কালের খেয়া

কালের খেয়া


উথানির বাপ

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৯ জুন ২০২০      

হোসেন আবদুল মান্নান

সূর্যাস্তের লাল আভায় চারদিক ফর্সা হয়ে আছে। সবুজ বৃক্ষের একেবারে মগডালের পাতাগুলো অস্তমিত দিবাকরকে সহাস্যে বিদায় জানাচ্ছে। সরাসরি ভেতরে না গিয়ে আমি বাড়ির সামনেই থেমে গেলাম। গাড়ি থেকে মাটিতে পা স্পর্শ করতে না করতেই জানতে পারলাম, সাবের আলী মৃত্যুবরণ করেছে। তবে কোথাও তেমন সাড়াশব্দ নেই। সুনসান, কান্না-বিলাপ, হায়-হুতাশ নেই। বেশ নীরবতা মনে হচ্ছে। আমি জানতে চাচ্ছিলাম, তার কী হয়েছিল? একে-ওকে প্রশ্ন করেও যথার্থ কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। একজন প্রতিবেশী হিসেবে তার মৃত্যুর কারণটি জানা দরকার। তা ছাড়া লোকটাকে তো মাত্র ক'দিন পূর্বেও দেখেছি। আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা ধরে গরু নিয়ে মাঠ থেকে বাড়ি ফিরে আসছে। সেদিন আমি নিজেই তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম-

ভাই কেমন আছ?

মুখে অভ্যাসগত হাসি মাখিয়ে সে উত্তর দেয়, 'ভালোই আছি ভাই।' বরং আমাকে জিজ্ঞেস করে, 'তুমি কেমন আছ?'

আমি বলি, তোমার কয়টা গরু?

'এই তো তিনটা গাই, আর এদের বাছুর। মোট ছয়টা।'

গাভীগুলো দুধ দেয় তো?

'হ ভাই, দুধ দেয়। বিক্রি করে কোনোমতে সংসার চলে।'

ধীর গতিতে গরুর পেছনে হেঁটে আসছে সাবের। হাতে একটি পুরোনো ছাতা ও লাঠি। তাকে খানিকটা মনমরা-মলিন বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বলে মনে হয়েছিল। তবে কে জানত, সে এত তাড়াতাড়ি দুনিয়া ছেড়ে পরপারে যাত্রা করবে! হায়রে মানবজীবন! কারও এক মিনিটের ভরসা নাই। আমি মনে মনে তার কৈশোর এবং যৌবনকালের কথা ভাবছিলাম। ভাবছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের সময় সাবেরের বয়স কত ছিল; কেমন ছিল?



সন্ধ্যার পরই রিকশায় চেপে একজন যুবক মাইকে তারস্বরে ঘোষণা করে যাচ্ছে- কোনাপাড়া নিবাসী মো. সাবের আলী অদ্য বিকেলে ইন্তেকাল করেছে। রাত আটটায় তার নামাজে জানাজায় শরিক হওয়ার জন্য এলাকাবাসীকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। আজকাল গ্রামেও কোনো মানুষের মৃত্যুর সংবাদ মাইকে সহজেই ঘোষণা করে দেওয়া যায়। সাবেরের বেলায়ও একই ব্যবস্থা করা হলো। পাড়া-প্রতিবেশী, নিকটাত্মীয়-স্বজন সবাই ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিচ্ছে সাবেরের নামাজে জানাজায় যাবে। তার আপন দুই ভাই প্রায় বাকরুদ্ধ। তারা নিভৃতে জানাজার সব আয়োজন করে যাচ্ছে। আমিও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাড়ির লোকজনকে তাগাদা দিচ্ছি, চলো সবাই জানাজায় শরিক হই। সাবের ভাই একজন ভালোমানুষ ছিল। সে কারও কাঁচা আইলে কখনও পা দিত না। সারা জীবন গ্রামেই কাটাইয়া দিছে বেচারা। কোনোদিন শুনিনি, সাবের কোনো বড় ধরনের অন্যায়-অপরাধ করেছে। শরীর খাটাইয়া সংসার চালাইয়া গেছে, তবু নীচুমানের কোনো কাজ-কর্মে লিপ্ত হয় নাই। সে একজন ধার্মিক প্রকৃতির মানুষ ছিল। সব সময় চুপচাপ, স্বল্পভাষী থাকত। অপ্রয়োজনে বাহুল্য বাক্য বিনিময় করা তার একেবারেই স্বভাববিরুদ্ধ ছিল। এক কথায়, সে ছিল সাদা মনের মানুষ।



জানাজার পথে মসজিদের সামনেই দেখা হলো তার ছোট ভাই নঈমের সঙ্গে। আমি জিজ্ঞেস করি, কী অসুখ হয়েছিল সাবের ভাইয়ের?

ছোট ভাই আমতা-আমতা করে উত্তর দেয়, 'না ভাই, তেমন কিছু না। ভাই তো বলত, তার পেটব্যথা। কোনো খাবারই গিলে খেতে পারত না। অনেক দিন যাবৎ কষ্ট করতেছিল।'

ডাক্তার দেখাইছিলা?

'দু-একবার ডাক্তার এসে দেখেছে। রক্ত পরীক্ষাও করা হয়েছে। ডাক্তার কিছু পাই নাই।'

ঔষধপত্র খায় নাই?

নঈম বলে, 'ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রমতে বাজার থেকে ঔষধ আনতে দেখেছি। খাইতেও দেখেছি। তবে কতদিন খাইছে তা বলতে পারত না। যাক ভাই, আল্লাহ নিয়া গেছে, কারও হাত নাই। আমার ভাইয়ের জন্য ছোট বড় সবাই তোমরা দোয়া করো।'

আমি বললাম, আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসিব করুন। চলো, সবাই মিলে জানাজা পড়ে আসি। আল্লাহই তাকে হেফাজত করবেন।



স্পষ্ট মনে পড়ে, মুক্তিযুদ্ধের সময় সাবেরের বয়স ১৭-১৮ বছর হবে। আমার তখন ১০। সে কোনো স্কুলে লেখাপড়া করে নাই। পারিবারিকভাবে সচ্ছলতায় ছিল না তারা। মাঠের কৃষিকাজ করাই পৈতৃক পেশা। অনেক ভাইবোন। সহায়-সম্পদ ছিল খুবই সীমিত। টানাপোড়েনের সংসার। ক্ষেতের ফসল, মাঠের ধান, বিলের মাছ- এসবই ছিল এদের বাঁচার একমাত্র অবলম্বন। সহজ-সরল গ্রাম্য জীবনাচার নিয়েই আর দশজনের মতো বেড়ে ওঠে সাবের। ৭১ সালে তার সমবয়সী কেউ কেউ গোপনে মুক্তিযুদ্ধে গেলেও সে যেতে পারেনি। এ নিয়ে তার সারাজীবন অনেক আফসোস ছিল। কারণ তাকে বলা হয়েছিল, লেখাপড়া না-জানা মানুষকে মুক্তিফৌজ বানায় না। ফলে যুদ্ধের দিনগুলোতে তার মন সব সময় বিষণ্ণভরা থাকত। দিনভর রাখালের মতো কাজ আর রাতে রেডিওতে চরমপত্রের নেশা। সে যেন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকত দীর্ঘ দিনাবসানের। সাবের সবার মধ্যেও যেন একা। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ চলেছে। চারদিকে ভয়-ভীতি, শঙ্কা, উৎকণ্ঠা। কোথাও একটি পাতা নড়ে উঠলে মানুষ চমকে উঠত। বাঁশের ঝাড়ে আচমকা দমকা বাতাসে বাঁশে-বাঁশে সংঘর্ষ হয়ে বিকট শব্দ হলেও লোকজন প্রাণভয়ে পালাত- এই বুঝি পাঞ্জাবি চলে আসছে! যে যেখানে থাকত প্রাণের ভয়ে দৌড়াত। দিনভর এমনি আতঙ্কিত থেকে সন্ধ্যার পরে প্রায় প্রতি বাড়ি থেকে প্রবীণ ও যুবক শ্রেণির কিছু মানুষ জড়ো হয়ে দূরে কোথাও গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারের খবর শুনতে উদগ্রীব হয়ে থাকত। সেকালে একটি ভালো রেডিওর মালিক হওয়া সাধারণ ব্যাপার ছিল না। তখন আমাদের গ্রামসুদ্ধ জানত, রবু মিয়ার বাড়িতে থ্রি ব্যান্ড রেডিও আছে। এতে স্বাধীন বাংলা বেতার ছাড়াও বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা ধরে। সেখানে গিয়ে সবাই ভিড় জমাত। তবে মিয়া সাহেবের একটিই অনুরোধ ছিল- সবাই যেন অতি সন্তর্পণে এসে চুপচাপ খবর শুনে চলে যায়। স্থানীয় রাজাকাররা জানতে পারলে তার বাড়ি পুড়িয়ে দেবে। যারা খবর শুনতে আসে, তাদেরও জীবন যাবে। এ বিষয়ে সবাই একমত হন এবং অতি গোপনীয়তা রক্ষা করে চলতেন। এমনকি দিনের বেলায় পরিবারের সদস্যদেরও জানানো হতো না যে তারা প্রতি রাতে মিয়ার বাড়ি গিয়ে খবর শোনে।

প্রতিবেশী অনেকের সঙ্গে গোপনে খবর আর চরমপত্র শোনার জন্য সাবের নিয়মিত সহযাত্রী হতো। একান্ত আগ্রহে বসে থাকত- কখন চরমপত্র শুরু হবে! এমআর আখতার মুকুল সাহেব যুদ্ধদিনে 'চরমপত্র' পাঠ করে দুনিয়াব্যাপী বিখ্যাত হয়েছিলেন। তার ব্যঙ্গাত্মক, রসাত্মক ও আঞ্চলিক ভাষার উপস্থাপনা স্বাধীনতাকামী কোটি কোটি বাঙালির মানসিক শক্তি ও প্রশান্তির অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছিল। সাবের রেডিওর সব কথা যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারত না। তথাপি গভীর মনোযোগী এক নিয়মিত শ্রোতা। মনে হয়, রেডিওর সব খবরই এতদিনে তার মুখস্থ হয়ে গেছে। কোনটার পর কোনটা প্রচার হবে তা সে পূর্বেই বুঝতে পারত। তবে তখন তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় মূলত দুটো বিষয়- এক. চরমপত্র, দুই. উথান্ট।

খবর শুনে মধ্যরাতে সংগোপনে বাড়ি ফেরার পথে সাবের প্রায়ই সমবয়সী শিক্ষিত কাউকে জিজ্ঞেস করে একটু পরিস্কার ধারণা নিত। তেমনি একদিন সঙ্গে থাকা বন্ধু হাসানকে জিজ্ঞেস করে, 'হাসান, বল তো- একটা লোকের নাম প্রত্যেক দিন শুনি; এই মানুষটা কে?'

হাসান বলে, 'কার নাম জানতে চাস্‌?'

'এই যে বলে উথান না কী যেন, ওনি কী?'

ও, উথান্ট সাহেবের কথা বলছ?

'হ। এই লোকটার কথা সব দেশ থেকেই খবরে বলতেছে।'

হাসান বলে, 'তিনি তো জাতিসংঘের মহাসচিব।'

তার কথা সব দেশ শোনে। কারণ তিনি দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের যে সমিতি আছে সে সমিতির বড় নেতা।

সাবের- ওনি তো আমাদের বাংলাদেশের পক্ষেই মনে হইতেছে।

হাসান- অবশ্যই। তিনি চাচ্ছেন আমাদের দেশের নিরীহ মানুষকে যাতে পাকিস্তানিরা হত্যা না করে বা জ্বালাও-পোড়াও না করে।

সাবের- আমার তো মনে হয় মানুষটা খুব ভালো। আল্লাহ তারে বাঁচাইয়া রাখুক।

হাসান- মনে রাখিস, তার বাড়ি কিন্তু বার্মায়।

সাবের- তাই নাকি! আরে বার্মায় তো আমার দাদা, চাচা- এরা সবাই ছিল। তারা বার্মার কত মজার মজার গল্প করত। দু'য়েক জন তো বার্মা থেকে লম্বা লম্বা মহিলা বিয়ে করে দেশে নিয়ে আইছিল। ছোট সময় তুইও দেখছিলি, মনে হয়।

হাসান বলে, উথান্ট মানুষ হিসেবে খুবই উচ্চশিক্ষিত। রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বড় ডিগ্রিধারী লোক। তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন আমাদের দেশের মানুষের যাতে আর কোনো ক্ষতি করতে না পারে পাকিস্তানি জান্তারা।

সাবের যথারীতি রাতে খবর শুনতে যায়। মুক্তিযুদ্ধে যেতে না পারার কষ্ট প্রতিনিয়ত তাকে তিলে তিলে দহন করছে। ক'দিন পর আকস্মিকভাবে সাবের তার আসল সিদ্ধান্তের কথা জানায়। সে বলে, শোন হাসান। কখনও বিয়ে করলে আমার যদি ছেলে সন্তান হয় তার নাম রাখব উথান।

সাবেরের উথান্ট উচ্চারণটি আসে না। সে তার মতো করেই বলে।

উচ্চস্বরে হাসি দিয়ে হাসান বলে, তোর মেয়ে হলে কী করবি?

অনেকক্ষণ ভেবেচিন্তে দৃঢ়তার সঙ্গে সাবের উত্তর দেয়, তো আর কী করা! তবু এই নাম ছাড়ব না। মেয়ে হলে নাম রাখব 'উথানি'। এবার হাসান অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। খুব ভালো, খুব ভালো। তাই হবে। দেখব ভবিষ্যতে কী করবি।

এরই মধ্যে অনেক দিন অতিবাহিত হলো। হাসান এসব কথা ভুলেই গেছে। তার মাথায় কলেজের লেখাপড়া। দেশ স্বাধীন হলো ঠিক নয় মাস পরে। সদ্য স্বাধীন দেশে সাবেরকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করানো হয়। বছর দুই পরে সাবেরের স্ত্রী রহিমা এক শ্যামলা বর্ণের কন্যা সন্তান জন্ম দেয়। বাড়ির সবাই মেয়ের নাম রাখে কুলসুম। মা রহিমা রাখে রাবেয়া বেগম। অন্য সবার থাকলেও মেয়ের নাম নিয়ে সাবেরের কোনো আগ্রহ নাই। এতে তার ব্যক্তিগত উচ্ছ্বাস বা আবেগ প্রকাশ করে নাই। সে তার যুদ্ধকালীন শপথের মতো সেই অঙ্গীকারমতে কন্যার নাম রাখে 'উথানি'। সবাই চমকে ওঠে। কেউ কেউ হাসা-হাসি শুরু করে। এটা কী নাম গো? এটা কোন্‌ দেশি নাম? মুসলমান মেয়ের নাম কি এমন হয়? নানা জনের নানা কথা। কিন্তু সাবের আলী ধীর-স্থির। যেন দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব। তার মেয়ের নাম উথানি থাকবে। আর এই নামের কোনো বদল হবে না।

গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ৪৭ বছর পর আমাদের গ্রামের সাবের আলীর মৃত্যু হয়। এলাকার স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রজন্মের ক'জনই বা প্রকৃত ঘটনা জানত? তাকে গ্রামের সব শ্রেণির মানুষ কেন উথানির বাপ বলে ডাকত? অথচ পরে তার আরও একাধিক ছেলে সন্তান জন্ম নেয় কিন্তু তার নিজের নাম থেকে যায় 'উথানির বাপ' বলেই। উথানির বাপ নামের নিচে যেন পর্বতের মতো চাপা পড়ে যায় বাবা-মায়ের দেওয়া নাম সাবের আলী। কী আশ্চর্য! লক্ষ্য করলাম, মৃত্যুর দিনও এলাকার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা বলাবলি করছিল, উথানির বাপের রোগ বলতে একটাই ছিল, সারা বছরের পেটের ব্যথা। এর কোনো উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়া গেল না। দেশ-বিদেশের কত ডাক্তার-কবিরাজ এসে ঔষধপত্র দিয়ে গেল, কেউ তারে ভালো করতে পারল না। বেচারা কষ্ট করতে করতে শেষ পর্যন্ত মরেই গেল। া