কালের খেয়া

কালের খেয়া


প্রেম স্মৃতি ও সম্ভাবনার উপন্যাস

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৯ জুন ২০২০      

আবু বকর সিদ্দিক

জীবনের প্রথম প্রেম-যে প্রেমে থাকে প্রচণ্ড ইমোশন আর কৌতূহল, সেই প্রেম যদি হয় না-পাওয়ার, সেই প্রেম যদি হয় 'অচরিতার্থ প্রেম'-তবে তাকে ভুলা যায় না। সে-প্রেমের স্মৃতি একটা মানুষের মনোচৈতন্যে প্রভাব ফেলে, সে একটা ঘোরের মধ্যে থাকে; সে ঘোর হয়ত কাটে না সারা জীবনেও! তেমনই এক অচরিতার্থ প্রেমের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে জফির সেতুর 'একটা জাদুর হাড়' উপন্যাসে।

উপন্যাসের প্লট খুব আঁটসাঁট, কোনও বাহুল্য নেই। উপন্যাসের নায়ক বিজয়। নায়িকা মিথুন। নায়ক বিজয়ের জবানিতে কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। অনেক দিন আগে মাহমুদুল হকের কালো বরফ উপন্যাসে এ-ধরনের বর্ণনাভঙ্গির পরিচয় পেয়েছিলাম; কিন্তু এ-উপন্যাসের বর্ণনাভঙ্গি আরও বেশি অভিনব। জফির সেতুর উপন্যাসে বৃদ্ধ নায়কের বয়ানে বর্তমানের চেয়ে অতীতের ঘটনাই বেশি এসেছে; কখনও কখনও অতীত, বর্তমান একাকার হয়ে গেছে; সময়ের ধারণাকেই তিনি পরোক্ষভাবে অস্বীকার করতে চাচ্ছেন মনে হয়। কাহিনি বর্ণনায় 'চেতনাপ্রবাহ রীতি'র প্রভাবও রয়েছে। কেননা, নায়ক বর্তমানে বাস করে অতীতকে বর্ণনা করছে, আবার ভবিষ্যতে কী হবে তাও চিন্তা করছে। এ ঔপন্যাসিকের প্রধান পরিচয় তিনি আপাদমস্তক একজন কবি; উপন্যাসের ভাষা কাব্যময় হয়েও গতিহীন হয়নি; বরং কাব্যময় ভাষা পাঠককে যেমন আচ্ছন্ন করে রাখতে পারে, পাশাপাশি উপন্যাসের রস আস্বাদনে এ-ধরনের ভাষা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

১৯৬৫ সালে নায়ক বিজয় পড়াশোনার জন্য সিলেট আসে। যুবক সিলেট শহরের একটা 'টিনের ডেরা'তে বাস করত; সেই সময়ে দেখা সিলেট শহর কেমন ছিল তা বৃদ্ধ বয়সে এসে নিজের স্মৃতিচারণে প্রকাশ করছে; সেই 'অধ্যাত্মনগর' বর্তমানে কতটা পরিবর্তন হয়েছে, সেটাও তার পর্যবেক্ষণে বাদ যায়নি। উপন্যাসের 'রহস্যের নগর' অংশে ঔপন্যাসিক সচেতনভাবেই সিলেট শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বৃদ্ধ নায়কের বয়ানে তুলে ধরেছেন- 'নালন্দা, তক্ষশীলা আর মিথিলা'র সঙ্গে শ্রীহট্টের অতীতকালে যোগ থাকা; সুরমা নদী, চাঁদনিঘাট (যেখানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের বজরা শতবর্ষ আগে এসেছিল!); শাহজালাল (র.) কীভাবে সিলেট এলেন তার বর্ণনা; সুরমা নদীর উৎপত্তি কীভাবে হলো; সিলেট শহরের ধর্মীয় ঐতিহ্য; নাগরী লিপি ও পুঁথি সাহিত্যের ঐতিহ্য; গৌড়গোবিন্দের টিলা (পাহাড়)- আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও ঐতিহ্যের সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে এ উপন্যাসে। বৃদ্ধ নায়কের বয়ানে তার শৈশবকে যেমন পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি গ্রামের একটা কোমল, অপরূপ ও চিরায়ত প্রকৃতির রূপ সেখানে ধরা পড়েছে। যুবক বয়সের মাতাল করা প্রেম যেমন আছে, তেমনি আছে বৃদ্ধ বয়সে এসে সেই প্রেমের স্মৃতি রোমন্থন করা। এ-জন্যই বলছি, এ-উপন্যাসে গ্রাম ও শহর, অতীত ও বর্তমান, যৌবনকাল ও বৃদ্ধকালের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। এ উপন্যাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হচ্ছে কামরুল। কামরুল বিজয়ের বন্ধু। আমার কাছে মনে হয়েছে, ঔপন্যাসিকের মানসচেতনার প্রতিফলন ঘটেছে এ-চরিত্রে- প্রেমদর্শন, জীবন-মৃত্যুদর্শন, ধর্মদর্শন প্রভৃতি বিষয়ে কামরুল প্রগতিশীল চিন্তার পরিচয় দিয়েছে।

ঔপন্যাসিকের জীবনদর্শনটা কী এ-উপন্যাসে? কিংবা প্রেম নিয়ে নতুন কী বলতে চান? ঔপন্যাসিক প্রেমের ক্ষয়িষ্ণু রূপকেই শাশ্বত বলে হাজির করতে চান।

উপন্যাসটির সীমাবদ্ধতার কথা যদি বলি তাহলে বলতে হয়, নায়ক বিজয়ের সমগ্র জীবন এখানে অনুপস্থিত। বিজয়ের শৈশব আছে, যৌবনকাল আছে (তাও সম্পূূর্ণ নয়), বৃদ্ধকালও (তখন বয়স ৭৭) আছে; কিন্তু যেটা নেই তা হচ্ছে নায়ক বিজয়ের বিবাহিত জীবন-মিথুনের প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বিবাহিত জীবনে সেই প্রেমের স্মৃতি, প্রেমের আবেশ বিজয়কে কতখানি প্রভাবিত করেছে তার সরাসরি কোনো বর্ণনা নেই; তবে সমগ্র উপন্যাস পাঠ শেষে এটা বোঝা যায় যে, মিথুনের প্রেমের আবেশ তাকে সারাজীবনই মোহাবিষ্ট করে রেখেছে- জীবন যাপনে নায়কের যে শীতলতা লক্ষ্য করা যায়, তাও সেই প্রথম জীবনের প্রেমের কারণেই। আবার, নায়িকা মিথুনেরও খণ্ডিত জীবনকে উপন্যাসে পাওয়া যাচ্ছে। তবে একটা সার্থক উপন্যাসের অত্যাবশ্যকীয় গুণ হচ্ছে 'পরিমিতিবোধ', 'ঔপন্যাসিকসুলভ সংযম' এবং ' অহেতুক প্রলুব্ধ বর্জন'- এখানে যে ঔপন্যাসিক সফল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আরও একটা কথা বলা দরকার, এ উপন্যাসের 'উৎসর্গ' লেখা আছে, 'যারা ভালোবাসে'; আমারও মনে হয়, 'একটা জাদুর হাড়' উপন্যাসের জাদু তারাই টের পাবে, যারা সত্যিকার অর্থে জীবনে প্রেম করেছে কিংবা করেছিল! া