কালের খেয়া

কালের খেয়া


সবকিছু থমকে যাবার পর

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৯ জুন ২০২০      

বদরুন নাহার

দীর্ঘ শীতনিদ্রা পেরিয়ে নিউইয়র্কের মাটিফুঁড়ে সদ্য মাথা তুলেছে লিলি-টিউলিপের ঝাড়, পত্রহীন ডালগুলো সেজে উঠছে গোলাপি হাসির চেরিতে। যদিও পারদের দাগে তাপমাত্র কখনও কখনও মাইনাস। তবুও অফিসিয়ালি এ দেশে বসন্ত শুরু। কিন্তু সবকিছু থমকে গেছে তারও আগে। গত সপ্তাহেই বন্ধ হলো স্কুল-কলেজ। পৃথিবীর রাজধানী খ্যাত নিউইয়র্ক, এখানে প্রায় ১৭০টি ভাষাভাষির অভিবাসীর বাস। ঘনবসতি আর অবৈধ অভিবাসীদের ঘনত্বের কারণেও সুখ্যাতি আছে এ রাজ্যের। এ শহর ঘুমায় না বলে বিশ্ব জানে বহুকাল; সেই মোবেলিটির শহরটি এখন ভূতুড়ে। রাস্তা মানুষশূন্য। মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে এসে দাঁড়ানো মেট্রোরেলের লম্বা পেট ভরে যেত নিমেষেই, সেই সাবওয়েও এখন জনশূন্য। এখানে এখন জরুরি অবস্থা চলছে, যদি আর একটু আগে যদি ফিরে যাই, তবে দেখতে পাব কি হচ্ছিল সবার ভেতরে ভেতরে।

ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়, আমি যে ইনস্টিটিউটে পড়ছি, সেখানে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে প্রতিটি ক্লাসে শিক্ষকরা করোনাভাইরাস সম্পর্কে বক্তব্য দিলেন। ক্লাস রুমের সামনে বসল অটোমেটিক হ্যান্ড স্যানিটাইজার ডিভাইস, হাত পাতলেই বেরিয়ে আসবে সুরক্ষা! বলা হলো, পারস্পরিক দূরুত্ব বজায় রেখে চলতে, প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করো এবং সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার প্রসঙ্গে। মার্চের শুরুতে ক্লাস লেকচার হলো সিডিসি (ঈউঈ) ওয়েবপেজ ও করোনার ওপর। সবাই যেন এখন থেকে সিডিসি (ঈউঈ) ফলো করি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, নিউইয়র্কে হাজার হাজার মানুষ সকাল থেকে পাবলিক পরিবহনে ছুটছে, আমিও। ব্যাগে একটি মাস্ক নিয়েছিলাম, আর ব্যাগে সারা বছরই হ্যান্ড স্যানিটাইজার থাকে। কিন্তু মাস্ক আমি ব্যবহার করিনি। কেননা গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে বা বসেই মেট্রোতে যাচ্ছিলাম, কদাচিৎ কেউ মাস্ক ব্যবহার করছে, তা ১০০ জনে একজন। অন্যদিকে সরকারিভাবে বলা হচ্ছিল, যারা সুস্থ তাদের মাস্ক ব্যবহার দরকার নেই। ইতোমধ্যে মাস্ক পরার কারণে দু-একজন এশিয়ান হেটক্রাইমের শিকারও হয়েছেন। মার্চের শুরুতে কেউ কেউ মাফলার দিয়ে নাক ঢেকে চলছিল। বিষয়টা কেউ মুখ ফুটে বলছে না, সবাই সবার প্রয়োজনে ছুটে চলছে কিন্তু কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা এইসব মানুষের চোখেমুখে আতঙ্ক। পারস্পরিক দৃষ্টিটা ছিল যেন সবাই ভাইরাস বহনকারী; সতর্ক আর ভয়ার্ত চোখ! এমনই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি চলছিল। মার্চে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন বিশ্ব মহামারি ঘোষণা করল, শুরু হয় দোকানে দোকানে ভিড়, হ্যান্ড স্যানিটাইজার নেই, টয়লেট টিস্যু নেই। এভাবে আমরা ধীরে ধীরে সবাই করোনা মহামারিতে ঢুকে পড়ি। জরুরি অবস্থা ঘোষণার আগেই ওয়াশিংটনে করোনায় আক্রান্ত জীবনহানি ঘটে গেছে। করোনা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশেরও বেশ পরে জরুরি অবস্থার ঘোষণা এলো। এখন পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে আক্রান্তদের সংখ্যা-পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে, আর এ সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পৃথিবীতে অনেকবার মহামারি হয়েছে, ইতিহাস পাঠে, গল্প-উপন্যাস থেকে সেসব সময়ের কথা আমরা জানি। শুরুতেই করোনা মহামারিকে সাম্যবাদী ভাইরাস বলছে মানুষ, কিন্তু এর সমাপ্তির কথা আমরা এখনও জানি না। ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লুর মহামারিতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মারা যায় ছয় লাখ মানুষ। যাদের বেশিরভাগই ছিল তরুণ। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের কারণে সে খবর বিশ্বব্যাপী গোপন করা হয়েছিল বলে জানা যায়। গবেষকদের মতে, ফ্লুর খবর প্রচার পেলে মানুষ সচেতন হতে পারত, তাতে মৃত্যুর হার হ্রাস পেত। বর্তমান পৃথিবী অনেক ছোট হয়েছে তথ্যপ্রবাহের মাধ্যমে। 'ব্ল্যাক ডেথ' নামক চতুর্দশ শতকের প্লেগ মহামারি মূলত উইরোপেই ছিল, 'বেঙ্গল কলেরা' নামের মহামারি এশিয়া থেকে ইউরোপে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল প্রায় এক দশক। এখন শুধু খবর নয়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভাইরাস পৌঁছে যায় এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে। প্রকৃতি সৃষ্ট এইসব মহামারি যুদ্ধের চেয়েও ভয়ঙ্কর। অদৃশ্য, অশরীরী শত্রু আর তার কৌশল আমাদের সামনে দৃশ্যত নেই। যুদ্ধের ময়দানে চিকিৎসাকর্মীরা যে সেবা দিতে পারেন, মহামারিতে তা সম্ভব নয়। কেননা এখন তাদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই এখন প্রথম পদক্ষেপই হচ্ছে নিজেকে গৃহবন্দি করা। এই গৃহবন্দি অবস্থার সেদিন একটি প্যানডেমিক সিনেমা দেখে শিউরে উঠছিলাম, অনেক জানাও হলো তা থেকে। বলছিলাম, ২০১১ সালে স্টিভেন সোডারবার্গ নির্মিত কন্টেজিয়ন (ঈড়হঃধমরড়হ) সিনেমাটি নিয়ে। যার কাহিনি সাজানো হয়েছে নেটওয়ার্ক ন্যারেটিভের মাধ্যমে। যেখানে কাহিনি শুরু হয় 'ডে টু' থেকে, কাহিনি একে একে মহামারির এক একটি দিন পেরিয়ে যায় ... একেবারে শেষে পৌঁছে আমরা খুঁজে পাই 'ডে ওয়ান'! মানে সমস্যার শুরু। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও অনেক জানার বাকি আছে। মনে হচ্ছে, আমরা এর প্রতিরোধে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছি? যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত বিশ্বের দেশেও দেরিতে পদক্ষেপ নিল! প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে অর্থনৈতিক ধস নিয়ে শঙ্কায় প্রকাশ করতে দেখা গেছে, পরবর্তীতে তা অর্থনীতি থেকে সরে জীবন বাঁচানোর শঙ্কায় পৌঁছেছে। যেখানে জার্মানির সরকার শুরুতেই জীবন বাঁচানোর প্রসঙ্গ এনেছিলেন। যখন এই লেখাটা লিখছি তখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় আক্রান্তদের সংখ্যা সূচক জার্মানির চেয়ে অনেক উঁচুতে। কেন এইসব কালক্ষেপণ? তার সবটুকু উত্তর এখনই পাওয়া সম্ভব নয়। কোনো কালেই তা এত তাড়াতাড়ি জানা যায় না। এও এক রাজনীতি, পলিসির অংশ, কখনও কখনও কন্সেপিরেসির অংশ। চীনের রাষ্ট্রীয় চরিত্রগত কারণে হয়তো শুরুর ঘটনার অনেক কিছুই আমরা জানব না। তেমনি ইরানের বিষয়টিও অজানা থাকবে, ইতালির ঘটনা আপেক্ষিকভাবে বেশি প্রকাশ পেল? কোন সরকার এটা ঠেকাতে কোন কৌশল নিল? নানাজনের মতে, চীনের কঠোর নীতির কারণে চীন ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নির্মূল করেছে।

আবার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ইতালি দেরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ কি আরও দেরি করে ফেলেনি? নজরুলের সেই কবিতার লাইন এ অবস্থায় স্মরণ করা যেতে পারে-

বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি

কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও; উঠিছে ডঙ্কা বাজি।

গতকালও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ব্রিফিংয়ে বর্ণবাদী শব্দ ব্যবহার করে করোনাকে বলেছেন, চীনা ভাইরাস! অথচ চীনে যখন মহামারি চলছিল তখন যুক্তরাষ্ট্রে চীন থেকে আসা কোনো করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী পাওয়ার খবর আমরা শুনিনি। তবে এখন এই ভাইরাসটি কি ইউরোপ ঘুরে যুক্তরাষ্ট্রে আসছে? বিষয়টা এমন নয় যে এই মহামারিতে হোম কোয়ারেন্টাইন একমাত্র প্রতিষেধক। এটা একটা কৌশল মাত্র। মূলত তথ্য বিনিময় এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া এই যুদ্ধের সমাপ্তি সম্ভব নয়। ১৯৭৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী গুটিবসন্ত নির্মূল হওয়া এবং মানবতার জয় ঘোষণা করেছিল; এই ঘোষণা আসারও আগে বিশ্বের সব মানুষের জন্য এই রোগের প্রতিষেধক নিশ্চিত করতে হয়েছে।

আমাদের ভাবতে হবে, প্রকৃতির সীমান্ত আসলে কোথায়? চীন সীমান্ত? ইতালি সীমান্ত? বা যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সম্ভব্য দেয়াল স্থাপনে নির্ণীত হবে প্রকৃতির সীমানা?

বাংলাদেশ, ভারতসহ পৃথিবীতে নানা দেশের সীমান্ত থাকতে পারে, কিন্তু প্রকৃতির কোনো সীমান্ত নেই, প্রকৃতি সৃষ্ট ভাইরাসের কোনো সীমান্ত নেই। এ প্রসঙ্গে টাইম অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত বিখ্যাত ইতিহাসবিদ, লেখক, অধ্যাপক ইয়োভাল নোয়াহ হারারির প্রবন্ধের উল্লেখ করতে চাই। তিনি তাঁর 'করোনার বিরুদ্ধে লড়াই, মানবজাতি নেতৃত্বশূন্য' প্রবন্ধে বলেছেন, 'এ রকম বিপর্যয়ের কালে, চরম লড়াই দেখা দেয় মানবজাতির নিজেদের মধ্যেই, এই মহামারি যদি আরও বৃহৎ অনৈক্য ও অবিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে যায়, তবে ভাইরাসেরই জয় হবে। মানুষ যখন কলহে লিপ্ত থাকে, তখন ভাইরাস দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, যদি এই মহামারির সময় বিশ্ব সহযোগিতার হাত ধরে এগোয়, তাহলে এই জয় শুধু করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধেই ঘটবে না। মানুষ ভবিষ্যতের সব জীবাণুর বিরুদ্ধেই জয়ী হবে।'

তিনি বলেছেন, ২০১৪ সালে ইবোলা মহামারির সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসন সেসব ভূমিকা সংকোচন ঘটিয়েছে, যা আজ তাদের নিজেদেরও বিপদের মুখোমুখি করছে। তিনি আরও বলেছেন, কেউ কেউ ভাবছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তাদের আদর্শ জয় ও প্রমাণে এই সময় সুযোগ নিতে পারে। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে তেমন কোনো পদক্ষেপে যেতে দেখিনি, বা ইউরোপ এ নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত ব্যর্থ বলা যায়। এখন ইতালিতেই দিনে ৮০০ জন মানুষ মারা যাচ্ছে। বরং অনেক দিন বাদে আপেক্ষিকভাবে দ্রুত বৈঠক করতে দেখা গেছে সার্কভুক্ত রাষ্ট্রপ্রধানদের। যদিও সার্কের সব দেশের বাকি পদক্ষেপ এখন দৃশ্যত নয়। আসলেই বিশ্বের নেতৃত্বশূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ব যদি ইবোলা, সার্স আর সোয়াইনের মতো ভাইরাসের আগমনে সমন্বিত বৃহৎ পদক্ষেপ নিতে পারত, তবে হয়তো করোনা এতটা শক্তিশালী হয়ে ওঠার আগেই মানুষ প্রতিরোধের হাতিয়ার হাতে পেত বলে কেউ কেউ মনে করেন।

কিন্তু মহামারি করোনার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, এখন মোকাবিলার সময়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পুতুল নাচের ইতিকথা উপন্যাসটি শুরু করেছিলেন, এভাবে- 'খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়া হারু ঘোষ দাঁড়াইয়া ছিল। আকাশের দেবতা সেইখানে তাহার দিকে চাহিয়া কটাক্ষ করিলেন। হারুর মাথায় কাঁচা-পাকা চুল আর বসন্তের দাগভরা রুক্ষ চামড়া ঝলসিয়া পুড়িয়া গেল। সে কিন্তু কিছুই টের পাইল না।' মানিকের উপন্যাসের হতভাগ্য গাওদিয়া গ্রামের কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামবাসী পরবর্তীতে পাশে পেয়েছিল কলকাতাফেরত ডাক্তার, নায়ক শশীকে। তার জয় আমরা দেখেছি, 'যামিনী কবিরাজের বৌ বাঁচিয়া উঠিয়াছে, ভগবানের দয়া, যামিনী কবিরাজের বৌয়ের কপাল; শশীর গৌরব।' শশী তথা বিজ্ঞানের গৌরবের অপেক্ষায় আজ সারা বিশ্বের সকাতর মানুষ।

নিউইয়র্ক এখন লকডাউন। সবাই আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছি। প্রবাসীদের আতঙ্ক শুধু নিজেকে নিয়েই নয়। আমার চারপাশের মানুষকে বাংলাদেশ নিয়েও আতঙ্কিত হতে দেখেছি। সবারই বাবা-মা-ভাইবোন দেশে আছেন। আর সচেতন মানুষ শুধু কেবল নিজের স্বজন নয়, বাংলাদেশের মতো ছোট একটি দেশের সক্ষমতা নিয়েও আতঙ্কিত। সমষ্টিগত বিষয়েই চিন্তিত। দেশে ইতালিফেরত প্রবাসীবিষয়ক যে বিতর্ক আর অপ্রীতিকর বাক্যবাণের ঘটনা ঘটেছে, তা যেমন এই সময়ের অস্থিরতার বহির্প্রকাশ, তেমনি দীর্ঘদিনের অসহনশীলতার সংস্কৃতিও বটে। বাঙালির প্রবাদ বাক্যেরই দুটি পরস্পরবিরোধী প্রকাশ আছে। যেমন 'বিপদে প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় মেলে', অন্যদিকে 'আপনে বাঁচলে বাপের নাম'। আমরা কোন পথে হাঁটব? কিংবা বিশ্বের সবাই কোন পথে হাঁটছে? কেন আমাদের কাছে কানাডিয়ান প্রেসিডেন্ট জাস্টিন ট্রুডোর ঘোষণাকে রূপকথার গল্প বলে মনে হয়।

আসলেই যেন করোনা সাম্যবাদী ভাইরাস, মানুষের শ্রেণি চিহ্নিত করে এর বিকাশ ঘটছে না। তা থেকে যে সত্যটি প্রকট হলো, স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি কেবল একটি শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে কেউ বেঁচে যাবে না। প্রান্তিক থেকে শুরু করে সবাইকে স্বাস্থ্যনীতির আওতায় না আনলে মানুষের মুক্তি মিলবে না। করোনায় আক্রান্ত মানুষকে শনাক্তকরণ কিট নিউইয়র্কেও পর্যাপ্ত নেই, নেই অনেক ভেন্টিলেশন মেশিন। যদিও কোনো দেশেই আইসিইউ আর ভেন্টিলেশন মেশিন অনেক থাকে না বা থাকার কথা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় এখনকার অবস্থা যদি পর্যালোচনা করি তবে বাংলাদেশের সঙ্গে আনুপাতিক খুব বেশি তারতম্য পাব না। কিন্তু তারপরও তারতম্য আছে, দিনে দিনে হচ্ছে আরও বেশি। ভৌগোলিক, আঞ্চলিক আর রাজনৈতিক কলা অনুযায়ী প্রতিটি দেশেই এই বিপদকালীন সময়ের আখ্যান ভিন্নতর হবে। জার্মানির চ্যান্সেলর যেমন শুরুতেই বলেছেন, দেশের ৭০-৮০ শতাংশ লোক এই মহামারিতে আক্রান্ত হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, এটা একটা ঢেউয়ের মতো আসবে, এই ঢেউয়ের কার্ভটাকে অতি উচ্চ হতে দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের করোনাবিষয়ক সুস্পষ্ট কোনো বিষয় আমি এখনও জানতে পারিনি।

বিষয়টি এমন নেই, যে আমাদের এখানে হবে না বলার অবকাশ আছে। কিংবা মানুষ নিজেরা সতর্ক না হয়ে বা রোগীরা হাসপাতাল থেকে পালিয়ে মুক্তি পাবেন। এ প্রসঙ্গে সেই ১৯৭০ সালে প্রকাশিত অজয় ভট্টাচার্যের কুলি-মেম উপন্যাসের কথা মনে এলো। সেখানে চা-বাগানের অশিক্ষিত কুলিদের প্রসঙ্গে পাই- 'একে ত কলেরার আতংক, তার উপর চিকিৎসাবিদদের এ দৌরাত্ম্য-মজুররা প্রমাদ গুণল। কিন্তু উপস্থিত এ বিপদ থেকে উদ্ধারের আর কোন দ্বিতীয় পথ নাই দেখে অবশেষে বস্তিগুলো খালি করে সোজা পথে তারা বনে-জঙ্গলে পালিয়ে গেল। ... এখন এ গহন অরণ্যে রোগ ও রোগীর সন্ধান করবে কে? সবাই বুঝল, এরপর আর রোগ নিয়ন্ত্রণ একেবারেই অসম্ভব।'

অবশেষে সারা বিশ্বই ধরে নিয়েছে এই ভাইরাসে তাদের সবাই আক্রান্ত হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রথম পদক্ষেপ 'হোম কোয়ারেন্টাইন'। এর মাধ্যমে আক্রান্তকারীদের গতিটাকে কমানো। এখন গতিরোধ করার গুরুত্ব অনেক। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নতুন নতুন অস্থায়ী হাসপাতাল বানাচ্ছে, ডাক্তারদের প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্টসহ সব ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত। বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নানা বিষয়ে কন্টিবিউট করছে। সাধারণ রোগে রোগীদের জরুরি না হলে ডাক্তারের কাছে যেতে না করা হয়েছে। জরুরি আর করোনা আক্রান্ত রোগী সবার চিকিৎসার ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে বাড়ানোর হচ্ছে। সব যেমন হয়ে যায়নি, তেমনি তা থেমেও নেই। সব প্রক্রিয়া চলছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, প্রতিদিন প্রেসিডেন্ট এবং অঙ্গরাজ্যের গভর্নররা ব্রিফিং দিয়ে সব বিষয়ে জনগণকে অবহিত করছেন এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। তারা আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনার স্বল্পতার কথা জানিয়েছেন এবং পরবর্তী ব্যবস্থাপনারও আপডেটও দিচ্ছেন। এই বিষয়গুলো জনগণের মনে বেশ প্রভাব রাখছে বলে আমার ধারণা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোর মাঝে গুজব বা অপপ্রচারগুলো বাড়ছে। কারণ জনগণের আস্থার জায়গা তৈরি হচ্ছে না। দেশের মানুষ জানে জনবহুল এক দরিদ্র দেশের সক্ষমতা কম হবে। তারা একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আর ব্যবস্থাপনার কথা জানতে পারলে নিজেদের তৈরি করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। অতীতে আমাদের দেশের ডাক্তারা অনেক সমস্যার সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। নিপা ভাইরাসকে নিজেরাই সামাল দিয়েছিলেন। ডেঙ্গুতে জনসচেতনতা অনেক কাজে এসেছে। প্রয়োজন সত্যটা জানার। বস্তুনিষ্ঠ এবং পরিকল্পিত কার্যক্রম দরকার। করোনা রোগী ছাড়াও যারা গুরুতর অসুস্থ, তাদের চিকিৎসার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা দরকার। কোন কোন হাসপাতাল কোন রোগী জরুরি সেবা পাবে, এসব ব্যবস্থাপনা জরুরি যেমন, তেমনি সে বিষয়ে জনগণকে অবহিত করার দরকার আছে।

আমাদের দেশে খাদ্য সংকট নেই, কেবল সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আপৎকালীন সংকট মোকাবিলা সম্ভব। কানাডার প্রেসিডেন্ট জাস্টিন ট্রুডো যখন বলেন, বেতন পৌঁছে যাবে, খাবার পৌঁছে যাবে, আপনারা বাড়িতে থাকুন। তখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে তা রূপকথা মনে হবে। কেননা বাংলাদেশে নাগরিকদের সামাজিক নিরপত্তার ইস্যুটি আজ পর্যন্ত সুগঠিত নয়। কানাডা আগে থেকেই শিশুদের জন্য প্রণোদনা, বেকারভাতাসহ মানুষের রেশনিং পদ্ধতি বিষয়ে কাজ করেছে, আমরা হয়তো সে খোঁজ রাখিনি। রাতারাতি অনেক কিছু সম্ভব নয়। কানাডার সরকারও এই মহামারি-উত্তর আর্থিক সংকটে পড়বে না, সে নিশ্চয়তা কেউ বলেনি। কিন্তু তাদের রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে হয়তো দ্রুত এসব ঘোষণা দিতে পেরেছেন। অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকারী আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারলাম সে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা মানে সরকার সে সময় জনগণের ভরণপোষণ করবে। নিউইয়র্কে স্কুলগুলোকে ছুটি দিতে বেশ কালক্ষেপণ হলো শিশুদের দুই বেলার খাবার পাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে। জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইনে স্কুল-কলেজের ক্লাস চালু করা হয়েছে। এজন্য নিউইয়র্কের প্রশাসনকে অনেক প্রযুক্তিবিষয়ক বাজেট তৈরি করতে হয়েছে। আজই খবর পেলাম বাংলাদেশে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণির ক্লাস সংসাদ টিভির মাধ্যমে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এটা খুব আশার খবর, আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমরা দারুণ একটা উদ্যোগ নিতে চলেছি।

আবার গতকালই জানতে পারলাম নিউইয়র্ক ট্রাফিক-পুলিশের নতুন সমস্যা সম্পর্কে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার কারণে খাবারের দোকানগুলো টেকওয়ে ছাড়া বসে খাওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ। ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা তাদের ডিউটির সময় নিকটস্থ ফাস্টফুডের দোকানে বসতেন, ওইসব দোকানের টয়লেট ব্যবহার করতেন; এখন তারা তা পারছেন না। অন্যদিকে, পুলিশশাসিত দেশে এইসব ট্রাফিক পুলিশদের কোনো সেফটি পোশাকও দেওয়া হয়নি। এমনকি মাস্ক বা হ্যান্ড গ্লাভস। অতএব, প্রাকৃতিক এই মহামারি মোকাবিলায় রাতারাতি কেউ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে পড়বে বিষয়টা তা নয়। কিন্তু যখন সরকারপ্রধানের তৎপরতা জনগণের কাছে স্পষ্ট হবে, তখন জনগণও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। সমন্বিত হতে না পড়লে বিপদ বাড়বে একটি দেশের, সমন্বিত না হতে পারলে বিপদ থেকে উদ্ধার পাবে না বিশ্ব। মনে রাখতে হবে, এটা প্রাকৃতিক অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ, এটা কোনো সীমান্ত মানবে না। এ যুদ্ধে মানবতার ঐক্যই জরুরি।

এ যুদ্ধ জয়ী হয়তো মানুষই হবে। পরবর্তী যে সকল দুর্যোগই আসুক না কেন, বিশ্বকে আরও অনেক বেশি বিজ্ঞানের পরিচর্যায় মনোযোগী হতে হবে। া

ষ নিউ ইয়র্ক থেকে