কালের খেয়া

কালের খেয়া


সাসান্দ্রা নদীর পাড়ে

বইয়ের ভুবন

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯      

আঞ্জুমান রোজী

সাসান্দ্রা নদীর পাড়ে

ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা, লেখক :কাজী রাফি, প্রকাশনী :অনিন্দ্য প্রকাশনী, প্রকাশকাল :ফেব্রুয়ারি ২০১০, মূল্য :৫০০ টাকা

'সাসান্দ্রা' শব্দটির প্রতি কৌতূহলবশত কাজী রাফির 'ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা' উপন্যাসটি পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। পুরো উপন্যাসটি পড়ার পর জানতে পারলাম, সাসান্দ্রা একটি নদীর নাম। যদিও জীবনানন্দের ভাষায় 'নদীর মানে স্নিগ্ধ শুশ্রূষার জল'। কিন্তু এই নদীর বিষয়-বৈশিষ্ট্য ভিন্ন আবহের। লেখকের এক সাক্ষাৎকার থেকে জানতে পারি, আফ্রিকার চারটি প্রধান নদীর একটি এই সাসান্দ্রা। নদীর কোল ঘেঁষেই উপন্যাসের মূল কাহিনি আবর্তিত। কাহিনির শুরু পশ্চিম আফ্রিকায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে যোগদানের জন্য বাংলাদেশ থেকে এক সামরিক অফিসারের নেতৃত্বে একটি গ্রুপের যাত্রা দিয়ে। ঘটনার ঘনঘটায় কাহিনির বাঁকে বাঁকে ঘটনা আরও ঘনীভূত হয় সাসান্দ্রা নদীকে কেন্দ্র করে। সাসান্দ্রা শব্দের অর্থ সমাধিস্থল, যা দ্বাদশ শতাব্দীতে আফ্রিকা দখল করা পর্তুগিজদের দেওয়া। ওই সময় মহামারিতে মানুষ মারা গেলে এই নদীতে ছুড়ে ফেলা হতো, এর পরিপ্রেক্ষিতে নদীর নামকরণ হয় সাসান্দ্রা। নদীর ভয়াবহ রূপের দৃশ্যকল্প ফুটে উঠেছে উপন্যাসটিতে। কাহিনির আবহের সঙ্গে সাসান্দ্রা নদীর যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

উপন্যাসের প্রধান তিন চরিত্র- অথৈ, এলমা এবং দিবাকে নিয়ে ঘটনার মূল কাহিনির সূত্রপাত হয় সাম্রাজ্যবাদের করালগ্রাস নিয়ে। বর্তমান বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদ কীভাবে অস্থির নৈরাজ্য তৈরি করে রেখেছে এবং জাতিসংঘের সহযোগিতায় করপোরেট ভ রাজনীতি কীভাবে মিথ্যা শান্তির কথা বলে, তারই অকপট দলিল এই 'ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা'। মূলত পুরো উপন্যাসেই সাম্রাজ্যবাদীদের নির্মমতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। আফ্রিকাসহ পৃথিবীর সব বঞ্চিত মানুষের অধিকারের কথা বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারণ করতে গিয়ে লেখক সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সাহসিকতা ও প্রতিবাদের স্বাক্ষর রেখেছেন। সেইসঙ্গে এসেছে দেশ, সমাজ, মানুষ ও প্রেম।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অথৈ, বাংলাদেশের এক তরুণ সামরিক অফিসার। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্টে যাত্রা শুরু হয় তার। যাত্রার প্রাক্কাল থেকে শুরু করে উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত অথৈর ভূমিকা ছিল সরব এবং সক্রিয়। আদর্শ ও নীতিতে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারী অথৈ।

উপন্যাসের দ্বিতীয় চরিত্র দিবা, যাকে মনে করা হয় বাংলার শাশ্বত রূপ। একধরনের সারল্য যেন প্রকৃতির নিয়মে তার ওপর ভর করে আছে। অথৈর মনে বাংলার রমণী যেভাবে ছক বেঁধে আছে ঠিক সেভাবেই দিবা এসে ধরা দেয়। বুদ্ধিমতী, লন্ডনে ইংরেজি সাহিত্যে পড়ুয়া শিক্ষিত দিবা খুব সহজেই অথৈর দৃষ্টি কেড়ে নেয়। স্বপ্নের নারীর সঙ্গে অথৈর দেখা হয়ে যায় উপন্যাসের শুরুতে, যখন ঢাকার বিমানবন্দরে অথৈ অপেক্ষা করছিল পশ্চিম আফ্রিকায় যাত্রা করার জন্য। উপন্যাসে লেখক অথৈ এবং দিবাকে একে অপরের কাছে হৃদয়ের প্রণোদনায় অপরিহার্য করে তোলেন।

কিন্তু সদ্য বিবাহিত অথৈকে ফিরে যেতে হয় কর্মক্ষেত্রে, পশ্চিম আফ্রিকার আইভরি কোস্টে; যে জায়গাটা ফরাসিদের অধীন হয়ে আছে। সেখানে এক গভীর অরণ্যে অপহৃত কর্নেল ফল-ব্যাককে উদ্ধার অভিযানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অপারেশন 'রেইন হান্টার'-এর নেতৃত্বের দায়িত্ব বর্তায় অথৈর ওপর। একই উদ্ধার অভিযানে ফরাসি বাহিনী নিয়ে সুন্দরী, বিদুষী এবং চৌকস অফিসার ক্যাপ্টেন এলমা অথৈর সঙ্গে যোগদান করে। বলতে গেলে, এখান থেকেই উপন্যাসের আসল কাহিনির বাঁক ঘুরে যায়। কাহিনির চুম্বকীয় অংশ অর্থাৎ 'রেইন হান্টার' অভিযানের যাত্রা সাসান্দ্রা নদীকে ঘিরে শুরু হয়।

এ উপন্যাসে এলমা একটি ব্যতিক্রমী বলিষ্ঠ চরিত্র। পশ্চিমা ধাঁচে গড়া ফরাসি নারী এলমা জীবনকে দেখে বাস্তবতার আলোকে, যেখানে আবেগের ছিটেফোঁটা নেই। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, মননে মগজে আধুনিকতার ছাপ নিয়ে চলা এলমা বোঝে- যখন, যেভাবে, যেমন জীবন; ঠিক তেমনি আনন্দ, হাসিতে জীবনকে কীভাবে উপভোগ করতে হয়। অথৈর সঙ্গে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে এলমা বুঝতে পারে সাম্রাজ্যবাদের ভয়াবহ চিত্র। কীভাবে পশ্চিম আফ্রিকার আইভরি কোস্টকে ফরাসি কলোনি বানিয়ে আফ্রিকানদের মাতৃভাষা কেড়ে নেওয়া হয়, কীভাবে তাদের খনিজসম্পদগুলো নিয়ে যাওয়া হয়, তারই নির্মমতা এলমা দেখতে পায়।

লেখক কাজী রাফি তার সহজ-সরল ভাষায় বেশ সাবলীল গতিতে 'ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা' উপন্যাসের কাহিনি তুলে ধরেন। পড়তেও বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হয়। ঘটনার বর্ণনায়, বিভিন্ন ধাঁচের চরিত্র চিত্রণে বেশ মুনশিানা দেখিয়েছেন লেখক। জীবনদর্শন, রাজনৈতিক-সামাজিক চিত্র, মানবের যে কোনো সম্পর্কের ওঠানামা এবং বৈপরীত্যবোধের যে জটিলতা তা লেখক বর্ণনার আতিশয্যে মূর্ত করে তুলেছেন। উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অথৈর ভূমিকা পুরোটাই বক্তব্যপূর্ণ। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল লেখক যেন অথৈয়ের মধ্য দিয়ে নিজেকে দেখতে পাচ্ছেন। বড় বেশি বক্তব্যধর্মী এবং টানা কথোপকথনে অথৈর ওপর যেন লেখক ভর করেছিলেন। লেখককে এ বিষয়টি জিজ্ঞেস করতেই বললেন, নিজের কাছে সৎ থাকতে গিয়েই এভাবে সবকিছু উঠে এসেছে। বাস্তবতাকে তো অস্বীকার করতে পারি না। এটাও সত্য যে, বাস্তবতার ওপর ভর করেই কল্পনার রাজ্যে ভ্রমণ করতে হয়, না হলে সেই সৃষ্টির কোনো ভিত থাকে না। সেই অর্থে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে রচিত 'ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা' উপন্যাসটি সমসাময়িক ঘটনার সাক্ষী, যা কালের যাত্রাপথে সময়ের পাটাতনে থেকে যাবে।