কালের খেয়া

কালের খেয়া


নদীর নামে গ্রাম

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯      

বিপ্রদাশ বড়ূয়া

স্বপ্নের নদীর চেয়ে বলশালী তিনটি ভিন্ন ভিন্ন রূপপ্রকৃতির নদীর কোলে আমার ইছামতী গ্রামখানি রেখে এসেছি ভাঙনপ্রবণ ইছামতী নদীতে, আমার গ্রামে। সেই হারানো প্রথম যৌবনে। কর্ণফুলী, ইছামতী ও সুন্দরী খাল তিন দিকে ঘিরে রেখেছে মেখলার মতো। সেই গ্রামের বাড়ি এখন শুয়ে-বসে আছে একাকী। তালাবদ্ধ। আমার দুই বড় ভাই, পুত্র-কন্যা-কলত্র নিয়ে ব্রিটেন-আমেরিকা প্রবাসী।

বাড়ির উত্তর পাশের পাকা রাস্তার উত্তর পাশ ঘেঁষে আমাদের বড় পুকুর। প্রথম বর্ষায় সেখান থেকে মাছ উজিয়ে বিলে-পুকুরে আশ্রয় খোঁজে। ডিম দেওয়ার সময় এসে যাচ্ছে ওদের। মাগুর, কৈ, শোল, পুঁটি সবার শরীর জানান দিয়েছে। ছেলেবেলায় গ্রামে থাকতে আদি ভিটের পুকুরে ওদের কাণ্ডকীর্তন দেখতাম। পুকুরের উজানো মাছ ধরার অধিকার ছিল না বাবার কড়া শাসনে। তখন জ্যান্ত মাছ ধরার বা খাওয়ার রেওয়াজ ছিল না- কারণ প্রাণী হত্যা নিষেধ। মাছের সেই উজান বাওয়ার খেলা দূর থেকে দেখতাম। কাছে যাওয়া বিপজ্জনক বিষধর সাপের জন্য। ওসব বিষধর সাপের আবাস ছিল ওই পুকুরপাড়ের নির্জনতা ঘিরে। এখন নতুন বাড়ির দক্ষিণ দিকের ছোট পুকুরে মাছ উজান বেয়ে ছোটে কি-না জানি না, সেদিকে তেমন করে কোনো সময় খুঁজে দেখিনি। রাস্তার উত্তর পাশের বড় পুকুর থেকে মাছ উজানো বিখ্যাত। পাড়ার তেজস্বী যুবকেরা এখন ওর খবর রাখে, মাছ ধরে নিয়ে যায় ঘরে। ওই সময় কখনও নতুন বাড়িতে থাকার অবসর হয়নি। সেই রোমাঞ্চ থেকেও অন্য অনেক কিছুর মতো নিজেকে বঞ্চিত ফেলে রেখেছি। ঝম ঝম বৃষ্টির রাতে বা দিনে মাছেরা উজানে যায় ডিম দিতে।

তিন দিকে পাকা দেয়াল ঘেরা নতুন ভিটের আম-কাঁঠাল-জলপাইয়ের প্রকৃত অধিকারী এখন পাখি ও কাঠবেড়ালি। কাকা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুশান্ত বড়ূয়া বড় পুকুর পাড়ে ঘর বেঁধেছে আমাদের থেকে নিয়ে। পাঁচ পুরুষ আগে এই কাকারা এক পরিবারভুক্ত ছিল আমাদের।

ছোট পুকুরে মাছরাঙা আসে সকালে নির্দিষ্ট সময়ে। কাঠবেড়ালিরা সারাদিন এদিক-ওদিক করে। প্রজাপতিরা বাড়ির সামনের জবা ফুল থেকে মধু খায়। বারান্দায় বসে ওদের দেখি। আমি ভাবি, প্রজাপতি হলো পাখাসহ ফুল। ফুল ও প্রজাপতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য- একজন উড়তে পারে না, আরেকজন উড়তে পারে। আমি দেখি। ওদিকে বড় পুকুর থেকে খুব ভোরে যেমন জেগে ওঠার তান ধরে তেমনি দিনেও প্রহরে প্রহরে তান ধরে, 'র্কো‌ র্কো‌ র্কো‌বা, ক্রো ক্রো ক্রো...'। এক কলিকে নানান মাত্রা দিয়ে বাঁধা ওদের গান, আমি কান পেতে শুনি, অন্য সব চিন্তা বা কাজ থেকে ছুটি নিই তখন। ভিটেয় ওরা চরে, পোকা-মাকড় ধরে। প্রতিটি পদক্ষেপে লেজের একগুচ্ছ পালক নিয়মিত বিরতিতে ওঠে-নামে। গ্রামবাংলার অত্যন্ত সংবেদনশীল পাখি। এখনও ওদের দেখতে পাই বলে গ্রামে যাই। বদলাতে বদলাতে এখনও গ্রাম টিকে আছে, প্রাচীন গ্রাম এখন আর নেই।

ওই দাঁড়কাক কমে গেছে, পাতিকাক তার থেকে বেশি। রাতে শুয়ে শুয়ে পেঁচার ঘুৎকার শুনি। বাড়ির ওপর ঝুঁকে পড়া জলপাই ও আম-কাঁঠাল গাছের ডালের সঙ্গে মিতালি করতে ছাদে উঠি। সারা গ্রামে এখন আমার বয়সী গাছ খুঁজে পাই না। পাহাড়ে, সুন্দরবনে ও নানা জেলায় গেলে আমার এক চোখ খোঁজে আমার বয়সী গাছ। পাই না। পাবলাখালী বন অফিসে পেয়েছিলাম দশ-পনেরো বছর আগে- কিছু দৈত্যাকার পদাউক। আমার পুরনো ভিটেয় ছিল। নদীর ভাঙনের সময় এক সন্ধেয় সীমানার পাটিবেত, বড় বড় দুটি আম ও একটি কাঁঠাল গাছ ছোট গাছপালা সঙ্গী করে নদীতে পড়ে কোথায় উধাও হয়ে গেল! ইছামতী নদী থেকে কর্ণফুলীতে চলে গেল তীব্র স্রোতে। চেয়ে চেয়ে দেখে দেখে শুধু কাঁদলাম ঠাকুমা, ভাই-বোনরা। শতাব্দীর গাছ ঠেলে নিয়ে গেল। তেমন বয়স্ক গাছ গ্রামে একটিও নেই, এমনকি চল্লিশ-পঞ্চাশ বছুরে কোনো গাছ নেই। নদীর স্রোতের কী প্রতাপ!

আমি বাংলাদেশে যেখানেই যাই আমার বয়সী গাছ খুঁজি। পাই না। বরং শহরে-নগরীতে শেষ হতে হতেও কিছু টিকে আছে লোভীদের চোখে পড়েও। এসব দেখতে দেখতে আমার মনে পড়ে অস্ট্রেলিয়া-ব্রিটেনের কথা। ওই দুটি দেশের সমস্ত গাছের মালিক রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্র। আমাদের যৌবনে প্রায় সব শহরে ছিল শতবর্ষী বৃক্ষ। তারা ছিল যুবকের মতো দৃঢ়-বলবান। নেই ওরা অনেকেই। একটি দেশ বা শহরের বয়স্ক গাছের সংখ্যা দেখেই সেই দেশের শাসকের চরিত্র ধরা পড়ে। আমাদের সমস্ত জেলা শহর ঘুরলে তার প্রশাসকদের চরিত্র বুঝে নিই, দশ-পাঁচ বছর আগেও যে বৃক্ষ মহাশয়েরা ছিলেন তাদের কে হত্যা করেছে! কেন নগরীর বৃক্ষ ও পুকুর অদৃশ্য হয়ে যাবে! এ জন্য গ্রামেও শতাব্দীর বৃক্ষ নেই, কারণ এদের রক্ষা করার কোনো অভিভাবক রাষ্ট্রে নেই। নদীরও একই দশা, ওরা মা-বাপহীন। পদ্মা নদীর মাছের ঘেরের সীমা মানচিত্র দেখলেই তা ধরা পড়ে। দিবালোকে। একদিন ওদের হাতের মুঠোয় চলে যাবে নদী। কবিতায় জীবনানন্দ দাশ যা লিখে গেছেন তা আর নেই। যা থাকার কথা তা নেই বলেই...।

গ্রামের প্রধান রাস্তা পূর্ব সীমান্ত থেকে সোজা পশ্চিম প্রান্তে ইছামতী নদীর তীরে এসে দক্ষিণ দিকে বাঁক নিয়ে দক্ষিণপাড়া হয়ে কর্ণফুলীতে মিশেছে। ইছামতী নদীর তীরে বিশাল বটগাছটি দাঁড়িয়ে ছিল। প্রাচীন বটগাছ। বৃত্ত থেকে বটগাছের নাম। বিলের মাঝে ও যেখানেই দাঁড়াক সে গোলগাল একটি বৃত্ত। তেমন আর একটি শতাব্দীর বটগাছ ছিল গ্রামের উত্তর সীমান্তে যেখানে ইছামতী নদীতে যুক্ত হয়েছে সুন্দরী খাল। এই খালের নাম উইটেগার নামক এক ব্রিটিশ শাসকের নামে। যার অধীনে সুন্দরী খাল পুনর্খনন হয়েছিল। নেলী সেনগুপ্তা ছিলেন তখনকার আমলে রাজনীতিক, যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তের স্ত্রী। সে রকম শতাব্দীর বৃক্ষ মহাশয়েরা এক সময় হারিয়ে গেল। এখন গ্রামের কোথাও আমার বয়সী একটি প্রবীণ বৃক্ষও নেই। একটি গ্রামে আমার পূর্বসূরি কোনো বৃক্ষ এখন আমরা দেখতে বা দেখাতে পারি না। নদীর ভাঙনে সারাদেশের প্রায় একই চিত্র। চিল-শকুন বাসা করার জন্য চাই উচ্চতম বৃক্ষ। আমি নিজেকে স্বপ্নে দেখানোর জন্য শতাব্দীর একটি বৃক্ষ কাউকে দেখাতে পারি না এখন। ইছামতী ও কর্ণফুলীর চরে সেই সময়ের ফুটি-তরমুজ উধাও। একবার তামাক চাষের প্লাবন এসেছিল। সে রকম উচ্ছ্বাসের ঢেউও লুপ্ত। আছে শুধু মাথার ওপর অনন্ত বিস্তার আকাশ। চাঁদহীন কোনো রাত পেয়ে উঠে যাই ছাদে। পাটি বিছিয়ে মাথার নিচে দুটি বালিশ পেতে প্রাতঃস্মরণীয় মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের তারা-পরিচিতি বই দু'হাতে চোখের ওপর ধরে পাশের হারিকেনের আলোয় খুঁজে নিলাম ছায়াপথ। উত্তর-পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে শুয়ে আছে বিশাল আকাশ-শয্যায়। এখন মেঘ নেই, কুয়াশারও সর্বগ্রাসী দাপট নেই। গ্রামের আকাশই একমাত্র আগ্রাসহীন আছে এখনও। ছেলেবেলায় যেমন শুকতারা চিনিয়ে ছিলেন ঠাকুমা ও বাবা, এখনও তেমন চেনা রয়েছে। একেবারে উত্তর আকাশের শেষ প্রান্তে বিশাল ড্রাকো মণ্ডল- আঁকাবাঁকা এক বৃহৎ সর্প। ধ্রুবতারার উত্তর-পশ্চিম থেকে উত্তর-পুব দখল করে আছে। কাকা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুশান্ত বড়ূয়ার মেয়ে গ্রামে এসেছে কলেজ-ছুটির অবসর পেয়ে। আমরা দেখছি।

পুব আকাশে বীর কালপুরুষ হাতে বিশাল মুগুর নিয়ে যেন আকাশ প্রহরা দিচ্ছে অনন্তকাল ধরে। ডিসেম্বর মাসে উত্তর আকাশের একেবারে দিগন্তে। রাত যত বাড়বে দিগন্ত থেকে ওপর দিকে অগ্রসর হবে। তারাদের হাঁটা তারাদের মতো, দিনের তারা সূর্য যেমন আকাশ পথে হেঁটে হেঁটে পাড়ি জমায়। মহামহিম সূর্যের মৃত্যু হবে কত শতবর্ষ ভবিষ্যতে? গুগল ঘেঁটে বের করে নিতে পারেন অনুসন্ধিৎসু-তৃষার্তপাঁড় পাঠক। দুনিয়া ও দুনিয়ার বাইরের মহাকাশের সব খবর রাখেন বিজ্ঞানীরা। তারা জানেন সূর্যের মৃত্যু কবে হবে, চাঁদের কী দুর্গতি হবে তখন নাকি তার আগে পৃথিবীর মৃত্যু হবে! থাক, মৃত্যুচিন্তা যদি আপনাকে দুর্বল করে দেয়, তাহলে থাক সেই মুখপোড়া মৃত্যু মহাশয়।

জীবনকে সচল রাখে মৃত্যু। এই ধরুন মাছে-ভাতে বাঙালি। মাছের মৃত্যু না হলে কী কাণ্ড হবে বলুন তো! পুকুর-নদী-সমুদ্রে তো মানুষ বা কোনো প্রাণী নামতেই পারবে না। তখন মাছের খাদ্য ঘাটতি হয়ে যাবে। মাছ ডাঙায় উঠে আসবে পানির আবাস ছেড়ে...। মানুষও অবশ্য মাছ ধ্বংস করার জন্য মারাত্মক অস্ত্র বা ওষুধ আবিস্কার করে বসবে। মাছের সঙ্গে কি লড়াই হতে পারে না! বাঘ-সিংহের সঙ্গে হয় না...! স্বপ্ন ও কল্পনার সঙ্গে হতে পারে না!

আমরা ফিরে আসি চাঁদ, বাঘ, সিংহ থেকে ধরাধামের গ্রামে। পুকুর পাড় ও পুকুর থেকে ডাহুকের খাবার আসে। ভিটের ঝোপ-ঝাড় ও ঘাস থেকে পোকা-মাকড় ধরে খায়। ধান জমিতে চাষিরা সার দেয়, পোকা-মাকড় মারার জন্য ওষুধ ছিটোয় বলে ডাহুক আর ব্যাঙ, কেঁচো, মাছদের আগের মতো খাবার জোটে না। ওই লাজুক ও ভীতু ডাহুক মানুষের খুব কাছাকাছি আসে না। আমি ওদের ভয় জয় করার জন্য উঠোনে ও রান্নাঘরের বাইরে খুব কাছাকাছি খাবার দিই। আমাকে দেখতে না পেলে কাছে চলে এসে খাবারে মুখ দেয়। যেই আমার মুখ বা ছায়া দেখতে পেল অমনি দশ হাত দূরে। এত অভয় দিয়ে, খাবার দিয়ে, গান শুনিয়ে দেখেছি। ওদের মন পাওয়া বড় কঠিন শুধু নয়, অসাধ্য। তবে খাঁচায় পুষলে হাত থেকে খাবার খাবে, ঘরেও ঢুকে এটা-ওটা দেখবে উৎসাহী হয়ে। না, এখন আমি পাখিদের খাঁচায় পোষায় আপত্তি জানাই। 'বন্যেরা বনে সুন্দর' এই-ই ভালো। 'আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে' গানটি গেয়ে নিন।

গ্রামে বেজি আছে, পুরনো ভিটেয় প্রচুর ছিল। বেজি থাকলে সাপ থাকতে পারে না। ওদের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বেজি জিতে যায়। আমি গ্রাম এত ভালোবাসি কিন্তু এখন সেখানে ফিরে যাওয়া আর কি সম্ভব! একেকবার ভাবি কেন হবে না, কেন পারব না! কারণ হারিয়ে ফেলেছি সেই ছেলেবেলার মতো বাল্যকালের জীবন। এখন নাগরিক জীবনের পোষা প্রাণী হয়ে উঠেছি। সেই ছেলেবেলার টুকটুকে মনটিই মরে গেছে। শিক্ষার প্রতিটি স্তর আমাকে শহুরে করে তুলেছে। নিজের কাছে নিজে উদ্বাস্তু হয়ে গেছি।

এখন আমার ভিটে ছোট্ট হলেও তেমন ছোট নয়। একটি সুফলা জলপাই রুইয়েছিলেন বড়দা জিনদাশ বড়ূয়া। পাতা পাকলে খয়েরি লাল হয়ে যায়। সবুজের সঙ্গে প্রবল বিরোধী, মার্কামারা বিপরীত। জবা ফুলে প্রজাপতি আসে ফুলের মধু খেতে। ছবি তুলতে যাই, একটুও তর সয় না। বসতে বসতে উঠে যায় পাখা কাঁপিয়ে। ভ্রমর-মৌমাছি যে কোথায় কোন বাগানে গেছে কে জানে। পুরনো ভিটেয় বড় বাগান ছিল। নাগকেশর, পাখি ফুল, স্থলপদ্ম, নানা রকম জবা, গন্ধরাজ, সূর্যমুখী আরও কত কত ফুল। ইছামতী নদী সব ভক্ষণ করে ক্ষান্ত হয়েছে। হয়নি, কোথাও বাধা পেলে সব তছনছ করে পথ করে নেবেই সে।

পাঠাগার ছিল একটি, নাম ইছামতী জ্ঞানদায়িনী পাঠাগার। বেঁচে থাকলে এ বছর শতবার্ষিকী পালন করতাম। আমি ছিলাম তার শেষ সম্পাদক। তার পরও কিছুদিন বা দু-চার বছর টিকে ছিল। ওখানে আমার বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব সেরা লেখকদের সঙ্গে লেখায় পরিচয়। সঙ্গে বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে। তলস্তয়, গোর্কি, শোলকভ গ্রাস করে নিল আমাকে। এক সময় রুশ সাহিত্যের বই রাখা ছিল অপরাধ। লুকিয়ে-চুরিয়ে রাখতে হতো। কম্যুনিস্ট জুজু। এখন সে সব দেশের সঙ্গে মিত্রতা আবার চাইছে।

সে সময় গ্রামে বিয়েতে বই উপহারের খুব প্রচলন। সঞ্চয়িতার দাম ছিল ১৬ টাকা, কলকাতায় প্রকাশিত। নজরুলের সঞ্চয়িতা ছিল। কৈশোর থেকে যৌবনে পা দেওয়ার সময় কাউকে সঞ্চয়িতা উপহার দিতে পারলে গর্বে বুক ফুলে উঠত। কিন্তু অত টাকা জোগাড় করা সে বড় কঠিন ছিল সেই সময়।

ভাঙন শুরু হলো আশির দশক থেকে। ধান কাটার পর বিলে ফুটবল খেলার দিন বেশ তড়িঘড়ি উঠে গেল। ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, গ্রামীণ খেলাধুলো গ্রাম থেকে প্রায় একরকম উঠে গেল। এখন খেলাধুলো প্রায় নেই। আছে মোবাইল, ফেসবুক ইত্যাদি। ইছামতী নদীতে স্নান করা উঠে গেল। পুকুর বা চাপকলে স্নান। গ্রামে গ্রামে, এক মাইল দূরের অক্ষয় রাম মহাজনের মাঠে ফুটবল প্রতিযোগিতা আর নেই। রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠের জমজমাট প্রতিযোগিতা উঠে গেল প্রায়। নৌকাবাইচ ও হা-ডু-ডু উধাও। বলীখেলা অর্থাৎ কুস্তি ছিল চট্টগ্রামের জমকালো মেলা ও প্রতিযোগিতা। চট্টগ্রাম শহরে এখনও টিকে আছে জব্বারের ঐতিহ্যবাহী বলীখেলা ও লোকজ জিনিসপত্রের মেলা।

গ্রামের দক্ষিণ দিকে কর্ণফুলীতে প্রতি বছর নৌকাবাইচের সঙ্গে মাটির হাঁড়ি-পাতিল-হুঁকো ইত্যাদির মেলা বসত। গ্রামের পুব সীমান্তের দিকে কুমোরপাড়া। মাটির হাঁড়ি-পাতিল-সানকি-হুঁকো সেখানে তৈরি করত তারা। চৈত্রসংক্রান্তির শেষে গরুর লড়াই হতো গ্রামে। কিন্তু মেলা বসত না। মেলা হতো ফাল্কগ্দুনী পূর্ণিমায়, সেইসঙ্গে গ্রামের বার্ষিক নাটক। কী সুন্দর আর আবেগ-উদ্বেগে মাখামাখি সেই প্রথম কৈশোর-যৌবন উন্মেষের দিনগুলো! 'আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি' গান শুনেছি তার অনেক পরে। এখনও সেই গান মন-প্রাণ ভরে শুনি, আবেগ আর শিহরণ জাগে। নিশ্চয়ই প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসাধারণ মিষ্টি কণ্ঠের গান। গানের বাণীও তেমন। মনে পড়লে গুনগুন করে আওড়াই। এই গানকে আমি চিরায়ত বলব।

আমন ধানের 'ধুয়া পিডা' অর্থাৎ ভাপা পিঠে খেজুরের রস সিক্ত বিখ্যাত খাবার। আবার খেজুরের তরল গুড়ও আছে চট্টগ্রামে। তার সঙ্গে চিতই পিঠেও খুব জমে। তারপর ধান কাটা সারা হলো। পিঠে-পুলির উৎসব শেষ হতে বাকি নেই। আমন ধান কাটা শেষ হওয়ার পর গরুর লড়াই। এ সময় বিশেষ করে পয়লা বোশেখের দিন আমাদের গ্রামে গরুর লড়াই হতো। রাউজান থানার পাহাড়তলী গ্রামে পয়লা বোশেখের মাসব্যাপী মেলা শুরু হয়। বর্ষ শেষ ও বর্ষ শুরুর অনুষ্ঠান একটানা কোথাও তিন-চার দিন, কোথাও সাত দিন, কোথাও মাসখানেক। পাহাড়তলী মহামুনিতে তখন যাত্রা গান চলতে শুরু করে।

ফাল্কগ্দুনী পূর্ণিমায় গ্রামে বাৎসরিক নাটক হয় প্রতি বছর। সেখানে একটি ছোট চরিত্রে, এমনকি মৃত সৈনিকের অভিনয় করাও ছিল গৌরবের ব্যাপার। অথবা নাটকের দৃশ্য শেষে 'ড্রপ সিন' টানার বা ফেলার কাজটি পেলেও বর্তে যেতাম। এ সময় সিরাজদৌলা, মিসর কুমারী প্রভৃতি বিখ্যাত সব নাটকের অভিনয় হতো। পার্শ্ববর্তী গ্রামের দর্শক এসে ভরে যায়। ফাল্কগ্দুনী পূর্ণিমা হলো জ্ঞাতি সম্মিলনের প্রাচীন সংস্কৃতি। গৌতমবুদ্ধের সময় এই উৎসবের প্রচলন শুরু হয়। বসন্তের এই পূর্ণিমা বৃষ্টি বা ঝড়-বাদলামুক্ত ঋতুকাল। জ্ঞাতি সম্মিলনের কাল সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত। মৃত সৈনিকের অভিনয়ও অনেক যত্ন করে শিখিয়ে পড়িয়ে নিতেন নাটকের পরিচালক।

নেই। সেই নিবিড় অনুশীলন এখন আর নেই। আমাদের বালক বয়সে ছিল। তবে পরে কলেজে পড়ার সময় 'আলেকজান্ডার' নাটকে আমার পরিচালনায় আমি নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। এখন আমি সেই বালখিল্যতায় নিজের কাছে নিজে মুখ লুকোই। এখনকার মতো মোবাইল ফোন থাকলে সেই আমার চিত্রটি নিশ্চয়ই বা হয়তো ধরে রাখতাম। কে জানে!

কিন্তু সিরাজদৌলা নাটকের অনেক কিছু ভুলে গেলেও আমার পঞ্চাশ-ষাট বছর বয়সে মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের কথা ভুলতে পারি না। স্ত্রী রুবী বড়ূয়া, মেয়ে মেঘনা ও নাতি শিশু ইভানকে নিয়ে সিরাজের সমাধি দেখে আসার স্মৃতি অক্ষয় হয়ে আছে। আবেগে আমি সেদিন ভেসে যাই। রুবী ও মেঘনার কাছে শেষ পর্যন্ত লুকোতে পেরেছিলাম কি-না আজ পর্যন্ত জানতে চাইনি। মানুষ বোধ করি অত্যন্ত আপনজনের কাছেও তুচ্ছ বিষয়ে নিজেকে গোপন করতে ভালোবাসে বা নিজের অজান্তে চায়। অথবা ওই নিয়ে খেলা করে যায়। আমিও তা করেছিলাম কি-না আমি জানি না। মনে করতে পারছি না। মনে পড়ে না। না।

আমার সবকিছু জন্মভূমি আমার গ্রাম থেকে পাওয়া। গ্রাম, নদী, চাষবাস, মানুষ ও প্রকৃতির মিলিত ফসল আমি। সবার কাছে আমি স্বাধীনতা পেয়েছি। গ্রামের মানুষের ভালোবাসা দু'হাতে লুট করে নিয়েছি। প্রকৃতি থেকে অবাধে লুট করেছি। বাংলাদেশের কিছু কিছু জায়গার আনাচ-কানাচ ঘুরেছি। তার অনেক কিছু আমার প্রকৃতি-বিষয়ক লেখায় প্রায় অকপটে স্বীকার করেছি। আবার অনেক কিছু বলতে পারিনি। আমার গ্রামের কথাও কি পেরেছি। কোনো মানুষের পক্ষে সব কথা খুব খোলাখুলি বলা কি সম্ভব! অথবা বলাও কি উচিত! গল্প-উপন্যাসে নানা ছলে, রূপ-প্রতীকে, আভাসে একজন শিল্পী বলে যান। কারণ বলার জন্যই তার কলম। আকাশকে কি সব কথা মানুষ বলে? মানুষ নিজেকে কি সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করে! তার সৃষ্ট চরিত্র কি সব সময় তাকে মেনে চলে?

আমার স্বপ্নকে আমি মেনে চলতে চাই। কিন্তু স্বপ্ন কি আমাকে মানে! স্বপ্ন কি মানুষের মনের ফসল নয়! তাহলে স্বপ্ন ও মানুষের মধ্যে এত সংঘর্ষ কেন! তাহলে সংঘর্ষ থেকেই সৃষ্টি!