি দত্ত

বিচ্ছিন্নতাবোধ ও বিমূর্ততার গালগল্প

'লেজি ইভিনিং' [ওয়াটারকালার]

গ্যালারি দ্বীপে চলছে শিল্পী নাজিব তারেকের একক চিত্রপ্রদর্শনী। প্রদর্শনীর শিরোনাম 'Anybody can do it, please do it...। প্রদর্শনীর মূল শিরোনামের একটি সহ-শিরোনাম আছে- 'বিমূর্ততার গালগল্প'। পাঠক প্রদর্শনীর শিরোনাম থেকে আপনাদের মনে কি কোনো প্রশ্ন বা আগ্রহ তৈরি হচ্ছে? যদি হয়ে থাকে, তবে আমার বাকি লেখাটুকু এখন আর না পড়ে চলে যান গ্যালারিতে। শিল্পকর্মগুলো দেখে আসুন এবং ইচ্ছে হলে শিল্পীর সঙ্গেও কথা বলতে পারেন। তারপর এসে আমার বাকি লেখাটুকু পড়া যাক। কারণ আমি বিশ্বাস করি, আপনার নিজস্ব ভাবনার যে একটা শক্তি আছে, প্রদর্শনী দেখে মিলিয়ে নিলে তা আপনাকে আত্মবিশ্বাসী করবে এবং ছবির সঙ্গে আপনার নিজের একটা বোঝাপড়া তৈরি করবে। তারপরই অন্যের মতামত জানা যেতে পারে। তাহলে দর্শক ও পরে পাঠক হিসেবে আমার মতামতের সঙ্গে আপনার মতের একটা সংলাপ তৈরি হতে পারে।

লক্ষ্য করুন আমার কাছে কোনো না কোনোভাবে প্রদর্শনীর শিরোনাম গুরুত্ব পেয়েছে। শিরোনামকে আমরা দু'ভাবে দেখতে পারি- এক. শিল্পীর শিল্পকর্মের প্রতি সহজতাবোধ, যা দ্বারা তিনি সবাইকে এসব শিল্পকর্ম করার আমন্ত্রণ জানান; আর দুই. তিনি দর্শককে ব্যঙ্গ করেন বা যাকে আপাতদৃষ্টিতে সহজ বলে দর্শক ভাবেন, তা কতটুকু সহজ তা বুঝে নিতে বলেন! অর্থাৎ দ্বিতীয়ত, কাজ করে শিল্পীর অহমবোধ। শিল্পীর এই দ্বৈত অবস্থান সহ-শিরোনাম দ্বারা কোনো একটি দিকে কি ঝুঁকে পড়ে? নাকি তিনি দুটিকেই নস্যাৎ করে দেন কর্মী-শিল্পী হিসেবে, যখন তিনি উচ্চারণ করেন- 'বিমূর্ততার গালগল্প'? নাকি এই তিনের টানাপোড়েন থেকেই আক্রান্ত হয়ে পড়েন বিচ্ছিন্নতাবোধে? শিরোনামকেন্দ্রিক এসব প্রসঙ্গকে বিবেচনায় নিয়ে যেমন শিল্পকর্মগুলোকে দেখা যেতে পারে, তেমনি শিরোনাম বাদ দিয়ে শুধু শিল্পকর্মগুলোকেও আমরা বিবেচনায় নিতে পারি। আবার শিল্পীর দুটি প্রবণতার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কও আমাদের ভাবনার অন্তরাজুড়ে থাকতে পারে; বা থাকবেই।

শিরোনাম বা টেক্সট বাদ দিয়ে যদি আমরা গ্যালারিতে প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলো দেখি, তাহলে নিরেট শিল্পকর্মগুলো আমাদের সামনে কীভাবে উপস্থাপিত হয়? গ্যালারিতে শিল্পকর্মের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। প্রায় অণুচিত্রণধর্মী এসব কাজ গ্যালারির পরিধি বাড়িয়ে দিয়েছে মনস্তাত্ত্বিকভাবে। ফলে প্রায় ৮৯টি কাজ গ্যালারিতে স্থান পেলেও পরিসর বিবেচনায় শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হয় না।

প্রশ্ন হলো, প্রায় অনুচিত্রণধর্মী এসব কাজে শিল্পীর প্রবণতা কী? তিনি কি অনুপুঙ্খ, সময়সাপেক্ষ কোনো শারীরিক শ্রমনির্ভর শিল্পকর্ম করেছেন? আমার উত্তর অন্তত এক কথায় না। অতি দ্রুত সময়ে (অন্তত দৃষ্টিগ্রাহ্য অনুভূতি তাই) স্বতঃস্ম্ফূর্ত প্রবণতাকে প্রশ্রয় দিয়ে তিনি যে ধরনের শিল্পকর্মগুলো করেছেন, তাতে বিস্তারিত বিবরণ বা যাপিত সময়ের দীর্ঘ কোনো ইতিহাস-বোধ তার কাজে নেই। আছে জাগরিত মুহূর্ত-বোধ। এই জাগরণ ও মুহূর্তের বোধ শিল্পী কীভাবে সঞ্চয় করেন নিজের মধ্যে, এই প্রশ্নটিই তার কাজে মৌলিক প্রবণতা হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়।

এই উপস্থিতির ধরন একটু জটিল। বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পইতিহাসে বিমূর্ত শিল্পের প্রাসঙ্গিকতা ইতোমধ্যে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার শিল্পরূপ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে। আমাদের আগ্রহের বিষয় হলো শিল্পী নাজিব তারেক তাদেরই একজন, যিনি শিল্পী কিবরিয়ার বিমূর্ত শিল্পের প্রাসঙ্গিকতা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। তার সেই ব্যাখ্যানে 'বিচ্ছিন্নতাবোধ', 'আধ্যাত্মিক বা আত্মিক সংকট', নৈতিক পরিবর্তন', 'অবক্ষয়', বা 'অনিশ্চিত জীবনবোধ'-এর মতো শব্দগুলো আমাদের চৈতন্যকে বিদ্ধ করে এবং ভাবতে বাধ্য করে। এই শব্দগুলো কেবল কতকগুলো ধ্বনি সমষ্টি নয়, একটি নির্দিষ্ট সমাজের সাংস্কৃতিক জ্ঞান-কাঠামোরও চিহ্ন। এই চিহ্নগুলোকে কীভাবে পাঠ করেছেন শিল্পী নাজিব তারেক, তা দিয়েই আমরা তার শিল্পবোধের সাংকেতগুলো পাঠ করার চেষ্টা করতে পারি।

শিল্পী কিবরিয়ার বিমূর্ত শিল্পের ভাষা পাঠ করতে গিয়ে শিল্পী নাজিব গুরুত্ব দিয়েছেন, প্রত্যেক শিল্পীর বা দেশের নিজ নিজ প্রাসঙ্গিকতার ওপর। ফলে তিনি ইউরোপীয় বিমূর্ত শিল্পের বাস্তবতা এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের রাজনীতিতে দেশভাগ ও দেশভাগ-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের শিল্পবাস্তবতাকে এক মনে করেন না। এখানে কনটেক্সট বা প্রসঙ্গের ভিন্নতার কারণে নির্মিতির যে ভিন্ন রসায়ন শিল্পীর মধ্যে চলে এবং আপাতদৃষ্টিতে 'রূপ' বিমূর্ত হলেও তার যে চেতনাগত মৌলিকত্ব টের পান, তাকে নাজিব তারেক গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনেন। শিল্পী নাজিব তারেকের এই যে কনটেক্সচুয়াল স্টাডি- এই পথেই আমরা তার কাজকে বোঝার চেষ্টা করতে পারি; যা বাংলাদেশের কিবরিয়া পরবর্তী প্রজন্মেরও বিমূর্ত শিল্পের ভাষা ও তার নির্মিতির পেছনের রাজনীতি বুঝতে সহায়িকা হিসেবে কাজ করতে পারে।

শিল্পী নাজিব তারেক প্রগতিশীল পরিবারের সুবিধা-সূত্রে প্রায় শৈশব থেকেই বিশ্বশিল্পের এক বিশাল ভাণ্ডারের সঙ্গে যেমন পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান, তেমনি সাহিত্যের সঙ্গেও তার পরিচয় ঘটে। শিল্পীর মামা বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিল্পীর মতে, নানা'র প্রশ্রয় না পেলে দিনাজপুরে তার মামার যে শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়েছিল, তা সম্ভব হতো না। ফলে বলা যায়, শিল্পী নাজিব তারেক পারিবারিক সূত্রেই একটি তাত্ত্বিক সংস্কৃতির আবহে বড় হয়েছেন এবং নিঃসন্দেহে এই তাত্ত্বিক সংস্কৃতির ভিত্তি বামপন্থি রাজনীতির সংস্কৃতি। একই সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হয়, সাময়িক হলেও দেশভাগকালে বামপন্থি রাজনীতির 'ধর্ম' অর্থে 'জাতি' প্রশ্নে মুসলিমদের সঙ্গে সহাবস্থানের বিষয়টি। ফলে শিল্পী নাজিব তারেকের বিমূর্ত শিল্প ও তার গালগল্পের কনটেক্সট বুঝতে এই রাজনীতির সংস্কৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

দেশভাগ, পাকিস্তান পর্ব ও পরে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্বাধীনতা লাভ- এই তিন ধাপেই এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, এ দেশের প্রগতিশীল, বিশেষ করে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব মূলত বামপন্থিদের হাতে ছিল। আবার দ্বিজাতিতত্ত্বের রাজনীতি আক্ষরিকভাবেই সক্রিয় ছিল পাকিস্তান পর্বে। এ দ্বিমুখী বাস্তবতা থেকে সৃষ্ট সংকটের মুখে প্রগতির শেকড়- ধর্ম ও জাতীয়তাবোধ বাদ দিয়ে ইউরোপীয় দীপায়নে (এনলাইটেনমেন্ট) আশ্রয় নেয়। এই সংকটকে বাম রাজনীতি তার আন্তর্জাতিকতাবোধের তত্ত্বের বাইরে দাঁড়িয়ে কতটুকু শনাক্ত করতে পেরেছিল, তা একটি জিজ্ঞাসা। তাই এই দুটি পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে বলা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক গুণাবলির প্রাথমিক অভ্যুদয় হয়, এই উপমহাদেশের বাম রাজনীতির দুর্বলতা বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও দ্বিজাতিতত্ত্বের কারণে জন্ম নেওয়া উদ্বাস্তু সংস্কৃতি যে জায়গায় আপাতদৃষ্টিতে একবিন্দুতে মিলিত হয়, সেই দৃশ্যমান প্রগতির ওপর দাঁড়িয়ে। যে বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার শিল্পী নাজিব তারেক।

প্রশ্ন হলো, বাম রাজনীতির সাংস্কৃতিক কনটেক্সট কী? সুনিশ্চিতির দাবি থেকে নয় বা বিতর্ক প্রত্যাখ্যান করেও নয়, তবে উত্তরাধুনিকতাবাদীদের বাম রাজনীতির ওপর ইউরোপীয় দীপায়ন ধারণা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। যেখানে 'বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের নিশ্চিতি ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং সমাজের প্রগতি সম্বন্ধে ধারণা, ইউরোপীয়দের কর্তৃত্ববাদী করে তুলেছে।'

এই কর্তৃত্ববোধ আমরা ইউরোপীয় আলোকায়নের ধারণা থেকে ঔপনিবেশিক শাসনসূত্রে গ্রহণ করেছি; কিন্তু শ্রেণি অধিকারের দাবিকে আমরা বর্জন করেছি রাশিয়ার পতনের সঙ্গে সঙ্গে; যা মূলগত অর্থে কর্তৃত্ববোধেরই প্রকাশ। এই পতন ও অর্জন মূলত একশ্রেণির বাম রাজনীতির ধারকদের শ্রেণি চরিত্রকেই উন্মোচিত করে। ফলে রাশিয়ার উত্থান পর্বে কর্তৃত্বপরায়ণতার যে ঢেউ ঔপনিবেশিক ভারতীয় উপমহাদেশে এসে লেগেছিল, তারও খণ্ডিত সংস্কৃতি নিয়ে দেশভাগ এবং আরও পরে প্রায় নস্টালজিক শ্রেণিবোধ নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রগতিশীল সংস্কৃতি মার্কসীয় চেতনার নয়, বরং অনেক বেশি তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়ার কর্তৃত্ববোধের সংস্কৃতির অনুগামী, যার স্মৃতি ও অহমিকা নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রগতিশীল সংস্কৃতির আত্মপ্রকাশ। ফলে যথারীতি রাশিয়ার পতন ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানকালে এ অঞ্চলের প্রগতিশীলদের মধ্যে কর্তৃত্বপরায়ণতার স্মৃতিটুকু থেকে যায়; অহমিকা রূপান্তরিত হয় গ্লানিতে, যা তাকে সংখ্যালঘুর মনস্তত্ত্বের দিকে ঠেলে দেয়। শিল্পী নাজিব তারেক এই প্রগতিশীল সংস্কৃতিরও উত্তরাধিকার।

তাই আমরা তার অনুচিত্রধর্মী কাজ দেখি, তা আরও ভালো করে দেখার জন্য নিকটবর্তী হই। নিকটবর্তী হওয়ার পর আমাদের প্রশ্ন তৈরি হয়, শিল্পী কী করতে চেয়েছেন? এর উত্তর শিল্পী দেন তার শিরোনামে, তার লিখিত বয়ানে। বৌদ্ধিক অবস্থান তার ছবিকে বর্ণিত করে, তার অবস্থান স্পষ্ট করে। অবস্থান স্পষ্ট করার এই চেষ্টা বা সহজাত স্বভাব আর তার কাজকে আদতে বিমূর্ত রাখে না। অথচ তিনি দৃশ্যত বিমূর্ত। কেন বিমূর্ত? কোন ধরনের 'বিচ্ছিন্নতাবোধ', 'আধ্যাত্মিক বা আত্মিক সংকট', 'নৈতিক পরিবর্তন', 'অবক্ষয়' বা 'অনিশ্চিত জীবনবোধ'- শিল্পীকে তাড়িত করে এবং ভাষাকে অবোধ্য করে দেয়?

অথচ আমরা দেখি কর্মে তিনি বিমূর্ত হলেও বয়ান দ্বারা একটি কার্যকারণ নির্মাণ করতে চান। এই কার্যকারণ নির্মাণের প্রবণতা, এই যৌক্তিক অনুষঙ্গ খোঁজের আকাঙ্ক্ষ এবং অর্থহীন শুদ্ধ নান্দনিক-বোধ অস্বীকার করতে না পারার দ্বান্দ্বিক অবস্থান একটি সর্বগামী প্রচেষ্টারও স্মারক; যা ইউরোপীয় দীপায়নসূত্রকেও যেমন স্মরণ করিয়ে দেয়, তেমনি বিশ্বায়নের লিবারেল ধারণারও অনুগামী। এই দ্বন্দ্ব কি বাংলাদেশের প্রগতিশীল সংস্কৃতিরও বাস্তবতা?

ফলে শিল্পীর নিজের কর্মজীবনের ধারাবাহিকতায় তার কাজগুলো দেখলে আশির দশক ও বর্তমান কাজের একটি বিবর্তিত প্রাসঙ্গিকতা আছে কি-না তাও বোঝার চেষ্টা করার সুযোগ থাকে। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ কি ব্যক্তিক, নাকি রাষ্ট্রিক অর্থে সামষ্টিক? দীর্ঘ ও সামষ্টিক এই চর্চা কি বিচ্ছিন্নতাবোধকেও আলঙ্কারিক করে তোলে, যা কেবল শৈলী প্ররোচনায় আশ্রয় পায়।

প্রদর্শনীটি চলবে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। পাঠক এবার আমার মতামত ও আপনাদের পঠন প্রক্রিয়ার মন্তাজে শিল্পী নাজিব তারেকের কাজ সম্পর্কে নতুন আরেকটি ধারণা-বিন্দু তৈরি হবে কি?