কালের খেয়া

কালের খেয়া


দুঃসময়ের কবিতা

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৯ জুন ২০২০      
কোয়ারেন্টাইনে ভগবান

রবীন্দ্র গোপ



[করোনাভাইরাস নিয়ে যে শিশু জন্ম নিলো]



ভগবান ঘুমোচ্ছে ঘুমাতে দাও, তিনি ক্লান্ত

হাঁচি কাশি জ্বর নিয়ে হাসছে করোনা

তাকে একাকী আইসোলেশনে পাঠাও

সে পর্যন্ত শেষ চুম্বনের স্বাদ আমাকে নিতে দাও।



নীলাঞ্জনা আমি জানি আবার তোমার সাথে

হবে দেখা, আমাদের জন্য তৈরি হচ্ছে স্বর্গের বাগান

মঙ্গল গ্রহের বাড়িটায় করোনাকে পাঠাবো একাকী

তবে ভয় হয় আমার করোনা নিজেই তো জ্বর সর্দি নিয়ে কষ্টে আছে।



করোনার জন্য আমার করুণা হয় কোয়ারেন্টাইন

শূন্য পড়ে আছে ওখানে ঘুমোবেন ভগবান।

এখন তার ক্ষমতা কমে গেছে

আসছে না আর কোনো রোগী, অসহায় ভাইরাস বিনাশ হলো

ভগবানকে এবার জাগানো যায় পৃথিবীতে সব পাপ

মোচনের আনন্দে এবার মানব সভ্যতা আবার জাগছে

এবার ভগবানের বাড়িটায় মাঙ্গলিক উৎসব হবে।





হুবহু আমার মত

শামীম আজাদ



এ শহর থেকে চলে যাওয়া

মৃত মানুষের সংখ্যা

এই নিয়ে হল সাত।

শেষ মানুষটি এ তল্লাটেই ছিলো

সেইন্ট প্যাট্রিক চার্চের পরের

চটুল বাড়িটিতে,

ফ্ল্যাট নম্বর আট।



আমিও দেখেছি নাকি তারে

হয়রান হাল সে হতভাগীরে।

রঙিন ট্যাসেল বাঁধা

চাকার চেয়ারটি ঠেলে ঠেলে যেতে।

রোববারে রোমান রোডে

রবারের কোট পরে উহাতেই বসিতো সে রোদে।



কে জানে হয়তো সে গতকালই

হুবহু এমনি কোন

অথবা প্রায় এই পণ্যশূন্য দোকানেই

এসেছিলো। দস্তানা হাতে, মুখে মাস্ক

র‌্যাক থেকে শেষ শক্ত পাউরুটিটি

নেড়েচেড়ে

'অখাদ্য' বলে রেখে গিয়েছিলো।

আর আজ আমি

সেই মরা মানুষের পরিত্যক্ত

রুটিটিই ছুঁয়ে দেখিতেছি

আমারও লাগিতেছে শক্ত!



ভাবতেই বিষাক্ত সাপের মত

রুটি ছেড়ে র‌্যাক থেকে

ছুড়ে যাই, পড়ে যাই।

কেউ তবু আসে না ধরিতে

দূর হতে দাঁড়িয়ে বলে মিজ,

ইউ অল রাইট?

স্যরি,

ইট ইজ সাচ এ ন্যাস্টি ভাইরাস

উই অল হ্যাভ টু ফাইট!



সে নাকি আমারই মত ছিল একা।

সমিল বয়স ছিলো, ছিলো সুচিবায়ু,

কেবলি বলিত নিজে নিজে কথা!



হয়তো সে সারা দিন ছিল কোরেন্টিনড।

সকালে পার্সেল এলে

ডোর বেল শুনে

খোলেনি দুয়ার

'প্লিজ পোস্টম্যান ওখানেই রেখে যাও' বলে,

ওয়াশিং লিকুইড দিয়ে পুনরায়

হাত মুখ নখ ধুয়ে

প্যাকেট খুলিয়া দেখে মেয়ে তার

গরমের দেশ থেকে পাঠায়েছে

তিনখানা মাস্ক আর

বারোটি প্যাকেট ভরা স্যানিটাইজার।



হয়তোবা তারপর

চা বানিয়ে বসে

আমারই মত পেয়েছে সে

এক চিরকুট আর চকোলেট বার

তাতে লেখা, মা আমার

বাঁচতে হলে এ থেকে দিও না কাউকে

কোন ভাগ, খবরদার!



অশনি সংকেত

দুলাল সরকার



মেধাবী প্রকৃতি- ঋণী আমি

সর্বোচ্চ প্রযুক্তি তার করায়ত্ত



স্বয়ংক্রিয় শক্তির অধীনে সব জীব

জীব-অণু সৃজনের উৎস আঁধার,



ধ্বংস ও সৃষ্টির উৎসরণে প্রকৃতি বিরূপ

ধ্বংসের নেশায় মত্ত চরিতার্থরূপ



অসহায় মানুষ আজ যূপকাষ্ঠে

বিশ্বজুড়ে করোনার অশনি সংকেত,



পৃথিবী ক্রমশ ত্রস্ত- বিপর্যস্ত মানব অস্তিত্ব

স্তব্ধ জনপদ, ভয়ংকর হাসির উল্লাসে,



নির্বাক প্রকৃতি তার নিষ্ঠুর খেয়ালে

স্তব্ধ বিজয়ের রথ- শুধু ক্রীড়নক,



কালবেলা?

ভাঙবে না মেঘের উৎসব নিস্তেজ সৌরভা?



কোয়ারেন্টাইনে

উম্মে মুসলিমা



যার সাথে পরিচয় আছে বা যে প্রায়শ হেঁটে যায়

কলোনির দক্ষিণের সেমি পাকা পথ দিয়ে

হাত উঁচিয়ে চলন্ত গাড়ি থামায় আর

তর্জনী দিয়ে নাক খুঁটে থেমে যায় গলির দোকানে

সে যত বড় মহাজন হোক কাব্যে কিংবা শিল্পে

তাকে নিয়ে দানা বাঁধে না খি ত আসঙ্গলিপ্সা।

একবার নিউ মার্কেটে কে যেন বলছিল 'দেখ দেখ

এ সময়ের সেরা কবি, দিব্যি বসে ফুচকা খাচ্ছে'

আমি বাঁ হাতে চোখ ঢেকে ঝট করে থামের আড়ালে লুকাই।

দেখবো না। দেখলেই তার গোঁফে লাগা তেঁতুল টক,

খাবারে মাখামাখি দাঁত আর গলার ভাঁজে ঘামে ভেজা

পাউডার জমা দেখে মন ভেঙে যেতে পারে।

জানি সে পরে থাকে স্বেচ্ছায় দু'পায়ে দু'রঙের পঞ্জ

শার্টে বেঠিক বোতাম লাগিয়ে কপচায় বোদলেয়ার

সে থাক তার মতো। আমি থাকি খোয়াবের ওমে।

উদয়শংকরকে দেখে মৈত্রেয়ী দেবীর নাকি ভারি

নিম ব্যক্তিত্বের মানুষ মনে হয়েছিল

আমারও যে তা হবে না তার নিশ্চয়তা কী?

আমার অসংগতি নিয়ে আমিও তো কোয়ারেন্টিনে।



মরামানুষের শুমারি

আনিসুর রহমান



কাঁপে দেশ দুনিয়া শিশু যুবক বৃদ্ধ সকলে

পানশালা ধর্মশালা আকাশ বাতাস জল স্থল-

ঘাট মাঠ হাট সবই আজ আতঙ্কের কারফিউ;

কে বাঁচে, কে মরে- ঘরে ঘরে কে খায় কে অনাহারে?



শুরু হয় ক্ষণগোনা, বিপর্যয়ের শেষ সীমানা;

দিন দিন দুনিয়া চলেছে জাহান্নামে-

দেশের পর দেশ আজ সর্বনাশের কিনারে

কলকারখানা গাড়িঘোড়া থেমেই গেছে হঠাৎ করে!



কে কবে মরে, সে ফর্দ হাতে করে মানুষ ভুলে গেছে;

কার কী নাম; আজরাইলের খবর নাই আজ;

খবর আছে ভাইরাসের ও মরা মানুষের শুমারির;

সংখার শীর্ষে ইতালি এর পর চীন স্পেন জার্মানি . . .



বাছাই চলছে আজ- কে শয্যা পাবে কে পাবে না!

কে খাবে কে খাবে না- কার মুখে ওষুধ দিবে কার মুখে দিবে না?

কার লাশ ফেরারি কারটা নয়- কে খবর হবে কে হবে না?

কে মৃতের শুমারিতে স্থান পায়, কে বাদ পড়ে?



কার মরা কবরে- কার মরা পোড়ে?

কে কার কবর খোঁড়ে- কে কার চিতায় পোড়ে?





রুখে দেই কভিড নাইন্টিন

ঋষি অরুণ চন্দ্র



বসন্তের কয়েকটি কোকিল যোগ দিয়েছে মৃত্যুর মিছিলে

প্রেমিক প্রেমিকারা ভুলতে বসেছে ভেনিসের গন্ডোলা ভ্রমণ।

দূরের ঝুল বারান্দা থেকে ভেসে আসে করুণ সুরের মূর্ছনা

বহুদিন ধরে নির্ঘুম রাত কাটায় বৃক্ষের সবুজ পল্লবেরা!

আকাশের মুক্ত বিহঙ্গের মুখ ঢেকে যায় কালো মুখোশে

হাঁসের পাল খুঁজে বেড়ায়; কোথায় আছে উন্মুক্ত জলরাশি

পরিচ্ছন্ন গলির ল্যাম্পপোস্ট সেও দাঁড়িয়ে কাঁদে একা...

যখন শুনেছে, কোয়ারেন্টিনে চলে গেছে প্রিয় চায়ের পেয়ালা।

সুনসান নীরবতায় হেঁটে বেড়ায় প্রাণঘাতী কভিড নাইন্টিন

তবুও জেনিফার হলার লড়ে প্রবল দৃঢ়তায় অতি গোপনে...