কালের খেয়া

কালের খেয়া


'বীরাঙ্গনাকাব্যের' একটি পত্র 'লক্ষ্মণের প্রতি সূর্পণখা'

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২০      

লুৎফর রহমান

লক্ষ্মণ, সূর্পণখা দু'জনই পৌরাণিক চরিত্র। ভারতীয় মহাকাব্য বাল্মীকি রামায়ণ-উক্ত দুটি চরিত্র- লক্ষ্মণ ও সূর্পণখা। রামায়ণে রাম-লক্ষ্মণ-সীতা শুভ ও কল্যাণের প্রতীক; ত্রেতাযুগের পিতৃশোভন মূল্যবোধ, সত্য-সুন্দরের পোষকতা এবং একনিষ্ঠপ্রেমের অহংবোধে অবিচল নারীর অতুল সামাজিক মর্যাদা বক্ষ্যমাণ মহাকাব্যের নায়কপক্ষের আদর্শিক মানদণ্ড। আলোচ্য মহাকাব্যের খলনায়ক ভারতীয় আর্যসমাজ বহির্ভূত রাক্ষসরাজ রাবণ-মেঘনাদ। আর্যঅধ্যুষিত ভারতীয় সমাজে ভূমিজ অধিবাসীগণ আধিপত্যবাদী আর্য কর্তৃক অনার্য অভিধাপ্রাপ্ত। শাসক আর্যগণ ভারতীয় সমাজকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র- এই চতুর্বণে বিভক্ত করে এবং সবার উপরে থাকে শিক্ষিত, সূক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী ব্রাহ্মণ। পরশ্রমভোগী এই ব্রাহ্মণরাই ছিল আর্য সমাজের চালক। উপরি-কথিত সমাজে দ্বিজগণকে (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য) শ্রমলব্ধ অর্থ ও সেবার দ্বারা বাঁচিয়ে রাখা শূদ্রজনের জন্মের উদ্দেশ্য বিবেচিত হতো। ফলে স্থানীয় অধিবাসীগণ অচ্ছুৎ বিধায় অনার্য, রাক্ষস ইত্যাদি অভিধায় শনাক্ত হয়। রামায়ণের রাক্ষসগণ মূলত উৎপাদনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত দেশীয় শূদ্র শ্রেণির অন্তর্গত। তাদের আচরণ আর্যসমাজ অধিকর্তাদের বিচারে অসংস্কৃত; ভাষা স্থানীয় তাই অসংস্কৃত, আত্মগরিমায় উজ্জ্বল। কিন্তু প্রতিশোধপরায়ণ- অকুতোভয়। রাক্ষসরাজ রাবণের ভগিনী সূর্পণখা বক্ষ্যমাণ পত্রের রচয়িতা। লক্ষ্মণ রামায়ণের নায়ক অবতার রামচন্দ্রের কনিষ্ঠ ভ্রাতা, দশরথপুত্র। মধুসূদন দত্ত রচিত বীরাঙ্গনাকাব্যের নায়ক-নায়িকা বাল্মীকি-রামায়ণ থেকে নির্বাচিত। কিন্তু ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী আধুনিক মানুষরূপে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। পৌরাণিক চরিত্রের আধুনিক রূপায়ণই এ পত্রের মৌল উদ্দেশ্য।

পুরাণ একটি জাতির অস্তিত্বের অভিজ্ঞান। কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর সুদীর্ঘ কালের বিবর্তনের ইতিহাসের অভ্যন্তরে বিধৃত তার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, আর্থনীতিক উৎপাদন ব্যবস্থার ক্রমোৎকর্ষ সাধনের প্রচেষ্টা, অবিস্মরণীয় যুদ্ধের ইতিবৃত্ত, সাহস-বীরত্ব, ধর্মবিশ্বাস, বৌদ্ধিক বিকাশের বিচিত্র ঘটনা, বিশ্বরহস্য উদ্‌ঘাটন প্রয়াস, প্রণয়-বিরহ-বিবাহ, স্বপ্ন-কল্পনা, উৎসব-কৃত্য ও আচার অবলম্বনে রচিত আখ্যান যা ওই জাতিসত্তার মৌল বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক এবং প্রাত্যহিক জীবনের হলেও প্রত্যক্ষ বাস্তবের সঙ্গে দূর সম্পর্কে অন্বিত, তাই তারা পুরাণ। এরূপ পুরাণের চরিত্র সূর্পণখা ও লক্ষ্মণ। ভারতীয় মহাকাব্য বাল্মীকি রামায়ণে সূর্পণখা-লক্ষ্মণ প্রেম-সম্পর্ক নিম্নরূপভাবে বিন্যস্ত হয়েছে-

গোদাবরীতে স্নান করে সীতা ও লক্ষ্মণের সঙ্গে রাম আশ্রমে ফিরে এলেন এবং পর্ণশালায় উপবিষ্ট হয়ে লক্ষ্মণের সঙ্গে বিবিধ কথা কইতে লাগলেন। এমন সময় এক রাক্ষসী যদৃচ্ছাক্রমে বিচরণ করতে করতে তাঁদের কাছে এলো। দেবতুল্য রূপবান মহাবাহু জটামণ্ডলধারী সুকুমার রাজলক্ষণযুক্ত কন্দর্পকান্তি রামকে দেখে সেই কুরূপা লম্বোদরী তাম্রকেশা কর্কশকণ্ঠী বৃদ্ধা রাক্ষসী কামমোহিত হয়ে বললে, তুমি তপস্বীর বেশে ধনুর্বাণহস্তে ভার্যার সঙ্গে কেন এই রাক্ষসসেবিত দেশে এসেছ? রাম সরলভাবে নিজের সকল বৃত্তান্ত জানিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কে? তোমাকে রাক্ষসী মনে হচ্ছে, এখানে কেন এসেছ?

রাক্ষসী বললে, আমি কামরূপিণী রাক্ষসী সূর্পণখা, এই বনে একাকী বিচরণ করি, সকলে আমাকে ভয় করে। রাবণের নাম শুনে থাকবে, তিনি আমার ভ্রাতা। নিদ্রাসক্ত মহাবল কুম্ভকর্ণ ধর্মাত্মা বিভীষণ- যাঁর স্বভাব রাক্ষসোচিত নয়, এবং বিখ্যাত যোদ্ধা খর ও দূষণ- এঁরাও আমার ভ্রাতা। তোমাকে দেখেই আমি মোহিত হয়েছি। আমি প্রভাবশালিনী, সর্বত্র ইচ্ছামতো যেতে পারি, তুমি আমার ভর্তা হও। সীতাকে নিয়ে কী করবে, ও বিকৃতা কুরূপা, তোমার যোগ্য নয়। আমিই তোমার অনুরূপ ভার্যা। এই কুৎসিত অসতী ভয়ংকরী কৃশোদরী সীতাকে আর তোমার ভ্রাতাকে আমি ভক্ষণ করব। তুমি আমার সঙ্গে দণ্ডকারণ্যের সর্বত্র যথেচ্ছা বিচরণ করবে।

রাম একটু হেসে বললেন, আমি কৃতদার, ইনি আমার প্রিয়া পত্নী। তোমার মতো নারীদের পক্ষে সপত্নীর সঙ্গে থাকা কষ্টকর হবে। আমার এই কনিষ্ঠ ভ্রাতা লক্ষ্মণ সচ্চরিত্র ও প্রিয়দর্শন। ইনি অবিবাহিত, রূপে তোমারই তুল্য। বিশালাক্ষী, তুমি এঁকেই ভজনা কর।

রাক্ষসী রামকে ছেড়ে লক্ষ্মণকে বললে, তোমার যে রূপ তা আমারই যোগ্য। তুমি আমাকে বিবাহ ক'রে আমার সঙ্গে দণ্ডকারণ্যের সর্বত্র সুখে বিচরণ করবে। লক্ষ্মণ সহাস্যে উত্তর দিলেন, আমি আমার অগ্রজের দাস। তুমি দাসী-ভার্যা হতে চাচ্ছ কেন? তুমি রামেরই কনিষ্ঠা পত্নী হও। রাম এই বিরূপা অসতী করালদর্শনা বৃদ্ধাকে ত্যাগ করে তোমারই ভজনা করবেন।

লক্ষ্মণের পরিহাস বুঝতে না পেরে সূূর্পণখা রামকে বললে, তুমি তোমার এই কুরূপা ভার্যাকে ত্যাগ করে আমার আদর করছ না। দেখ, আমি এখনই একে ভক্ষণ করছি। এই বলে সে ক্রুদ্ধ হয়ে সীতার দিকে ধাবমান হলো, যেন মহা উল্ক্কা রোহিণী নক্ষত্রের দিকে যাচ্ছে। তখন রাম বললেন, সৌমিত্রি, এই ত্রূক্ররপ্রকৃতি অনার্যার সঙ্গে পরিহাস করা উচিত নয়, দেখ, সীতা যেন মৃতপ্রায় হয়েছেন। তুমি এই প্রমত্তা অসতীকে বিরূপ করে দাও।

লক্ষ্মণ তখনই খÿাঘাতে সূূর্পণখার নাসাকর্ণ ছেদন করলেন। বর্ষার মেঘের ন্যায় গর্জন করতে করতে সেই রাক্ষসী শোণিতাক্তদেহে মহাবনে চলে গেল [রামায়ণ, রাজশেখর বসু, পৃ. ১৬২]

রাম-লক্ষ্মণ কর্তৃক লাঞ্ছিতা-অপমানিতা সূূর্পণখা প্রথমে তার ভ্রাতা খর-দূষণের কাছে গিয়ে উপস্থিত হয়ে সমগ্র বৃত্তান্ত বর্ণনা করে এবং ভাইদের এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে বলে। রাম-লক্ষ্মণ অতঃপর খর-দূষণসহ চৌদ্দ হাজার রাক্ষসকে হত্যা করে। কিন্তু সূূর্পণখার অন্তরে জাগ্রত ক্রোধ, প্রতিহিংসার আগুন তাতেও নেভে না। সে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাবণের নিকট আনুপূর্বিক যাবতীয় ঘটনা উপস্থাপন করে নিজের অপমানের প্রতিশোধ নিতে ভাইকে অনুরোধ করে এবং এক পর্যায়ে ভর্ৎসনাও করে। তখন রাবণ মারীচের সহায়তায় পঞ্চবটী বনের পর্ণকুটির হতে সীতাকে হরণ করে লঙ্কায় নিয়ে যায়। সীতাকে উদ্ধারের নিমিত্ত রাম-লক্ষ্মণ বানরসৈন্যসহ লঙ্কা আক্রমণ করে। এভাবেই ঘটনাপরম্পরায় রামায়ণের লঙ্কাযুদ্ধের মূল কারণ রূপে আবির্ভূত হয় সূূর্পণখা [প্রাগুক্ত]।

মধুসূদন দত্ত রামায়ণের 'লঙ্কাকাণ্ড' অবলম্বন করে রচনা করেন তাঁর অমর সৃষ্টি 'মেঘনাদবধ কাব্য'। পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে, তিনি বাল্মীকির অনুসারী নন। 'মেঘনাদবধ কাব্যে'র আখ্যান বিন্যাসে তিনি স্বীয় পরিকল্পনার অধীন- যেখানে আক্রান্ত দেশের রাজা মার্জিত রুচির ও উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী দেশপ্রেমিক, প্রজাবৎসল রাজা রাবণ। ন্যায়দণ্ডের অধিকারী রাবণ বোনের সম্মানহানির প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যেই সীতাকে হরণ করে এবং অপহৃত া সীতাকে সসম্মানে বিভীষণ-স্ত্রী সরমার তত্ত্বাবধানে রেখে তার মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। লঙ্কা আক্রমণকারী রাম-লক্ষ্মণ দেশবৈরী, রাবণের ব্যক্তিগত শত্রু তারা নয়। দেশের সম্মান, স্বাধীনতা রক্ষায় রাবণ সর্বশক্তি নিয়োগ করে। 'মেঘনাদবধ কাব্যে' বিভীষণ রামায়ণের বিভীষণের মতো মহাত্মা নয়, সে দেশের শত্রু, জাতির শত্রু। রাম-লক্ষ্মণকে লঙ্কায় প্রবেশের সহযোগিতা করেছে বিভীষণ- শত্রুপক্ষ অবলম্বন করায় সে দেশবাসীর কাছে বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হয়েছে। মীর জাফর এসে তারই ছায়ায় দঁাঁড়ায় যেন। পলাশীর যুদ্ধে পূর্বাপর নবাব সিরাজের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খানের ভূমিকা মেঘনাদবধ কাব্যের বিভীষণের ভূমিকার সমান্তরাল। এ কথাও মান্য যে, একালের কোনো বাঙালি যদি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি সেনাদের যাবতীয় অপকর্মের দোসর এদেশীয় রাজাকার-আলবদরদের বিভীষণগোত্রীয় বলে চিহ্নিত করেন, তাতেও সত্যের অপলাপ হবে না।

অপরপক্ষে, সূূর্পণখা মধুসূদনের দৃষ্টিতে রূপমুগ্ধা প্রেমিকা, সে নিরপরাধ। বাঞ্ছিতজনকে প্রেমের প্রস্তাব দান অঙ্গহানি ঘটাবার মতো কোনো অপরাধও নয়। একজন নারী বাঞ্ছিত পুরুষকে তার আন্তরিক আকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্ত করবে- এটাই আধুনিক চিন্তা, নিয়ম ও নীতি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মধুসূদন দত্তের শূর্পনখা সুরুচিসম্পন্না আধুনিক বিদূষী নারী। সে তার নির্বাচিত পুরুষ লক্ষ্মণকে কায়মনোবাক্যে মন দিয়েছে সেই মুগ্ধতাবিধৃত তার পত্রে। মধুসূদন লেখেন-

'যৎকালে রামচন্দ্র পঞ্চবটী-বনে বাস করেন, লঙ্কাধিপতি রাবণের ভগিনী সূর্পণখা রামানুজের মোহন-রূপে মুগ্ধা হইয়া, তাঁহাকে এই নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি লিখিয়াছিলেন। কবিগুরু বাল্মীকি রাজেন্দ্র রাবণের পরিবারবর্গকে প্রায়ই বীভৎস রস দিয়া বর্ণন করিয়া গিয়াছেন; কিন্তু এ স্থলে সে রসের লেশ মাত্রও নাই। অতএব পাঠকবর্গ সেই বাল্মীকিবর্ণিতা বিকটা সূর্পণখাকে স্মরণপথ হইতে দূরীকৃতা করিবেন।'

উদ্ধৃতাংশে মধুসূদন দত্ত তাঁর আলোচ্য পত্র রচনার উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট করেছেন। তাঁর বক্তব্যে রাবণ চরিত্র ও তার পারিবারিক পরিবেশ ও জাতি পরিচয় রচনায় কবিগুরু বাল্মীকির পক্ষপাতিত্বের প্রসঙ্গ উত্থাপিত। রাক্ষস নামক কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব একমাত্র রামায়ণ ব্যতীত বৈদিক সাহিত্য এবং আর্যপুরাণ, সংহিতা ও সামাজিক অনুশাসন-শাস্ত্রে লভ্য; অন্যত্র এ প্রসঙ্গ অনুপস্থিত। এমনকি জীববিজ্ঞানও সম্ভবত এমন প্রজাতির কোনো প্রাণীর সন্ধান পায়নি আজও। 'রামায়ণ'-এ যে, আর্য-অধ্যুষিত ভারতবর্ষে স্থানীয় জনগণকেই অবজ্ঞাভরে অনার্য, রাক্ষস, বানর ইত্যাদি পারিভাষিক শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে, তা সন্দেহাতীত। আর্যধর্ম অবতার রামচন্দ্র ধরাধামে আসেন- হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী সে ইতিহাস ত্রেতাযুগের। মধুসূদনের শিল্পভাবনা ও দার্শনিক অভিপ্রায় তা থেকে ভিন্ন। সেই ভিন্নতা মানবী সূর্পণখার আবেগ প্রকাশের মধ্য দিয়ে নবরূপে বিধৃত। নিল্ফেম্নর বক্তব্য সূর্পণখার প্রতিনিধিস্বরূপ। সূূর্পণখা লিখেছে-

"কে তুমি নির্জন গহনবনে একাকী করছ ভ্রমণ, ঐশ্বর্য-অলঙ্কৃত অঙ্গ?
ভস্মমাঝে আগুন লুকিয়েছ বলো কোন্‌ কৌতুকে?
তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, পূর্ণিমার চাঁদ যেনো মেঘের আড়ালে
রেখেছে ঢেকে আপন বিভা?
মোহনীয় অপরূপ রূপের অধিকারী তোমার, মাথায় জটাজুট দেখে
কষ্টে ফেটে যায় বুক হে, মনোহর চুলের অধিকারী!
সোনার বিছানা ত্যাগ করে কষ্টে নিঃস্পৃহ জেগে থাকি আমি,
যখন ভাবি হায়রে! প্রতিদিন রাতভর হে, চমৎকার দেহের অধিকারী,
মাটির শয্যায় তুমি কতো কষ্টে করো রাত্রি যাপন।
নিয়মের অধীন দাসী আহারের জন্য প্রতিবার সুস্বাদু রাজভোগ
করে পরিবেশন, রুচে না মুখে সে খাদ্য আমার, কেঁদে ফিরাই মুখ
অন্যদিকে;

মনে পড়ে কতো কষ্টে তুমি করছ দিন যাপন,
হে বীর শুধুই ফল-মূল প্রতিদিনের খাদ্য তোমার।
এই বন ছেড়ে সোনার মন্দিরে পিতৃগৃহে প্রবেশের পর শ্নথ হয়ে আসে
আমার গতি আনন্দহীনতায়, কারণ তোমার বসবাস বেতসকুঞ্জে!
হে সুন্দর! শীঘ্র এসে আমাকে বল শুনি- এই খরযৌবনে কোন্‌ সে দুঃখে
এমন বিমুখ হয়েছ তুমি জাগতিক সুখ-ভোগে? কোন্‌ সে অভিমানে
রাজবেশ ত্যাগ করে, বিচরণ করছ এই উদাসীন বেশে? সোনার বরণ
মৈনাক পর্বতের মতো, হে তেজস্বি, বলো, তুমি এ গহন অরণ্যে
শীর্ণদেহে কর বিচরণ সীমাহীন কষ্টে একাকী, বিষাদভারাক্রান্ত চিত্তে,
ঢেকে রেখে তোমার প্রবল পৌরুষ?
মনের কথা তোমার আমাকে বল এসে-

কোনো শত্রুর বীরত্বের কাছে যদি পরাজিত হতমান তুমি তবে
শীঘ্র বলো আমাকে; জগৎজয়ী সৈন্য তোমাকে দিব- রথ, অশ্ববাহিনী,
রথচালনায় জগদ্বিখ্যাত রথী- যাদের তুলনা নেই এ বিশ্বে।

যার অস্ত্রভয়ে ভীত ইন্দ্র (শচীর প্রিয়তম স্বামী), স্বর্গীয় দেবতা, সেই ভীম
আদেশ দিলে আমি, রথে আরোহণ করে যুদ্ধে করবে লড়াই তোমার জন্যে-
চন্দ্রালোকে, সূর্যলোকে, স্বর্গ-মর্তে, ত্রিভুবনের যেখানেই থাক লুকানো শত্রু
বেঁধে এনে তাকে হে বীর, তোমার পায়ে করব উৎসর্গ।

দেবী দুর্গা যিনি আমার কুলদেবী, ইচ্ছে করলে তুমি, আমার সাধনা বলে ভীষণ
খড়গ হাতে হুঙ্কার দিয়ে আসবে ছুটে যুদ্ধের ময়দানে লড়তে নেচে নেচে,
তিনি দেবতা-দৈত্য-মানুষের মূর্তিমতী ত্রাস। বল তাড়াতাড়ি;- লঙ্কার
অলঙ্কার ভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দেব তোমার মনস্তুষ্টির জন্য আমি; অন্যথায়,
মায়া বা যাদু বলে উড়িয়ে দিয়ে রত্নব্যবসায়ীকে লুট করে দেব রত্ন-ভাণ্ডার।
মণিমুক্তাভরা মণির উৎপত্তিস্থান খনি যতো সব দেব তোমাকে।

প্রেমউদাসীন যদি তুমি, বলো হে গুণমণি কোন্‌ যুবতীর
(আহা, ভাগ্যবতী সে রমণী নারী সমাজে!)- তাড়াতাড়ি বল,
কোন্‌ যুবতীর নবীন যৌবন-মধু কাঙ্ক্ষিত তোমার? ধারণ করে তার রূপ
মুহূর্তমধ্যে (সক্ষম আমি হে প্রিয়, ধারণ করতে যেমন ইচ্ছে রূপ) আমি করব
মনরঞ্জন তোমার। স্বর্গের পারিজাত ফুল এনে প্রতিদিন রচনা করব
তোমার শয্যা, আমার সঙ্গে আমার হাজার সখী তোমার মনরঞ্জনের জন্যে
নাচ, গান, অভিনয়ে কাটাবে ব্যস্ত সময়।
অপ্সরা, কিন্নরী, বিদূষী সুন্দরী স্বর্গরমণীগণ যেমন সেবা করে
স্বর্গরাজ ইন্দ্রের স্ত্রী শচীকে, তেমনি করে সেবা আমাকে এক হাজার দাসী;
সোনাদ্বারা নির্মিত ঘরে আমি বসবাস করি-
তার মেঝে তৈরি মুক্তা দ্বারা; মরকত ধাতু নির্মিত তার সিঁড়ি;
হীরা ও পদ্মরাগ মণির স্তম্ভ সে গৃহের, আইভরি নির্মিত জানালা,
কপাটে নানা রত্নমণি! রাতদিন চারি দিকে ধ্বনিত তার সুমধুর কলকণ্ঠ;
পাখি গান গায় মধুর সুরে; নারীশিল্পীগণ মধুরতর সুরে বাজায় বীণা;
শত শত ফুলবাগানের সুগন্ধ লুট করে সারাক্ষণ বইতে থাকে সুস্নিগ্ধ বাতাস!
ঝর্না আপন খেলে খেয়ালে সারাক্ষণ; কলকল শব্দে বইতে থাকে জল।
কিন্তু অর্থহীন এ বর্ণনা।
এসো হে গুণবান, এসে দেখো,-
তোমারই পায়ে আমার এই মিনতি। তোমাকে আমার দেহ-মন-প্রাণ সমর্পণ
করব আমি।...

[অংশ] ইতি শ্রীবীরাঙ্গনাকাব্যে সূর্পণখা পত্রিকা নামে পঞ্চম সর্গ।
[দ্র. ক্ষেত্রগুপ্ত সম্পাদিত. মধুসূদন রচনাবলী, সাহিত্য সংসদ]

এ পত্রের ভাষা, ভাব, বাণী আধুনিক। মধুসূদনের জীবনবোধে উচ্চকিত। এই সূর্পণখার চরিত্রে বাংলার বৈষ্ণব সাহিত্যের নায়িকার অন্তর্গত ভাবোচ্ছ্বাসের সঙ্গে ইউরোপীয় রোমান্টিক কাব্যের নায়িকার কল্পনার বিস্তার অদ্বৈতসত্তায় লীন হয়ে আছে।

মধুসূদন দত্ত রামায়ণের 'লঙ্কাকাণ্ড' অবলম্বন করে রচনা করেন তাঁর অমর সৃষ্টি 'মেঘনাদবধ কাব্য'। পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে, তিনি বাল্মীকির অনুসারী নন। 'মেঘনাদবধ কাব্যে'র আখ্যান বিন্যাসে তিনি স্বীয় পরিকল্পনার অধীন- যেখানে আক্রান্ত দেশের রাজা মার্জিত রুচির ও উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী দেশপ্রেমিক, প্রজাবৎসল রাজা রাবণ। ন্যায়দণ্ডের অধিকারী রাবণ বোনের সম্মানহানির প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যেই সীতাকে হরণ করে এবং অপহৃত া সীতাকে সসম্মানে বিভীষণ-স্ত্রী সরমার তত্ত্বাবধানে রেখে তার মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।