কালের খেয়া

কালের খেয়া


হ্যাঁ অথবা না এর গল্প

বইয়ের ভুবন

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯      

শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত

হ্যাঁ অথবা না এর গল্প

হ্যাঁ অথবা না এর গল্প, লেখক :রাজিব মাহমুদ, প্রকাশনী :চিরন্তন প্রকাশ, প্রচ্ছদ :ধ্রুব এষ, প্রকাশকাল :ফেব্রুয়ারি ২০১৯, মূল্য :২৫০ টাকা

যারা অতিপ্রচলিত গল্পসাহিত্যের আগ্রহী পাঠক, যারা প্রেম-অপ্রেম, বিরহ-মিলন, ভালোবাসা-বিচ্ছেদের চক্রযানে সদা ঘূর্ণায়মান, তাঁরা রাজিব মাহমুদের প্রথম গল্পগ্রন্থ 'হ্যাঁ অথবা না এর গল্প' সম্পর্কে কী বলবেন? সম্ভবত তাদের কাছ থেকে তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া উঠে আসতে পারে-

এক- প্রথম গল্পটি পড়েই তাদের মনে হতে পারে যে আর এগোনো উচিত হবে না। কারণ ফার্ডিন্যান্ড ডি সস্যুরের পর দ্বিতীয় গল্পে এডমন্ড হুসার্ল (Husserl) এবং তার পরে নোম চমস্কি এসে যাবেন অবধারিতভাবে। নিছক নিপাট গল্প উপভোগ করার জন্য এঁরা আদৌ অপরিহার্য নন।

দুই- প্রথম গল্পটি (স্বপ্নবড়ি) আদ্যন্ত অপ্রচলিত, নিঃসন্দেহে উপভোগ্য এবং এটি পাঠ করার পর আমরা পরের গল্পটিতে যাব।

তিন- প্রত্যাখ্যান ও গ্রহণের মাঝে যে আলো-আঁধারির বর্তমান, গল্পটি আমাদের সেই অনিশ্চিত রাজ্যে নিয়ে যায়, পাঠক বুঝতে পারে না যে সে এগোবে, না পিছিয়ে যাবে।

প্রতিক্রিয়া যাই হোক না কেন, এ বিষয়ে তিনজন ভিন্ন ভিন্ন পাঠকই একমত হন, গল্পগুলো পাঠকের দিকে একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, এবং তাদের চিন্তা-ভাবনাকে উদ্বুদ্ধ করে। যেভাবে ব্রেখ্‌ট-এর নাটক আমাদের 'ponder and reflect' করতে বাধ্য করে, ঠিক সেভাবেই রাজিব মাহমুদের 'হ্যাঁ অথবা না এর গল্প'-এর গল্পগুলো দাবি করে মনন-সমৃদ্ধ বিশ্নেষণের। লেখক প্রথম গল্পে যখন লেখেন, 'ভাষাকে ধরা-ছোঁয়া যায় না। অথচ এই ধরা-ছোঁয়া জগতের প্রায় প্রতিটি বস্তু-অবস্তুকে ভাষার ধ্বনিতে, শব্দে-বাক্যে ধরা যায় বা অন্তত ধরার চেষ্টা করা যায়। অর্থাৎ অবস্তু ধারণ করছে বস্তুকে'; তিনি আমাদের চেতনাকে উস্কে দেন এবং আমরা ধ্বনি-শব্দ-বাক্য-সংক্ষেপে ভাষার প্রয়োগ ও প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠি। দ্বিতীয় গল্প 'সত্যাসত্য' পাঠের পর্বে আমরা অনুরূপ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হই। লেখকের ডিটেইল-সমৃদ্ধ পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনাটুকু এ রকম-

'চশমার ফাঁক দিয়ে দেখলাম মচমচে খোলসের ভেতর গাদাগাদি করে বসে আছে ছোটো ছোটো নরম হলুদ আলুগুলো; আর ওগুলোকে পেঁচিয়ে-জড়িয়ে আছে সেদ্ধ-সবুজ ধনেপাতা। প্রতিদিনকার অতি চেনা এই দৃশ্যটা চোখের বাইরেই ছিল এতদিন।'

এটি পড়ে কিন্তু আমরা আর নির্বস্তুর বিশ্বে থাকি না বরং বস্তুনির্ভর হয়ে উঠি পুরোপুরি। এই বস্তুনিষ্ঠতাই আমাদের প্ররোচিত করে প্রশ্ন রাখতে। এই গল্পে লেখক নিজেই উত্থাপন করেন একটি প্রশ্ন, 'আচ্ছা এই আলুগুলোর জীবনের সত্য কী?' আমি সচেতনভাবেই 'সত্যাসত্য' গল্পটির এই অংশটি উদ্ধৃত করেছি যেখানে বস্তুঘন বর্ণনাই প্রমাণ করে যে লেখক চিন্তাশীল নিঃসন্দেহে, অর্থাৎ নিছক কল্পনাবিলাসী নন।

ডিটেইলের প্রতি এই আনুগত্য সাম্প্রতিক গল্প-উপন্যাসের একটি মূল্যবান সম্পদ। গুন্টার গ্রাস ও গ্যাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেজ তাঁদের উপন্যাসগুলোতে একটির পর একটি ডিটেইল যুক্ত করে বাস্তবের সূক্ষ্ণতা ও জটিলতাকে মূর্ত করে তোলেন। আমাদের আপন লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও এই ডিটেইলের প্রগাঢ় ভক্ত। আরও একজন কথাসাহিত্যিকের কথা এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, তিনি সদ্যপ্রয়াত রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়। এঁরা সবাই এঁদের ডিটেলগুলোকে স্বতন্ত্র জীবন দিয়ে গেছেন। তবে এঁদের সবারই বৈশিষ্ট্য হলো, এঁরা তাদের ডিটেইলে সৃষ্ট বাস্তবের ঠাসবুনোটটি এমনভাবে তৈরি করেছেন যে তা নিছক দর্শন-নির্ভরতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।

পাঠক হয়তো একটি প্রশ্ন, এমনকি অভিযোগ উত্থাপন করতে পারেন। তা হলো, গল্পলেখক কি ঘোরতর উত্তরাধুনিক হওয়ার তাগিদে তার বইয়ের কয়েকটি আখ্যানে, যেমন ধরা যাক 'ক্যাফে ইনসমনিয়া'তে তত্ত্ব, তথ্য, সমাজদর্শনের মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ ঘটিয়েছেন যা নান্দনিকতাকে বিঘ্নিত করে? আমার মনে হয় সেটি ঘটেনি। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে টমাস মান ও গুন্টার গ্রাসের লেখাতেও তত্ত্ব, তথ্য, দর্শন জোরালোভাবে উপস্থিত, তবে তা সৃজনেরই স্বার্থে। মান যে রকম তার প্রসিদ্ধতম এপিক নভেল 'Magic Mountain' ' গড়েই তুলেছেন তর্ক-বিতর্কের আশ্রয় নিয়ে; কিন্তু এতে তার গভীর সৃজনমাত্রা ব্যাহত হয়নি একটুও। তার আরেকটি কালজয়ী উপন্যাস 'Dr. Faustus'-এর শেষ কয়েকটি পাতা সম্পূর্ণভাবে সমাজচিন্তার প্রতি নিবেদিত। সেখানেও নান্দনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়নি। উপরন্তু যারা গুন্টার গ্রাসের 'Die Rattin' পড়েছেন, তারা বুঝেছেন যে তর্কনির্ভর সংলাপ কীভাবে উপন্যাসটির সৌধ নির্মাণ করেছে।

এবার দেখা যাক রাজিবের 'ক্যাফে ইনসমনিয়া' গল্পের ইলিশ মাছের দিকে। লেখক বলছেন-

'শিশু-ইলিশদের জন্মের পরপরই বাবা মা'র কাছ থেকে আলাদা করে এনে রিজার্ভেশনে রাখা হয়। ফলে মা ইলিশ জন্মের পরে তার সন্তানদের আর দেখতে পায় না। ফলশ্রুতিতে সমাজের সব শিশু-ইলিশকেই মা-ইলিশ নিজের সন্তানের মত দেখতে শেখে। ক্ষমতাসীন ইলিশেরা রাষ্ট্রীয়ভাবে তৈরি করেছে এই নিয়ম। এর মাধ্যমে প্রতিটি শিশু-ইলিশের দায়িত্ব নেয় রাষ্ট্র।'

না, এখানে দার্শনিকতার কোনো আধিক্য চোখে পড়ে না। বরং আমরা পাই বস্তুঘন কল্যাণ রাষ্ট্রের চরম পরাকাষ্ঠা।

হ্যাঁ অথবা না এর গল্প-এর সবক'টি গল্পই আমি মন দিয়ে পড়েছি। এর একটি গল্পকেও আমার জ্ঞান-বিতরণী বটিকা মনে হয়নি। তবে সব থেকে ভালো লেগেছে 'শ্রেণিশত্রু' গল্পটি। গদ্য এখানে নির্ভার কিন্তু তীব্র, চেতনা টানটান, এবং কাহিনি নির্মাণের রীতি চমকপ্রদ। এই গল্পেরই কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করে লেখাটি শেষ করছি যেখানে বাসনা ও চৈতন্য একে অন্যের হাত ধরে গড়ে তুলেছে নির্বস্তু ও বস্তুর সুনিপুণ যুগলবন্দি-

'এর পরের সময়টুকু আর আমাদের কারোরই নিয়ন্ত্রণে থাকে না। একটা ঘন-উষ্ণ চোরাবালির ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছিলাম দু'জনে।...প্রাপ্তবয়স্ক শরীরের গোপন গ্রন্থিগুলো একে একে খুলে যাচ্ছিল একে অন্যের গভীর অথচ কাল্পনিক স্পর্শে...একটা অর্ধচেতন ধ্যানমগ্নতায় আস্তে আস্তে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া আসলেই আর কিছু করার ছিল না আমাদের।'