কালের খেয়া

কালের খেয়া


শ্রদ্ধাঞ্জলি

'বাংলা ভাষা মূলগতভাবে লিরিক্যাল'

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০      
২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রয়াত হয়েছেন বাংলা ভাষার অসামান্য প্রতিভাধর কবি আল মাহমুদ। মৃত্যুর আগের এক জন্মদিন উপলক্ষে বাংলা কবিতার ছন্দ ও ব্যঞ্জনায় প্রবাদপ্রতিম এ কবি কথা বলেছিলেন কালের খেয়ার জন্য। রোগসজ্জা থেকে ফিরে ক্ষীণ শ্রবণ ও ভাঙা ভাঙা বাক্যে তার জীবন ও সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছিলেন। প্রথম প্রয়াণবার্ষিকীতে সেই একান্ত আলাপচারিতার কিছু অংশ পত্রস্থ হলো। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সঞ্জয় ঘোষ।

আপনাকে সুস্থ দেখে ভালো লাগছে। একদিন বলেছিলেন, একজন কবি জাতিকে স্বপ্ন দেখায়। আপনি সেই স্বপ্ন কতটা দেখাতে পেরেছেন?

সুখে থাকার, ভালো থাকার কিছু স্বপ্ন আমি দেখাতে চেষ্টা করেছি। কতটা পেরেছি, জানি না।

কেমন লেগেছে এই জীবন?

মোটামুটি একটা দীর্ঘ জীবন কাটিয়েছি। ভালোই লেগেছে।

কবি হয়ে কোনো আফসোস আছে আপনার? জীবনে কবি না হলে কী হতেন?

আই উইশ টু বি এ পোয়েট। আমি কবি হতেই চেয়েছিলাম। কবিতার প্রতি একটা পক্ষপাত আমার আছে। কবিতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল। কবিতা লিখেছি। কবিতা প্রকাশ হলে আনন্দিত হয়েছি।

এখনকার সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে জানতে ইচ্ছা করে না?

হাঁ, করে। শারীরিক বার্ধক্যের কারণে পারি না। তবে খুবই জানতে ইচ্ছা করে।

গত কয়েক বছর আগেও দেখেছি, আপনি দিন শুরু করতেন গোল্ডলিফ দিয়ে। আগের মতো সিগারেট খেতে ইচ্ছা করে এখন আর?

যদিও এখন খাওয়া হয় না। খেতে দেয় না, অসুস্থতার কারণে। তবে দিলে শখ করে একটা খেতে ইচ্ছা করে।

জীবনের এ পর্যায়ে এসে কবিতা থেকে কি অবসর নিয়েছেন বলে মনে হয়? নাকি লিখতে ইচ্ছা করে এখনও?

অবসর নিয়েছি- এটা মনে হয় না। তবে একা একা পারছি না। কবিতা তো আমৃত্যু লিখতে ইচ্ছা করে। কারণ একদিন কবিতা আমাকে হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে।

অজস্র কবিতা এবং সেই সঙ্গে গল্প-উপন্যাসও লিখেছেন। এমন কিছু কি লেখার ছিল, যা না লিখতে পেরে আফসোস হয় বা লিখতে ইচ্ছা করে?

লিখতে তো ইচ্ছা করে। সুযোগ পেলে লিখতাম। কিন্তু কী লিখতাম জানি না।

শৈশবের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, তিতাসের পাড়ে যেতে ইচ্ছা করে?

কেউ তো নেই ...! কার কাছে যাব!

জায়গাগুলো তো আছে ...

হাঁ, আছে। কিন্তু পরিচিত মানুষ যারা ছিল, তারা তো আর নেই। স্বাভাবিকভাবেই সময় ও বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে। একটা ভাই আছে। আর সবাই তো চলে গেছে দেশে-বিদেশে অথবা মৃত্যুর ওপারে। যেতে ইচ্ছা করলেও তো হবে না- আমি তো প্রায় অন্ধ মানুষ। কেউ নিয়ে না গেলে তো আর যেতে পারি না। তা ছাড়া কে আমাকে নিয়ে যাবে!

ছেলেবেলার বন্ধুরা কই? মনে আছে তাদের কথা?

মনে আছে, তবে এখন আর চিন্তা করতে পারি না।

আবার জীবন পেলে কী হতে চাইবেন?

আবার জীবন পেলে আমি কবিই হতে চাইব।

কেন?

আমার কবি-জীবন পূর্ণ হয়নি। আমার কবি-জীবন অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

কেন অসম্পূর্ণ মনে হয়?

মনে হয় কারণ, ভাবি, কল্পনাশক্তির সাহায্য নিয়ে আরও কিছু কাজ করতে পারতাম। পারিনি। আরও কিছু কাজ রয়ে গেছে।

একে একে আপনার সব কাব্যসহযাত্রী চলে গেছেন। নিঃসঙ্গ মনে হয় না?

হুম্‌, খুব কষ্ট হয়। কারণ এদের জন্য আমার মধ্যে একটা ফিলিং আছে।

এখন একলা থাকলে কী ভাবেন?

নিরুত্তর।

'পাঠে আমার মন বসে না কাঁঠালচাঁপার গন্ধে'... সেই কাঁঠালচাঁপা গাছটা কোথায়?

আমাদের বাড়িতে ছিল। অসাধারণ ঘ্রাণ। তবে গাছটা কোনদিকে ছিল, এখন ঠিক মনে নেই।

আপনার বাবা-মা কি চেয়েছিলেন যে আপনি কবি হবেন?

না, তারা চাননি।

বাধা দিতেন?

বাধাও দিতেন না।

বাবা-মা ছেলেকে কেমন দেখতে চাইতেন?

এক ধরনের সার্থক জীবনই তারা চাইতেন।

আপনি কি মনে করেন, আপনার জীবন সার্থক নয়?

আমি আমার জীবনকে সার্থক ভাবি।

বলছিলাম, জীবনের এই এতটা সময়ের উপলব্ধিগুলো কেমন? এই পার করে আসা জীবনের অনুভবটা কেমন লাগে?

বার্ধক্য একটা আনন্দদায়ক অবস্থাই তৈরি করে আমার কাছে। কারণ মানুষ এমনিতেই বৃদ্ধ হয় না। অনেক দেখে-শুনে, কষ্ট পেয়ে, আনন্দের মধ্যে থেকে বৃদ্ধ হয়। বার্ধক্য মানেই হলো অভিজ্ঞতা, পরিপূর্ণতা। আমার কাছে বার্ধক্য সহনীয়। কখনোই অসহনীয় মনে হয় না।

যৌবনের কাব্যময় দিনগুলোর কথা কতটা মনে পড়ে?

পঞ্চাশের দশকের আধুনিক কবিতার জন্মই তো আমাদের হাতে হয়েছে। এই ঢাকার পথে, আড্ডায়, আনাচে-কানাচে। আধুনিক কবিতার বয়স কত হবে? ধরা যাক একশ' বছর। তার পরও কবিতাকে তো আর আধুনিক বলা যায় না। কিন্তু কবিতা, কবিতাই। কবিতা চিরকালীন। আমরা এই ঢাকায় বাংলা সাহিত্যের একটা স্থায়ী আসর তৈরি করে রেখেছিলাম। যারা তরুণ কবি, তাদের কবিতার নতুনত্ব, আবার কিছু কিছু বিষয়ে বিরোধিতা, সমর্থন, উত্তেজনা- সব মিলিয়ে একটা কম্পমান অবস্থা ছিল ঢাকার সাহিত্যে, ঢাকার শিল্পে।

মাঝে মাঝে কি এখন আর নিজের প্রিয় পঙ্‌ক্তিমালা মনে করে আওড়ান?

হাঁ, এমন হয় মাঝে মাঝে। কিন্তু আমার স্মৃতিশক্তি আর আগের মতো নেই। আমার বিস্মরণ আছে।

আপনার কবিতায় নারী, প্রেম যেমন গভীরভাবে এসেছে, তেমনি প্রকৃতিও এসেছে মাটি ও প্রেমের হাত ধরাধরি করে ...

হুম্‌, আমার কাছে প্রেম কবি-জীবনের এক অপরিহার্য সম্পদ। আর একটা দেশের সঙ্গে, তার প্রকৃতির সঙ্গে, মাটি ও নদীর সঙ্গে একজন কবির রক্ত-মাংস জড়িত। দেশ যেমন থাকে, একজন কবিও তেমনি থাকেন। তার অন্য কোনো ভালো-মন্দ নেই। দেশবোধ তো থাকবেই। এটা আসলে মানুষের একটা আকাঙ্ক্ষা। এ আকাঙ্ক্ষা থাকেই। এ আকাঙ্ক্ষাকে কখনও কাজে লাগানো যায়, কখনও যায় না। কিন্তু সৃজনবেদনা যেটাকে বলে- তৈরি করার জন্য, সৃষ্টি করার জন্য মানুষের মনে একটা অ্যাগনি, পেইন থাকে, যাকে সৃজনের বেদনা বলি; কবির মধ্যে থাকে সবচেয়ে বেশি। সেই বেদনাকে বিশ্নেষণ করে দেখতে হবে যে, এর মধ্যে কী আছে।

সারাদিন কীভাবে কাটে এখন?

সারাদিন বসেই থাকি। তবে সারাদিনই মানুষ আসে নানা রকম। একা তো থাকি না। সব সময় মানুষ আসে। আমার সঙ্গে কথা বলতে আসে, আমাকে দেখতে আসে। এটাও আমার একটা সৌভাগ্য।

তুলনামূলক বিচারে বাংলা সাহিত্য এবং তার অবস্থান সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?

বাংলা তো আর অন্য ভাষার মানুষ পড়তে পারে না; তাকে ইংরেজিতে পড়তে হয়। তা ইংরেজি দিয়ে বাংলার আর কতখানি ধরা যায়! বাংলা ভাষার ঐশ্বর্য দুই হাজার বছর আগে থেকে বিস্তৃত। সেই যে চর্যাপদ বা তারও আগে থেকে শুরু। একটা কথা আছে না, চর্যাপদের হরিণী। সেই চর্যা থেকে দেখলে বাংলা ভাষার গতি-প্রকৃতি অত্যন্ত দৃঢ়গামী, আনন্দদায়ক এবং হৃদয়ে পুলক সৃষ্টিকারী। ওই যে আছে না- 'আঙ্গন ঘরপণ সুন ভো বিআতী।/ কানেট চোরে নিল অধরাতী/ সসুরা নিদ গেল বহুড়ী জাগঅ।/ কানেট চোরে নিল কা গই মাগঅ' এই তো!

বাংলা ভাষা মূলগতভাবে লিরিক্যাল। ছন্দে-গন্ধে ভরপুর। যারা এই সব পদ রচনা করেছেন, তারা ছিলেন অসাধারণ ব্যক্তি। পরিবর্তন তো অহরহ হচ্ছেই। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে, মানুষের লিরিক্যাল মেজাজ যেটা, মানে আমাদের যে গীতিপ্রবণতা; এটার কখনও পরিবর্তন হবে না। এটা বাংলা ভাষার মৌলিক সম্পদ।

কবিতা এমন
আল মাহমুদ

কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান
আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি
পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ভাই-বোন
আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি- রাবেয়া রাবেয়া-
আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট!


কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী
কুয়াশায়-ঢাকা-পথ, ভোরের আজান কিম্বা নাড়ার দহন
পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ
মাছের আঁশটে গন্ধ, উঠানে ছড়ানো জাল আর
বাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর।

কবিতা তো ছেচলিল্গশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর
ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান
চতুর্দিকে হতবাক দাঙ্গার আগুনে
নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্রজের কাতর বর্ণনা।

কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস
ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর
গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর
কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।