কালের খেয়া

কালের খেয়া

তিষ্ঠ ক্ষণকাল

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২০

শরাফত আলী

বেশ ক'দিন আগে একটি নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষায় বাংলা সাহিত্যে অনার্স এবং এমএ করা যশোরের এক প্রার্থীকে প্রশ্ন করেছিলাম, যশোর বিখ্যাত একজন কবির নাম বলুন। প্রার্থী সঠিক উত্তর দিয়েছিলেন, 'মাইকেল মধুসূদন দত্ত'। পরের প্রশ্নটি করেছিলাম, 'মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের সমাধি কোথায়?' 'যশোরের সাগরদাঁড়িতে', প্রার্থীর উত্তর। আমি বললাম, 'আপনি নিশ্চিত?' 'আমি নিজে গিয়েছি' এই উত্তর শুনে আমি আর কোনো প্রশ্ন করিনি। বোর্ডের সভাপতি রোকসানা কাদের (অতিরিক্ত সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ) এবং অন্যরাও কেউ কোনো প্রশ্ন করেননি।

রাতে ভাবছিলাম আমার পুত্রকে যদি কোনোদিন এমন প্রশ্ন করে এবং উত্তর দিতে না পারে তবে কেমন হবে?

নভেম্বরে তাই যখন কলকাতা গিয়েছিলাম তখন এক অবসর দিনের সকালে, পুত্রকে নিয়ে বেরোলাম। লোয়ার চিৎপুর রোডের (স্থানীয়রা নোনা পুকুরও বলে) সিমেট্রিতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের সমাধি খুঁজে পেতে কষ্ট হয়নি। নিরিবিলি শান্ত সমাধিস্থলের মাঝ দিয়ে সরু বাঁধানো রাস্তা। মাইকেলের সমাধির নির্দেশনা তীর আকৃতি কাঠের ওপর লিখে দেওয়া আছে। বেশ সামনে গিয়ে ডানে ঘুরে এক কোনায় লোহার গ্রিল দেওয়া একটা অংশে সবুজ ঘাসের মাঝখানে চিরনিদ্রায় সমাহিত কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

সমাধির গায়ে সেই বিখ্যাত এপিটাফ

"দাঁড়াও পথিক বর, জন্ম যদি তব

বঙ্গে; তিষ্ঠ ক্ষণকাল! ..."

কবি হবেন বলে সব ছেড়েছিলেন। রাজনারায়ণ দত্তের মতো ধনী পিতা ও সম্পত্তিকে। নিজের ব্যক্তিগত সম্মান এমনকি ধর্মত্যাগও করেছিলেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে তুলে দিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।

১৮৪০ থেকে পরবর্তী ৪০ বছরের মতো অর্থাৎ, ১৮৮০ সাল বাংলা রেনেসাঁর যুগ। ডিরোজিও এসে তরুণ সমাজকে কুসংস্কার ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করছেন। রাজা রামমোহন রায় বিলেত যাচ্ছেন। হিন্দু কলেজ সংস্কৃত কলেজ পরস্পরের সঙ্গে সুস্থ প্রতিযোগিতায় নামছে। সতীদাহ প্রথা বিলোপ, বিধবা বিবাহ প্রচলন, নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সে এক ওলটপালট করা সময়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আসছে বিবর্তন। সংস্কৃতের দেয়াল ডিঙিয়ে আধুনিক বাংলা ভাষা ধীরে ধীরে সূর্যের মুখ দেখছে। এই ঘূর্ণায়মান সময়ে যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ির মধুসূদন দত্ত কলকাতায় এসে নিজেও নিজের জীবনকে এলোমেলো করেছেন।

খিদিরপুরে বিশাল বাড়িতে বসবাসরত রাজনারায়ণ দত্ত এক ধনবান ব্যক্তি। জাহ্নবী দেবীর গর্ভে তার একমাত্র সন্তান মাইকেল মধুসূদন দত্ত। হিন্দু কলেজে পড়েছেন। ডিএল রিচার্ডসনের কাছে কাব্য শিক্ষা লাভ করেছেন। ধারণ করেছেন হৃদয়ে। বাঙালি এবং বাংলা ভাষাকে প্রথম জীবনে দেখেছেন অবজ্ঞার চোখে। প্রশ্রয় পেয়েছেন বাবা-মা'র অঢেল। চাওয়ামাত্র পেয়েছেন যে কোনো খাদ্য, পোশাক বা পানীয়। রাজনারায়ণ নিজেই খাদ্যরসিক। সাহেব বাবুর্চি রাখতেন বাড়িতে। তিনজন মাত্র ব্যক্তির সংসারে দাস-দাসী ১৪-১৫ জন। হিন্দু কলেজের সহপাঠী গৌর, ভূদেব, বঙ্কু প্রমুখকে বাড়িতে ডেকে এনে খাওয়াতে ভালোবাসতেন। নিজের ছিল ভারি অহঙ্কার। বন্ধুদের সামনে বলে উঠতেন- 'I am like the earth revolving around the self-same sun'. পালকি বেহারা থেকে শুরু করে কাউকে গুনে টাকা দেননি।

সে সময়ে ঝামেলা বাধল মধুর বিয়ে নিয়ে। প্রথা এমন ছিল যে, কনের বয়স হবে ৮-৯ বছর এবং বরের ১৮-২০। মধুর কবিমন শুধু স্ত্রী খোঁজে না, খুঁজেছিল সঙ্গী। বন্ধুদের বলেছেন, বিয়ে করব আট-নয় বছরের মেয়েকে? সে আমার কোনো কথা বুঝবে? নাক দিয়ে সিকনি পড়বে আর ভ্যা ভ্যা করে কাঁদবে।

কবিতার জন্য বাবা-মাকেও ছাড়তে চেয়েছেন। বন্ধুদের শুনিয়েছেন কবি আলেকজান্ডার পোপের বাণী, "To follow lowerly one must leave both father and mother". বিয়ে না করার জন্যই কি মধুর খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়া? মনে হয় না। কৈশোরের শেষ প্রান্তেই মধু ইংরেজিতে কবিতা লিখতে চেয়েছেন এবং লিখেছেন। সে সময় প্রকাশিতও হয়েছে। কিন্তু অবশেষে বুঝেছেন কবি (ইংরেজি ভাষার) হতে গেলে তাকে যেতে হবে ইংল্যান্ডে। সেখানেই লিখে কবিযশ পেতে হবে। এর জন্য বাবার অঢেল সম্পত্তি, প্রাণের বন্ধু এবং ধর্মকেও ছাড় না দিয়ে মধুসূদন দত্ত খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছেন। শুধু কবিযশ লাভের জন্য এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা! প্রণমি তোমায়।

আর্চ ডিকন ডিয়াল্ট্রি মধুকে যেদিন খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করেন, সেদিন ইংরেজ সৈন্য পাহারা দিয়েছে। পেছনে রাজনারায়ণ লোক পাঠিয়ে মধুকে তুলে নিয়ে না যায়। খ্রিষ্টান হওয়ার কারণে হিন্দু কলেজ ছাড়তে হলো। এরপর যে বিশপস কলেজ, সেখানেও খরচ জুগিয়েছেন রাজনারায়ণ দত্তই। হাজারো চেষ্টা করেছেন ছেলেকে ফেরাবার। যে কোনো রকম প্রায়শ্চিত্তের মাধ্যমে। গৌরদাস বসাক প্রাণের বন্ধু, যাকে নিয়ে ভালোবাসার উচ্ছ্বাস ভরা কবিতা লিখেছেন। তাকেও জানাননি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের কথা। আসলে মধুর মাইকেল হয়ে যাওয়া শুধু যশ, নাম বা এর জন্য নয়। সে সময় খ্রিষ্টধর্মকে শ্রেষ্ঠ ভেবেই মধু মাইকেল হয়েছিলেন। এ তো ইতিহাসের কথা।

এক সময়ে রাজনারায়ণ দত্ত টাকাপয়সা দেওয়া বন্ধ করলেন। ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করলেন মধুসূদনকে। একের পর এক বিয়ে করলেন একটি সন্তানের আশায়। কিন্তু রাজনারায়ণ দত্তের সে আশা পূর্ণ হয়নি। সামান্য এক স্কুলশিক্ষকের চাকরি নিয়ে মধু পাড়ি দিলেন মাদ্রাজ। যে স্কুলের শিক্ষক ছিলেন মধু, রেবেকা নামের এক ছাত্রী ছিলেন সে স্কুলে। তার সঙ্গে প্রণয় এবং বিয়ে ১৮৪৮ সালে। এ বছরই বেরোয় তার কাব্যগ্রন্থ 'ঞযব ঈধঢ়ঃরাব খধফরব'. কিন্তু ইংরেজরা এ কাব্যকে কোনো মূল্যই দেয়নি। স্যার লর্ড বিটন তো বলেই ছিলেন, মাতৃভাষায় কাব্যচর্চা করতে। যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের জন্য তিনি বিখ্যাত ইংরেজি 'রিজিয়া' নাটকটিও ব্ল্যাংক ভার্স বা অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা।

তরুণ মধুসূদন চাকরি করছেন। সংসার সামলাচ্ছেন। নিতান্ত স্বল্প আয়ে। যে রাজনারায়ণ দত্তের ঐশ্বর্য আর বৈভব ছিল রূপকথার মতো, যে মধুসূদন প্রকৃতির রং পরিবর্তনের সঙ্গে দামি পোশাকটাও পাল্টে ফেলতেন। এক পোশাকে বেশিক্ষণ থাকাকে ছোটলোকের কাজ বলে মনে করতেন, সেই মধুসূদনের মাদ্রাজে এহেন জীবন অকল্পনীয়। এই যে সংকল্প তাও কিন্তু প্রণাম পাওয়ার মতোই।

মধুসূদন-রেবেকার ঘরে জন্ম নিয়েছিল চার সন্তান। দুই মেয়ে আর দুই ছেলে। এরই মধ্যে জড়িয়ে পড়লেন এক মাতৃহীন মেয়ে হেনরিয়েটার সঙ্গে প্রণয়ে। ইংরেজ প্রেমিকা এমেলিয়া হেনরিয়েটা সোফিয়া হোইটস। ধীরে ধীরে মাইকেলই হয়ে উঠলেন হেনরিয়েটার প্রেম।

১৮৫৬ সালে মাদ্রাজ ছেড়ে কলকাতায় ফিরে এলেন। এরপর একদিনও রেবেকা বা তার সন্তানদের খবর নেননি। কেমন ধারার লোক? পৃথিবীর সবাইকে ছেড়ে যেতে পারে। রেবেকাকে কখনও ডিভোর্স করেননি। আবার হেনরিয়েটাকেও কখনও বিয়ে করেননি। কী অদ্ভুত মেয়ে এই হেনরিয়েটা, মাইকেলের তিনটি সন্তানের মা হয়েছেন। অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছেন। একটি পয়সা হাতে নেই, এমনকি অনেক বেলা খেতেও পাননি দেশে এবং বিদেশে। তবু মাইকেলকে কখনও ছেড়ে যাননি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত নামের এই অদ্ভুত চরিত্রের মানুষটি হয়ে উঠেছিল হেনরিয়েটার মনের মানুষ। ততদিনে রাজনারায়ণ দত্ত এবং জাহ্নবী দেবী প্রয়াত। পিতৃ সম্পত্তি উদ্ধারের শতচেষ্টা করেও মধুসূদন তা উদ্ধার করতে পারেননি। খিদিরপুরের সেই রাজকীয় বাড়ি উদ্ধারে গিয়ে রাজনারায়ণ দত্তের বহুবিবাহের এক স্ত্রী অর্থাৎ এক অর্থে তার জননীকে দেখে সে বাড়ির দাবিত্ব ত্যাগ করেছেন।

কলকাতায় ফিরে এসে কোর্টে চাকরি নিয়েছেন। বন্ধুদের সঙ্গে মিশেছেন সেই বাংলা রেনেসাঁর যুগে যখন নীলকর বিদ্রোহ, সতীদাহ প্রথা বিলোপ, বাংলা ভাষা এবং নবজাগরণের যুগ এর মধ্যে মধুসূদন কলকাতায়। তার ফেরার পরের বছর ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম ১৮৫৭ সালে। ইংরেজরা যাকে সিপাহি বিদ্রোহ হিসেবে চালাতে চেয়েছে।

বেলেগাছার পাইকপাড়ার জমিদারদের কাছে বাংলা ভাষা আজীবন কৃতজ্ঞ থাকতে পারে। রামনারায়ণ তর্কালঙ্কার দিয়ে তারা 'রত্নাবলী' নাটক লিখিয়ে মঞ্চস্থ করেছিলেন। দেখে মধুসূদন বলে উঠলেন এর চেয়ে ঢের ভালো আমি লিখতে পারি, এ কোনো নাটক হলো। নিজেই লিখে ফেললেন 'শর্মিষ্ঠা'। তুমুল জনপ্রিয়তা পেল সে নাটক। এরই মধ্যে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন আন্দোলন শুরু হয়েছে। দীনবন্ধু মিত্র লিখে ফেললেন 'নীল দর্পণ'। কিন্তু অনুবাদ করবেন কে? বন্ধুরা মধুসূদন দত্তকে ধরলেন। রাজি হলেন মাইকেল, বিনিময়ে দিতে হবে ১৬ (ষোলো) বোতল বিয়ার। এক রাতেই অনুবাদ শেষ করলেন। সে নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা, আরও কত কী! মধুসূদনের গায়ে আঁচ লাগল না। কারণ ছাপা হয়েছিল এক ইংরেজ পাদ্রি লঙ্গ সাহেবের নামে।

প্রশংসায় সবসময় মধুসূদন নামক বাতিটির শিখা জ্বলে ওঠে। এর পরেই লিখে ফেললেন 'পদ্মাবতী', 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ', 'একেই কি বলে সভ্যতা'। শেষের দুটিই প্রহসন। যতীন্দ্রমোহন বাগচী যখন বললেন বাংলায় অমিত্রাক্ষর ছন্দ সম্ভব নয়। সেই গালে লাগল মধুসূদন দত্তের। লিখে ফেললেন 'তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য' খুব অল্প সময়েই।

কিন্তু যার জন্য তিনি সবচাইতে বিখ্যাত সেই 'মেঘনাদবধ কাব্য' লিখেছেন দীর্ঘদিন ধরে। একুশ শতকের সাহিত্যে মূল বিষয়কে দূরে রেখে তার চাইতে দূরের কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে সাহিত্য রচনা বিরল নয়। কিন্তু মধুসূদন 'রামায়ণ' থেকে কাব্যের নায়ক করেছেন। 'রামায়ণে'র ভিলেন রাবণপুত্র মেঘনাদকে অন্যায় যুদ্ধে হত্যা করা হয়েছে, তাকে উপজীব্য করে লিখলেন 'মেঘনাদবধ কাব্য'। এটির অংশবিশেষ প্রকাশ হওয়ার পরপরই মধুসূদন খ্যাতির শিখরে পৌঁছে যান। কালীপ্রসন্ন সিংহের বিদ্যোৎসাহিনী সভা তাকে সংবর্ধনা দেয়। আবার হাতে আসে অর্থ। মোটামুটি ধনবান ব্যক্তিতে পরিণত হন।

'মেঘনাদবধ কাব্যে'র অনেক মিল 'Paradise Lost'-এর সঙ্গে। এসবে মধুসূদন তেমন অহমিকা বোধ করেননি। তুলনা কেন তিনি নিজে তো শ্রেষ্ঠ কবি হতে চান। যখনই টাকাপয়সা হাতে এসেছে, তখনই নতুন, না নতুন কেন পুরোনো ভূত মাথায় চেপেছে।

বিলেত গিয়ে ব্যারিস্টার হবেন, তা গেলেনও ইংল্যান্ড। সঙ্গে সঙ্গে আবার অর্থনৈতিক দুর্দশা। একসময় যে 'টুলো পি ত'-এর চেহারা নিয়ে কটাক্ষ করেছেন, সেই করুণাসাগর 'বিদ্যাসাগর'ই ছিলেন তার শেষ আশ্রয়। বিদ্যাসাগর টাকা পাঠিয়েছেন, সে এক অন্য ইতিহাস। নিজের সম্পত্তি বন্ধক রেখেও টাকা পাঠিয়েছেন, মধুসূদন ব্যারিস্টারও হয়েছেন। প্রথম বাঙালি ব্যারিস্টার হতে না পারলেও ব্যারিস্টার হয়েছেন। কলকাতায় ফিরে ব্যারিস্টার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেননি। ক্রমশ ঋণের জালে আবদ্ধ হয়েছেন। একসময় ত্যক্তবিরক্ত হয়ে বিদ্যাসাগরও সাহায্যের হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। এরপর? আর কি! নিয়তির বরপুত্র মধুসূদন ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন দেহত্যাগ করেন। অপরিমিত মদ্যপান, সঙ্গে হার্টের অসুখসহ অন্যান্য ব্যাধি নিতান্ত স্বল্প বয়সেই মৃত্যু কেড়ে নিল তাকে। তার কয়েকদিন আগেই হেনরিয়েটাও মৃত্যুবরণ করেছেন। শেষ সময়ে কলকাতার খ্রিষ্ট সমাজও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল তার থেকে। কোথায় সমাধি হবে, কে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করবে এই নিয়েও ছিল সংশয়। মৃত্যুর পর একদিন কেটে গেলেও বেরিয়েলের জন্য বিশপের অনুমতি মেলেনি। শেষমেশ তার ঠাঁই হয়েছিল লোয়ার সার্কুলার রোডে হেনরিয়েটার পাশেই। যে হেনরিয়েটা শত কিছুর পরও মধুসূদনকে ছেড়ে যাননি, তার পাশেই চিরদিনের জন্য সমাহিত হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

এ যেন এক ঐশ্বরিক চুক্তি। যার পরিপ্রেক্ষিতে এই অভাজন লিখেছিল জীবনের প্রথম সনেট 'সন্ধি সমাধি'।

স্বপ্ন দেখি যে রঙ্গিন সোনালী আলোয়,
ভরা থাক মোদের তৃষ্ণা মেটা জীবন।
ভুবন পূর্ণ হোক তব প্রেম-মায়ায়,
অপূর্ণতা যাক চলে অতল-গহীন।

তবুও এ ধরা ভরে ওঠেই গরলে,
ব্যথাময় জীবনে রক্তের হলাহল।
সময় যে যায় আঁধার চোখের জলে,
বিধি-লিপি বিষাদে হৃদয়ে কোলাহল।

এলো ভেসে যে কত অমানিশার রাতি,
তারই মাঝে তুমি জ্বালো স্বপ্নের বাতি;
মম চিত্তে তুমি যে আমরণের সাথী।

স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা হবে কি নিয়তি?
তাই কি হবে পরজন্মের চির-স্মৃতি!
শুধু থাক একটি পূর্ণ প্রাপ্তির তিথি।
অনেক দিন পর প্রিয়তম বন্ধু গৌরদাস বসাকের উদ্যোগে কয়েক বন্ধু মিলে বসিয়েছিলেন মাইকেলের নিজের লেখা এপিটাফ-

"দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব
বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধিস্থলে
(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি
বিরাম) মহীর পদে মহানিদ্রাবৃত
দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন!
যশোরে সাগরদাঁড়ী কপোতাক্ষ-তীরে
জন্মভূমি, জন্মদাতা দত্ত মহামতি
রাজনারায়ণ নামে, জননী জাহ্নবী!"

শুভ জন্মদিন দত্তকুলোদ্ভব কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

তথ্যসূত্র, কৃতজ্ঞতা ঋণ


-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (সেই সময়);
- নগেন্দ্রনাথ সোম (মধু স্মৃতি);
- প্রমথনাথ বিশী (মাইকেল মধুসূদন-জীবনভাষ্য);
- গোলাম মুরশিদ (আশার ছলনে ভুলি);
- সুরেশচন্দ্র মৈত্র (মাইকেল মধুসূদন দত্ত জীবন ও সাহিত্য);
- শিশির রায় :গবেষক, কলাম লেখক, আনন্দবাজার পত্রিকা;
- মধুসূদনের লেখা পত্রসমূহ; অন্যান্য গ্রন্থ।