কালের খেয়া

কালের খেয়া


অধিকাংশ দেশে গণতন্ত্র কেন পিছু হটছে

সাম্প্রতিকের তর্ক ও বিতর্ক

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৯ জুন ২০২০      

পর্ব ::৪৮

[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

অথচ অনেককেই আজকাল চলতি হাওয়ার প্রভাবে সংকুচিত হয়ে বলতে শুনি 'ডিক্টেটরশিপ অব প্রলেতারিয়েত? ওটা তো উনিশ শতকীয় ধ্যান-ধারণা। আধুনিক যুগে তা বাতিল হয়ে গেছে কবেই।' ফুকো অন্তত তা মনে করতেন না। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলও তা-ই ভেবেছেন। কেননা, তারা খুব কাছে থেকে দেখেছিলেন কীভাবে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের গাছ বেয়ে স্বৈরতন্ত্রের সর্প ঠিকই রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছে যেতে পারে। ডেমোক্রেটিক ম্যান্ডেটই গণতন্ত্রের শেষ কথা নয়। সুতরাং গণতন্ত্রের ধারণাটি মার্কসের কালে যেমন, বিশ শতকের শেষভাগে এসেও একটি অস্বস্তিকর ধারণা হিসেবে রয়ে গেছে। যারা প্রথাগত অর্থে মার্কসবাদী ছিলেন না, তাদের কাছেও।

শুধু ফুকো নন, তার চেয়ে কমবয়েসী কিন্তু ভিন্ন পথের পথিক জাক দেরিদার কাছেও বুর্জোয়া গণতন্ত্র সমাদৃত হয়নি। তিনি সাধারণ গণতন্ত্রকে এক পাশে রেখে র‌্যাডিকেল ডেমোক্রেসির কথা ভেবেছেন। বলেছেন এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা, যার পরিচয় ক্রমশ প্রকাশ্য- 'যে-গণতন্ত্র আসতে বাকি' (Democracy-to-come)। এর অর্থ নির্বাচনী সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে গণতন্ত্রের অন্য কোনো অর্থ খুঁজে নিতে হবে। উনিশ শতকের গণতন্ত্রে, নির্বাচনে ভোটের অধিকার ছিল কেবল শ্বেতাঙ্গদের। তা-ও সবার নয়, যারা 'প্রপার্টিড ক্লাস' তাদেরই ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল। বিশ শতকের শেষে এসে কালক্রমে অধিকাংশ দেশেই সার্বজনীন ভোটের ('ওয়ান ম্যান ওয়ান ভোট') গণতন্ত্রের প্রথা চালু হয়। এই-যে 'শ্রেণি' থেকে 'সার্বজনীনতা'য় উত্তরণ, একে গণতন্ত্রের অন্তিম পরিণাম বলে ভাবতে চেয়েছেন কেউ কেউ। কিন্তু দেরিদার এতে সায় নেই। আগামীকালের গণতন্ত্র বলতে তিনি এমন একটি ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা ভিন্ন স্বরের সাম্যবাদেরই নামান্তর। এদিক থেকে দেখলে মিশেল ফুকো, জাক দেরিদা, এলান বাদিউ- এই প্রভাবশীল ত্রয়ীর মধ্যে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে অন্য গণতন্ত্রের, অন্য ক্ষমতাবলয়ের, অন্য সাম্যবাদের তত্ত্ব-তালাশের চেষ্টা দেখতে পাই। শুধু ফরাসী দার্শনিকদের মধ্যে নয়; জার্মান দার্শনিক হাবেরমাসও এই পথের পথিক।

এ তো গেল উন্নত বিশ্বের প্রসঙ্গে গণতন্ত্রের ধারণাটির অব্যাহত সীমাবদ্ধতার কথা। তৃতীয় বিশ্বের প্রশ্নে এসে গণতন্ত্রের গতি-প্রকৃতি নির্ণয় আরো বেশি অনির্ধারিত হয়ে পড়ে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার সাথে যারা জড়িত ছিলেন তাদের কথা। সাব-অলটার্ন হিস্টরি প্রকল্পের সময় বহু ডিসিপ্লিনের চিন্তকরা যুক্ত হয়েছিলেন। এর মধ্যে পার্থ চ্যাটার্জী একাধারে ইতিহাসবিদ ও পলিটিক্যাল থিওরিস্ট। তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো- উনিশ শতকের বুর্জোয়া গণতন্ত্র একদিকে যেমন সম্প্রসারিত হয়েছে সার্বজনীন ভোটাধিকারের মধ্যে, অন্যদিকে এর সার্বজনীনতার আবেদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পুঁজিবাদের প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকার কারণে। 'পুঁজিবাদ গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ছে'- এটাই তার মুখ্য বক্তব্য। এবং সেটা শুধু তৃতীয় বিশ্বেই নয়, প্রথম বিশ্বেও। ফলে উনিশ শতকীয় গণতন্ত্রের মধ্যে ফরাসি রাষ্ট্রদূত, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক আলেক্সি দ্য টোকভিল (Alesis de Tocqueville) তার 'ডেমোক্রেসি ইন আমেরিকা' বইতে যতটা প্রগতিশীল ও আশার উপাদান দেখেছিলেন, তার অনেকটাই এখন অবলুপ্তির মুখে। ফরাসি বিপ্লবের একটি উদ্ভাবন ছিল 'রিপাবলিক' বা প্রজাতন্ত্র। তৃতীয় বিশ্বের নানা দেশের সংবিধানের প্রতিশ্রুতিতে 'প্রজাতন্ত্র' উল্লিখিত হলেও তা বাসতবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে 'প্রজায়' ও 'তন্ত্রে'। প্রজাদের তন্ত্র হয়নি, নাগরিকরা উল্টো তন্ত্রের প্রজায় পরিণত হয়েছে। ফরাসি বিপ্লবের পর পরস্পরকে বিপ্লবীরা ডাকতেন 'সিটিজেন রবেস্পিয়ার', 'সিটিজেন দান্তন', 'সিটিজেন কামিল', 'সিটিজেন স্যাঁ জুস' ইত্যাদি সম্বোধনে। রাষ্ট্রের চোখে সবারই ছিল একই পরিচয়। সবাই 'সিটিজেন'- ধনী-গরিব নির্বিশেষে। আমাদের রিপাবলিকে প্রজারা কখনোই সম্পূর্ণ সিটিজেন বা নাগরিক হতে পারেনি। ক্ষমতার কাছে নিতান্ত 'রায়তি প্রজা' হিসেবেই রয়ে গেছে। এটিও পার্থ চ্যাটার্জীর আরেকটি পর্যবেক্ষণ। সুতরাং গণতন্ত্র পিছু হটেছে বা হটেনি- সে প্রশ্নের বিচার করার আগেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, গণতন্ত্রের ক্রিটিক্যাল তাত্ত্বিকদের চোখে বিশ শতকের শেষের গণতন্ত্র- তার সার্বজনীন ভোটাধিকারের অর্জন সত্ত্বেও একটি সংকটজনক অবস্থায় উপনীত হয়েছিল। এই সংকটপূর্ণ ধারণার আবার 'আরো পিছু হটা' কল্পনা করতে হলে সংকটের ভেতরে আরো গভীর সংকটের অস্তিত্ব চিন্তা করতে হয়। এ যেন ঝড়ের ভেতরে ঝড়ের কেন্দ্রকে বা 'আই অব দ্য স্টর্ম'কে তথ্যে-তত্ত্বে প্রত্যক্ষ করার বিষয়।

গণতন্ত্র বিষয়ে বিভিন্ন মত ও পথের এত দুস্তর ব্যবধান যে এক হিসেবে এর 'পিছু হটা' নিয়ে আলোচনা করা খুবই দুরূহ। গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ কী- প্রশ্ন করলে মহামতি প্লেটো হয়তো বলতেন, এর আসল অর্থ স্বর্গলোকে লুকানো, এবং দুঃখজনকভাবে সেই অর্থটা আমাদের আজও জানানো হয়নি। শতপথ ব্রাহ্মণের সূত্রেও বলা হয়েছিল- নিও-প্লাটোনিজমের প্রভাব সেখান থেকেই চলে আসে- যে 'সত্য এক হিরণ্ময় পাত্রের মধ্যে লুকিয়ে আছে'। এ জন্যেই সঠিক অর্থে কখনোই পৌঁছানো যাবে না, অভিজ্ঞতার আলোকে একটা কেজো-অর্থ তৈরি করেই এগোতে হবে। তবে যে-অর্থই করি না কেন, এর পক্ষে-বিপক্ষের অবস্থানটা একটু পরিস্কার হওয়া দরকার। যেমন, প্লেটো তার রিপাবলিক-এ গণতন্ত্র চাননি। শুধু চাননি তা-ই নয়; একে পরিত্যজ্য জ্ঞান করেছেন। তার চোখে, গণতন্ত্রে বা লোকতন্ত্রে গণমানুষ বা লোকসাধারণের যে-শাসন, তা হচ্ছে এক নিকৃষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন। সংখ্যাধিক্যের জোরে বর্বররা যেখানে তাদের অসংস্কৃত শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। আর সেই শাসন জনগণের নয়- আসলে উন্মত্ত জনতার। জনতা অর্থাৎmob- a powerful, selfish, fickle, and inconsistent beast’;
এর ওপরে কীভাবে রাষ্ট্র-শাসনের অধিকার ছেড়ে দেওয়া চলে! স্মর্তব্য, প্লেটোর সময়ে এই 'জনতার' মধ্যে শিক্ষা-দীক্ষার চল নেই বললেই চলে। গ্ল্যাডিয়েটরদের মধ্যে রক্তপাতময় যুদ্ধ দেখাই যাদের বিনোদনের একমাত্র বা প্রধান ক্ষেত্র, তারা কীভাবে বুঝবে সক্রেটিসের দর্শন, এরিস্টোফেনিসের কমেডি, সফোক্লিসের ট্র্যাজেডি, পিথাগরাসের গণিত, আর হোমার বা হোরেসের কাব্য? সে জন্যই তিনি চান, রিপাবলিক শাসন করবেন রাজর্ষিগণ। যিনি রাজা তিনিই হবেন ঋষি, অথবা যিনি ঋষি, তিনিই হবেন নৃপতি। যেভাবেই ঘটুক, তাকে হতে হবে দ্বৈত-ভূমিকার 'ফিলোসফার-কিং'। এটা বলতে প্লেটো আসলে ক্ষমতার সাথে জ্ঞানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই বুঝিয়েছেন। পুরো উদ্ধৃতিটা মনোযোগের দাবি রাখে: রাজর্ষির দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত‘either philosophers become kings or those who are now called kings come to be sufficiently inspired with a genuine desire for wisdom; unless power and philosophy meet together’.. প্লেটোর এই কথার অনুরণন আধুনিককালেও আমরা শুনেছি। বর্বর অশিক্ষিত আবেগ-উন্মত্ত জনতার শাসনকে গণতন্ত্র নাম দিলেও তা কখনোই সুফল বয়ে আনতে পারে না- এ রকম কথা শিল্প-বিপ্লবের ইউরোপেও ধ্বনিত হয়েছে। জন স্টুয়ার্ট মিলের 'এসে অন লিবার্টি' এবং 'কনসিডারেশনস অন রিপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট' বই দুটিকে লিবারেল ডেমোক্রেসির মূল টেক্সট হিসেবে ধরা হয়। সেই তিনিও বিশ্বাস করতেন, ভোটাধিকার সব প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের (এবং নারীরই) পাওয়া উচিত, তবে একটি মাত্র শর্তে। ভোটারদের আগে 'বাধ্যতামূলকভাবে মাধ্যমিক শিক্ষায়' শিক্ষিত হতে হবে। এবং যতদিন তা না হচ্ছে, সার্বজনীনতার প্রস্তাব ততদিন মুলতবি রইল। মিলের এই 'শিক্ষিত গণতন্ত্র' প্রত্যয় অমর্ত্য সেনের 'গভর্নমেন্ট বাই ডিসকাশন' ধারণার ওপরে গভীর ছায়া ফেলেছে (মিলের 'শিক্ষার' সাথে সেনের 'ক্যাপেবিলিটি' ও 'পাবলিক রিজন' প্রকল্পের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে)। টোকভিলও ১৮৩০-এর দশকে বারবার গণতন্ত্রের শাসনে‘The dangers of a tyranny of majority কথা বলে গেছেন। জেফারসন বৃদ্ধ বয়সে বলেছেন,‘An elective despotism was not what we fought for.’ অর্থাৎ আদি-চিন্তকরাও গণতন্ত্র নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের শিক্ষা, রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারক ভূমিকা পালন করে থাকে এবং তা সময় সময় গণতন্ত্রের চরিত্রকে কলুষিত করতে পারে। সাম্প্রতিককালের একটি উদাহরণ দিই। গত কয়েক বছরে ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটের মাধ্যমেই কেন্দ্রে ও কিছু রাজ্যে জয়যুক্ত হয়েছে। ধারণা করা হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের মন-মানসিকতায় প্রবল হিন্দুত্ববাদী 'মোড় ফেরা' একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে এতে। তারই পরিণামে কাশ্মীরে 'আর্টিকেল ৩৭০' বাতিল শাসক শ্রেণির কাছে 'জনপ্রিয় রাজনৈতিক পদক্ষেপ' বলে বিবেচিত হয়েছে।

প্লেটো যা-ই বলুন না কেন, তার গুরু সক্রেটিস জনতার প্রতি অত নির্দয় ছিলেন না। শেল্ডন ওউলিন ( (Sheldon Wolin) তার 'ফিউজিটিভ ডেমোক্রেসি' বইতে দেখিয়েছেন যে ডেমোক্রেসির 'ডেমোস' কোনো অসংস্কৃত, বর্বর নয়। তাদের দক্ষতা রয়েছে নিজ নিজ কাজে। একজন কাঠমিস্ত্রি বা কারিগর বাড়ি তৈরি করতে পারে বাড়ি তৈরির পেছনের বিজ্ঞান বা কলাকৌশল তাত্ত্বিকভাবে না জেনেও, এবং সেই অর্থে 'রাষ্ট্র পরিচালনা'র খুঁটি-নাটি ব্যাপার-স্যাপার তত্ত্ব-তথ্য না জেনেও তারা রাষ্ট্র-কার্যে অংশ নিতে পারে। সক্রেটিসের সাথে সংলাপে এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে, যার থেকে গণতন্ত্রের পক্ষে যুক্তির স্পেস খুলে যায়। উদাহরণত, সক্রেটিস তর্কালাপের এক-পর্যায়ে দাবি করলেন যে 'কেবলমাত্র মহৎ ও ন্যায়বিচার করতে সক্ষম' এমন লোকদেরই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে দেওয়া উচিত। তখন আলসিবিয়াডস্‌ (Alcibiades) বললেন, 'তা কী করে হয়? সেটা হলে তো যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করছে তারা শাসনকার্যের নামে পরস্পরকে ব্যবহার করতে চেষ্টা করবে নিজেদের স্বার্থে।' এদিক থেকে আলসিবিয়াডস-এর সমসাময়িক 'হিস্টরি অব পেলপোনেসিয়ান ওয়ার'-এর লেখক (যিনি খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতকে স্পার্টা ও এথেন্সের মধ্যকার মহাযুদ্ধ নিয়ে লিখেছিলেন) থুসিডাইডস্‌ ((Thucydides)) স্পষ্ট করেই বলেছিলেন ‘The demos includes the whole state, oligarchy only a part. None can hear and decide as well as the many : those talents receive their due in a democracy.’ রাজর্ষিরা ক্ষণজন্মা অথবা বিরল, সুতরাং রাজর্ষিদের পরিচালিত রাষ্ট্র কাঙ্ক্ষিত হলেও ডেমোস-এর ওপরেই ভরসা করা উচিত- এই ছিল প্লেটোর ক্রিটিকদের মত। আশা করা গিয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত অ্যারিস্টটলের মাধ্যমে এই বিতর্কের সমাধা হবে। কিন্তু বরাবরের মতো অ্যারিস্টটল এই প্রশ্নেও মধ্য পন্থার আশ্রয় নিলেন। প্লেটোর রাজর্ষি-কর্তৃক শাসনও নয়, আবার ডেমোস কর্তৃক শাসনও নয়। তিনি প্রস্তাব করলেন যে 'অ্যারিস্টোক্রেসি' পরিচালিত রাষ্ট্র-ব্যবস্থাই সর্বোত্তম।



[ক্রমশ]